ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমার বড় চাচা (মেঝো দাদার বড় ছেলে) যেদিন মারা গেলেন সেদিন ছিল ঈদ-উল-ফিতর। দুপুরের দিকে মারা গেলেন, এরপর সে কি বৃষ্টি। দাফন হতে হতে রাত ১০টা পার হয়ে গেলো। ঈদের দিন জন্য সবাই বিভিন্ন জায়গা থেকে বাড়িতে ফিরেছিলেন, তাই জানাজা ও মাটি দেয়ার সময় নিকট আত্মীয়দের অর্থাৎ আপনজনদের প্রায় সবাই ছিলেন।

গোরস্থানটা বাড়ি হতে প্রায় কিলো খানেক দূরে। পাকা রাস্তা হতে প্রায় ২০০ গজ রাস্তা কাঁচা আর ওই জায়গাটা বেশ পিচ্ছিলও ছিল। যাহোক, ১০ টার পর দাফন সম্পন্ন হলো আর দোয়াটা আমাকেই করতে অনুরোধ করা হলো। মূল গোরস্থান থেকে বের হয়ে এসে সবাই কাঁদামাটি মাখা হাত ধুলেন গোরস্থানেরই পুকুরে। এরপর আমি দোআ শেষ করে চোখ মেলে দেখি যে, সবাই যে যার মতো তীব্র গতিতে ছুটছে বাড়ির দিকে। যেন দৌড় প্রতিযোগিতার শুরুর বাঁশি কেবলই রেফারি বাজিয়েছেন। আমি চেয়ে চেয়ে দেখতেছিলাম। দূরেই পড়ে আছে লোহার খাটিয়াখানা, যাতে করে একটু আগে চাচাকে নিয়ে এসে চির বিদায় দিয়ে যাচ্ছি আর অল্প কিছু দিনের মধ্যে আমাদেরকেও তাতে উঠতে হবেই।

আমি নির্বাক! একটু আগে যার জন্য সবাই কাঁদতেছিল, বাড়িতে মহিলারা এখনো কাঁদতেছে, আর তাকে মাটির নিচে রাখার পরই এত ভয় তাকে? অথচ তার নিজের দুই ছেলে, দুইজন আপন ভাই, তিনজন আপন ভাতিজা, বেশ কয়েকজন আপন ভাগিনা, অনেক কয়জন আপন চাচাতো ভাই আরও খুব কাছের অনেকেই ছিলেন। আমিতো চাচাতো ভাইয়ের ছেলে তার। সবাই চলে যাচ্ছে, আমি শেষের তিনজনকে দৌড়ায়ে গিয়ে ধরলাম। তিনজনই (আব্দুল মাজিদ, আব্দুস শুকুর, আব্দুল ওয়াজেদ) আমার চাচাতো চাচা অর্থাৎ মৃত চাচার চাচাতো ভাই। বললাম, কাকা খাটিয়া কে নিবে? আসেন। জবাব দিলেন, যাদের ঘরের লোক তারা তো চলে গেলো, তোর আমার কি ঠেকা? বললাম, এটা আমার আপনার সবারই তো। একদিন আপনাদেরও উঠতে হবে এতে, এটা তো মসজিদের। আর যারা চলে গেছে তাদের তো বলে লাভ নাই, আসেন আমরা চারজন মিলে নিয়ে যাই। চারজন মিলে কাঁধে করে নিচ্ছিলাম আর ভাবতেছিলাম যে, হায় রে দুনিয়া! চাচাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম, কাকা, কি দেখলেন? বলে, কোনে? আমি বললাম, এই যে খাটিয়া কাঁধে! বললেন, কি আর দেখবো? বললাম, না দুনিয়া কি দিলো দেখছেন? কোনো মতো কবর দিয়েই দৌড়! এটাই দুনিয়া। নিশ্চুপ জবাব দিলেন তিনজনই।

কেন এই কাহিনী বলা? আমার ওই চাচার ঢাকা, জেলা সদর (পাবনা), থানা লেভেল (সুজানগর) আর গ্রামে তো বটেই, ভালোই সম্পদ আছে। আছে ভালো ভালো আত্মীয় (পোস্ট পজিশন ওয়ালা), আছে নিজের সন্তান (২ ছেলে, ১ মেয়ে), মোটামুটি মানুষ যার প্রত্যাশী দুনিয়াতে তার সবই আছে। কিন্তু, শুধু মাটির নিচে চাপা দেয়ার সাথে সাথেই সম্পদ হাতছাড়া আর স্বজনদের কাহিনীতো শুনলামই। অথচ তার ওই সম্পদ গড়ার ইতিহাস বড় লম্বা আর সুখকর নয়! কি কাজে লাগলো শেষে?

আজ মানুষ আমার আমার করে। সম্পদের বড়াই, পজিশনের দম্ভ, ক্ষমতার অপব্যাবহার তাকে এমন অন্ধ করছে যে, যেন সব কিছুই তার হাতের মুঠোয়। আর যার যা অভাব আছে তার ধারণা যে, আমার অমুক জিনিস থাকলে আমি চিরসুখী হয়ে যেতাম। হায়রে বোকা মানুষ, চিরসুখী? মরার পর একবার চোখ মেলে দেখার সুযোগ দিলে বুঝতে কি তোমরা? সবই তো অন্যের, শুধু হাত বদল আর হাত বদল। আর তাই নিয়েই এত অহংকার? আর যা কাজে লাগবে সেই কাজ যারা করে তাদের নিয়ে কতই না মস্করা। নিজের উপর নিজের এই জুলুমের কি কোনো সীমারেখা আছে?

যেহেতু মরার পর ফিরে আসার কোনো সুযোগই নাই, তাই অন্যের সাথে ঘটে যাওয়া এসব কঠিন আর অপ্রিয় বাস্তবতা দেখে সত্য ও সরল পথে মরার আগেই ফিরে আসা চাই এবং তা এখনই। কারণ বলা তো যায় না, পরের নিঃশ্বাসটাই যে আমার শেষ নিঃশ্বাস না তা কি কেউ জানে?