ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আপনার বয়স যদি ৪০ এর উপরে হয়ে থাকে তাহলে আমার এই লেখাটা মনযোগ দিয়ে পড়ুন। আর আপনি যদি ৪০ এর কম হয়ে থাকেন, তাহলেও দয়া করে এই লেখাটা অবজ্ঞা করবেন না।

ঘটনার শুরু ২০১০ সালের ১৫ মে, শনিবার সকাল ৬টায়। বাচ্চাদের স্কুল আছে, তাই ছুটির দিনেও আরাম করে ঘুমাতে পারলাম না। অন্যদিনের মত এদিনও চাইলে তারা স্কুল বাসে করে যেতে পারতো। কিন্তু তাদের আবদার, বাবার সাথে স্কুলে যাবে। আমি বরাবরই বাচ্চাদের এসব আবদারে খুব বেশি পাত্তা দিয়ে থাকি। তাই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠা। দাঁত ব্রাশ করে শেভ করার জন্য যেই না আয়নার সামনে দাঁড়ালাম, অমনি ’ঘ্যাচাং’ করে বুকের বাম দিকটায় কে যেন একটা খোঁচা মেরে দিল। সূক্ষ একটা সুঁইয়ের খোঁচার মত অনুভূতি হল যা মাইক্রো সেকেন্ডেই মিলিয়ে গেল। আমি শেভ করার দিকে মনযোগ দিলাম।
এরপর বাচ্চাদের ঘুম থেকে উঠানো হল, স্কুলের পোষাক পড়ে ওরা তৈরী হলো। তারপর সবাই মিলে টেবিলে নাস্তা করতে বসবো। এসময় আবার ’ঘ্যাচাং’। এবারেরটা একটু তীব্র, একটু দীর্ঘস্থায়ী তবে সেটাও এক কোয়ার্টার সেকেন্ডের কম সময়ে মিলিয়ে গেল। মনে হল শরীর একটু দুলে উঠলো। আমি একটা ধাক্কা মত খেলেও খাবার টেবিলে সবার সামনে স্বাভাবিক আচরণ করলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রওয়ানা হতে কত দেরি।

আনুমানিক সোয়া সাতটায় বাচ্চাদের নিয়ে বের হলাম। সাথে স্ত্রী। বাসা থেকে ৪০ মিনিটের পথ। নিজেই ড্রাইভ করছিলাম। এর মাঝে আরো দুই-তিন বার সুঁইয়ের খোঁচা। আস্তে আস্তে তীব্রতা বাড়ছে, দুই খোঁচার মাঝে বিরতির সময় কমে আসছে। মনে মনে ভাবলাম, এমনিই কিছু হবে হয়তো। রাতে ভাল ঘুম হয়নি- সেটার প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। ঠিক ৭ টা ৫৫ তে বাচ্চাদের স্কুলের সামনে নামিয়ে দিলাম। গাড়ি পার্কিং এ রেখে কিছুক্ষন গেটের সামনে অযথা হাঁটলাম। আসলে আমি দেখতে চাইছিলাম শরীরে আর কোন পরিবর্তন হয় কিনা কিংবা গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরে যাবার মত সুস্থতা আছে কিনা?

সেলফ এসেসমেন্ট করে মনে হল, বাসায় যেতে পারবো। তবে এর আগে গাড়ির সার্ভিস সেন্টারে যেতে হবে। সদ্য কেনা গাড়ির মেইনটেন্যান্স (ফ্রি সার্ভিসিং) এর সময় হয়ে গিয়েছিল। তাই স্কুল গেট থেকে সার্ভিস সেন্টার। সেখানে তখনো কেউ আসেনি। বসে থাকলাম, আর মনে মনে নিজের অবস্থাটা যাচাই করতে থাকলাম। একদমই ভয় পাইনি।
সাড়ে নয়টা নাগাদ সার্ভিস সেন্টারের লোকজন এলো, আমার সিরিয়াল নম্বর এক। ৩০-৪০ মিনিটের ভেতর সব কাজ হয়ে গেল। তবে এর মাঝে আমার বুকের ভেতরের খোঁচার তীব্রতা বেড়েই চলেছে এবং মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান মারাত্বক ভাবে কমে আসতে শুরু করেছে। এখনো আমি স্বাভাবিক আচরণ করছি। এরপর পাশে স্ত্রীকে বসিয়ে নিজে ড্রাইভ করে বাসায় ফিরে যাচ্ছি। তখন চট্টগ্রামে থাকি। ফয়েজ লেকের পাশে দিয়ে যেতেই মনে হল আমার আর এ যাত্রায় বাসায় যাওয়া হচ্ছে না। আস্তে করে গাড়িটি রাস্তার পাশে দাঁড় করালাম। এরপর খুব ঠাণ্ডা মাথায় স্ত্রীকে সকাল থেকে ঘটে চলা সব কিছু খুলে বললাম। সাথে এটাও বললাম যে তখন আর আমার পিছু ফিরে যাবার উপায় নেই, তাই আগে বাসায়ই যাব। যদি এর মধ্যে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই তাহলে যেন আমাকে দ্রুত রাস্তার পাশের কোন হাসপাতালে নিয়ে অক্সিজেন দেয়া হয়, জরুরি ভিত্তিতে হার্ট এটাকের চিকিৎসা দেয়া হয়।

ফোন করে বাসার প্রতিবেশি ডাক্তার ভাইটিকে সব কিছু জানালাম। তিনি সেখানেই গাড়ি রেখে তার ক্লিনিকে চলে যেতে বললেন। কিন্তু দামি নতুন গাড়ির মায়া ছাড়তে পারিনি। তাই তার কথা অবহেলা করে প্রথমে বাসায় গেলাম। এরপর ফোন করে এম্বুলেন্স আসতে বললাম। এর মধ্যে তিনি এসে দেখে গেলেন এবং বললেন, সম্ভবত হার্ট এটাক জাতীয় কিছু নয়, বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তার কথায় খুব একটা ভরসা পেলাম না। এম্বুলেন্স আসতে খুব দেরি হচ্ছিল। তাই আবারো নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে চট্টগ্রাম শহরের একটা হাসপাতালে উপস্থিত হলাম।
১০ দিনের মত থাকলাম। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় – অপ্রয়োজনীয় অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ডাক্তার এনজিওগ্রাম করতে চাইলেন। আমি সেই হাসপাতাল থেকে ছাড় নিয়ে ঢাকায় এসে এনজিওগ্রাম করে জানলাম হার্টে দুইটা ব্লক আছে একটা ২৫% আরেকটা ৪০%। আমার বয়স অনুযায়ী ২৫-৪০% ব্লক মোটেই সিগনিফিকেন্ট নয়। তারপরও প্রতিদিন নিয়ম করে এস্পিরিন (৭৫ মিলিগ্রাম) খেতে বললেন, সাথে সাথে জীবন যাত্রার ধরণ পাল্টানোর উপদেশ। গরুর- খাসির মাংস, ডিমের কুসুম, চিংড়ি মাছ এসব বাদ। সিগারেট অনেক আগেই ছেড়েছি। প্রতিদিন ৪০ মিনিট হাঁটতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর আবার কাজে ফিরে গেলাম। সারা দেশ চষে বেরিয়েছি। প্রথম কয়েক মাস বা এক বছর ডাক্তারের কথা মত চলতে চেষ্টা করেছি – তারপর এক সময় সব ভুলে গেছি।

২০১৪ সালের জুলাইতে উগান্ডা চলে এলাম। এর আগে কিছুদিন যশোরে। যশোরে থাকতে একদিন একটা ফিল্ড ট্রিপে নোয়াপারা যাচ্ছিলাম। পথে হঠাৎ বুকটা কেউ যেন চেপে ধরলো, শ্বাস নিতে একটু কষ্ট তারপর আবার সব ঠিক। পরপর দুই তিন দিন এরকম হওয়াতে এবং সেই সাথে শারিরীক ডিসকম্ফোর্ট মনে করাতে ডাক্তারের কাছে গেলাম – তিনি দেখে বললেন অতি উচ্চরক্ত চাপ বাসা বেঁধেছে শরীরে। আসলে তখন আমার উগান্ডা যাওয়া প্রায় পাকাপাকি শুধু টিকেট-ভিসার অপেক্ষা। জয়েনিং লেটার পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি নিয়োগ কর্তাদের কাছে দুই মাস সময় চেয়েছিলাম যাতে নিজ পরিবারকে একটু গুছিয়ে রেখে যেতে পারি। পরিবার তখনো ময়মনসিংহেই থাকতো। ওরা চাইছিল যেন পরিবার নিয়েই আমি চলে যাই কিন্তু বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এদেশেই ওদেরকে বড় করতে চাইছিলাম। যাই হোক ২০১৪ – ২০১৫ সাল পুরোটাই উগান্ডার আনাচে কানাচে ঘুরে বেরিয়েছি। পাশের দেশ কেনিয়া, ডি আর কঙ্গোতেও যেতে হয়েছে দুয়েকবার।

পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে উগান্ডাতে নীল নদের উৎস নিয়ে একটা ব্লগ লিখেছিলাম। নীল নদের উৎস দেখার পর কাছেই একটা জলপ্রপাত দেখতে যাই। সেখানে ছোট একটা পাহাড়ের ওপর থেকে ২০-৪০ ফুট নীচে নেমে জলপ্রপাতের খুব কাছে যাওয়া যায়। যাওয়ার সময় ভালই গেলাম। কিন্তু ওপরে ওঠার সময় সময় হঠাৎ বুকটা কেউ যেন খামচি মেরে ধরে ফেললো। নিঃশ্বাস বন্ধ হবার জোগাড়। আমি আমার সঙ্গীকে কিছু না বলে মাটিতে বসে পড়লাম। কিছু একটা সমস্যা হয়েছে বুঝলেও তিনি আর তেমন কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। আমি প্রায় ৩০ মিনিট বসে বিশ্রাম নিয়ে গাড়িতে ফিরে গেলাম। এরপর কাম্পালা হয়ে এনটেবেতে ফেরত। ব্লগে আমার অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। কিন্তু বুক চেপে ধরার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাচ্চাদের এসএসসি পরীক্ষা। ছুটি চাইলে আমার নিয়োগ কর্তারা টালবাহানা শুরু করে দেয়। আমি প্রায় তিন মাস আগেই নোটিশ দিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু তারপরও প্রজেক্টের লেজে গোবরে অবস্থা দেখে ওরা আমাকে ছুটি না নেয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করতে থাকে। কিন্তু আমি নাছোড় বান্দা। ঐ সময়ে হঠাৎ করে খুব অগোছালো-বেহিসেবি জীবন–যাপন করতে থাকি। এসবের মধ্যে একদিন বড় কর্তা বলেই দিলেন প্রয়োজন হলে ইস্তফা দিয়ে যেন যাই। আমাকে চাকরির ভয় দেখায় কে? এক তরফা ইস্তফা দিয়েই পরীক্ষার আগে কয়েকদিন দেশে চলে আসি ।

পরীক্ষা চলছে। মার্চের মাঝামাঝি কোন একদিন। সেটাও শনিবার। ঘুম থেকে উঠে আদর সোহাগের পর্ব চলছে। এর মাঝেই হঠাৎ বুকে তীব্র ব্যাথা। এত তীব্র যে আমি দাঁড়াতেও পারছিলাম না। দ্রুত ড্রাইভার ডেকে ময়মনসিংহ শহরের একটা ক্লিনিকে চলে গেলাম। কর্তব্যরত অল্প বয়সী এক ডাক্তার সাথে সাথে ইসিজি করলো, কিন্তু সেটা নরমাল। ’ট্রপোনিন আই’ নামে একটা রক্তের পরীক্ষা আছে সেটা করা হলো – সেটাও নরমাল। পাশে থেকে আমার স্ত্রী বারবার ডাক্তারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন – এটা গ্যাসের ব্যাথা। বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট স্বাভাবিক আসায় ডাক্তারও ধরে নিল ওটা গ্যাসের ব্যাথা। কিন্তু আমি মনে মনে ভাবছিলাম- গ্যাসট্রিকের ব্যাথা হলে বুকের ওপরের দিকে ব্যাথা হবে কেন? সেই সাথে পিঠ এবং বা হাতে ব্যাথা হবে কেন? যাই হোক এক ঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে আবারো ইসিজি- ট্রপোনিন করা হল। সব নরমাল। ডাক্তার ছেড়ে দিল। তবে ডাক্তার ছেলেটি এবার এসপিরিনের সাথে আরেকটা ঔষধ যোগ করে দিল – নাইট্রোগ্লিসারিন ট্যাবলেট ( ট্যাবলেট জিটিএন ২.৬ মিঃগ্রাঃ)। একই সাথে একটা নাইট্রো-গ্লিসারিন স্প্রে দিয়ে দিল – কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করতে হবে সেটাও বলে দিল।

আমি ভাল মত বাসায় ফিরে গেলাম। বাচ্চাদের পরীক্ষা শেষ করে ঢাকায় বাসা নিলাম। বনানীর ২৩ নম্বর রোডে। ৪ তলায় বাসা, লিফট আছে। হাতে তেমন কোন কাজ নেই। এখানে সেখানে সিভি দেই, অনলাইন ইন্টারভিউ দেই। গাড়ি নিয়ে পরিবার সমেত ঘুরে বেড়াই। ওদেরকে যেভাবে দুটি বছর বঞ্চিত করেছি সেটা পুষিয়ে দিতে চাইছিলাম। তখন বনানীর ১৮ নম্বর রোডে রাস্তা মেরামতের কাজ চলছিল। বনানী কবরস্থানের রাস্তার সামনে নিত্য ট্রাফিক জ্যাম। লাগাতার কাদা-ময়লার মাখামাখি। প্রায় প্রতি সপ্তাহে, কখনো কখনো সপ্তাহে দুই তিন বার চেয়ারম্যানবাড়ির ওখানে একটা কার ওয়াশ সেন্টারে গাড়ি ধুতে নিয়ে যাই। প্রতি ওয়াশ ৬০০ টাকা। বেকার জীবনে এটা নেহায়েত কম নয়। কখনো কখনো নিজেই বাসায় ধুয়ে ফেলি। ছেলে সাহায্য করে। এর মাঝে আস্তে আস্তে নিজেকে খুব দুর্বল লাগছিল। নিঃশ্বাস নিলে বুক ভরে না, তৃপ্তি পাই না। আদর সোহাগ একেবারেই ভাল লাগে না। বিশেষ করে নিজে নিজে কার ওয়াশ করতে চাইলে সেটা একবারেই করতে পারতাম না। খুব ক্লান্তি লাগতো। আমি ভাবলাম বয়স হচ্ছে তাই হয়তো শরীরের জোর কমে যাচ্ছে। কিছুটা খরচ আর বেশির ভাগ পরিশ্রম বাঁচানোর জন্য ১৪ হাজার টাকায় একটা জেট স্প্রে (Karcher, Made in Germany) মেশিন কিনলাম যাতে অতি অল্প পরিশ্রমে গাড়ি ধোয়া যায়। দুই-এক বার গাড়ি ধুয়ে নিলাম। খুব ভালই লাগছিল। মোটামুটি এক মাসেই ৩-৪ হাজার টাকা উসুল।

এর মাঝে এক বন্ধুর অনুরোধে ওর অফিসে বসি। সেখানে হঠাৎ হঠাৎ ক্লান্ত লাগে। আমাকে একটা আলাদা অফিস রুম দেয়া হল। সেখানে মাঝে মাঝে ক্লান্তিতে সোফায় শুয়ে পড়ি। অফিস সহকারীর মত একজন ছিল। ওকে বলতাম প্রয়োজন না হলে যেন অযথা আমাকে কেউ বিরক্ত না করে। মনে হচ্ছিল আমি ভেতর থেকে শেষ হয়ে যাচ্ছি। দুঃখের বিষয় বাসায় এসব নিয়ে আলোচনা করতে পারতাম না। ভালবাসার আধিক্যে আমার স্ত্রী এসব শুনতেই চাইতেন না। আমি যে একটা মানুষ, মানুষের যে রোগ শোক হতে পারে – তিনি বিশ্বাস করতে চাইতেন না। তার এক কথা – ’তোমার এসব হবে কেন? তুমি বাড়িয়ে বলছো। এসব তোমার আজে বাজে চিন্তা। হলে বড় জোর গ্যাস্ট্রিক এর ব্যাথা হবে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মাঝে আমি অনেকবার ডাক্তারের কাছে যেতে চেয়েছি কিন্তু প্রতি বারই তিনি আমাকে নিরুৎসাহিত করতেন। অনেক সময় উপহাস করতেন। আমি কিছুই বলতাম না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিলাম।

এ সময় একদিন আমি আমার ছেলেকে আলাদা করে ডেকে বললাম আমার যদি কিছু একটা হয়ে যায় সে যেন তার মা এবং বোনকে দেখে রাখে। সেই সাথে আমার কোথায় কি সহায় সম্পত্তি আছে (আসলে নগদ কিছু টাকা ছাড়া আর কিছু নেই) সব বুঝিয়ে দিলাম। সে খুব অবাক হল এবং সেটা নিয়ে আমার অনুপস্থিতিতে তার মায়ের সাথে বেশ শক্ত করে আলোচনা করলো। কিন্তু আমার আর ডাক্তার দেখানো হয়ে ওঠেনা। হয়তো ডাঃ মমিনুজ্জামানের একটা এপয়েন্টমেন্ট নিলাম কিন্তু বিকেলে স্ত্রী এমন একটা কাজ নিয়ে হাজির হবেন যে আমার আর ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়ে ওঠেনা। মে মাসের প্রায়ই বাসায় বিদ্যুৎ থাকতো না। বাজারে গিয়েছি – ফেরার সময় বিদ্যুৎ নেই। লিফট বন্ধ। হাতে ১০-১২ কেজির ব্যাগ নিয়ে অনেক কষ্ট করে চার তলায় উঠতাম। এরপর রুমে গিয়ে টানা এক ঘন্টা বিশ্রাম। তখন জেট স্প্রে মেশিন দিয়েও গাড়ি ধোয়া হয় না। মেশিন অলস পড়ে থাকে। গাড়ি নোংরা, কদাকার।

এপ্রিলের শেষ বা মে ২০১৬ মাসের শুরুর দিকে এর দিকে একদিন এক বড় ভায়রা ভাইয়ের বাসায় গেলাম। তিনিও চার তলায় থাকেন। কিন্তু সেখানে লিফট নেই। আমি দোতলা পর্যন্ত উঠে হাঁপিয়ে পড়লাম। বুকে চিন চিন ব্যাথা শুরু হয়ে গেল। এ সময় নামাজ পড়তে যাওয়ার জন্য আমার ভায়রাও সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছিলেন। আমাকে দেখে খুবই অবাক হলেন। নামাজ শেষে বাসায় এসে নিজে থেকে বললেন – চার তলা উঠতে যদি আমার আজকের মত এমন কষ্ট হয় তাহলে শীঘ্রই ডাক্তার দেখানো দরকার। স্ত্রী পাশে ছিলেন- কিন্তু তিনি নির্বিকার এক হাসিতে উড়িয়ে দিলেন। ’আমার রোগ হতে নেই। হতে পারে না। যেহেতু তিনি নিয়মিত আল্লাহকে ডাকেন, তাই প্রাণঘাতী কোন রোগ আমার হতে পারে না। বয়স হচ্ছে তাই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। আমার আগে তিনিই মারা যাবেন’ – ইত্যাদি ইত্যাদি।

জুন ২০১৬। রমজান মাস এসে গেল। প্রথম রোজার দিনটা আজো আমার স্পষ্ট মনে আছে। দুপুর ২টা পর্যন্ত বন্ধুর অফিসে ছিলাম এরপর বাসায় চলে আসি। গাড়িটা খুব নোংরা হয়ে ছিল। বিকেলে ইফতার কিনতে বের হব। ভাবলাম একটু পরিস্কার করে নেই। জেট স্প্রে মেশিন এবং সাথে কিছু আনুষঙ্গিক জিনিষপত্র নিয়ে লিফটে করে নীচে নেমে আসলাম। প্রথমে পানির লাইন দিতে হবে। এরপর বিদ্যুৎ। পানির আউটপুট লাইন লাগিয়েছি কোন সমস্যা হয়নি। বাসার দারোয়ান সাহায্য করেছে। এরপর ইনপুট লাইন লাগানোর জন্য দুটি পাইপ হাতে নিয়েছি। মেশিনের ইনপুট এবং গ্যারেজের কলের আউটপুট পাইপ। এ সময় একটা ঘটনা ঘটতে শুরু করলো। কিছুতেই সহজ ভাবে পাইপ দুটো লাগাতে পারছিলাম না। শরীরের স্বয়ংক্রিয় সিষ্টেম বা মোটর নিউরন কাজ করছিলো না, তাই বারবার পাইপ দুটো হাত ফস্কে যাচ্ছিল। একটা পাইপ আরেকটার মুখে আনতেই পারছিলাম না। দরদর করে ঘামছি – আর চেষ্টা করছি। মাটিতে বসেই পড়লাম। আর ঠিক এ সময় শুরু হল তীব্র বুক ব্যাথা। আমি কি বুঝলাম জানি না। পাইপ ছেড়ে পাশের চেয়ারে বসে পড়লাম। এই প্রথমবার আমি ভাবলাম হয়তো রোজা রাখাতে খালি পেটে গ্যাস জমেছে – তারই ব্যাথা। একটু অপেক্ষা করলাম। ব্যাথা কমে গেল। আমি আবারো দুই পাইপ এক সাথে করার চেষ্টা করছি। এবারো হচ্ছে না। ব্যাথা শুরু হল আবারো। আমি আবারো চেয়ারে বসে পড়লাম।

এসময় কি মনে করে আমার স্ত্রী নীচে নেমে এলেন। আমি তাকে আমার ব্যাথার কথা বললাম। আর অনুরোধ করলাম যেন দারোয়ানকে দিয়ে যব যন্ত্রপাতি বাসায় নেয়ার ব্যবস্থা করে। আমি লিফটে চড়ে ফ্লাটে চলে এলাম। ময়মনসিংহের ডাক্তারের দেয়া নাইট্রো-গ্লিসারিন স্প্রে মুখের ভেতর দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। এরপর কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না।

রাত আনুমানিক ১১ টায় ঘুম ভাঙলো। একেবারে সতেজ, ঝরঝরে। কিচ্ছুই হয়নি। কিন্তু খুব দুর্বল লাগছিলো। সামান্য কিছু খেয়ে শুয়ে পড়লাম। রাতে ভালই ঘুম হলো। পরদিন ১০টার দিকে অফিসে গেলাম। না গেলেও চলতো। সময় কাটানোর জন্য যাওয়া। বন্ধুকে গত দিনের কথা বললাম। সে দ্রুত ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দিল। আর পরবর্তী কয়েকদিনের ভেতর ডাঃ মমিনুজ্জামান (ইউনাইটেড হাসপাতাল)কে দেখানোর জন্য এপয়েন্টমেন্ট করে দিল। বাসায় এলাম। মাঝে মাঝেই তীব্র বুক ব্যাথা করে। আমার মনে হয় গ্যাসট্রিকের ব্যাথা। দুই তিনটা করে অমিপ্রাজল খাই। রোজা রাখতে পারছিলাম না। কিছু খেতেও পারছিলাম না। খেলেই সাথে সাথে বুক জ্বলে, তীব্র বুক ব্যাথা হয়। বুক ব্যাথার ভয়ে আমি খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিলাম। গ্যাসট্রিক বা আলসারের ব্যাথার ধারণা আরো তীব্রতর হলো।

১৫ জুন ২০১৬। বুধবার। বন্ধুর অফিসে ইফতারের দাওয়াত। যাব কি যাবো না। এর আগের দিন রাত নয়টায় আমি ইউনাইটেড হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে ইমার্জেন্সিতে সব কিছু খুলে বলার পর ওরা কিছু পরীক্ষা করলো (ইসিজি, ট্রপোনিন আই)। কিন্তু  কিছু না পেয়ে সারা রাত রেখে দিতে চাইলো। যেহেতু আর দু-তিন দিন পরেই ডাঃ মমিনুজ্জামানের সাথে এপয়েন্টমেন্ট করা ছিল তাই শুধু শুধু ভর্তি হয়ে টাকা গচ্চা দিতে চাইছিলাম না। পাশে থেকে স্ত্রীও আশ্বাস দিচ্ছিলেন – এটা গ্যাসট্রিকই হবে। কিছুটা তার জোরাজুরির কারণেই কর্তব্যরত কার্ডিওলজিষ্ট আর হাসপাতালে রাখলেন না। বন্ড সই নিয়ে ছেড়ে দিলেন।

ইফতার পার্টিতে হাজির হয়েই আমার খুব খারাপ লাগছিল। শরীর চলছিল না। কোন মতে বসে থাকলাম। প্রাণ জুস একটু মুখে দিলাম। কিছু খেলেই যেহেতু বুক ব্যাথা করে তাই ভয়ে কিছুই স্পর্শ করলাম না। ইফতার শেষে সবাই মাগরেব নামাজের জন্য উঠলো। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে যেতে হবে। আমি ভাবলাম নীচে নেমে যাই। চেয়ার ছেড়ে উঠেছি এসময় আবারো তীব্র ব্যাথা। সে এমন এক ব্যাথা যা ভাষায় লিখে প্রকাশ করা যাবে না। দোয়া করি এরকম ব্যাথার অভিজ্ঞতা যেন কোনদিন কারো না হয়। মনে হয় হাত দিয়ে কেউ আমার হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে আনতে চেয়েছিল। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। দর দর করে ঘামছিলাম। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। কোনমতে ব্যালকনি আর সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলাম। ড্রাইভার আর অফিস সহকারীর দেখা পেলাম- তাদেরকে বললাম সোজা বাসায় নিয়ে যেতে। গাড়িতে যখন উঠছি – কিছু মনে আছে। এর পর সব অন্ধকার। কিছু ঝাপসা সৃতি। বনানীর ট্রাফিক জ্যাম , জোরে হর্ন দিয়ে বিপজ্জনক গতিতে একে বেঁকে গাড়ি চলা। মাঝে মাঝে তীব্র ব্রেক। সবই ঝাপসা হয়ে আছে।

আমার পরম সৌভাগ্য আমার অফিস সহকারী আর ড্রাইভার আমাকে বাসায় নিয়ে যায়নি। ওরা আমার অবস্থা দেখে কি বুঝেছে জানিনা – সোজা হাসপাতাল। পথে ফোন করে আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে আসতে বলা, সাথে টাকা পয়সা আনতে বলা, পুরনো প্রেসকিপশন সব কিছু। এই অল্প বয়সী ছেলেটি সেদিন আমার ত্রাণকর্তা হয়ে দেখা দিয়েছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নাকি জ্ঞান হারিয়েছিলাম বলতে পারবো না। তিন দিন পর যখন চোখ মেলে তাকালাম – তখন হাসপাতালের স্বচ্ছ বিছানায় নাকে মুখে অনেক নল, শরীরে অনেক আইভি লাইন লাগানো অবস্থায় নিজেকে আবিস্কার করলাম। পাশে বিস্ফোরিত নয়নে আমার স্ত্রী-সন্তানেরা বসে আছে।

সেদিনই আমার এনজিওগ্রাম করা হলো। এ ব্যাপারে আমি অভিজ্ঞ ছিলাম। মনিটরে আমার হার্টের রক্ত সরবরাহকারী ধমনীগুলো দেখছিলাম। প্রথম স্ক্রিন শট দেখেই ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম আমি কিভাবে বেঁচে আছি? বাম দিকের বড় ধমনী (LAD) যা হৃদপিণ্ডের ৭০% ভাল রক্ত সরবরাহ করে সেখানে ৯৯% ব্লক! মুচকি হেসে ডাক্তার জবাব দিলেন – একই প্রশ্ন তারও। কিভাবে আমি বেঁচে উঠলাম! একেই বলে মিরাকল। একেই বলে সৃষ্টিকর্তার মহিমা!

প্রথমে বাইপাস করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমার শরীর সেই ধকল নিতে পারবে না তাই একটা রিং (Stent) লাগিয়ে দিয়েছেন। লম্বায় সাড়ে তিন সেন্টিমিটার, প্রস্থে বোধ হয় এক। এরপর আমি আবার ঘুমিয়ে গেছি। অনেক দিন পর আরামের ঘুম। এত ভাল লাগছিল যা বোঝাতে পারবো না। বেঁচে গেছি সেজন্য নয়। অনেক দিন পর বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম, খুব সতেজ লাগছিল নিজেকে।

LAD

আল্লাহর কাছে হাজার শোকরিয়া। আমি এ যাত্রায় মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছি। আল্লাহ আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছেন । খুব উপভোগ করছি আমার এই নতুন জীবন। কিন্তু আগের মত সেই শক্তি নেই। তাই ব্লগে লেখা কমে গেছে। বাইরেও খুব একটা যাই না। নির্দিষ্ট রুটিনের মাঝে চলার চেষ্টা করছি। সবার কাছে দোয়া চাইছি।

আমার এই অভিজ্ঞতা সবার সাথে শেয়ার করার একটাই উদ্দেশ্য। হৃদয় নিয়ে কেউ হেলাফেলা করবেন না। হৃদয় খুব হৃদয় হীন। Heart is very heartless. আল্লাহর রহমতে আমি অনেক সময় পেয়েছি, হেলাফেলা করেছি। কিন্তু আপনাকে ’সে’ সময় নাও দিতে পারে। আপনি আমার মত মহাভাগ্যবান নাও হতে পারেন। তাই সময় থাকতে সচেতন হোন।