ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

একজন নারীকে যদি জিজ্ঞেস করেন  আপনার দিন কিভাবে শুরু হয়, তবে তিনি নিশ্চয়ই বলবেন ঘুম থেকে উঠেই তাঁর প্রথম ভাবনা পরিবারের সবাই সকালে কী নাস্তা করবে, ছেলেটা মেয়েটা কখন স্কুলে যাবে, কার ব্যাগ গোছাতে হবে, কার রুম পরিষ্কার করতে হবে, কোন জামা কাপড় কে পরে যাবে, কার রাস্তায় গেলে মাথা ব্যাথা হয়, কার ব্যাগে ঔষধ দিয়ে দিতে হবে, কটার মধ্যে নাস্তা রেডি করতে হবে, এবং সব শেষে স্বামীর জন্য কিভাবে দিনটাকে শুভ করে দেওয়া যায় ইত্যাদি ইত্যাদি । অবশেষে সকাল বেলা একজন নারী নিজের জন্য হয়তো ১০ মিনিট সময় বের করে নেন। ব্রাশ করেন, ভালো  কাপড় গায়ে দেন, নিজের কর্মস্থল থাকলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। মার্চের ৮ তারিখ বিশ্ব নারী দিবসে এই ব্যাপারটি অন্যরকম হয় কিনা জানিনা । কজন নারীই বা জানেন মার্চ ৮ তারিখ হল নারী দিবস অথবা নারীদের জন্য একটি দিন যে দিনে নারী অধিকার নিয়ে পৃথিবী জুড়ে আলোচনা, র‍্যালি, লেখালেখি, কতকিছুই করা হয় । যদি বা জানলোই, জেনে কী হয়?  নারী তো নারীই থেকে যায়। নারী  থেকে যায় পুরুষ শাসিত সমাজে, পরিবারে, মহল্লায়, রাষ্ট্রে, পথে ঘাটে, বিছানায় অথবা মাটি চাঁপা দেওয়া নষ্ট ভ্রূণের ভিড়ে। কারন নারী  একটি অভিশাপ,  এই সমাজ বলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

উচ্চ বা মধ্য  বিত্তদের চাইতে নিম্নবিত্ত পর্যায়ের  নারীরা  অগ্রাধিকার  এবং অধিকার বেশীই পায় বলে  মনে হয় । আমাদের দেশের নিম্নবিত্ত নারীদের অবাধ কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ, পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে জীবনধারণ, সংসার পরিচালনা থেকে শুরু করে রিক্সা চালানো বা হকার হিসেবে অবাধ উপার্জনের যে স্বাধীনতা  রয়েছে সেটি বরং চোখে লাগার মত । খবরের কাগজে প্রায়শই এমন খবর দেখে আমরা আবেগে আপ্লুত হবার চেষ্টা করি যে, জরিনা এখন রিক্সা চালিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছে অমুক এখন ফেরি করে কাপড় বিক্রি করে সচ্ছলতার মুখ দেখছে । আমাদের আবেগ খুব বেশী চুইয়ে গড়িয়ে পরে কারন এরা নারী এবং এদের এই কাজটা করার কথা ছিলনা কিন্তু দারিদ্র্যতা তাঁদের করতে বাধ্য করেছে । কথাটা অন্যভাবে ঘুরিয়ে বোঝার চেষ্টা করলে তা হবে এইরকম- (১) আমাদের বহুদিনের সামাজিক কাঠামো, অনুশাসন, নারীদের ঘরের বাইরে যেতে নেই, ইত্যাদি জাতীয় কথার সাথে এদের পরিচিতি নেই।  (২) এমন কোন পুরুষ নেই যে ঐ নারীটির জন্য দু’বেলা আহার দেবে এবং বাড়ির  বাইরে যেতে নানা রকম বিধি-নিষেধ বানিয়ে রাখবে।

যার ফলশ্রুতিতে ঐ সকল  নারী নিজেকে একজন পুরুষের সমান তো মনে করেই বরং সেই আত্মবিশ্বাসটি তৈরিও করে ফেলেছে যে একজন পুরুষ বিনাও সে বেঁচে থাকার যোগ্যতা রাখে । কিন্তু  মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত পর্যায়ের নারীরাই কর্মক্ষেত্রে বা পুরুষদের সাথে জীবন সংগ্রামে কম অবদান রেখে চলেছে বলে মনে হয়। পারিবারিক চাহিদা মেটানোর জন্য পুরুষ একজনের আয় যথেষ্ট হলেই শিক্ষিত নারী অর্ধাঙ্গীনিটি  ঘরে বসে পরিবার সামলান। স্কুলে ছেলেমেয়েদের আনা-নেওয়া করেন অথবা ছেলেমেয়েদের স্কুলের অবিভাবক কর্নারে বসে সারাদিন আড্ডা দেন। প্রশ্নটা হল,  শুধু পরিবার কেন্দ্রীক ভাবনা নিয়ে পরে থাকা নারীদের জন্য ৮ মার্চ কোন কাজে আসবে কী? নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে বহুমুখী ভাবনার বিকল্প নেই  বলে বোধ করি। উপার্জন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমাজ পরিবর্তন পরিমার্জনের মতো বড় বড় সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ করার মানসিকতা থাকা  জরুরী। তবে হয়তো পুরুষ শাসিত সমাজের বুনে দেওয়া সেই বীজ  ’নারী তুমি ঘরে থাকো’ শব্দটি  অঙ্কুরেই পচে-গলে মরে যাবে বলে বিশ্বাস।

নারী দিবস

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০১৬ ও আসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬ সালে ৭২৪ জন নারী ধর্ষনের শিকার হয় বাংলাদেশে। এই অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে প্রায় দু’জন নারী ধর্ষনের শিকার হয়েছে। আমরা যতোই সভ্য, ডিজিটাল, উন্নয়ন বলে/করে  লাফাচ্ছি ততোই নারী নির্যাতনের হার চোখের সামনে দিয়ে বাড়ছে । শুধু ধর্ষণ  বা শ্লীলতাহানি নয় যৌতুক, সালিশ, ফতোয়া ইত্যাদি উছিলায়  নারী নির্যাতন চলছেই । বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দোষীদের বিচার নেই। আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। অথবা আইন প্রয়োগকারীদের গাফিলতির শেষ নেই। রাস্তাঘাট ফ্লাইওভার নির্মিত হচ্ছে উন্নয়নের কথিত জোয়ার বইছে ঠিকই কিন্তু নারীদের প্রতি সেকেলে ভাবনাটা আমাদের  মধ্যযুগের মতোই রয়ে গেছে । পুরুষ ভাবে তাঁর শরীরের জোর বেশি তাই নারীদের উপর জোড় খাটায়। কিন্তু পুরুষ এটাও  ভাবে জোড় ফলিয়ে সে পুরুষত্ব নয় পশুত্ব দেখায়। এই পশুত্বকে সে বৈধ্য বানানোর চেষ্টা করে এই বলে যে, ’মেয়ে মানুষকে লাই দিতে নাই’ এই নোংরা মানসিকতাকে ঠিকই লাই দিয়ে  চলেছে  আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজ!

করুণাময় রাষ্ট্র কখনও কখনও নারীবাদী হওয়ার চেষ্টা করেছে। নারীদের জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করেছে, প্রতীতি গণপরিবহনে নারীদের জন্য আলাদা সিট রাখার ব্যাবস্থা করেছে এমনকি নারী শিক্ষাকে ফ্রি করে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছে। আবার এই রাষ্ট্রই ধর্ষিত, খুন হওয়া নারীটির সঠিক বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে। রাজপথে মানুষের আন্দোলন দেখেছে । নারীবাদী লেখিকা এবং নারী অধিকার নিয়ে যে সকল নারীরা কথা বলেন তাঁদের উপর চড়াও হওয়াটা আমাদের জন্য স্বাভাবিক। সোশ্যাল মিডিয়াতে অশ্লীল কমেন্টের বাহার। প্রকাশ্যে হুমকি-ধামকি তো বোনাস হিসেবেই থাকে । আর এসব দেখে আমাদের খুব ভাল অভ্যাস হয়ে গেছে । সাইবার ক্রাইম তো সেইসব লেখিকারা করেন যারা ’লজ্জা শরম’ ভুলে পুরুষীয়  কথাবার্তা বলেন, তাই না? কারণ আমরা তো বিশ্বাস করিই ’লজ্জা হল নারীর ভূষণ’!  কিন্তু পুরুষরা নির্লজ্জ হলেও যায় আসেনা! ভাগ্যটা ভালো যে একজন পুরুষ জন্মাবার সাথে সাথেই  অন্তত একজন মা নিয়ে জন্মায়। শুধু  সেই একজন নারীটি তাঁর ছেলের কাছে হয়তো নিজেকে সেফ মনে করে। কিন্তু অন্যান্য  মায়েদের জন্য সেই পুরুষটিই  হয়তো বিপদজনক। স্মার্ট পুরুষকে একটু দুর্ধর্ষ হতে হয় বৈকি! নাহলে বন্ধু-স্বজন-পাড়াপ্রতিবেশী তিরস্কার করতেই পারে ’হাফ লেডিস’ বলে। লেডিস তো একটি গালি!  অপমানজনক একটি সম্বোধন! আমরা তো হরহামেশাই অকর্মা পুরুষকে গালাগাল দেই এই বলে যে ’যাও হাতে চুরি, শরীরে শাড়ি পরে ঘরে বসে থাকো’! কি অদ্ভুত গালি! সব মিলিয়ে আমরা হলাম মানুষ! আমাদের বোধকে  বলা হয় মনুষত্ববোধ। কিন্তু এটি যদি মনুষত্ব বোধ হয়, তবে সুশৃঙ্খল  পিঁপড়া  আরেক বিশৃঙ্খল পিঁপড়াকে গালি দিয়ে বলতেই  পারে যে ’তুই একটা মানুষের বাচ্চা’।

বাংলাদেশে সরকারি মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয়মাস হলেও অন্যান্য প্রাইভেট ফার্মে এই সুবিধা খুব একটা দেখা যায়না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন সময় চাকুরীজীবী নারীদের  চাকরি ছেড়ে দেবার সংখ্যাটা  বেশি। সরাসরি চাকরি ছাড়েন বলতে না পারলেও কোম্পানিগুলো ইনিয়ে বিনিয়ে চাকরি ছাড়িয়ে নেয়। এক্ষেত্রে সরকার ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করি। তাছাড়া স্কুল-কলেজে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থীদের উপর শারীরিক নির্যাতনের চিত্রও নেহাত কম নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধে অনেক আগেই আইন করা হয়েছে কিন্তু আইনটি খুব বেশি কার্যকর বলে মনে হয়না। এক্ষেত্রেও প্রশাসনের দৃষ্টি রাখা দরকার । মোট কথা নারীদের ক্ষেত্রে, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোন কিছুই সহনশীল পর্যায়ে নেই। সারা বছর পুরুষ দিবস কায়েম করার পরেও একদিন ৮ মার্চ নারী দিবসে নারীদের জন্য ছুটি নেই!  তবুও নারী দিবস সফল হউক। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা হউক।