ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

অনেক ছোট বেলায় পাড়ার মসজিদে হুজুরের কাছে কোরান শরীফ পড়া শিখেছিলাম। বাবা নিজে আমাকে হুজুরের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের পরিবারে সেটাই প্রচলিত ছিল। ছেলে মেয়েরা একটু বড় হলেই সকালে উঠে মসজিদে আরবী পড়তে যেতে হত। আমার আগে আমার বড় ভাই, বড় বোন সেখানে ছিল। বেশিক্ষন না। ফজর নামাজের পর হয়তো এক ঘন্টা বা দেড় ঘন্টা। সপ্তাহে তিন – চারদিন, যার মধ্যে রবিবার (সাপ্তাহিক ছুটির দিন) এবং শুক্রবার ছিল খুব স্পর্শকাতর যেদিন না গেলে খবর হয়ে যেত। সেখানে কোরআন পড়া রপ্ত করার পাশাপাশি নামাজ শিক্ষা, বিভিন্ন হাদিস, কালাম শেখাটাও হত বিনামূল্যে। পুরো পাড়ার অসংখ্য ছেলে মেয়ে হুজুরের কাছে যেত। ভোরে এভাবে কোরআন পড়তে যাওয়াটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এরপর স্কুলে থাকার জন্য জোহর আর আসর নামাজ বাদে অন্যান্য ওয়াক্তের নামাজ পড়তে যাওয়াও বাধ্যতামূলক ছিল। বিশেষ করে সকালে ফজর আর সন্ধায় মাগরেবের নামাজে যেতে না পারলে পরদিন আর রক্ষে থাকতো না। পিটিয়ে পিঠের ছাল বাকল সব তুলে ফেলতেন আমাদের সেই হুজুর যিনি একজন কোরআনে হাফেজ ছিলেন।

যখন কোরআন শরীফ একটু একটু করে পড়তে শিখেছি তখন মাঝে মাঝে বাসায় বসে পড়তে হত। হুজুর হোমওয়ার্ক দিতেন – অমুক পারা থেকে অমুক পারা পর্যন্ত পড়ে আসবি কিংবা অমুক পারার এত নম্বর আয়াত থেকে অত নম্বর আয়াত পর্যন্ত। বাসায় একটিই কোরআন শরীফ ছিল যেটা বাবা, মা, বড়ভাই এবং বড়বোন ভাগাভাগি করে পড়তেন। বাসায় পড়ে গেলে হুজুরের সামনে আবার পড়তে হত। বাসায় পড়ে গিয়েছিলাম কি না সেটা পড়ার গতি এবং ভুল ভ্রান্তির পরিমান দেখেই হুজুর বুঝতে পারতেন। কিছুদিন কায়দা, তারপর আমপারা পড়লাম। এরপর মসজিদে থাকা কোরআন শরীফ নিয়ে তালিম শুরু। যেদিন প্রথম হোম ওয়ার্ক দিলেন সেদিন বাসায় আমি কোরআন শরীফ হাতে নিয়ে দেখি কিছুই পড়তে পারি না। অক্ষরগুলো বড়ই অচেনা, পেঁচানো লাগছিল। ফলাফল স্বরূপ হুজুরের কাছে বকাঝকা খাচ্ছি। একদিন বাবাকে আমার সমস্যার কথা বলার পর বাবা আমাকে সাথে করে বাংলাবাজার নিয়ে গেলেন। বাসার কাছেই ছিল বাংলা বাজার। সেখানে বইয়ের দোকানে গিয়ে বাবা দোকানিকে একটা লখনৌ ছাপার কোরআন শরীফ দিতে বললেন। আমি সেটা হাতে নিয়ে দেখলাম সেটার লেখা হিজিবিজি বা পেঁচানো, অনেকটা বাসার কোরআন শরীফের মতই। পড়তে অসুবিধা। এরপর বাবা দোকানিকে কোলকাতা ছাপার কোরআন শরীফ দিতে বললেন। সেটা হাতে নিয়ে দেখলাম পরিস্কার ঝকঝকে লেখা, পড়তে কোন অসুবিধা হচ্ছিল না। বাবা খুশি হয়ে দোকানিকে হাদিয়া দিয়ে দিলেন। সেই আমার প্রথম কোরআন শরীফ কেনা। সেই আমি প্রথম জেনেছি – কোরআন শরীফে বিভিন্ন রকমের ছাপা হয়। আসলে বর্তমানে আমরা ইংরেজী, বাংলায় যে রকম বিভিন্ন ফন্ট ব্যবহার করি, কোরআন শরীফের ক্ষেত্রেও তৎকালে এবং এখনো পর্যন্ত বিভিন্ন ফন্ট ব্যবহার করা হয়। আমার জন্য কোলকাতা ছাপা মানে বিশেষ একটা ফন্ট বাবা বেছে দিয়েছিলেন। এখনো আমি ঐ কোলকাতা ফন্ট বাদে অন্য কোন ফন্টে কোরআন শরীফ পড়তে পারি না।

আসলে লখনৌ ছাপা বা কোলকাতা ছাপা যাই হোক না কেন সেগুলি কি আদৌ ভারতের কোলকাতা বা লখনৌতে ছাপা হতো কিংবা এখনো ছাপা হয় কিনা এ বিষয়ে কখনো জানার আগ্রহ হয়নি। বছর আটেক আগে একবার ছেলে-মেয়ের জন্য আলাদা কোরআন শরীফ কিনতে গিয়ে কোলকাতা ছাপা দিতে বলেছি। ঠিক যেভাবে বাবা বলেছিলেন। এরপর বছর চারেক আগে স্ত্রীর জন্য একটা কিনতে গিয়ে সেই একই কোলকাতা ছাপাই কিনেছি। এই দুই ছাপার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো লখনৌ ছাপাতে যে ক্যালিগ্রাফিক ষ্টাইল ব্যবহৃত হয় সেখানে একটা হরফ তথা অক্ষরের সাথে আরেকটা হরফ বা অক্ষর মিলে মিশে এমনভাবে পেঁচিয়ে থাকে যে, যারা নিয়িমিত পড়েন না বা কিছুটা নতুন তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অক্ষর বাদ পড়ে যেতে পারে কিংবা ভুল উচ্চারিত হতে পারে। অপরদিকে কোলকাতা ছাপায় প্রতিটা অক্ষর মোটামুটি আলাদা থাকে, ঝকঝকে এবং বেশি পেঁচানো হয় না। পড়তে সাচ্ছন্দ লাগে।

ý

এতক্ষন আসলে যা বললাম সেটা ধান ভানতে শিবের গীত না হলেও আজকের লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। পাঠক ক্ষমা করবেন। তবে আপনাকে ধন্যবাদ যে কষ্ট করে এতদুর পর্যন্ত পড়েছেন। অনুরোধ করছি – লেখাটা শেষ অবধি পড়ুন।

সৌদি আরবের মদীনা শহর। যে শহরে ঘুমিয়ে আছেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব, নবীকূল শিরোমনি, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ মুস্তফা (সাঃ)। এই মদীনা শহরে আছে কিং ফাহদ কমপ্লেক্স (King Fahd Complex)। এই কমপ্লেক্স হতে পৃথিবীর ৭০ টি ভাষায় কোটি কোটি কপি কোরআন শরীফ ছাপা হয়েছে। এই অত্যাধুনিক কমপ্লেক্স তথা প্রিন্টিং প্রেসে বছরে ১২ মিলিয়নের অধিক সংখ্যক পবিত্র কোরআন শরীফ ছাপা হয়। অতি বিজ্ঞ কোরআনের হাফেজ, আলেম, বুজুর্গসহ বিভিন্ন পদে এখানে প্রায় ১৭০০ লোক কাজ করে। পবিত্র কোরআনের পাশাপাশি এই প্রেস হতে তাফসির সহ তরজমা, বিভিন্ন ভাষায় ইসলামিক বই, কোরআন তেলাওয়াতের অডিও (সিডি, টেপ, ইউএসবি) ইত্যাদি প্রকাশ করা হয়। এছাড়া এদের ওয়েব সাইটেও (http://qurancomplex.gov.sa/) এসকল মূল্যবান সামগ্রী আপলোড করা হয়। যে কেউ চাইলে বিনামূল্যে এগুলো ডাউনলোড করতে পারেন।

কীভাবে ছাপা হয় পবিত্র কোরআন? জেনে খুবই অবাক হলাম কিভাবে একটার পর একটা স্তর পার হয়ে প্রায় ৮-১০ টি ধাপে এক খণ্ড কোরআন ছাপা হয় যার প্রতিটি স্তর হতে হয় একেবারে নিখুঁত। স্তরগুলো এরকমঃ

১। সর্বপ্রথমে একজন ক্যালিগ্রাফার নিজ হাতে একপাতা এক পাতা করে কোরআন লিখে যান যেখানে শুধুই অক্ষরগুলো থাকে, সেখানে কোন নোক্তা, জের, জবর এগুলো থাকে না। লেখার জন্য তিনি বড় একটা লেমিনেটিং শীট ব্যবহার করেন। এরপর ৯ জন আলেম আলাদা আলাদা ভাবে প্রতিটি পাতা পরীক্ষা করেন এবং প্রতি পাতায় নিজ নিজ স্বাক্ষর প্রদান করেন। এই শীট থেকে অফসেট পদ্ধতির মত ছাপার জন্য পজিটিভ প্লেট তৈরী করা হয়। ছাপার মেশিনটি প্রথম স্তরে শুধুই এই অক্ষরগুলো ছাপে। অনেকটা কাগজের নোট ছাপানোর মত প্রথমে একটা নির্দিষ্ট রং ব্যবহার করা হয়। একটা বড় কাগজে অনেকগুলো পৃষ্ঠা থাকে যেগুলো পরে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে ভাজ করা হয়।

æ

২। এই পর্বে আরেকটা লেমিনেটিং শীটে ক্যালিগ্রাফার নোক্তাগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় বসান বা লিখেন। এটা করার সময় প্রথম স্তরের লেমিনেটিং শীট নীচে ধরে রাখতে হয় যেন এই নোক্তাগুলো নীচের অক্ষর বরাবর নির্দিষ্ট জায়গায় বসে। শুধুমাত্র নোক্তা বসানো এই লেমিনেটিং শীটের মাধ্যমে পজিটিভ তৈরী করে কাগজের পাতায় ২য় স্তরের ছাপা হয়। এবারেও ৯ জন আলেম এটাকে আলাদা আলাদা ভাবে পরীক্ষা করে নিজেদের স্বাক্ষর সংযুক্ত করেন।

dav

৩। তৃতীয় পর্বে আবার একটা লেমিনেটিং শীট ব্যবহার করা হয়। এবার জের-জবর (অর্থাৎ বাংলায় যাকে আমরা আকার, ই কার বলি সেরকম) যোগ করা হয় এবং ৯ জন আলেম দ্বারা পরীক্ষা করে পজিটিভ তৈরী করে কাগজে তৃতীয় ধাপের ছাপ নেয়া হয়। খেয়াল করুন, এই পর্যন্ত একটি কাগজ তিনবার মেশিনে ঢুকেছে আর বেরিয়েছে।
’

৪। চতুর্থ হতে ৬ষ্ঠ পর্বে সাকিন, রুকু-সেজদা এবং আয়াত চিহ্নিত করা হয় এবং প্রতিবারই ৯ জন আলেম সেগুলোকে পরীক্ষা করেন, তারপর পজিটিভ প্লেট এবং সবশেষে কাগজে ছাপা। দেখা যাচ্ছে একটি কাগজ মোট ৬ বার মেশিনে ঢুকানো হচ্ছে ৬ টি স্তরের ছাপা সম্পন্ন করছে।

” P h L

৫। এরপর প্রতিটি কাগজ ভাঁজ করা হয় (যেভাবে বই ছাপার পর ফর্মা হিসেবে ভাঁজ হয় ঠিক সেরকম)। প্রতিটি ফর্মার জন্য একটি বার কোড এবং কালিতে ছাপা সাধারণ কোড ব্যবহার করা হয়। কম্পিউটার এবং সর্টিং মেশিন এই বার কোড মিলিয়ে কাগজগুলো ফর্মা আকারে ভাজ করার কাজটা করে থাকে। তবে মেশিনের কাজ ঠিক আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করার জন্য কালিতে ছাপা সাধারণ কোড মিলিয়ে দেখা হয়। সেটা এমন সাধারণ কাজ যা সামান্য প্রশিক্ষণ নিয়ে যে কেউ করতে পারবে।

Ô , | Â

৬। সবগুলো ফর্মা একত্রে সাজানো হয়ে গেলে একটি লটের মধ্যে যত কপি কোরআন শরীফ ছাপানো হচ্ছে সেখান থেকে কয়েকটি কপি পুনরায় ১০-২০ জন আলেম মিলে প্রতিটি লাইন এমনকি প্রতিটি অক্ষর ধরে পরীক্ষা করেন। যদি পরীক্ষায় এগুলো ঠিক পাওয়া যায় তবে সেগুলোকে বাঁধাইয়ের অনুমতি দেয়া হয়। যদি এমন ভুল ধরা পড়ে যা হাতে সংশোধন করা সম্ভব তাহলে একটি একটি করে হাতে ধরে ধরে সেগুলি সংশোধন করা হয় এবং পুনরায় পরীক্ষা করে আলেমদের স্বাক্ষর নেয়া হয়। ভুল যদি এমন হয় যা সংশোধনের অযোগ্য তাহলে পুরো লটে যত কোরআন শরীফ ছাপা হয়েছে সেগুলোকে সব পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়। এই কমপ্লেক্সের সাথে রয়েছে অত্যাধুনিক ফার্নেস যেখানে পোড়ানোর কাজটি করা হয়। ভাবতে অবাক লাগে যে, এই পোড়ানোর কাজটিও অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে করা হয় যেন কোন মতেই ভুল কোন কপি বাইরে যেতে না পারে।

৭। ফর্মা বাঁধাই চূড়ান্ত হয়ে গেলে, সর্বশেষ বারের মত আলেমগণ পরীক্ষা করেন এবং সার্টিফিকেট দেন। বাঁধাই সম্পন্ন হবার পর এগুলো জেদ্দা পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে নির্দিষ্ট মন্ত্রনালয়ের তত্বাবধানে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এভাবে ছাপা, বাঁধাই থেকে শুরু করে কাংখিত গন্তব্যে প্রেরণের যাবতীয় খরচ সৌদি সরকার বহন করে থাকে। আমাদের দেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করলে আপনি হয়তো এরম একটা বাংলায় তাফসীর এবং তরজমাসহ একটা কোরআন শরীফ পেতে পারেন। প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে যোগাযোগ করলে বাংলাদেশস্থ সৌদি দুতাবাসে গেলেও তারা হয়তো সহায়তা করবেন।

মূল আরবী ভাষার সাথে অন্য কোন ভাষায় অনুবাদ এবং তাফসির সহ অথবা অনুবাদ ও তাফসির ছাড়া নতুন একটি লট ছাপানোর পরিকল্পনা শুরু করার পর ছাপা – বাঁধাই শেষ হয়ে জেদ্দার গুদামে যেতে দুই বছর সময় লাগে। দুই বছর!

একদিকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি হাফেজ এবং অন্যদিকে এত নিখুঁত ভাবে ছাপানোর ব্যবস্থা থাকার কারনেই পবিত্র কোরআন শরীফ অবিকৃত অবস্থায় আছে- কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে। আল্লাহ সুবহানুতায়ালা নিজেই তার পবিত্র গ্রন্থ হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন।