ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

ইদানিং যে কোন পাবলিক পরীক্ষা শুরু হবার আগে পরীক্ষার চেয়ে প্রশ্ন পত্র ফাঁস নিয়ে আলোচনা বেশী প্রাধান্য পায় । বলাই বাহুল্য যে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর আমলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারটি পুরোপুরি শিল্প এবং এক মহা বানিজ্যের রূপ নিয়েছে। আর এটাকে কেন্দ্র করে মিথ্যাচার, একে অন্যকে দোষারোপ, সংশ্লিষ্টদের ইচ্ছাকৃত নির্লজ্জ এবং নীরবতা বেশ চোখে পড়ে।

যখনই সংবাদপত্রে, ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে কোন আলোচনা শুরু হয় তখন আমাদের কিছু বুদ্ধিজীবি এবং শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের জ্ঞানী গুনী পন্ডিতরা একের পর এক ফর্মূলা নিয়ে হাজির হন। সেই ফর্মূলায় কখনো থাকে একাধিক তৈরী সেট থেকে পরীক্ষার দিন সকালে দৈব চয়নের ভিত্তিতে সেট বাছাই করে পরীক্ষা নেয়া, আবার কখনো ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠানো ইত্যাদি গাঁজাখুরি প্রস্তাবনা। এসবের পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রীর অসহায় আত্মসমর্পনের ছবি ভেসে আসে বিভিন্ন মিডিয়ার পাতায় পাতায়। অন্য যে কোন সভ্য ভব্য দেশ হলে অথবা সংশ্লিষ্টদের ন্যূনতম আত্মসন্মান থাকলে তারা এতদিনে পদত্যাগ করতেন। কিন্তু আমরা বড়ই দুর্ভাগা জাতি। তাই এখানে পদত্যাগের বদলে শুনতে হয় “ সব কিছু বলতেও পারি না, সহ্য ও করতে পারি না”। খুব জানতে ইচ্ছে করে কি সেই কথা যা শিক্ষা মন্ত্রী বলতে পারেন না?

আগে বলা হতো বিজি প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয়। তদন্তে সেটার প্রমান মেলার পর সেখানে কিছু ব্যবস্থা গ্রহন করা হলো। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হয়নি। এরপর চললো কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান। সর্বশেষ ঢাকার মতিঝিল এলাকার বেশ কিছু খ্যাত-অখ্যাত স্কুলের শিক্ষক, নামীদামী কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কিছু হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হয়েছে। প্রশ্ন হলো এরপর কি প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে বন্ধ হবে? আমার সোজা সাপটা উত্তর – না। বন্ধ হবে না। যতক্ষন গোঁড়া ঠিক না হচ্ছে ততক্ষনে এসব ছোটখাট অভিযান বা গ্রেফতার করে খুব একটা লাভ হবে না। ধূলা ঢাকতে গিয়ে পুরো পৃথিবী চামরা দিয়ে ঢাকার বদলে শুধুমাত্র পায়ের পাতা ঢেকে দেয়াই উত্তম। পুরো পৃথিবী ঢাকা যে সম্ভবও নয় – এটা একালের গবুচন্দ্ররা বুঝতে চাচ্ছে না।

এবার এইচএসসি পরীক্ষার আগে শিক্ষা মন্ত্রী ঘোষনা দিয়েছেন – এর পর পরীক্ষার দিন সকালে প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে পরীক্ষা নেয়া হবে। আমি শুনে আতংকে স্থির হয়ে গেছি। আর তাই এই লেখার অবতারণা। পরীক্ষার দিন সকালে ১০-১২ লক্ষ প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে কেন্দ্র পর্যন্ত নির্বিঘ্নে পাঠানোর সক্ষমতা শিক্ষামন্ত্রী বা তার মন্ত্রনালয়ের আছে কি? ঢাকা –চট্টগ্রাম এর মত শহরে যেখানে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী – সেখানে অল্প সময়ে কয়েক লক্ষ প্রশ্ন ছাপানো সম্ভব কি? তাহলে সকাল কয়টায় প্রশ্ন ছাপানো শুরু করতে হবে? বিদ্যুৎ – ইন্টারনেট থাকবে তো? সে ই তো পরীক্ষার দিন সকালে শত শত শিক্ষক ডেকে এনে প্রশ্ন গুনে প্যাকেট করার মান্ধাতা আমলের ব্যবস্থা থাকছেই। যেখানে ইদানিং প্রশ্ন ফাঁসের কুকীর্তিতে শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে সেখানে এই ব্যবস্থা আদৌ কাজে দিবে কি? হাজারটা প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু জানি এর একটা উত্তরও শিক্ষা মন্ত্রনালয় দিতে পারবে না।
মূল আলোচনায় যাবার আগে আসুন সবাই মিলে দেখি কিভাবে প্রশ্ন তৈরী হয়? পরীক্ষার আগে-পরে স্কুল কলেজগুলোর ভুমিকা কি? আমরা আমাদের আলোচনা শুধুমাত্র এসএসসি এবং এইচএসসি তে সীমাবদ্ধ রাখবো।

২০১৯ সালে যারা এসএসসি দিবে তারা এ বছর নবম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার ঠিক আগে পরে কোন এক সময় নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের কাছে রেজিস্ট্রেশন করবে। এই রেজিষ্ট্রেশন প্রক্রিয়ার পর পরই বোর্ডগুলো জেনে যাবে যে, আনুমানিক কত শিক্ষার্থী ২০১৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করবে। একই ভাবে যারা ২০১৯ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিবে তারা এ বছরে কোন এক সময় নিজ নিজ কলেজের মাধ্যমে বোর্ডে রেজিষ্ট্রেশন করবে। প্রতি বছর যত ছাত্র ছাত্রী রেজিষ্ট্রেশন করে, তাদের সবাই বিভিন্ন কারণে এসএসসি কিংবা এইচএসসি তে অংশগ্রহন করে না। এ সংখ্যাটা নেহায়েত কমও নয়। এই এপ্রিলে যারা এইচএসসি দিয়েছে তারা ২০১৫ সালেই রেজিষ্ট্রেশন করেছিল।

37-Chili-powder-poly-pack

রেজিষ্ট্রেশন হবার পর সকল ছাত্র-ছাত্রী একটা বিশেষ পরিচিতি নম্বর পায় যাকে আমরা রেজিষ্ট্রেশন নম্বর বলি। এরপর দশম এবং দ্বাদশ শ্রেনীর টেষ্ট পরীক্ষা শেষ হবার পর পরীক্ষায় অংশ গ্রহনে আগ্রহীরা পরীক্ষার জন্য চুড়ান্ত ভাবে আবেদন করে যাকে আমরা “ফর্ম ফিল আপ “ নামে জানি। পরীক্ষার অন্ততঃ তিন মাস আগে এটা সম্পন্ন হয়ে থাকে। বিশেষ বিবেচনায় অনেক ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৬০ দিন আগেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ফর্ম ফিলাপের সুযোগ দেয়া হয়। এসএসসি কিংবা এইচএসসি তে কত জন পরীক্ষার্থী অংশ নিবে সেটা ফর্ম ফিল আপের পর পরই স্পষ্ট হয়ে যায় । এরপরও অনেক পরিক্ষার্থী নানা কারণে পরীক্ষায় অংশগ্রহন থেকে বিরত বা অনুপস্থিত থাকে। কিন্তু এই এই সংখ্যাটা খুব কম।
এদিকে ফর্ম ফিল আপের পর পর বোর্ড কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন নামী দামী স্কুল-কলেজের শিক্ষক-অধ্যাপক মন্ডলীর কাছ থেকে প্রশ্ন আহবান করে যা অত্যন্ত গোপনে সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রতিটি বোর্ডে একটি প্রশ্ন পত্র প্রণয়ন কমিটি থাকে যারা বিভিন্ন শিক্ষক মন্ডলীর কাছ থেকে পাওয়া অসংখ্য প্রশ্নের মধ্য হতে বাছাই করে, মিলিয়ে মিশিয়ে কয়েক সেট চূড়ান্ত প্রশ্ন পত্র তৈরী করে । এরপর সেটা ছাপাখানায় চলে যায়। আমি যতদুর জানি এই পর্যন্ত প্রশ্ন পত্র গুলো MS Word এ তৈরী করা হয়। ছাপা খানায় আসার পর প্রথমে প্রশ্ন পত্রের ফাইল ফর্মেট পরিবর্তন করে Adobe বা অন্য কোন উপযুক্ত (Compatible) ফর্মেটে রুপান্তরিত করা হয়। এরপর সেটা কাগজের মাপে সেট করা হয় (Page, Margin, indent ইত্যাদি) । সেট করা প্রশ্ন পত্র টি এরপর বিশেষ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যায় যেখানে প্রথমে একটা নিগেটিভ তারপর পজিটিভ প্লেট তৈরী করা হয়। পজিটিভ প্লেটকে ছাপা মেশিনে লাগিয়ে দেবার পর, সেখানে কাগজ ও কালি ভরে দেয়া হয়। অটোমেটিক মেশিন হলে ঠিক কত কপি ছাপা হবে সেটাও ঠিক করে দিয়ে প্রিন্টিং শুরু হয়। MS Word সফটওয়্যারে থাকা অবস্থায় একবার এবং প্রিন্টিং এর পর আরো একবার বানান পরীক্ষা করার কথা, কিন্তু সেটা করা হয় কি না আমি জানিনা (কারণ প্রায়শঃই ভুল বানানে ভরা প্রশ্নপত্র আমরা দেখতে পাই) ।

প্রিন্টিং এর পর এসব প্রশ্ন আবার সংশ্লিষ্ট বোর্ডে কিংবা বোর্ড চাইলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট জেলার ট্রেজারীতে চলে যায়। বোর্ড জানে একটি জেলায় বা উপজেলায় কোন বিষয়ের কতজন পরীক্ষার্থী আছে। সে অনুযায়ী বড় বড় প্যাকেটে করে পরীক্ষার আগে সেসব জেলা/উপজেলায় প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে দেয়া হয়। এসব প্রশ্ন জেলার ট্রেজারীতে (বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সোনালী ব্যাংকের ভল্ট) বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে থাকে। পরীক্ষার আগের দিন কেন্দ্র সচিবের নেতৃত্বে একদল শিক্ষক ট্রেজারীতে গিয়ে নিজ নিজ পরীক্ষা কেন্দ্রের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রশ্নপত্র বিষয় অনুযায়ী গুনে ঠিক ভাবে রেখে দিয়ে আসেন। পরীক্ষার দিন সকালে (সকাল ৭ টা থেকে ৮ টার মধ্যে) কেন্দ্র সচিব অথবা তার প্রতিনিধি স্বশরীরে ট্রেজারিতে গিয়ে প্রশ্ন পত্র নিয়ে আসেন। কেন্দ্র সচিবের কাছে প্রশ্নপত্র আসার পর কেন্দ্র সচিব তার অধীনস্ত কেন্দ্রের জন্য প্রশ্ন ভাগ করে দেন। কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা প্রশ্নপত্রগুলো নিজ নিজ কেন্দ্রে নিয়ে পরীক্ষা কক্ষ অনুযায়ী ভাগ করে রাখেন এবং পরীক্ষার ২০ থেকে ৩০ মিনিট আগে কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককে বুঝিয়ে দেন। কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক/শিক্ষক মন্ডলী পরীক্ষা শুরুর আনুমানিক ৫-১০ মিনিট আগে প্রশ্নপত্র নিয়ে কক্ষে যান এবং এরপর নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা শুরু এবং শেষ করেন।

পাঠক খেয়াল করে দেখুন, প্রশ্ন পত্র তৈরী এবং সেটা পরীক্ষার কক্ষে বা হলে যাবার আগ পর্যন্ত অসংখ্য জায়গায় প্রশ্ন পত্র ফাঁস হবার সুযোগ রয়েছে। আমি সেসব জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে চেষ্টা করবোঃ

ক। প্রশ্ন পত্র প্রণয়ন কমিটি এবং সাথে তাদের প্রত্যেকের ব্যাক্তিগত/একান্ত সচিব (যদি থাকে)।
খ। সে সকল টাইপিষ্ট যারা প্রশ্নপত্র প্রনয়ন কমিটির সাথে থেকে প্রশ্ন বাছাই ও টাইপ করেন।
গ। প্রশ্নপত্র প্রনয়ন কমিটির মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে প্রণীত প্রশ্নপত্র যারা ছাপাখানায় নিয়ে যান (আমি জানিনা এটা সফট কপি (USB drive এর মাধ্যমে বা E mail) নাকি কাগজে ছাপা হয়ে হার্ড কপি করে পাঠানো হয়। যেভাবেই যাক, সব খানেই প্রশ্ন ফাঁসের একটা সুযোগ থাকে বা তৈরী হয়)
ঘ। ছাপা খানা ( এর ভেতরের প্রতিটি স্তরে এটা সম্ভব)
ঙ। ছাপা হওয়া প্রশ্ন পত্র বোর্ডে কিংবা ট্রেজারীতে ফেরত আসার পর যেখানে বা যাদের মাধ্যমে সংরক্ষিত এবং জেলা/উপজেলায় পাঠানো হয়।
চ। পরীক্ষার আগের দিন জেলা – উপজেলা পর্যায়ে যারা ট্রেজারীতে প্রশ্ন গুনে আলাদা করে রাখেন তাদের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে।
ছ। পরীক্ষার দিন সকালে যারা ট্রেজারী থেকে প্রশ্ন নিয়ে আসেন।
জ। কেন্দ্র সচিব। (সাধারণত কোন স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা কলেজের অধ্যক্ষ।
ঝ। সহকারী কেন্দ্র সচিব এবং পরীক্ষা কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক।

একটা প্রশ্ন তৈরী হয়ে ছাপা হওয়া থেকে শুরু করে পরীক্ষার কক্ষে পৌছান পর্যন্ত এতগুলি ধাপ এবং উপধাপ জড়িত থাকায় মনে হতে পারে যে প্রশ্ন ফাঁস বুঝি সত্যি অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় প্রশ্ন ফাঁসের এটাই সব চে বড় কারণ। তাহলে প্রথম থেকেই শুরু করি।

প্রশ্ন পত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্যদেরকে বিশ্বাস না করে কোন উপায় নেই কারণ কম্পিউটার একা একা প্রশ্ন বানাতে পারবে না। প্রশ্ন পত্র প্রণয়ন কমিটির সাথে সংশ্লিষ্ট টাইপিষ্টদেরকে (যদি থাকে) এই প্রক্রিয়ার বাইরে বের করে আনতে হবে। সেজন্য প্রশ্নপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিটি সদস্যের জন্য বাংলা এবং ইংরেজী টাইপ জানা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। তাহলে উপরের নয়টি ধাপের অন্ততঃ দুইটি ধাপকে স্বচ্ছ করা হলো (আবারো বলছি প্রশ্ন পত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্যদেরকে বিশ্বাস করতেই হবে)।

এই প্রশ্ন পত্র ডিজিটাল (ইমেইল, ডিস্ক ড্রাইভ ইত্যাদি) কিংবা এনালগ (ছাপা কাগজে) যেভাবেই প্রেসে যাক না কেন – যাত্রা পথে এটা ফাঁস হতে পারে। এই পথ যাত্রা কিভাবে সুরক্ষিত করা যায় সেটা শিক্ষা মন্ত্রনালয় নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন।

ছাপা খানায় প্রশ্ন যাবার পর সেটিকে নির্দিষ্ট ফরমেটে রুপান্তর করতে হতে পারে (যেমন মাইক্রোসফট ওয়ার্ড থেকে কোন ডেস্ক টপ পাবলিশিং সফটওয়্যার)। এই রুপান্তরের সময় পুরো প্রশ্ন পত্র নতুন করে টাইপ কিংবা নির্দিষ্ট ফরমেটে কপি-পেষ্ট করতে হবে। যে বা যারা এ রুপান্তরের কাজটা করবেন – তারা এবং পরবর্তীতে যারা পজিটিভ প্লেট বানাবেন তারা সবাই প্রশ্ন পত্র ফাঁসের মতো অপকর্মটি করে বসতে পারেন। সুতরাং বোর্ডের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন কমিটিই যদি এমন ফরমেটে প্রশ্নগুলি প্রেসে পাঠান যেখানে নতুন করে ফরমেট পরিবর্তন করার দরকার নেই তাহলে আরো বেশ কয়েকটা ধাপে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো সম্ভব।

এবার আসি প্যাকিং এ। আমার দেখা এবং জানামতে প্রেস থেকে বিষয় কোড অনুযায়ী জেলাওয়ারী প্রশ্ন এক সাথে পাঠানো হয়। অর্থাৎ মানিকগঞ্জ জেলায় এইচএসসি’র এক লক্ষ পরীক্ষার্থী থাকলে বাংলা বিষয়ের এক লক্ষটি প্রশ্ন এক বা একাধিক বস্তায় ভরে পাঠানো হয়। বস্তার ভেতরে ছোট ছোট প্যাকেট থাকে যেখানে প্রতিটি প্যাকেটে কয়েক শত থেকে কয়েক হাজার প্রশ্নপত্র থাকে। ট্রেজারীতে পৌঁছার পর পরীক্ষার আগের দিন (বা দুই দিন আগে) কেন্দ্র সচিবদের প্রেরিত প্রতিনিধিরা নিজ নিজ কেন্দ্রের আসন সংখ্যা অনুযায়ী প্রশ্ন গুনে আলাদা করেন। ইদানিংকালে যেভাবে বা যেখানে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে – তার সবচে বড় কারণ এবং জায়গা হল – এই প্রশ্ন গুনে আলাদা করার সময় এবং জায়গা। অনেক শিক্ষক যেখানে অসৎ হয়ে গেছেন সেখানে পরীক্ষার আগে এভাবে প্রকাশ্যে (হোক সেটা ট্রেজারীতে) প্রশ্ন গুনতে দিলে গোনার ফাঁকে ফাঁকে ক্যামেরা ওয়ালা ফোনে ছবি তুলে রাখছেন অনেকেই। অনেক ক্ষেত্রে ৫-৬ জন শিক্ষক একত্র হয়ে ৩-৪ টি করে প্রশ্ন (এমসিকিউ এবং সৃজনশীল) দেখে মুখস্ত করে ফেলছেন এরপর বাইরে এসে সাথে সাথে সেগুলো হাতে লিখে – পূর্নাংগ এক বা দুই সেট প্রশ্ন তৈরী করে ফেলছেন। ফলাফল – পরীক্ষার আগের রাতে হাতে লেখা প্রশ্নপত্রে ফেসবুক আর নেট দুনিয়া সয়লাব। আমি এবার লক্ষ্য করেছি বাংলা পরীক্ষার আগে ট্রেজারীতে বাংলা বিষয়ের শিক্ষকরা গিয়েছেন, আবার ইংরেজীর আগে ইংরেজীর শিক্ষক। সাথে একজন স্থায়ী সদস্য ছিলেন। কিন্তু প্রতিদিন একজন করে বিষয় শিক্ষক সাথে গিয়েছেন। সুতরাং যে কোন প্রশ্ন দেখে সেটা পরবর্তী কয়েক ঘন্টা কিংবা কয়েক দিন মনে রাখা তাদের জন্য নস্যি মাত্র। এই যে ট্রেজারী থেকেই প্রশ্ন ফাঁসের চক্রান্ত কিংবা ফাঁস হওয়ার সুযোগ তৈরী হওয়া সেটা খুব সহজেই বন্ধ করা সম্ভব। আর এটা করতে পারলেই প্রশ্ন ফাঁস শতকরা ৯৫-৯৯ ভাগ কমে যাবে। দয়া করে আমার এই লেখার নীচের অনুচ্ছেদ গুলো পড়ুন।

সীট প্লান বা আসন বিন্যাসঃ

আশির দশকে আমরা যখন এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি তখন পরীক্ষার হলে যাবার আগে জানতেও পারতাম না আমার সামনে –পেছনে, ডানে অথবা বামে কে বসবে। কিন্তু এখন ফর্ম ফিলাপের সময় এমন কিছু কায়দা কানুন করা হয় যার ফলে প্রতিটি শিক্ষার্থী জানে – তার আশে পাশে কারা কারা আছে। অবাক করা বিষয় হলো, পরীক্ষার ৩-৫ দিন আগে প্রতিটি কেন্দ্রে একটা সীট প্লান তৈরী করে বোর্ডে পাঠানো হয়। সেখানে কোন কক্ষে কোন কোন রোল নম্বরধারী ছাত্র-ছাত্রী বসবে সেটা ঠিক করা থাকে। ফর্ম ফিলাপের সময় যে কায়দা কানুন করা তার আলোকেই এই আসন বিন্যাস নির্ধারিত হয় । স্কুল বা কলেজগুলো পরীক্ষার আগে থেকেই জানে কোন কক্ষে, কোন বেঞ্চে বসে কে বা কতজন পরীক্ষা দিবে। বোর্ডও এটা জানে, কিন্তু ততক্ষনে কিছু করার আছে বলে মনে হয়না।

প্রতিটি কেন্দ্রের কোন শ্রেণী কক্ষে কতজন শিক্ষার্থী বসে পরীক্ষা দিবে সেটার নিয়ন্ত্রন থাকে কেন্দ্র সচিব এবং সহকারী সচিবের কাছে। আর শ্রেণী কক্ষে কার পাশে কে বসবে সেটা ঠিক করেন আসন বিন্যাসের সাথে জড়িত শিক্ষক। আগেই বলেছি এটা করা হয় ফর্ম ফিলাপের সময় যেভাবে আসন বিন্যাস করা হয়েছে সেভাবে। আরমানিটোলা সরকারী বিদ্যালয়ে বসে আমি যখন এসএসসি পরীক্ষা দেই তখন আশে পাশে ১০-২০ জনের মধ্যে আমার নিজ স্কুলের নিজ ক্লাসের কোন ছাত্র ছিল না। আর ২০১৬ সালে আমার সন্তানেরা যখন এসএসসি পরীক্ষা দেয় তখন তাদের আশে পাশে শুধু তাদের বন্ধু বান্ধবরাই ছিল। একই কক্ষে অন্য স্কুলের যারা ছিল তারাও তাদের সারিতে তাদের বন্ধু বান্ধবদের পেয়েছে। এই হলো অবস্থা। এই আসন বিন্যাস নিয়ে আমার তেমন কোন আক্ষেপ নেই। প্রতিটি কেন্দ্রে কতজন শিক্ষার্থী কোন কোন বিষয়ে পরীক্ষা দিবে সেটা যদি পরীক্ষার দুই মাস আগে (চুড়ান্ত ফরম ফিলাপের পর বোর্ড থেকে কেন্দ্র নির্বাচন চুড়ান্ত হওয়ার পর) চুড়ান্ত করা যায় এবং সে অনুযায়ী কোন কক্ষে কোন বিষয়ের কত জন পরীক্ষার্থী বসবে তার আসন বিন্যাস চূড়ান্ত করা যায় তাহলে প্রশ্ন ফাঁসের কফিনে একটা বড় সড় পেরেক ঠুকে দেয়া যায়। এরপর ছাপা খানা থেকে প্রতিটি কেন্দ্রের প্রতিটি কক্ষের জন্য আলাদা আলাদা বিষয়ের প্রশ্ন আলাদা আলাদা প্যাকেটে অটোমেটিক মেশিনে সর্টিং- সিফটিং করে প্যাকেটে সীলড করে দেয়া যায় তাহলে প্রশ্ন পত্র ফাঁসের কফিনে ২য় সর্বশেষ পেরেকটি ঠোকা হয়ে গেল বলে আমি মনে করি। আর সর্বশেষ পেরেকটি ঠোকার জন্য দরকার একটি ছোট্ট আইন। পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রতিটি হলে/রুমে পরীক্ষা শুরুর ১০ মিনিট আগে উপস্থিত শিক্ষক/ইনভিজিলেটর পরীক্ষার্থীদের সামনে সীলড প্যাকেট খুলে প্রশ্ন পত্র বের করবেন এবং তারপর পরীক্ষা নিবেন। এভাবে সর্বশেষ পেরেকটি ঠোকা হয়ে যাবে।
এখানে মনে রাখতে হবে, এক্ষেত্রেও পরীক্ষার আগে কেন্দ্র সচিব কিংবা তাদের প্রতিনিধিকে ট্রেজারীতে যেতে হবে। তবে সেটা শুধু মাত্র কেন্দ্র, শ্রেণী কক্ষ এবং সর্বোপরি বিষয় কোড অনুযায়ী সীলড প্যাকেট আলাদা করার জন্য। খোলা অবস্থায় প্রশ্ন পত্র দেখা বা গুনে আলাদা করার জন্য নয়।
২০১৬ সালে আমি ময়মনসিংহে এটাও শুনেছি ( আমার কাছে চাক্ষুস প্রমান/স্বাক্ষী আছে) যেখানে কেন্দ্রে প্রশ্ন পত্র পৌছার পর পর কেন্দ্র সচিব নিজে প্রশ্ন খুলে বিষয় অনুযায়ী আগে থেকেই ডেকে নেয়া শিক্ষকদেরকে দিয়ে এমসিকিউ অংশের প্রশ্ন পত্র সমাধান করাতেন এবং তারপর তার নিজের বাসায় অবস্থানরত একজন পরীক্ষার্থীকে সেটা দিতেন। ফলে অন্য পরীক্ষার্থীরা ২০-৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে এলেও সেই শিক্ষার্থীকে ঠিক ৫ মিনিট আগে হাসতে হাসতে কেন্দ্রে এসে নির্দিষ্ট হলে ঢুকে যেতে দেখতাম। অনেক সময় সেই বিশেষ শিক্ষার্থী পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট পরও এসে উপস্থিত হয়েছে। দেরীতে আসার ফলে তার কোন টেনশন ছিল না কারণ ইতোমধ্যে সকল নৈর্বক্তিক উত্তর তার জানা। অন্য পরীক্ষার্থীরা যেখানে গলদ ঘর্ম সেখানে ঐ বিশেষ পরীক্ষার্থী ছিল নির্বিকার এবং ধীর স্থির। এত করেও খুব বেশী লাভ হয় নি। জিপিএ ৪.৮০ এর মত পেয়েছে। কিন্তু এটা ঠিক যে কেন্দ্র সচিবের বিশেষ আনুকূল্য না পেলে সে হয়তো পাশই করতো না।
সুতরাং আমার সার কথা – ছাপা খানার অটোমেশন দরকার যেখান থেকে প্রশ্নপত্র ছাপা হবার পর বিষয় কোড অনুযায়ী সীলড প্যাকেটে প্রশ্ন পত্র সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলা ট্রেজারীতে যাবে। সীলড প্যাকেটের উপর বিষয়, কেন্দ্র এবং কক্ষ নম্বর স্পষ্ট অক্ষরে লেখা থাকবে যাতে কোন কনফিউশন না হয়। ছাপা খানায় সীলড করা প্রশ্ন যদি একেবারে পরীক্ষার কেন্দ্রে নির্দিষ্ট শ্রেণী কক্ষে গিয়ে আলোর মুখ দেখে তাহলে অসৎ শিক্ষক, কেন্দ্র সচিব এরা কেউ আর সুযোগ পাবে না।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ১৯৮৫ -৮৬ সালের দিকে সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড র‍্যাংকের জন্য পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম। ঢাকা সেনানিবাসের ভেতর শহীদ রমিজউদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয়ে বসে লিখিত পরীক্ষা দিয়েছিলাম (নামটা আজো মনে আছে)। সকাল ৯ টায় পরীক্ষা। ঠিক ১০ মিনিট আগে একজন অফিসার সীলড করা একটা খাকী কাগজের খামে ভরে প্রশ্ন নিয়ে এলেন। তারপর আমাদের মধ্যে একজনকে দিয়ে সেই খাম পরীক্ষা করালেন, সবাইকে দেখালেন এবং আমাদের সামনে সেই খাম ছিড়ে প্রশ্ন বের করলেন। আমরা সেই প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছি। মোট চারটি বিষয় ছিল , প্রতিটির ক্ষেত্রেই একজন করে এসে সীলড খাম খুলে পরীক্ষা নিয়ে চলে গেলেন। এই সামান্য ঘটনা থেকে শিক্ষা মন্ত্রনালয় যদি কিছু শিখতে পারে তাই এত দিন আগের সেই ঘটনাটা বর্ণনা করলাম। শিক্ষা মন্ত্রনালয় চাইলে খাকী কাগজের খামের পরিবর্তে বিশেষ পলি প্যাকের খাম/প্যাকেট ব্যবহার করতে পারেন।
আমি জানি এতেও করে হয়তো কিছু ফাঁক ফোঁকর রয়ে যাবে। অতি সম্প্রতি নাইজেরিয়ায় পাবলিক পরীক্ষার আগে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলাফল জানিনা। কিন্তু আমাদের দেশেও পরীক্ষার ১২ ঘন্টা আগে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া যেতে পারে। যেমন রোগ তেমন ঔষধ আর কি। অনেক বিড়ম্বনা হবে কিন্তু নকল বাজ অভিভাবক আর শিক্ষক দের জন্য সবাই না হয় একটু কষ্ট করলাম। যতদিন পর্যন্ত সার্টিফিকেট সর্বস্ব বানিজ্যিক শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং সেই সাথে শিক্ষার্থী- অভিভাবক-শিক্ষক তথা আমলাদের চরিত্র পরিবর্তন না হবে ততদিন এসব নৈরাজ্য চলতেই থাকবে। আচ্ছা ২০০৯ সালে (যখন থেকে প্রশ্ন ফাঁসের নৈরাজ্য শুরু হলো) যারা এইচএসসি পাশ করেছেন তারা বর্তমানে শিক্ষার কোন পর্যায়ে আছেন? সম্ভবতঃ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে বিসিএস দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে অনেক নকল বাজ তথা প্রশ্ন ফাঁসের সুবিধা ভোগকারীও থাকবেন। এদের কেউ কেউ খুব শীঘ্রই সরকারী আমলা হবেন। কোন মুখে এরা নকলের বিরুদ্ধে কিংবা প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে কথা বলবেন? তাদের কি একটুকুও লজ্জা করবে না?