ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ২২ নং অভিযুক্ত কানাডা প্রবাসী, মাহফুজুল বারী না ফেরার দেশে চলে গেলেন। গত ২৩ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে গ্রামের বাড়ি রামগতিতে যাবার পথে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকার হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন ও আমার জ্যেঠাতো ভাই সার্জেন্ট আবদুল জলিলের সংগে আগরতলা (ষড়যন্ত্র!) মামলায় অভিযুক্ত বারী ভাইয়ের সাথে আমার ক’বার কথা হয়েছে। সেই স্মৃতিটুকু তাড়া করে ফিরছে আমাকে। তিনি ১৯৭১ সালে ২ নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া আমাদের জৈষ্ঠ্য একজন সহযোদ্ধা। তার মৃত্যুতে স্বভাবতই ব্যথাতুর মন। তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে থাকাকালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন এবং গোপনে সহকর্মীদের নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য কাজ করেন। ১৯৬৬ সালে করাচীর এয়ার ব্যাজ থেকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার একজন অভিযুক্ত হিসেবে তাঁকে গ্রেফতারের পর নির্মম শারিরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।

003.agortola_001

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে আগরতলা (ষড়যন্ত্র!) মামলা ও এর প্রতিক্রিয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ মামলায় অভিযুক্ত যে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল করা হয় তারা হচ্ছেন- শেখ মুজিবুর রহমান, কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, প্রাক্তন এলএস সুলতান উদ্দিন আহমেদ, সিডিআই নূর মোহাম্মদ, আহমেদ ফজলুর রহমান সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মাহফিজউল্লাহ, প্রাক্তন কর্পোরাল আবুল বাশার, মোহাম্মদ আবদুস সামাদ, প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন, রুহুল কুদ্দুস সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. ফজলুল হক, ভূপতিভুষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী, বিধানকৃষ্ণ সেন, সুবেদার আব দুর রাজ্জাক, প্রাক্তন হাবিলদার ক্লার্ক মুজিবুর রহমান, প্রাক্তন ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. আবদুর রাজ্জাক, সার্জেন্ট জহুরুল হক, মো. খুরশীদ, খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান সিএসপি, হাবিলদার আজিজুল হক, মাহফুজুল বারী, সার্জেন্ট শামসুল হক, শামসুল আলম এএমসি, ক্যাপ্টেন মো. আবদুল মোতালেব, ক্যাপ্টেন এ শওকত আলী মিয়া, ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা এএমসি, ক্যাপ্টেন এ.এন.এম নুরুজ্জামান, সার্জেন্ট আবদুল জলিল, মো. মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী, লে. এস.এম.এম রহমান, প্রাক্তন সুবেদার এ.কে.এম তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী রেজা, ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ এএমসি এবং লে. আবদুর রউফ।

004.Granade

পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রজনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার এ মামলাটি প্রত্যাহারে বাধ্য হয়েছিলো। ১৯৬৯ সালে অভিযুক্তরা স্বসম্মানে বীরোচিত মুক্তি লাভ করেন। মাহফুজুল বারী নোয়াখালীর রামগতিতে ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরে জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘অভিযুক্তের বয়ানে আগরতলা মামলা’ তাঁর লেখা একটি বই যা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের একটি অধ্যায়।

পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে আগরতলা (ষড়যন্ত্র!) মামলা রুজু করে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান কে প্রধান আসামি করে জেলে ঢুকিয়ে ছিলো। তার সংগে সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মরত ও প্রাক্তন সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের ও এ মামলায় জড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। তাদের বিরুদ্ধে মূলতঃ যে অভিযোগ ছিল-

ভারত সরকারের সহায়তায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র ও ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা শহরে ভারতীয় পক্ষ এবং আসামি পক্ষদের মধ্যে এ ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে অত্র মামলায় উল্লেখ করা হয় যার জন্য একে আগরতলা (ষড়যন্ত্র!) মামলা বলা হয়।

তৎসময়ে ক্ষমতাবিমুখ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী গ্রাম ভিত্তিক, উগ্র মতবাদে উজ্জিবিত করেছিলেন দেশের ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও জনসাধারণকে, যাদের অধিকার এবং স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি আগরতলা (ষড়যন্ত্র!) মামলা বাতিল, এবং জেলের তালা ভেঙ্গে শেখ মুজিবকে বের করে আনার আন্দোলনকে সারাদেশে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

002.Barri_Bahi

পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দাবাহিনী সারা পাকিস্তানে প্রায় দেড় হাজার বাঙালিকে এ মামলায় গ্রেফতার করে। কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতর ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি এক প্রেসনোটে জানায়, ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এক চক্রান্ত উদ্ঘাটন করেছে। এ প্রেসনোটে ২ জন সিএসপি অফিসারসহ ৮ জনের গ্রেফতারের খবর প্রকাশ পায়। স্বরাষ্ট্র দফতর ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি অপর এক ঘোষণায় শেখ মুজিবুর রহমানকেও এ ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত করে।

বারী ভাইয়ের সহযোদ্ধা আমার জ্যেঠাতো ভাই সার্জেন্ট আবদুল জলিল, (ষড়যন্ত্র!) মামলার ২৯ নং অভিযুক্ত ছিলেন যিনি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধেও আমাদের সাথে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে ছিলেন। তার বাসা থেকেই মামলার আলামত হিসেবে একটি গ্রেনেড উদ্ধার হয়। আগরতলা (ষড়যন্ত্র!) মামলায় অভিযুক্তদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই।

001. Sk. Mujib towards court

আগরতলা (ষড়যন্ত্র!) মামলার বিষয়ে ইতিহাস বিস্মৃতিই আমাদের স্বাধীনতার মূল জাতীয় ইতিহাসকে ভিন্ন পথে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে। আজো এ মামলা ষড়যন্ত্র! মামলা হিসেবেই পরিচিত। আর অভিযুক্তরা আসামী যা হবার কথা নয় বা ছিলো না। এ মামলায় সংশ্লিষ্টদের জাতীয় বীরের মর্যাদা দেয়া উচিত এবং পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করা উচিত। আমাদের জাতীয় বীরেরা একে একে না পাওয়ার বেদনা নিয়েই চলে যাচ্ছেন। বারী ভাইকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলাম লিখবো বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা সে বীর সৈনিকদের কথা। ভাবিনি তাকে নিয়ে লিখতে হবে আজকের এ শোকগাঁথা।

লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কানাডা ইউনিট কমান্ডের অন্যতম নির্বাহী ও বাংলাদেশ প্রেসক্লাব অব আলবার্টা এর সভাপতি।