ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

সকালের ট্রেনের সময় ছিল সকাল ৭:৪৫। রাতে গোছগাছ করে ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক রাত হয়ে গেল। উঠেই ছেলেকে তৈরি করে দিয়ে প্রায় ছুটতে লাগলাম। বিধিবাম!  ট্রেন মিস! আর একটা ট্রেন মিস মানে পরের ট্রেনগুলোও সময়মতো ধরা সম্ভব নয়! অগত্যা অপেক্ষা পরের ট্রেনের।  ছেলের বাবা তো এমনভাবে ভুরু কুঁচকে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলো যে মনে হতে লাগলো অামারই দোষ!  দোষ অবশ্য একটু ছিল। একটু নাদুসনুদুস মানুষ আমি দৌড়টা ঠিকমতো দিলে হয়তো বা ট্রেনটা ধরলেও ধরা যেতো!

BMW mesume BMW mesume

কতক্ষণ ধরে শুধু ট্রেনের গল্পই করে যাচ্ছি! যাচ্ছিটা কোথায়? আমরা যাচ্ছি বাভারিয়ার পথে। বাভারিয়া হলো বায়ার্ন এর ইংরেজিরূপ। জার্মানরা বলে বায়ার্ন। ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন রাজ্য বায়ার্ন জার্মানির দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সবচেয়ে জনবহুল ও বড় রাজ্য। আয়তনের দিক থেকে বায়ার্ন জার্মানির মোট ভূ-খন্ডের প্রায় ২০% স্থান দখল করে আছে। অামরা এখন যাচ্ছি মিউনিখ, বায়ার্নর রাজধানি এবং সবচেয়ে বড় শহর। এটা ৯০৭ শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়।

অামার ছেলে অতি চঞ্চল। বসে থাকা তার স্বভাববিরুদ্ধ!  সারা ট্রেনে দৌড়াদৌড়ি। অগত্যা বাবারও ছেলের পেছনে দৌড়। এভাবেই প্রায় অাড়াইটা বাজলো। বাবাই আর আমি ঠিক করলাম পরের স্টেশনে নেমে লাঞ্চ করবো। যেই ভাবা সেই কাজ। Treuchtlingen আসতেই ব্যাগসহ নেমে পড়লাম তিনজনে। ও মা! বের হয়ে হা হয়ে গেলাম! নীরব রাস্তায় সব কিছু বন্ধ। তারপরেও অামরা রেস্তোরার খোঁজে বেশ কিছুটা হাঁটলাম। দিনটাই কি খারাপ নাকি আমাদের জন্য? কিছুই খোলা নেই। অবশ্য দিনটি ছিল ২৫ মে, সরকারি ছুটির দিন। জামার্নীতে সেদিন ছিল Ascension Day এর ছুটি। এটি ইস্টারের ৪০তম দিন হিসেবে উদযাপন করে জার্মানরা। কিছুক্ষণ ঘুরে কিছু না পেয়ে অবশেষে সেই স্টেশনেই আবার ফেরত এলাম। স্টেশনের দোকান থেকেই খাবার কিনে খেলাম।

পরের ট্রেন ধরে প্রায় সন্ধ্যায় পৌঁছালাম München Hauptbahnhof, এবার অামাদের বুকিং করা হোটেলটি খোঁজার পালা। স্টেশন থেকে বের হয়ে একটু হাঁটতেই পেয়ে গেলাম। চেক ইন করে চার তলায় নিজেদের রুমে যখন পৌঁছলাম গরমে অস্থির অবস্থা আমাদের। সব জানালা দরজা খুলে দিয়ে একটু ঠাণ্ডা হয়েই ছুটলাম Marienplatz এর দিকে। আমাদের হোটেল থেকে হেঁটে গেলে মাত্র ১০ মিনিটের রাস্তা। এটি ১৮০৭ সালে শহরের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মেইন স্কয়ার হিসেবেই পরিচিত সবার কাছে। এখানে পুরাতন টাউন হল (Altes Rathaus) রয়েছে। এছাড়াও এটি শপিং করা, রেস্তোরা ইত্যাদির জন্যও পরিচিত, আমরা যখন গেলাম তখন মানুষে মানুষে যেন ভরে গিয়েছে পুরোটা জায়গা। কেউ গান করছে, কেউ বা সেই গান শুনছে, কেউ গল্প করছে, কেউ বা খুব আবেগ নিয়ে তার সঙ্গিনীকে চুমো খাচ্ছে। মোদ্দা কথা সবাই যেন নিজের নিজের মতো করে আনন্দ করছে। আমার ছেলেও করছে। সে রাস্তায় বসে থাকা কবুতরগুলোর পেছনে দৌঁড়াচ্ছে, আর বলছে ’আম্মু পাখি ভয় পায়’। ছেলের বাবা তো শিওর যে পাখিদের নাকি নিজেদের মধ্যে মিটিং হয়েছে আমাদের পুত্রকে নিয়ে।

Englischer Garten Neuschwanstein Castle

পরের দিন খুব সকালের ট্রেন ধরে Füssen যাবো ঠিক করলাম। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই হলো। আবারও ট্রেন মিস। পরের ট্রেনে উঠে আমি হতবিহ্বল। প্রথম থেকে শেষ কামরা পর্যন্ত কোথাও বসার জায়গা নেই। যারা সিট পায়নি তারা মেঝেতে, সিড়িতে বসেই রওনা হয়েছে  Neuschwanstein Castle দেখার উদ্দেশ্যে। বাবাই বলেছিল যে, ট্রেন থেকে নেমেই নাকি টুরিস্টরা বাসে সিট পাবার জন্য দৌড় দিবে, নিজের চোখে না দেখলে সত্যিই হয়তো বিশ্বাস করতাম না! যার বয়স যত কম, তার দৌঁড়ের তেজ তত বেশি! সবাই ভাবছেন অামিও দৌড় দিয়েছি কিনা? আরে নাহ! এসব দৌঁড় আমার পোষায় না রে ভাই।

বাসে চললাম প্রাসাদের উদ্দেশ্যে, এটি রেঁনেসা সময়কালীন প্রাসাদ। বাভারিয়ার এই রোমান স্থাপত্যশিল্পটি পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ৷ ১৮৬৯ সালে এটি তৈরি করেন রাজা দ্বিতীয় লুডভিগ৷ পাহাড়ের নিচে থেকে ওপরে যাওয়ার বাসের রিটার্ণ টিকেটসহ কাটলাম। তারপর যখন লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে উঠলাম সেখানে দাঁড়ানোর জায়গাও প্রায় নেই বললেই চলে! তো কি আর করা, বাবার কোলে ছেলে চড়ে বসলো। দাঁড়িয়েই যাত্রা শুরু করলাম।পাহাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রা করা যারপরনাই অসুবিধাজনক! যাক, অবশেষে বাস থামলো আর আমাদের বললো একটু ওপরেই একটি ব্রিজ আছে যেখান থেকে প্রাসাদটি দেখা যায়। সবাই আবারও ছুটলো সেই ব্রিজের দিকে। রানী মেরীর সেতু, Marienbrücke তে যাবার জন্য সবাই লাইনে দাঁড়িয়েছে, কারণ এত মানুষ একসাথে উঠলে বিপদ ঘটতে পারে। ব্রিজটি এত ওপরে যে অামার মোটামোটি হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল, কেন? কারণ আমার হাইটফোবিয়া আছে।

মোটামুটি বাবাই এর হাত খামচে ধরে যাচ্ছিলাম। বিশ্বাস করুন শুধু মনে হচ্ছিল এই বুঝি পরে গেলাম, পরলে তো নিচে পরার আগেই আমি হার্টএটাক করবো নি:সন্দেহে। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি এত সুন্দর চারিপাশ! ব্রিজের অন্য মাথায় ট্রেকিং এরও জায়গা আছে। ছেলে না থাকলে আমি তো শিওর বাবাই বলতো চলো যাই। এ যাত্রায় ছেলে বাঁচিয়ে দিলো বৈ কি!

তারপর ছেলেকে কাঁধে নিয়ে শুরু হলো আমাদের বাকি পথ চলা, পাহাড়ে এমনিতেই ওঠা কষ্টকর, তারোপর আমি একজন নাদুসনুদুস মানুষ। বুঝতেই পারছেন আমার দশা! প্রাসাদ দেখা শেষ করে নিচে নামার বাসে করে নিচে আসলাম, তখন বাজে দুপুর ২:৩০। লাঞ্চ এর সময়। পছন্দ করে একটি রেস্তোরাতে ঢুকে খাওয়া শেষ করতে করতেই ট্রেন ধরার সময় হয়ে গেলো। ট্রেনে ওঠার জন্য ফিরতি বাস ধরলাম। ট্রেন চলছে। হঠাৎ বাবাই বললো, চলো এর পর যেই স্টেশনই আসবে অামরা নেমে যাই। যাবে? ছেলে নিয়ে এই অ্যডভেঞ্চার করবো কিনা ভাবতে ভাবতেই পরের স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নিজেকে অাবিষ্কার করলাম।

ছোট্ট ষ্টেশন। হেঁটে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে যেতে হঠাৎ অজানা কোথাও উদ্দেশ্যহীনভাবে নেমে পরে প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানোরও যে  অন্যরকম মজা আছে সেটা ভালভাবেই টের পেলাম!

সারা শরীরে  পাহাড়ে চড়ার ব্যাথা নিয়ে ক্লান্ত আমরা হোটেলে ফিরলাম রাতের বেলায়। পরের সকালে ভাবছি মিউনিখটাই ঘুরে দেখি না কেন। প্রথমেই গেলাম  BMW Museum এ। এটি  BMW এর একটি ঐতিহাসিক মিউজিয়াম। সেই আদ্দিকাল থেকে যত গাড়ি আর ইঞ্জিন বানানো হয়েছে সব কি সুন্দরভাবেই না এখানে সাজিয়ে  রেখেছে। পুরোটা দেখতে দেখতে দুপুর হয়ে গেলো।

এবার ভাবলাম Englischer Garten মানে ইংলিশ গার্ডেনে গিয়ে লাঞ্চটা সেরে ফেলি। আমি একজন ভোজনরসিক মানুষ, খাবার দেখতেও আমার ভাল লাগে। তাই এখানে এসে খাবার পছন্দ করে নেবার সময় আমার উ্ৎসাহের কোন কমতি ছিল না বুঝতেই পারছেন সবাই! সবাই ভাবতেই পারেন যে এটি বুঝি খাবারেরই জায়গা। তা কিন্তু নয়! এটি জার্মানির সব থেকে বড় গার্ডেন যা কিনা প্রায় ৯১০ একর জমির ওপর সাজানো হয়েছে। এত বড় যে একসময় আমরা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। কিন্তু হায় বসার জায়গা একটুও খালি নেই। নেই মাঠের কোন জায়গা খালি! গ্রীষ্মকাল কিনা এরা প্রায় উচ্ছসিত! সানবাথ নিচ্ছে। আমরা হাঁটছি ছায়া দেখে দেখে আর ওরা সবাই হাঁটছে রোদের ভেতরে। রোদ, গরম ওদের বিশেষ প্রিয় কিনা! অামরা ভাই গরমের দেশের মানুষ। রোদ-গরম! উফ! অসহ্য আমাদের কাছে! আমরা চাই ফর্সা হতে আর বেচারারা একটু রোদ দেখলেই গায়ে মাখতে মাঠে শুয়ে পরে গায়ের রং কালো করতে। বড়ই বিচিত্র এই দুনিয়ার মানুষ! যার যা নেই তাতেই যেন আকর্ষণ বেশি।

ক্লান্ত হয়ে এমন অবস্থা যে কোনদিকেই যাবার শক্তি নেই। হঠাৎ দেখলাম আমাদের দেশের রিকসার মতো একটি যান। তবে আমাদের রিকসাচালক সামনে বসেন, এখানে রিকসাচালক বসেছে পেছনে। অ্যারাবিক গান ছেড়ে দিয়ে চলতে শুরু করলো, সে এক মজার দৃশ্যই বটে। এই বিচিত্র যান থেকে নেমে নৌ চালাবো ভেবে গেলাম নৌকার কাছে। বাবাই বললো, শোন, এমন রোদ, তুমি দেখা যাবে চালানো বন্ধ করে দিয়েছো। তখন আমাকেই চালিয়ে ফিরতে হবে। এই রোদে নৌকা চালাতে গেলে খবরই আছে। আমি বললাম, কথা সত্যি! তারওপর আবার ছেলেটার গায়ের চামড়া পুড়ে যাবে। কে যে কুৎসা রটায় আমরা হুজুগে জাতি বলে! দেখেছেন কিছু করার আগে আমরা মোটামুটি একটা গোলটেবিল বৈঠক করে ফেলি!

দু’দিনের ছোট্ট সফর ছিল আমাদের! ফিরছি আর বাইরের দিকে তাকিয়ে দূরের পাহাড়ের পাইনের সারির দিকে তাকিয়ে ভাবছি এই সেই বাভারিয়া। ছোটবেলায় গল্পের বই এর পাতা থেকে আমার কল্পনা থেকে আজ তা বাস্তবে, আমার সামনেই!  সেই বাভারিয়া!