ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

নাম তার মুজাফফর আলী মিয়া, বয়স ৭০। ১৯৭১ এ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি ছিলেন কাদেরিয়া বাহিনীর গুপ্তচর। পাক বাহিনীর কাছ থেকে কৌশলে তথ্য সংগ্রহ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পৌঁছে দিতেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কাছে। বঙ্গবীরের খুব প্রিয়ভাজন ছিলেন তিনি। তার ভূমিকার জন্য তাকে বলা হতো সিরাজুদ্দৌলাহ’র আলেয়া। এই খেতাব প্রাপ্ত হয়ে তিনি গর্ব বোধ করতেন। তিনি বলতেন, ‌’পুরুষ হলেও আমার কাজ ছিল আলেয়ার মতই।’ মুক্তিযুদ্ধের আগে তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন। সংখ্যায় হাজার দুয়েক হবে।

১৯৭১ টাঙ্গাইলে মোতায়েন ছিল পাঞ্জাব রেজিমেন্টের শক্তিশালী ইউনিট। মুজাফফর আলী জানালেন, সেই রেজিমেন্টে আসলাম নামে একজন নম্র-ভদ্র ক্যাপ্টেন ছিলেন। কবিতা শুনিয়ে তার সাথে তিনি সখ্য গড়ে তুলেছিলেন। ক্যাপ্টেন আসলামের কাছ থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে কাদের সিদ্দিকীকে পৌঁছে দিতেন তিনি। তিনি জানালেন, পাক সেনাদের ভূঞাপুর উপজেলা আক্রমণের দিন-তারিখ জেনে নিয়ে মুক্তিবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। তার সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ভূঞাপুরের সিংগুরিয়া ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবীর। এর ফলে বড় ধরণের রক্তপাত থেকে বেঁচে যায় ভূঞাপুরবাসী। নাগরপুর উপজেলার অপারেশনের খবরো তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। মোজাফফর আলী বললেন, নাগরপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি চিনতেন না। কাদের সিদ্দিকী তাকে জানিয়ে দিলেন, যে দলের কাধে গামছা থাকবে তারাই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি গামছা দেখেই মুক্তিযোদ্ধাদের সনাক্ত করেছিলেন। এ গামছাই এখন কৃষক-শ্রমিক-জনতা পার্টির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

কম বিপদেও পড়তে হয়নি মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আলীকে। পাকিস্তানী এক দোসরের উপকার করে তাদের হাতেই প্রায় মৃত‌্যুর মুখে পড়েছিলেন তিনি। তখন স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরি করতেন তিনি। কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গাতে ছিল তার অফিস। অফিস-বাড়িটির মালিক ছিলেন পাকিস্তানীদের দোসর বলে খ্যাত মুসা তালুকদার। বাড়িটি রাজাকারের বলে মুক্তিযোদ্ধারা জুলাই মাসের কোন এক সময় বাড়িটি উড়িয়ে দিতে আসে। মুসা তালুকদার ছিলেন মুজাফফর আলীর প্রতিবেশী। কাদের সিদ্দিকী তাকে বলেছিলেন, দেশ স্বাধীন হলে এই জায়গায় তিনি একটি কলেজ কিংবা হাসপাতাল স্থাপন করবেন। ওদিকে ডিনামাইট প্রায় সেট করা হয়ে গেছে। মুজাফফর আলী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে কাদের সিদ্দিকীর এই অভিপ্রায়ের কথা জানালে মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশন বাতিল করে ফিরে যান। তবে খবরটি চাপা থাকেনি। পৌঁছে যায় রাজাকার মুসা তালুকদারের কানে। পরদিন দলবল নিয়ে তার ছেলে খোকা তালুকদার সেখানে উপস্থিত হয়। মুজাফফর আলী ভেবে ছিলেন, বাড়িটি রক্ষা করার জন্য খোকা তালুকদার তাকে অভিনন্দন জানাবেন। কিন্তু তারা তাকে ধরে এলেঙ্গা বাস স্ট্যান্ডের কাছে নিয়ে যায়। খোকা তালুকদার তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী আখ্যা দিয়ে রাইফেলের বাট দিয়ে ওখানেই পেটাতে থাকে। পরে তার পরিচিত অন্য এক রাজাকারের সুপারিশে তিনি প্রাণে রক্ষা পান। এই স্মৃতি মনে হলে এখনো শিউরে উঠেন মুজাফফর আলী। অবশ্য এতে তিনি গর্বও বোধ করেন।

মুক্তিযোদ্ধা মুজাফফর আলী বর্তমানে টাঙ্গাইলের আদী টাঙ্গাইল এলাকায় বসবাস করছেন। তার ৫ ছেলে ও ২ মেয়ে। বর্তমানে তিনি মুক্তিযোদ্ধার ভাতাও পাচ্ছেন নিয়মিত। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নম্বর: ০১১৮০/১০৫৫৩। তার ব্যক্তিগত কোন চাওয়া পাওয়া নেই। বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসে তিনি ভূমিকা রেখেছেন এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে তিনি জানালেন।


৬ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. বোতল বাবা বলেছেনঃ

    ”তার ব্যক্তিগত কোন চাওয়া পাওয়া নেই। বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসে তিনি ভূমিকা রেখেছেন এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে তিনি জানালেন।”

    ”হয়ত বা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না
    বড় বড় লোকেদের ভীড়ে
    জ্ঞানী আর গুনীদের আসরে
    তোমাদের কথা কেউ কবে না।
    তবু হে বিজয়ী বীর মুক্তিসেনা
    তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না।
    না না না শোধ হবে না।।”
    -কথা ও সুরঃ আতাউর রহমান

    মুক্তিযোদ্ধা মুজাফফর আলী/সিরাজুদ্দৌলাহ’র আলেয়া’র জন্য এই বিজয়ের মাসে জানাচ্ছি অসীম শ্রদ্ধা।

  2. নুরুন্নাহার শিরীন

    নুরুন্নাহার শিরীন বলেছেনঃ

    এই মুজাফফর আলী এবঙ তাঁর মতোই আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তাঁকে ও সকল মুক্তিযোদ্ধাকে লাল সালাম, সততঃ সালাম।

  3. জনতার মতামত বলেছেনঃ

    একচল্লিস বছর পরে এসেও-
    মূসা তালুকদারেরা দাপটে আছে
    মুজাফ্ফর আলীরা ভাতা খেয়ে বাঁচে।
    অনেক মুজাফ্ফর আলী বিক্রীত আজ
    মূসা তালুকদারদের কাছে।

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...