ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

একটা সময় ছিল যখন বিআরটিএতে যেতে হবে মনে হলেই আমার গায়ে জ্বর এসে যেত। আমি খুব বেশিদিন আগের কথা বলছি না। তখন শত শত দালাল আর নিকৃষ্ট ঘুষখোর কর্মকর্তা-কর্মচারীতে মিলে মিশে একাকার হয়ে থাকত বিআরটিএ’র মিরপুর কার্যালয়। কে যে কর্মচারী আর কে যে দালাল, এটা বোঝাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অফিসের ছোট-বড় কর্তারা নিজেরাই অনেক দালাল পুষতেন। তাদের হয়ে দালালেরা আমাদের মত ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে টাকা আদায় করত আর দিনের শেষে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিত। শোনা যায় যে, পদ-পদবী অনুসারে সবাই ঐ ভাগের টাকা পেত। বিআরটিএ অফিসের বাইরে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য এমনকি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় পর্যন্ত এই চেইন বিস্তৃত ছিল।

আমাদের বর্তমান যোগাযোগ মন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর প্রথম যেই কাজটা করেন সেটা হল বিআরটিএ অফিস থেকে দালাল দূর করে, অফিসের শৃংখলা ফিরিয়ে আনা। সেই কাজে তিনি কতটা সফল হয়েছেন আজ তারই গীত শোনাব।

২০০৯ সালে আমি একটা গাড়ি কিনি, নিশান সানি ই এক্স সেলুন, মেরুন (বা লাল রঙও বলা যায়)। এই মডেলের যত গাড়ি আমি বাংলাদেশে দেখেছি তার সবই হয় মেরুন অথবা বেনসন কালারের। ২০০৯ এর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, ট্যাক্স, ইনস্যুরেন্স ইত্যাদি সকল কার্যক্রম গাড়ি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানই করে দেয় এবং তারপর থেকে আমি গাড়িটি চালিয়ে আসছি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নবায়ন (ট্যাক্স-টোকেন-ফিটনেস) করতে গেলে আমার কাছ থেকে স্মার্ট কার্ড ব্লু বুক এবং ডিজিটাল নম্বর প্লেট এর নামে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার আট শত (সঠিক অংকটা মনে নেই) টাকার মত বেশি নেয়া হয়।

স্মার্ট কার্ড ব্লু বুক (ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন কার্ড) এবং ডিজিটাল নম্বর প্লেট পাবার জন্য সেই টাকা দিতে আমি আপত্তি করিনি। আর আপত্তি করলেও কিছু হত না। সেটা বাধ্যতামূলক ছিল। তখন যারাই বিআরটিএ তে গাড়ির কাগজপত্র নবায়নের জন্য গিয়েছে, অটোমেটিক তাদেরকে ঐ বাড়তি টাকার স্লিপ ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই হিসেবে এতদিনে ঢাকার সব গাড়ির নম্বর প্লেট ডিজিটাল হয়ে যাবার কথা। কিন্তু এখনো রাস্তায় অসংখ্য গাড়ি দেখা যায় যাদের ডিজিটাল নম্বর প্লেট নেই। যাইহোক বাড়তি টাকা দেবার পর প্রায় দুই মাসের মধ্যে ডিজিটাল নম্বর প্লেট লাগানো হলেও ব্লু বুকের জন্য আমি এক বছর যাবত শুধু ঘুরছি আর ঘুরছি। এর মধ্যে রাস্তা ঘাটে বেশ কয়েকবার ট্রাফিক পুলিশকে কাগজপত্র দেখাতে হয়েছে এবং যেসব জায়গায় তারা আমার কাগজ মানতে চাননি, সেসব জায়গায় হালকা নজরানা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে গেছি। তখনো আমি জানিনা বিআরটিএ’র চূড়ান্ত অসৎ কর্মচারী-কর্মকর্তারা আমাকে কি বিপদের মধ্যে ফেলেছে?

২০১৫ সালের শেষ দিকে কিছুদিনের জন্য দেশে আসি। তখন অন্যান্য কিছু কাজের মধ্যে গাড়ির ফিটনেস করানোর জন্য বিআরটিএ’তে যাই। ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে গাড়ি নিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর প্রায় তিন ঘন্টা পর গাড়ির ফিজিকাল ইন্সপেকশন এর জন্য আমার সিরিয়াল আসে। গাড়ি চালিয়ে পরিদর্শকের সামনে যেতেই তিনি বলে দিলেন আমার গাড়ির ফিটনেস হবে না, কারণ ব্লু বুকে লেখা গাড়ির রঙ কালো! হায় ইশ্বর! হায় খোদা! নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। গাড়ি কেনার পর কখনো রঙ করা হয়নি, হাতে লেখা/কম্পিউটারে ছাপানো ব্লু বুক থেকে যখন স্মার্ট কার্ড ব্লু বুক দেয়া হলো তখন বিআরটিএ’র অসাধু কর্মকর্তারা আমার গাড়ির রঙ কালো লিখে দিয়েছেন। আমি গাড়ির পরিদর্শককে যতই বুঝাই, তিনি ততই অবুঝ। কি আর করা। গেলাম সংশ্লিষ্ট কামরায়। আমি আমার সমস্যা বুঝিয়ে বলার পর কর্মকর্তা হতবাক, কিন্তু এটা বলতে ভুললেন না যে বিআরটিএ কোন ভুল করেনি। আমিই গাড়ি রঙ করিয়েছি। আমি বললাম ২০০৯ সালের রেজিস্ট্রেশনের সময় গাড়ির মূল যে কাগজপত্র জমা দেয়া হয়েছিল সেটা পরীক্ষা করে দেখতে যে সেখানে কি রঙ বলা আছে? না তার এক কথা। আমি গাড়ি রঙ করিয়েছি। তার আচরণ ছিল একেবারে নিকৃষ্ট । আমার কোন কথাই শুনতে রাজি নন।

তাহলে উপায়? আমাকে নিজ খরচে গাড়ি কালো রঙ করিয়ে নিতে হবে। আমার মাথায় বাজ পড়লো। এই বাজারে একটা গাড়ি রং করাতে কমপক্ষে ৪০-৪৫ হাজার টাকা লাগবে। এছাড়া আর কি উপায় আছে? আরেকটা শর্টকাট উপায় হলো গাড়ির রং লাল রেখেই কাগজে কলমে কালো থেকে লাল রঙ করার জন্য আবেদন করতে হবে। তবে কাজটা জটিল এবং সময় সাপেক্ষ। আকারে ইংগিতে বুঝিয়ে দিলেন– দালাল ধরতে হবে। একজন আমাকে পাশে ডেকে নিয়ে বললেন, তিনি কাজটা করে দিবেন তবে তার জন্য সরকারি ফি এবং বিভিন্ন জায়গায় স্পিড মানি মিলিয়ে ৯০০০ টাকা লাগবে। আমি বললাম সরকারি ফি কত? স্পিড মানি কত? তিনি খুব একটা উৎসাহ বোধ করলেন না। আমি ফিরে এলাম।

পরদিন গাড়ি না পাঠিয়ে ড্রাইভারকে দিয়ে শুধু ফিটনেসের কাগজপত্র পাঠিয়ে দিলাম। আমাদের পরিদর্শক গাড়ি না দেখেই ফিট লিখে দিলেন। আমার গেল ১৫০০ টাকা। কিন্তু ফি বছর এই ঝামেলা কে পোহাবে? গাড়ীর ব্লু বুকের সাথে রঙ এর অমিল আজ অবধি কোন ট্রাফিক সার্জেন্ট ধরতে পারেনি, কিন্তু তাই বলে ভবিষ্যতেও পারবেনা সেটার গ্যারান্টি নেই। তারমানে রাস্তা-ঘাটে আরো অপদস্ত হবার আশংকা রয়ে যাছে। গেলাম এক বন্ধুর কাছে। তিনি বললেন গাড়ির রঙ পরিবর্তনের সরকারী ফি মাত্র ৭৫০ টাকার মত। কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করে নিজেই কিভাবে এটা করা যায় সেই পরামর্শ দিলেন। আমি তার পরামর্শ মত দিন দুয়েকের ভেতর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র (যার মধ্যে কোন একটি গ্যারেজ থেকে গাড়ি কাল থেকে লাল করার ভুয়া রিসিপ্টও আছে) জোগাড় করে, প্রয়োজনীয় ফি দিয়ে বিআরটিএ’তে সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিলাম। কাগজ জমা দেবার সময় কর্মচারিটি জিজ্ঞেস করলো কোন রেফারেন্স আছে কিনা? কিসের রেফারেন্স জিজ্ঞেস করাতে সে কিছু না বলে আমাকে একটা কাগজ (বিকল্প ব্লু বুক) ধরিয়ে দিল যেখানে এপ্রিল ২০১৬ তে নতুন ব্লু বুক দেয়া হবে উল্লেখ আছে। আরো জানালো ব্লু বুক হয়ে যাবার পর আমার কাছে এসএমএস আসবে। সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। আমি বিদেশে ফিরে গেলাম আফ্রিকার পাহাড়ে-জংগলে। বৌ বাচ্চারা থাকে আতংকে। কখন কোন পুলিশ রাস্তা ঘাটে কাগজপত্র পরীক্ষার নামে হেনস্তা করে বসে। অসুস্থতার কারণে এপ্রিলের শেষ দিকে দেশে ফিরে আসি। এসে খোঁজ নিলাম কোন এস এম এস এসেছে কিনা?

20170103_114233

মে মাস পার হয়ে যায়, আমার কাছে এসএমএস আসে না। মে, জুন, জুলাই এক এক করে মাস পেরিয়ে যায়। অসুস্থতার কারণে নিজে আর সেসব খোঁজ নিতে পারি না। আগস্টে লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিলাম। এবার বললো আমার ফিংগার প্রিন্ট নাকি সিস্টেম থেকে মুছে গেছে, নতুন করে দিতে হবে। সাত দিন পরে যেতে বললেন। ৫০০ তাকার বিনিময়ে সেদিনই ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে দিলাম। এবার আমার পুরনো কাগজ রেখে আরেকটা কাগজ ধরিয়ে দিল সাথে নতুন তারিখ ১০ অক্টোবর ২০১৬। ১০ অক্টোবরে গেলাম। এবার নতুন তারিখ ৩১ ডিসেম্বর, অথচ সেটা শনিবার, সরকারি অফিস বন্ধ থাকে। আজ ০৩ জানুয়ারি আবার গেলাম। এবার নতুন তারিখ ০৩ এপ্রিল ২০১৭! আমি জিজ্ঞেস করলাম এধরনের কাজ করতে কত দিন লাগে। কর্মচারিটি জানালো সর্বোচ্চ দুই মাস। তাহলে আমারটা এক বছর হয়ে গেল– তারপরও হচ্ছে না কেন? সে নিরুত্তর। আমি অনুরোধ করলাম তারিখটা ফেব্রুয়ারিতে আনা যায় কিনা? সে জানালো এটা সম্ভব নয়, কারণ কম্পিউটার সিস্টেম থেকে নাকি এই তারিখ অটোমেটিক তৈরী হয় সেখানে অপারেটরের করার কিছু নেই। আমি স্পিড মানি দিতে চাইলাম, কিন্তু সে প্রতিজ্ঞায় অটল। এবার আমি ধৈর্য হারালাম। প্রকাশ্যে গালাগালি করার পর একজন এসে আমাকে একটু আড়ালে নিয়ে যা বলো সেটা হলো, চিল্লাচিল্লি করে লাভ নেই। মাল ছাড়ুন, কাজ হয়ে যাবে, তা না হলে আমার স্মার্ট কার্ড নতুন ব্লু বুক ইহ জনমেও হবে না। কি আর করা। অনেক দেন দরবার করে ১০০০ টাকায় রফা হলো, টাকা আর কাগজ নিয়ে দালাল চলে গেল। আধ ঘন্টা পর এসে ৫০০ টাকা ফেরত দিয়ে বললো এক মাস আগেই পাওয়া যাবে, তার আগে কিছুতেই নয়। এবার নতুন তারিখ ০৫ মার্চ ২০১৭।

20170103_114242

আমি একটা আহাম্মকের মত কাজ করেছি। শুরুতেই মাল ঢেলে দিলে এত হ্যাপা পোহাতে হতো না। যোগাযোগ মন্ত্রীর অভিযান এবং কড়া নির্দেশের পর এখন স্পিড মানির প্রকাশ্য ছড়াছড়ি বন্ধ হয়ে গেলেও ভিন্ন পথে এখনো চালু আছে। রেট বেড়ে গেছে। আগে যেই কাজ ৫০০ তে হতো এখন সেটা ২০০০। পথ চিনতে দেরি হলেই আমার মত বিড়ম্বনা। সময়ও যাবে, টাকাও খসবে।