ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
Final

প্রায় এক দশক আগের কথা। মফস্বল থেকে উঠে আসা এক তরুণ ইট-পাথরের নগরে দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে! খুব থ্রিলিং! স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়! আলোকিত “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক” বিভাগ! অনেক চড়াই-উৎড়াই পেড়িয়ে ২০০৩-২০০৪ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হয়ে গেলাম। প্রথম দিকে প্রায়ই অসুস্থ্য থাকতাম; সরাক্ষণ আচ্ছন্ন থাকতাম গ্রামের মায়ায়। অবাক হয়ে দেখতাম অট্রালিকার পর্বতের নিরন্তর মুশিক প্রশব; নিরস নাগরিক জীবনকে যাপনের রসলো প্রচেষ্টা; ডাকসু ক্যাফেতে রুটিন মাফিক আড্ডাবাজি; মধুর ক্যান্টিনে ছাত্ররাজনীতির মহসমাবেশ উত্তপ্তকরণ ছিল নিত্যদিনের বদঅভ্যাস; টিএসসি, আইবিএ ক্যাফে, সেন্ট্রাল লাইব্রেরী কিংবা কার্জন হলের পশ্চিম গেইটে দলবদ্ধভাবে বিটলামি করাটা পৌছে গিয়েছিল শিল্পের পর্যায়ে; সন্ধ্যায় রোকেয়া হলের গেইটে পলিটিক্যাল বড় ভাইদের সাথে শোডাউন, মধ্য রাতে চানখারপুলে কালা ভূনায় অমৃতের স্বাদ; প্রতিরাতে গণরুম, টিভি রুম কিংবা গেস্টরুমে চলতো ম্যারথন আড্ডাবাজি, সময়করে চলতো ঢাকা সিটির সকল ঐতিহাসিক স্থানগুলো পরিদর্শন, ধারাবাহিক ভাবে সব হলের ক্যান্টিনে করতাম স্ববান্ধব ভূড়ি ভোজন, হলের ছাদে পূর্ণীমা রাতে ভাললাগতো গানের আসর মাতনো, বিকেলে টউশনিতে যাওয়া, প্রতি শুক্রবার, শনিবার ছায়ানটে সংগীতের তালিম গ্রহণ, ডিপার্টমেন্টে সিআর-গিরি, ক্লাস বাং মেরে মিছিলে যাওয়া ইত্যাদি নানা কাজে-অকাজে ডুবে থাকতাম সরাক্ষণ। ক্যাম্পাস দাবড়িয়ে বেড়াতাম ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে থাকতো বনে-জঙ্গলে, মেঘনার জল কিংবা দরবারের বাউল গানের আসরে।

নবীন বরণ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য অডিশন চলছে। অডিশন পর্ব শেষ। টিএসসি’র তিন তলায় অবস্থিত “জয়োধ্বনি” সাংস্কৃতিক সংগঠনের কক্ষে প্র্যাক্টিস করার জন্য আমাকে আসতে বলা হলো। ব্যাচ-৫৭ থেকে আমি গেলাম। সুমি আপু (চিরকুট ব্যান্ড) গাইলেন মৌসুমি ভৌমিকের “আমি শুনেছি সেদিন তুমি” গানটি। কী দারুণ গাইলেন। গানে কীযে দরদ! আবেগে মাখামাখি! তারপর আমি (রাজু চাকলাদার, অর্ফিউস ব্যান্ড) গেয়েছিলাম ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুর’র “আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে” গানটি। গীটার বাজাচ্ছিলেন শোয়েব ভাই (লীড গীটারিস্ট, মেঘদল ব্যান্ড)। শোয়েব ভাই দারুণ বাজাচ্ছিলেন! অসাধারণ! এত দারুন স্ট্রামিং, রীফ, কাট, নোটেশন করছিল যে, মনে হচ্ছিল গীটারে আগুন ধরে যাবে! এখনও চোখে লেগে আছে সেই গীটার বাজানো! আমার দেখা শ্রেষ্ঠ গীটারিস্ট মেঘদলের শোয়েব ভাই!!

পারভেজ ভাইকে (পারভেজ সাজ্জাদ) আমি বলি বাংলাদেশের কৈলাশ খের। দেখতে খুব গম্ভীর মনে হলেও আসলে খুব প্রানোচ্ছল মানুষ। ক্ল্যাসিকাল ও সুফিয়ানা টাইপের গানের বস্ হলো আমাদের পারভেজ ভাই। “সত্যি বলছি তোমাকে আর ভালবাসি না” গানটির স্রষ্ঠা, এ সময়ের জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী জয় ভাই (জয় শাহরিয়ার) বন্ধুসুলভ সারাক্ষণ। গলায় গামছা আর হাতে গীটার। কিশোর দা (কিশোর ক্লডিয়াস) হলো সবধরণের গানের ন্যাচারাল আর্টিস্ট। শুনলেই দিলখোশ। উনারা সহ বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে জনপ্রিয় অনেক আর্টিস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক ছাত্র। ভাবতেই দারুণ লাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীতের আতুরঘর হল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ যেখানে সিনিয়র-জুনিয়র পরম্পরাই যেন গুরু-শিষ্য পরম্পরার ন্যায়। আর সংগীত তো সব সময়ই গুরুমুখী বিদ্যা। তবে আমাদের সিনিয়র ভাই-ব্রাদারগণ শিখিয়েছেন হাউ টু পারফর্ম ইন লাইভ স্টেজ!

পেশাদার কুটিনীতিক, রাজনীতিক থেকে শুরুকরে বাংলাদেশের লীডিং পর্যায়ের অসংখ্য অতি-গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব/পদ অলংকৃত করে রেখেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক স্কলারগণ যাঁদের স্বপ্নের বাতিঘর হলো আমাদের প্রানপ্রিয় “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক” বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলার প্রতিটি শহুরে  কিংবা মফস্বল’র তরুণের স্বপ্নের দিগন্ত বিস্তৃতির বাতিঘর আলোকিত করে রেখেছেন যে বাতিওয়ালা, তিনি আমাদের সকলের প্রিয় অধ্যাপক ডক্টর ইমতিয়াজ আহমেদ স্যার যাঁর জ্ঞানের আলোয় আলোকিত পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়! একঝাঁক স্বপ্নের বাতিওয়ালা(প্রভাষক-অধ্যাপক), ওরিয়েন্টেশন থেকে শুরু করে ক্যাম্পাস জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কাঠামো গড়ে তোলেন অবিরত; আর বাংলাদেশ এগিয়ে যায় আরো এক ধাপ। জয়তু স্বপ্নের বাতিঘর, জয়তু বাংলাদেশ।