ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, মানবাধিকার

 

বিগত প্রায় এক যুগ আগে থেকেই আদিবাসীরা নিজেদের অবস্থান থেকে জানান দিয়েছে যে তাদের আদিবাসী বলে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।  আর ঐ সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি আদিবাসীদেরকে অ-আদিবাসী প্রমাণ করার জন্য উঠেপরে লেগেছে সুবিধাবাদীরা। তবে সুবিধাবাদী বা অ-আদিবাসী প্রমাণ করতে চাওয়া পক্ষের মানুষেরা কিন্তু সংখ্যায় খুব বেশি নয়। হাতেগোণা গুটিকয়েক কথিত বুদ্ধিজীবীরাই এই যুদ্ধের হাল ধরে বসে আছেন। অন্যদিকে সংবিধানে আদিবাসী শব্দকে বহাল করার জন্য যুদ্ধ করছে প্রায় দশগুণ বেশি জনতা । সুতরাং খালি চোখেই এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশে সব নাগরিকের অধিকার সচেতনতা বাড়লেও অধিকার বন্টনে অন্তরায় কমেনি । উল্টো করে বলতে গেলে বলা যায়, আঙ্গুল উঁচিয়ে যাদের সংখ্যালঘু বলা হয় তাদের সংখ্যাটাই সংখ্যালঘু বলে অধিকার হরণকারীদের চাইতে বেশি।  

গত ৫ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস ২০১৭ -কে সামনে রেখে একটি সংবাদ সম্মেলনে,  গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন,

‘দেশে শুধু আদিবাসী নয়, আওয়ামীবাসী ছাড়া আর কেউ ভালো নেই। তবে দেশটা শুধু আওয়ামীবাসীর নয়। সবাই মিলে যুদ্ধ করে দেশটাকে আমরা স্বাধীন করেছি।’

কথাটি সরকার দলীয় ব্যাক্তিদের কাছে বন্ধুসুলভ না হলেও দেশের সার্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষকাপট অনেকটাই  যুক্তিযুক্ত । চলমান বছরে জানুয়ারী মাস থেকে আজ আগষ্ট  মাস পর্যন্ত নির্যাতিত, সুবিধা বঞ্চিত, অধিকার হারানো, খুন, ধর্ষণের শিকার মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয় । রাঙামাটির লংগুদুতে হামলা, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা এই দেশের কারোরই অজানা নয়। হাজার ঘটনার ভিড়ে এটি হয়ত খুবই ছোট ঘটনা মনে হতে পারে । কারণ প্রতিদিন ঘটনা-দুর্ঘটনা তৈরি হচ্ছেই রীতিমত। তবে ঘটনার যারা ঘটাচ্ছেন তারা কিন্তু খুবই অল্প সংখ্যক। সংখ্যাটা তখনই বেড়ে যায় যখন ঘটনার সুস্থ তদন্ত না করেই দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নির্যাতিতদের বিপক্ষে অবস্থান নেন । আমাদের জাতীয় দৈনিক, ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়াসহ সব ধরণের গণমাধ্যম যখন সরব হয়ে উঠে তারপর না হয় ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন অনেকে তবুও একটা সাধারণ ডায়রি করতেও হাঙ্গামা হয় থানাগুলিতে।

adivasi

ঘটনা দুর্ঘটনায় নিমজ্জিত জনতা যখন মুখ তুলে বাঁচার পথ খোঁজে তখন প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের সম্প্রদায় । বা সাম্প্রদায়িক বিভাজন। এই পর্যন্ত সব রকমের বিচার বহির্ভূত অপরাধ অথবা সমস্যা নিরসন হয়নি এমন সব ঘটনার অন্তরালে সাম্প্রদায়িকতার মনোভাবই একমাত্র দায়ী। আমাদের জনপ্রতিনিধিরা ভোট জয় করেন কিন্তু দেশ জয় করেন না। জনপ্রতিধি নির্বাচনের সময় এলেই শুধু আদিবাসী জনপদ নয় সুবিধা বঞ্চিত মানুষেরা যেখানে থাকেন সেখানে কাদা মাড়িয়ে ভোট চাওয়া হয় কিন্তু ভোটের প্রতিদান দেবার সময় অজুহাতের কাদা হয় তিন গুণ তখন আর সেই কাদা মেখে মেঠো পথে কারোরই হাঁটা হয় না। তাহলে আপনাকে মানতেই হবে আমরা কয়েক সম্প্রাদায়ের মানুষ। কেউ আদিবাসী, কেউ নৃতাত্বিক, কেউ ক্ষুদ্র, কেউ সুবিধা বঞ্চিত, কেউ সংখ্যায় লঘু আবার কেউ দলের বাইরের যাদের জন্য সুবিচার বা অধিকারের প্রয়োজন নেই।  

৯ আগষ্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস ২০১৭ এর প্রতিপাদ্য বিষয় হলো  জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণা পত্রের এক দশক পূর্তি।  কিন্তু এক দশকে  কোন অণুচ্ছেদটি ঠিকভাবে বাংলাদেশের আদিবাসীদের জন্য প্রয়োগ হয়েছে তা জানতে চাইলে এক দশকের রেকর্ড ঘাটতে হবে। হয়ত রেকর্ডেও সমস্যা থাকতে পারে। ১৯৯২ সালে লোগাং গণহত্যার পর জানানো হয় গণহত্যায় শুধুমাত্র ১২ জন আদিবাসী নিহত হয়েছিল । কিন্তু স্থানীয় হামলার শিকার আদিবাসীরা জানিয়েছিল প্রায় ১১০০ লোক হত্যা করা হয় ঐ হত্যাকাণ্ডে।   ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ টি কার্যকর করার কথা হয়তো এই দেশে এখনও কেউ ভাবেনি কারণ বাংলাদেশের আদিবাসী আছে কিনা এই তর্কবিতর্কের ইতি টানতেই কেউ রাজি নয় । দূর থেকে দেখলে আপনার আমার মনে হতে পারে তথ্যের অভাব, পৃষ্ঠপোষকার অভাব  অথবা বাংলাদেশে ইহা কোন কালেই সঠিক ভাবে গবেষণা করা হয়নি। কিন্তু সমস্যাটা হয়ত শুধুমাত্রই রাজনৈতিক । যার কারনে ১৯৯২ এর লোগাং হত্যাকাণ্ড এবং ২০১৭ সালের লংগুদু হামলার ঘটনাও খুব বেশিদূর নাড়া দেয়নি আমাদের ।

আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণা পত্রের অনুচ্ছেদ-৮ এ বলা হয়েছে আদিবাসীদের ভূমি, ভূখণ্ড অথবা সম্পদ থেকে বিতাড়িত করার লক্ষে অথবা প্রভাবিত করে এমন যে কোন কার্যক্রম করলে রাষ্ট্র তা প্রতিকারে করবে। ভূমি সমস্যা নিরসনে আদিবাসীদের জন্য আলাদা ভূমি মন্ত্রণালয় গঠন করার দাবি বার বার উত্থাপন করা হলেও তা সরকার পক্ষ থেকে কোন সময় গ্রহণ করা হয়নি । অন্যদিকে জাতীয় উদ্যান, পর্যটন প্রকল্প প্রনয়নের নামে আদিবাসীদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করত ভুমি লুটের পাঁয়তারা কমেনি বরং নতুন করে গুঞ্জন উঠেছে শেরপুর জেলার গজনীতে নবমতম জাতীয় উদ্যান করার সিদ্ধান্ত প্রায় চুড়ান্ত। জানা মতে, গজনীর আশেপাশের এলাকায় শেরপুর জেলার গারো, কোচ, বানাই, হাজং ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর মোট   আদিবাসীদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ বসবাস করে। তাদের বেশিরভাগ বসতভিটাও সেখানে আর এই জাতীয় উদ্যানের সিদ্ধান্ত তাদের জন্য অভিশাপ হিসেবে আবির্ভুত হবে তা একশো পার্সেন্ট । বিগত কয়েক বছর আগে ২০০৪ সালে মধুপুর ইকোপার্ক আন্দোলনের কথা আমরা সবাই জানি । যখন বনরক্ষিদের গুলিতে মিছিলরত অবস্থায় পিরেন স্নাল নিহত হন । এটুকু হলেই হয়ত ক্ষান্ত দেওয়া যেত কিন্তু গত বছর আবার মধুপুরের অরণখোলা মৌজার ৯,১৪৫.০৭ একর ভূমিকে “সংরক্ষিত বনভূমি” ঘোষণা করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় । আদিবাসীদের জন্য ভুমি সমস্যা সৃষ্টি করে এই নিত্য নতুন সমস্যা তৈরি পেছনে নীল নকশা আদিবাসীদের জীবন মান উন্নয়ন যখন ব্যাহত করে চলেছে তখন আপনি আমি সুর মিলিয়ে বলতে পারিনা যে আমরা উন্নয়নে ভেসে যাচ্ছি ।

 

আদিবাসীদের সমস্যার প্রধান কারন বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতা। যারা এই ধরণের মনোভাব সৃষ্টি করেন তাদের সংখ্যা নেহাত হাতে গোনা কয়েকজন অথবা কয়েকশো। অন্যদিকে অত্যাচার নির্যাতন, অধিকার আদায়ের প্রত্যাশ্যায় ফেটে পরা জনতার সংখ্যা বহুগুণে বেশি হওয়াতেই দেশটা টিকে আছে বিশ্বাস করতেই হবে আমাদের । কেউ একজন আপনাকে আমাকে সম্প্রদায়ে বিভাজন করে ফায়দা লুটুক তা আমাদের কাম্য নয় । আদিবাসীদের সংবিধানে আদিবাসী হিসেবে নামকরণ পেতে হয়ত আরও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে কিন্তু দমে যাবার আগে অধিকারকামী জনতাকে জানতে হবে শত্রুরা সংখ্যায় খুব বেশি নয় । নির্যাতিতরাই এখনও সংখ্যায় গরিষ্ঠ। আদিবাসীরাও। অধিকার আদায়ে দশ হাতের জোর দিয়ে এক হাতের অপশক্তিতে গুড়িয়ে দেওয়া খুব বেশি কঠিন নয় ।