ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

গত ১৪ এপ্রিল ২০১৭, বাংলা নববর্ষের পহেলা বৈশাখ। বিকেল আনুমানিক ৪ টার দিকে আমার হঠাৎ জরুরী কিছু ঔষধের প্রয়োজন হয়। বাসা থেকে বের হয়ে বনানীর ২৭ নম্বর সড়ক (বনানী কবরস্থান সড়ক) ধরে কামাল আতাতুর্ক এভেনিউতে গুলশান ২নং কাঁচা বাজারের কাছে একটা বড় ফার্মেসী আছে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। পুরো রাস্তা ফাঁকা হলেও রাস্তার একেবারে শেষ মাথায় গিয়ে মোটামুটি জ্যাম। আস্তে আস্তে করে গাড়ি এগুচ্ছিল। একেবারে শেষ প্রান্তে এসে হঠাৎ দেখলাম আগে থেকে কোন প্রকার সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ছাড়াই পুলিশ রাস্তায় একমুখী চলাচল করে দিয়েছে। অর্থাৎ আপনাকে শুধু বামে মোড় করতে হবে। অথচ সেটি একটা চার রাস্তার মোড়। এখানে বামে গেলে গুলশান-২, ডানে গেলে কাকলী, সোজা গেলে গুলশান- ১২ নম্বর হয়ে ১১ নম্বর সড়কে যাওয়া যায়। ১২ নম্বর সড়কের এদিকের কোনায় গুলশান-২ নং ডিসিসি কাঁচা বাজার।

অবাক হয়ে দেখলাম কিন্তু কোন প্রকার নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে পুলিশের কিছু লোক ২৭ নম্বর সড়ক ধরে আসা সকল গাড়িকে বামে যেতে বাধ্য করছে। আমার তখন খারাপ অবস্থা। বাম দিকে মোড় নিলেই আমাকে প্রায় এক-দুই কিলো ঘুরে আসতে হবে। সেই এক-দুই কিলো রাস্তায় দূর থেকেই অসহনীয় ট্রাফিক জ্যামের গন্ধ পাচ্ছিলাম। কি করবো? সিদ্ধান্ত নিলাম গাড়ি ঘুরাবো। কিন্তু আমি যেখানে ছিলাম সেখানে ঘাড়ি ঘুরানোও সহজ নয়। ইট-বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী বেরিকেড দিয়ে লেন তৈরী করা হয়েছে। বাধ্য হয়ে আপাতঃদৃষ্টিতে (পুলিশের দৃষ্টিতে উল্টা হতে পারে কিন্তু যে কোন সুস্থ জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ বলবে আমি সঠিক ছিলাম) উল্টা পথেই গাড়ি চালালাম। ভাবলাম সামনে পুলিশকে আমার ইমার্জেন্সীর কথা বললে হয়তো তাদের দয়া (!) হবে।

কিন্তু না। আমার চকচকে গাড়ি দেখে তাদের জিহবা লকলক করে উঠলো। কর্মরত এসআই হাতের ইশারায় রাস্তার মধ্যে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কাগজপত্র নিয়ে নিলেন। এরপর অত্যন্ত খারাপ একটা জায়গায় গাড়ি পার্ক করে আসতে বললেন। আমি বললাম, আমার গাড়ি যেখানে দাঁড় করানো হল, সেখানে আমি ইতোমধ্যেই আমার প্রয়োজনীয় দিক (ট্রাফিক লেন) পেয়ে গেছি। সুতরাং উলটা দিকে যাব কেন? আমার কথায় ও সন্তুষ্ট হলো কিনা বুঝলাম না। হাতের ইশারায় গাড়ি থেকে নেমে আসতে বললো। সব কাগজপত্র পরীক্ষা করলো, কিন্তু মন মতো কিছুই পেল না। আমিও বুঝলাম না উল্টো পথে গাড়ি চালানোর সাথে গাড়ির কাগজপত্রের কি সম্পর্ক? যাহোক এরপর উল্টোপথে গাড়ি চালানোর অপরাধে একখানা জরিমানা ঠুকে দিল। ৫০০ টাকা। আমার ইন্সুরেন্সের কাগজপত্র রেখে দিল। একটা বেসরকারী ব্যাংকের মাধ্যমে ০৫ মে’র মধ্যে ৫০০ টাকা জরিমানা দিয়ে দিলে কুরিয়ার যোগে ইন্সুরেন্সের কাগজ বাসায় পৌঁছে দেবার কথা। আমি রাগে গজগজ করলেও সেটার প্রকাশ ঘটালাম না। কারণ আমি ভাল করেই জানি “মাছে রাজা ইলিশ, দেশের রাজা পুলিশ।” এদের সাথে কথা বলা আর নিজের পায়ে কুড়ালের কোপ মারা একই জিনিস। ঠিক দুই দিন পর ১৬ এপ্রিল নির্দিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে ৫০০ টাকা জরিমানা দিলাম। আমার এহেন হয়রানির কথা পত্রিকায় আসেনি।

এবার দেখুন অন্য আরেকটি ঘটনা। গত ০২ জুলাই রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনের (সাবেক শেরাটন) মোড়ে উল্টো পথে আসা হাইকোর্টের বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের গাড়ি জাবিন ফয়সাল নামক এক মোটর সাইকেল চালককে ধাক্কা দিয়ে মারাত্মক আহত করে। পুলিশ বলছে তখন বিচারপতি গাড়িতে ছিলেন না। বিচারপতি গাড়িতে ছিলেন কি ছিলেন না সেটা বিবেচ্য নয়। তিনি থাকলেই বা কি হতো? এখানে আমার দৃষ্টিতে কয়েকটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এক, উলটা পথে গাড়ি চালানো, দুই, বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে অন্য গাড়িকে দুর্ঘটনায় ফেলা এবং তিন, হত্যা (?) চেষ্টা।

দুর্ঘটনায় আহত জাবিন ফয়সাল এখনো রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার পায়ে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপাচার করেছেন।

07_Accident_Wrong+Side_Bike_020717_0006

.

দুর্ঘটনার পর পর পুলিশ গাড়ি ও গাড়ির চালক কামাল হোসেনকে আটক করলেও গ্রেফতার করেনি (অন্য যে কোন রাম-শাম-যদু-মধু হলে নির্ঘাত গ্রেফতার হতো কিংবা পিঠে কয়েকটি লাঠি পরতো)। এ বিষয়ে কোন মামলা হয়নি। উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে মোটরসাইকেল আরোহীকে চাপা দেওয়ার ঘটনায় গাড়ি চালক সেদিনই আপসে ছাড়া পেয়েছেন। এরপর গতকাল তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যেহেতু সংশ্লিষ্ট চালক বর্তমানে সেখানে কর্মরত।

এটা বিভাগীয় ব্যবস্থা। কিন্তু ড্রাইভার যে উল্টো পথে গাড়ি চালালো সেই অপরাধে মামলা–জরিমানা হলো না কেন? এটা কি পুলিশের দ্বৈতাচার নয়? আমার সাথে, অন্যান্য সকল আম জনতার সাথে এক আচরণ, আর বিচারপতির ড্রাইভারের সাথে আরেক আচরণ কেন? ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী সেই ড্রাইভারের অবস্থান রাষ্ট্রের নির্বাহীদের অবস্থানের কত নম্বরে? নাকি সেও বিচারপতি বনে গেছে? ইংরেজ সাহেবদের আমলের স্কুল শিক্ষকের মত প্রশ্নটা করতেই হচ্ছে- একজন শিক্ষক ইংরেজ সাহেবের কুকুরের কয়টা ঠ্যাঙয়ের সমান? আমার মত একজন আম জনতা একজন বিচারপতির কয়টা ড্রাইভারের সমান?

নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা দেবার পর ৫-৭ দিনের ভেতর কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আমার ইন্সুরেন্সের কাগজ বাসায় চলে আসার কথা। কিন্তু আজ আড়াই মাসের অধিক হয়ে গেলেও সেটা আসেনি। চারবার নিকুঞ্জ এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের অফিসে গিয়েছি– তারা খুঁজে পাচ্ছে না। হয়তো সত্যি সত্যি হারিয়ে ফেলেছে। অথবা ঘুষ ছাড়া সেটা দেবে না। আমার কাগজ নিয়ে হারিয়ে ফেললে সেটার দায় কার? আমার? এমনো হতে পারে ব্যাংকে যেই টাকা দিয়েছি সেটা সরকার পেয়েছে। “দেশের রাজারা” তো কিছু পায়নি। তাই অন্য রকম আবদার আছে। কিন্তু আমার এক কথা আমি কোন শালাকে ঘুষ দেব না, যায় যাক আমার চার পাঁচ হাজার টাকা। নতুন করে ইনস্যুরেন্স করাবো, আর গুলশান-বনানীর রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ দেখলেই অন্যদিকে মুখ ঘুরাবো (৫৭ ধারার কারণে অন্য কিছু লিখতে পারলাম না)।

যতদিন বেঁচে আছি গুলশান-বনানীতে পুলিশ দেখলেই বলবো, ছিঃ ছিঃ– তুই এত্ত খারাপ!