ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

প্রাণওয়ালারা বাক্সে ভরে প্রাণ নিয়ে ঘুরেন । যেমনটা আইসক্রিম ওয়ালাদের বাক্সে আইসক্রিম থাকে। বাস নামক বাক্সে  প্রায় শখানেক জীবন নিয়ে তিনি এখানে ওখানে দৌড়ান । আর ঐ প্রাণগুলো সেই ভয়ে থাকেন কখন জানি  প্রাণওয়ালার স্টিয়ারিং দু ইঞ্চি ভুলে ঘুরে যায় আর প্রাণটাকে  হারায় । প্রাণওয়ালারা  শুধু তাঁদের প্রাণ  নয় তার চলমান বাক্সের সামনে পেছনে সিএনজি, মাইক্রো, প্রাইভেটকার, রিক্সায় থাকা মানুষদের প্রাণটাও তাঁদের কব্জায় । ভুলে এগিয়ে গেলেই  বা পিছালেই তাঁদের প্রাণের যবনিকাপাত ঘটে যেতে পারে। কারা এই প্রাণওয়ালারা? সহজ উত্তর প্রসঙ্গতই বাসচালক। আর অন্যান্য ট্রাক ছোট গাড়ী বড় গাড়ী সবাই কমবেশী জীবনের বাণ্ডিল  দৈনিক হাতে নিয়ে এখানে ওখানে যান। এভাবে না ভেবে অন্যভাবে ভাবি এবার।  কে দিল সেই মানুষটিকে এতগুলো জীবন নিয়ে ঘুরার অধিকার? উত্তরঃ  যারা লাইসেন্স দেয় । ড্রাইভিং লাইসেন্স। উল্টো দিক থেকে এবার চিন্তা করি । নাম তার ’ট’। সে দুই কিলোমিটার রাস্তা স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ব্রেক কষে মোটামুটি ভালো গাড়ি চালাতে পারে। দু’এক মাস পরে সে ড্রাইভিং লাইসেন্স এর জন্য এপ্লাই করল। কিভাবে যেন লাইসেন্স পেয়েও গেল । আরও কয়েকমাস পড় সে এখন  একটা বাস চালায় । বাসে কম হলেও  প্রতিবার  যাওয়া-আসায় দেড়শ জন মানুষ আনা নেওয়া এখন তার চাকরি এবং সে মানুষটি হয়ে গেল  প্রতিদিন অগুনতি মানুষের প্রাণওয়ালা। ব্যাস! এভাবেই কিছু কিছু জীবনওয়ালারা বা প্রাণওয়ালারা  অধিকার পান আমাদের জীবন আনা নেওয়া করার। কিন্তু সমস্যা হয়তো অন্য কোথাও। এখন অনেকেই হয়তো অভিজ্ঞ চালক রাস্তায় গাড়ি চালান। কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণে  অভিজ্ঞ চালক নিয়োগ বা কাজে নেওয়ার ক্ষেত্রে কতটুকু যাচাই বাছাই করা হয়।  একজন বাস ড্রাইভার কেন শিক্ষিত হওয়া বা নুন্যতম শিক্ষা অর্জন করা ব্যাক্তি নন? বা শিক্ষার কি আদৌ দরকার কিনা? অন্তত সেই বিচার, বিবেচনা, সাধারণ জ্ঞান ধারণ করেন  কিনা যেটা ড্রাইভিং পেশাকে অনেক বড় দায়িত্ব ভাবার মতো মানসিকতার জন্ম দেয়? কেননা এই পেশা একটি যেনতেন পেশা নয় যে চাইলেই একশোজনের প্রাণ একজনের হাতে  স্টিয়ারিং এ বেধে দেওয়া যায়।

accident

ঢাকার রাস্তায় নসিমন করিমনের যেমন অভাব নেই তেমনি এসিস্ট্যান্ট খেতাব প্রাপ্ত ড্রাইভারদেরও অভাব নেই । ১২ বছর বয়সের বাচ্চা থেকে শুরু করে বহু বয়সের গাড়িচালক হর হামেশাই চালকের আসনে বসে  স্টিয়ারিং ঘুরান। শুধু শহর না,  সারা দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক অথবা ব্যাক্তিগত জীবন যাপনে একটা মহাসড়কের অবদান সবার আগে। মহাসড়ক ছাড়া কোন কাজের গন্তব্যে পৌঁছানো, উন্নয়ন, নির্মান, মুমুর্ষ রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া ইত্যাদি সম্ভব হয়নি, হবেনা। কিন্তু সেই  মহাসড়কটিই  যারা দখল  করে রেখেছে তাঁদের কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন করাটা বোকামি কিনা আমার জানা নেই । সারাদেশে বেশিরভাগ দুর্ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যানজটের কারণে সৃষ্ট। একজন বাস চালক, ট্রাক চালক বা প্রাইভেটকার চালক স্বভাবতই তারাতারি গন্তব্যে পৌঁছাতে চান। তখন কেউ অতিরিক্ত সীমা লঙ্ঘন করে উচ্চগতিতে গাড়ি চালান। বিশেষ করে যানজট লেগে থাকা শহরে অল্প ফাঁক ফোঁকর পেলেই চালকেরা জ্যাম থেকে দ্রুত গতিতে বেড় হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন আর তখনই ছোটখাটো দুর্ঘটনা অথবা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও ঘটে যায় ।  কিন্তু অনিরাপদ সড়ক, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচলের জন্য শুধু চালকরা দায়ী বলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্বে থাকা ব্যাক্তিরা দায় এড়াতে পারেননা। যতটুকু নিরাপদ সড়ক ও দুর্ঘটনা মুক্ত দেশ চাই বলে আমরা স্লোগান দেই ততটুকু টেকনিক্যালি  এবং সাবধানতা অবলম্বম করে  চালক নিয়োগ, গাড়ী চালানোর প্রযুক্তি জ্ঞানসহ সর্বনিম্ন কমন্সেন্স থাকা ব্যাক্তিদেরকে দায়িত্ব প্রদান ও যাকে তাঁকে লাইসেন্স ইস্যু করার বিষয়ে সচেতনতা অবলম্বন করা গেলে হয়তো অচিরেই মহা সড়কে মৃত্যুর মিছিল কমানো সম্ভব । আর এসকল  দায়িত্বগুলি দায়িত্বে থাকা মানুষেরা  একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে কয়েক পয়সা  ‘স্পিড মানি/ঘুষের’ লোভ সামলিয়ে  ঠিক মতো পালন করলেই বহু মায়ের কোল খালি হওয়া হ্রাস পাবে বলে মনে করি।

বাস মালিক সমিতি এবং পরিবহন শ্রমিকদের আচানক ধর্মঘট ও দুদিনের জনদুর্ভোগের প্রধান কারণ একটাই তা হল আইন, অপরাধ, দুর্ঘটনা সম্পর্কে গণপরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অজ্ঞতা। মালিক সমিতি পক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকরতারা যখন খুন-অপরাধ এবং দুর্ঘটনার পার্থক্য বোঝেনই না তবে তাঁদের দিক থেকে ধর্মঘট ডাকা খুবই স্বাভাবিক। ধর্মঘট ডেকে সেই সব আইন সম্পর্কে না জানা নিরীহ শ্রমিকদের ভাংচুর থেকে শুরু করে ইটপাটকেল ছুড়তে পাঠানো মালিক পক্ষদের যদি সড়ক দুর্ঘটনা আইন বা উক্ত বিষয়গুলো বোঝানো যেতো তবে সংঘর্ষে কোন শ্রমিকের হয়তো প্রাণ হারানোর মত ঘটনা ঘটার ছিলনা।  অদ্ভুত ব্যাপার হল গাড়ি চালক গাড়ি চালানো অবস্থায় কারো প্রাণহানি ঘটানোর পর চালকের অবহেলায় অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটালে সেটি সড়ক দুর্ঘটনা না হয়ে খুন হিসেবে আখ্যায়িত হবে এই কথা বোঝানোর পরেও আমরা বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলি। তবে দুর্ঘটনায় দোষী চালকের অবশ্যই সুস্থ তদন্ত হওয়া উচিৎ। এই ‘তদন্ত’ ঘটিত সমস্যা আমাদের দেশে এমনই জটিল যে কেউ কাউকে মানেনা । শেষে আইন অবমাননা পর্যন্ত গড়ায়।

সোজা সাফটা কথায়  জন সাধারণ অফিস যেতে, বাসা যেতে, স্কুল কলেজ যেতে গনপরিবহণ যেমন চায় ঠিক সেরকমই  নিরাপদ সড়ক চায় । রাস্তা থেকে বাসার দরজায় নিরাপদে পৌঁছাতে চায় এবং ব্যাক্তি-স্বার্থ বিশেষে না হয়ে সকল গণমানুষের কাতারে সড়ক দুর্ঘটনা আইনের বাস্তবায়ন চাই । আর জনগণের এই চাওয়াকে পূরণ করতে হলে পরিবহন শ্রমিক থেকে শুরু করে পথচারী, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সকলের আইন সম্পর্কে জ্ঞান এবং ধারণা থাকাটা যেমন জরুরি  তেমনি চালকদেরকে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়াটাও জরুরি যে ‘দুর্ঘটনার’ নাম করে অপরাধ করলে তার শাস্তি হবেই । কারণ দুর্ঘটনা কখন আসে কেউ জানেনা এটি যেমন সত্য,  তেমনি আইনের ফাঁক-ফোঁকর  বুঝে অবহেলাকারীদেরও অভাব নেই । উপযুক্ত আইন ও দণ্ডবিধির অভাব অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে যেমন দেয় তেমনি ’গাড়ি চালক মানেই দুর্ঘটনা ঘটাতেই পারে’  মুখস্ত বাক্য থেকে বেড়িয়ে আসাটা খুবই জরুরি।