ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ওদের পেশায় নাম লেখাতে কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিদ্যা-বুদ্ধি, মানবিকতা কিচ্ছু লাগে না। শুধু গরু-ছাগলের ছবি দেখে সেটা মানুষ নাকি অন্য কোন প্রাণী সেটার পার্থক্য নির্ণয় করতে পারলেই চলে। সোজা ডক্টরেট ডিগ্রী!

ওরা রাস্তা-ঘাটের মালিক। যেখানে ইচ্ছা থামবে, থামাবে; যেখানে ইচ্ছা ঘুমাবে কিংবা অন্য মানুষকে চিরতরে ঘুম পাড়াবে। ওরা যেদিক দিয়ে ইচ্ছা চলবে, চালাবে। আপনার আমার জন্য সেটা রং সাইড হলেও ওদের আইনে সেটাই রাইট। ওরা নিজেরা পিষ্ট হবে, আপনাকে পিষ্ট করবে, কিন্তু থামবে না। ওরা ঠান্ডা মাথায় চাপা দিয়ে আপনাকে মেরে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিবে। ওরা গতিতে বেপরোয়া, চাল চলনে বেপরোয়া। ওদের ইচ্ছা না হলে আপনাকে তুলবে না। ইচ্ছে হলে দুই ঘন্টা বসিয়ে রাখবে।

তেলের দাম বাড়ালে লোভে ওদের জিহ্বা চকচক করে, খুশিতে রাতে ঘুম হয় না। ঘুম কাতুরে নেশা নেশা চোখে ওরা পরদিন রাস্তায় বের হয়। এরপর সব কিছুর দাম বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আপনাকে-আমাকে পিষে মারার নেশা কাটে না। সরকার তেলের দাম কমালে ওরা দাম কমায় না। পিষে মারার চেতনা বাড়িয়ে নেয়।

একটা ছোট্ট বাচ্চা যেদিন বাবার হাত ধরে প্রথম স্কুলে যায় সেদিন ওরা সেই বাবার স্বপ্ন মাড়িয়ে দেয়। একটা মেডিকেল পড়ুয়া মেয়ে যেদিন মায়ের হাত ধরে পরম মমতায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে, সেদিন ওরা তার স্বপ্ন পিষে দেয়। ওদের হাতে আমাদের সন্তানদের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়।

ওরা গাড়ির মালিক, চালক শ্রমিক নামধারী এক বিশেষ শ্রেণী। ওরা মন্ত্রী, ওরা প্রতিমন্ত্রী, ওরা সরকার, ওরাই সাংসদ, ওরাই সব। আমি আপনি আপামর জনতা। আমার প্রতি সদা খড়গহস্ত হলেও সরকার ওদের কাছে অসহায়। এ দেশ ওদের জন্য। এখানে আমি – আপনি কেউ কিচ্ছু না।

কোন কিছু নিজেদের মন-পছন্দের না হলে ওরা তান্ডব শুরু করে দেয়। ওরা রাস্তা ঘাট বন্ধ করে দেয়, ওরা আইন-আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। ওরা পুলিশ বক্স উপড়ে ফেলে। টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তার বারোটা বাজায়। ওরা কর্মবিরতির নামে হরতাল করে। ওরা অন্যকে কর্মবিরতি মানতে বাধ্য করে। ওরা সরকারকে নাড়ায়। ওরা আদালতকে নাড়ায়, ওরা প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। ওরা দেশের প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা করে না, ওদের রয়েছে নিজস্ব আইন-কানুন। সেখানে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অসহায়। গণহত্যার দায়ে এদেশে রাজাকারের ফাঁসি হয়, ওরা নিয়ত মানুষ মারলেও হয় তিন-চার বছরের সাজা।

ওরা ভয়ংকর বিজ্ঞানী। ২৬ সিটের বাসের বডি কারসাজি করে ৩৬ সিট বানাতে পারে। ১০ টনি ট্রাকের চেসিস মডিফাই করে ২৪ টনি বানানোতো নস্যি। সেই ২৪ টনের গাড়ি চালিয়ে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকার লোভে ওরা ১০ কোটি টাকার বেইলি ব্রীজ ধসিয়ে দেয়। ওরা ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরোয়া করে না। গাড়ির ফিটনেসের ব্যাপারে থোড়াই কেয়ার করে। ওরা গাড়িতে সামনে পেছনে বাম্পার, দুই পাশে এঙ্গেল লাগিয়ে গাড়িকে যন্ত্র দানবে রূপান্তরিত করে।

ওরা অনেকেই জেনে শুনে গাড়িতে পকেটমার তোলে, অজ্ঞান পার্টি তোলে। কখনো কখনো মাঝ রাতে নিজেরাই ভয়ংকর খুনী কিংবা ধর্ষক বনে যায়। একলা বাড়ি ফেরা তরুণীটিকে দল বেঁধে ধর্ষণ করে। গাড়িতে উঠানো– নামানোর উছিলায় ওরা আমার মা, মেয়ে, বউয়ের গায়ে হাত দেয়। মানুষ মারার অঘোষিত লাইসেন্স ওরা পেয়ে গেছে বহু আগেই। গায়ে হাত দেয়া তো কোন ব্যাপার না। ওরা বাস স্ট্যান্ড চিনে না, মেয়ে মানুষের শরীরের চিনে। তাই সঠিক বাস স্ট্যান্ডে গাড়ী না থামালেও মেয়ে মানুষের শরীরের জায়গায় জায়গায় ওদের হাত ঠিকই থামে।

ওরা লেইন বোঝে না, লাইন বুঝে। তাই ৪০ টনি গাড়ি নিয়ে ওরা ১ নম্বর লেইন দিয়ে ধীর গতিতে হাইওয়েতে গাড়ি চালায়। কেউ কিচ্ছু বলে না। ওরা অন্যের গাড়ির হর্ণ উপেক্ষা করলেও নিজের প্রয়োজনে বিকট শব্দে হাইড্রলিক হর্ণ বাজায়। আশেপাশে ছোট গাড়ি দেখলে ওদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ওরা রাস্তার রাজা, ওদের রাস্তায় শুধু বাস, ট্রাক চলবে। সেখানে সিএনজি, অটোরিক্সা, প্রাইভেট কার কিংবা মাইক্রোবাসের প্রবেশ নিষেধ। ওদের রাস্তায় ওরা যা খুশী তাই করবে। ওরা আপনাকে রঙ সাইড দিয়ে গাড়ি ওভারটেক করতে বাধ্য করে। নিজেরাও রঙ সাইড দিয়ে ওভারটেক করে। ওরা যেখানে খুশী পার্কিং করবে, মেরামত গ্যারেজ বানাবে। ওরা রাস্তা আটকে যেখানে খুশী লোড-আনলোড করবে। যাত্রী উঠাবে-নামাবে। গাড়ি ঘুরবে, ঘুরাবে। ওরাই ট্রাফিক, ওরাই সিগনাল। ওরা সর্ব বামের লেন থেকে ডানে রাইট টার্ন কিংবা ইউ টার্ন করবে। আপনি করতে গেলে সোজা পেট বরাবর গাড়ি চালিয়ে দিবে।

ওরা মানুষ মেরে জেলে গেলে কিংবা ফাঁসির দড়িতে ঝুললে ওদের পরিবারের কি হবে এটা নিয়ে দিশেহারা, কিন্তু যে মানুষটিকে মেরে ফেলল কিংবা চিরতরে পঙ্গু করে ফেলল, সেই অসহায় ভিকটিম বা তার পরিবার নিয়ে ওদের কোন চিন্তাই নেই।

আপনি আয়কর না দিলে এনবিআর এর নোটিশ, মামলা খেয়ে জেরবার। ওদের নামে কোন আয়কর ফাইলই নেই। আপনি ফি বছর অগ্রিম আয়কর না দিলে বিআরটিএ’র টোকেন নবায়ন হয় না, ওদের টোকেন লাগেই না। আপনি নিজে গাড়ি নিয়ে না গেলে ফিটনেস নবায়ন হয় না, ওদের ফিটনেসই লাগে না। ওদের জন্য অন্য আইন।

ওরা সংঘবদ্ধ। ওরা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হরতাল ডাকতে পারে। লাশবাহী গাড়ি আটকে দিতে পারে। ওরা শত শত বিদেশগামী যুবক, যে নিজের সর্বস্ব বিনিয়োগ করে প্লেনে উঠার স্বপ্নে বিভোর তার স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারে। ওরা অসুস্থ মায়ের মুখটি দেখতে উদগ্রীব যাত্রীটিকে রুখে দিতে পারে। ওরা হাইওয়েতে আড়াআড়ি ট্রাক রেখে দেশ অচল করে দিতে পারে।

ওদের সেনাপতি এক “খান”। ওরা খানের সেনা। ওরা ভয়ংকর।