ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

 

abdul_jabbar_0

ছবিঃ সংগৃহীত

১.

সাল ১৯৭১। দেশের সকল মুক্তিযোদ্ধারা দিনরাত পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন। দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে তাঁদের এই তীব্র ত্যাগ। খেয়ে না খেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়ার জন্য অকাতরে যুদ্ধ করেছেন। কেউ সম্মুখ যুদ্ধ করেছেন, কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করে খাইয়েছেন, কেউ বিনামূল্যে মুক্তিযোদ্ধাদের চুল কেটে দিয়েছেন, কেউ বিনা ভাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাট পাড় করেছেন, কোনো কোনো মা তার একমাত্র সন্তানদের পিঠে হাত রেখে বলেছেন, ‘যা বাবা যুদ্ধে যা। দেশটা শত্রুমুক্ত কর’। কেউ আবার যুদ্ধদিনের সমস্ত ছবি সংগ্রহ করেছেন। এদের কারো অবদান অস্বীকার করার মতো নয়। এদের অগাধ ভালোবাসা ও অকৃত্রিম ত্যাগের কারণে আমরা ‘বাংলাদেশ’ পেয়েছি।

মুক্তিযোদ্ধারা দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসায়, দেশ মাতৃকা থেকে শত্রুমুক্ত করার আশায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তাদের মনোবল ছিল কঠিন, ইচ্ছা ছিল প্রবল। এই মনোবল তারা কোথা থেকে পেয়েছিল? এই মনোবলের উৎসই বা কি ছিল? এই প্রশ্নটা সবসময়ের।

১৯৭১ সালের ২৫ মে। কলকাতার বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি দোতলা বাড়িতে আশরাফুর রহমান খান, তাহের সুলতান, শহীদুল ইসলাম, টি এইচ শিকদার সহ বেশ কয়েকজন একত্র হয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলেন। স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রধান পরিচালক ছিলেন সমর দাস। এইবার একটু পিছনে আসি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, রাত। মগবাজার থেকে মিছিল নিয়ে কিছু লোক রাস্তায় বেরিয়েছে। তাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল জব্বার। মিছিল শেষে সবাই বাসায় ফিরে গিয়েছে। আবদুল জব্বারও গিয়েছেন। ২৯ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ জামাল আবদুল জব্বারের মগবাজারের বাসায় এসে তাঁকে বাসা থেকে বের করে দিলেন। শেখ মুজিবের শঙ্কা জব্বার জেদী লোক, দেশ ছাড়ার লোক সে নয়। তাই কামালকে পাঠিয়ে একরকম জোর করেই তাকে দেশ ছাড়া করলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় তিনি আগরতলা গিয়ে পৌঁছালেন। তত দিনে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছে, তাজউদ্দীন আহমদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী।

যুদ্ধের দিনে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে আবদুল জব্বার আগরতলা রেডিওতে গান করলেন। ‘ঘুরে এলাম কত দেখে এলাম, আমার গাঁয়ের মতো তবু দেখিনি, সে যে আমার প্রিয় জন্মভূমি’ আগরতলা রেডিওতে এটি তার প্রথম গাওয়া গান। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর তিনি যুক্ত হলেন তাদের সাথে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম গানটিই আবদুল জব্বারের গাওয়া। টি এইচ শিকদারের লেখা, নিজের সুরে ‘অনেক রক্ত দিয়েছি আমরা, দেব যে আরো, এ জীবনপণ, আকাশে-বাতাসে লেগেছে কাঁপন, হায়রে বাঙালি ডাকিছে রণ’। একের পর এক দেশাত্মবোধক গান প্রচার হতে থাকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে।

‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘সোনা সোনা বলে লোকে বলে সোনা’, ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি’, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘বিচারপতি তোমার বিচার’, ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ সহ অসংখ্য গান প্রচার হতে থাকে। এই সব গান আর প্রতিবাদী কবিতার ভাষাই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস ছিল।

তাছাড়া ‘চরমপত্র’, ‘জল্লাদের দরবার’, ‘বজ্র কণ্ঠ’ অনুষ্ঠানগুলো খুবই জনপ্রিয় ছিল। মূলত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দেশাত্মবোধক গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন চেতনায় উদ্দীপ্ত করতেন, এইসব দৃপ্ত কণ্ঠ শুনে যোদ্ধারা আরো বেশি উদ্ধুদ্ধ হয়ে, শক্তি নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।

শাহনাজ রহমতুল্লাহ, আংশুমান রায়, সমর দাস, আপেল মাহমুদ, রথীন্দ্রনাথ রায়, অরুণ গোস্বামী, মান্না হক, মাধুরী চ্যাটার্জী, ইয়ার মোহাম্মদ, প্রবাল চৌধুরী, কল্যাণী ঘোষ, উমা খান, নমিতা ঘোষ, স্বপ্না রায়, জয়ন্তী লালা, অজিত রায়, সুবল দাশ, কাদেরী কিবরিয়া, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, লাকী আখন্দ, বুলবুল মহালনবীশ, ফকির আলমগীর, মকসুদ আলী সাই, তিমির নন্দী, মিতালী মুখার্জী, মলয় গাঙ্গুলী, রফিকুল আলম প্রমুখ শিল্পীরা এইসব গান ধারণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রজ্বলিত করে তুলতেন। এই উদ্যমতাই মুক্তিযোদ্ধাদের শত্রু নিশ্চিহ্ন করতে সহায়তা করেছে।

২.

স্বাধীন বাংলার শিল্পীরা কাজে কর্মে কোনো রকম কার্পণ্য করেননি। খেয়ে না খেয়ে তাঁরা কাজ করেছেন। মুজিবনগর সরকারের অনুরোধে আবদুল জব্বার একটি সাংস্কৃতিক দল নিয়ে সারা ভারতে ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতেন এবং অর্থ সংগ্রহ করতেন। কলকাতা থেকে বম্বে পর্যন্ত একটি সাংস্কৃতিক দল বিভিন্ন জায়গায় গান করে প্রায় ১২-১৩ লাখ টাকা সংগ্রহ করে সরকারকে দিয়েছিলেন।

শুধু তাই-ই নয় ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আগে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি খালি গলায় গেয়েছেন এই আবদুল জব্বার। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশ্যে সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি দেন। ‘জয় বাংলা’ সিনেমায় গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা এই গানটি প্রথম আবদুল জব্বারই করেন। পরে অবশ্য তা দেশের গান হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধুকে ‘বাবা’ এবং ফজিলাতুননেসা মুজিবকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন তিনি। শেখ মুজিব তাকে খুব পছন্দ করতেন। প্রায়শই বাসায় ডেকে তার গান শুনতেন। মুজিব তাকে আদর করে ডাকতেন ‘পাগলা’ বলে।

মোহাম্মদ দখিল উদ্দিন ও ফুলজান বেগমের চার ছেলে এক মেয়ের মধ্যে আবদুল জব্বার সবার ছোট। কুষ্টিয়ার এই সন্তানের খেলাধুলার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। ফুলজান বেগমের গানের গলা খুব ভালো ছিল। তাঁর খুব শখ ছিল, ছোট সন্তান যেন গায়ক হয়। তাই ছোটবেলা থেকেই গান করতেন আবদুল জব্বার।

পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের আগ থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে গান করতেন। ছাত্রলীগের তোফায়েল আহমেদ, মরহুম আবদুর রাজ্জাক, আবদুল কুদ্দুস মাখন, আ স ম আবদুর রব ও ওবায়দুল কাদেরদের সাহচর্যে সবসময় ছিলেন তিনি। ছাত্রলীগের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গান করতেন। তখন এমন কোনো দিন পাওয়া যায়নি যেদিন তিনি গান করেননি। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতেই তিনি ছাত্রলীগের হয়ে গান করেছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু তাকে মন্ত্রী হওয়ার কথা বলেছিলেন, শিল্পকলা একাডেমীর বড় পদে চাকরিও দিতে চেয়েছেন, কিন্তু নির্লোভী জব্বার এইসব কিছুই চাননি। গানের প্রতি আসক্তির কারণে একটি সঙ্গীত একাডেমি করতে চেয়েছেন। তাই, বঙ্গবন্ধু ধানমণ্ডির ১৩/১ নম্বর বাড়িতে ‘গীতাঞ্জলি সংগীত বিদ্যালয়’ করার সুযোগ করে দিলেন। পঁচাত্তরে যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় তখন তার কাছ থেকে বাড়িটি ছিনিয়ে নেয়া হয়। নিজের থাকার জন্য নয়, নতুন ছেলেমেয়েদের গানে দীক্ষিত করার জন্য তিনি এই বাড়িটি এখনো ফিরে পাওয়ার আশা করেন।

৩.

শুধু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রই নয় বাংলা সিনেমায় অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। ‘পিচঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি’, ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘তুমি কী দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান এখনো আমাদের কানে বাজে। গানপাগল লোকটা সারাজীবন গানের জন্যই জীবন কাটিয়ে দিলেন। গানে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’, ১৯৮০ সালে ‘একুশে পদক’ এবং ১৯৯৬ সালে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ দেয়া হয়।

গান গাওয়ার নেশায় তিনি ছুটেছেন এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত। ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগের হয়ে গান গাওয়া, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং বাংলা চলচ্চিত্রের প্লে-ব্যাক কোথাও আবদুল জব্বারকে দমিয়ে রাখা যায়নি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের দক্ষতা দিয়ে সবার মন জয় করে নিয়েছেন। গানের পিছনে ছুটতে ছুটতে তার পড়াশোনা পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি, পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরী তাকে সঙ্গীতে মাস্টার্স ডিগ্রি দিয়ে দেন। কণ্ঠে অসাধারণ জাদুর বলে মানুষকে মুগ্ধ করে রাখতেন বলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করেছিল।

একজন নির্লোভী গান পাগল মানুষ, একজন জাদু কণ্ঠের শিল্পী আজীবন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে তার গানের মধ্য দিয়ে।

বিনয় দত্ত

লেখক, নাট্যকার ও গণমাধ্যমকর্মী