ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

উন্নতির চরম শিখরে পদার্পণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে এখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করাটা অযৌক্তিক কিছু নয়। সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাটা যতোটা সহজ ছিল এবং তা অর্জনের সময়সীমার দিকে লক্ষ্য রেখে আবিচারেই বলা যায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ঠিক ততটাই চ্যালেঞ্জিং হবে। কিন্তু পাশাপাশি ছোটবেলায় ক্লাস এ শিখিয়ে দেওয়া কথাটাও ভুলে যাবার নয় যে পৃথিবীতে কোনকিছুই অসম্ভব নয়। যেখানে সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮টি যা অতি দক্ষতার সাথে অর্জন করা সহজ হয়েছে ১৫ বছরের ব্যবধানে সেখানে কিন্তু একই সময়সীমার ব্যবধানে ২০৩০ এর সালের মধ্যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সহজ হবে তা এখন বিবেচনার বিষয় যখন ১৭টির মধ্যে ১০টিকেই লাল কার্ড প্রদর্শন করা হয়েছে। সাথে সাথে বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনা করলে তার প্রতিফলন তো আরও ভয়ানক।

বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৭ দেশের মধ্যে ১২০তম। খাদ্যের নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য, শিক্ষার বিকাশ, বিদ্যুৎ ঘাটতি, বসবাসের উন্নত পরিবেশ, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান প্রত্যেকটাতেই বাংলাদেশ পিছিয়ে। যেখানে জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সে দেশের পরিবেশের অবস্থা যদি এখনও উন্নত করা সম্ভবপর না হয় তা হলে জাতি হিসেবে আমরা আন্তর্জাতিক মহলে কিভাবে স্বীকৃতি পাবো তা এখন চিন্তার বিষয়। যেখানে বাংলাদেশ তার নিজ অর্থায়নে প্রকৃতির উন্নয়ন করেও লাল কার্ড পাচ্ছে সেখানে আমাদেরই প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও ভূটান প্রকৃতি বিষয়ক উন্নয়নে সবুজ সংকেত পাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উন্নত দেশের কার্বন নিঃসরণ যার আদৌ কোনো দৃষ্টান্তস্বরূপ ক্ষতিপূরণ বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পায়নি।

কার্বন নিঃসরণে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ নং এ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলোর মধ্যে (প্রথম স্থানে ভূটান)। যেখানে ২০০০ সালে মোট কার্বন নিঃসরণ এর পরিমাণ ছিল ২৭,৮৬৯ কিলোটন সেখানে ১৩ বছরের মাথায় ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো ৬৮,৯৫০ কিলোটন এ। খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, বর্তমানে খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আয় ব্যয়ের বৈষম্য জনজীবনে ডেকে এনেছে দুর্বিষহ কষ্ট ও ভোগান্তি। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে যে এক তৃতীয়াংশ বাংলাদেশি তরুন হয় বেকার না হলে আংশিক ভাবে বেকার। বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে যখন পরিসংখ্যান দেখা যায় যে দেশের ৬০.৭ মিলিয়ন সম্ভাব্য শ্রমশক্তি অব্যবহারিত রয়েছে।

আমাদের দেশে দুই লাখের কাছাকাছি বিদেশি শ্রমিক কাজ করে বিভিন্ন গার্মেন্টস শিল্প, আইসিটি এবং বিভিন্ন সেবা খাতে সেখানে আমাদের দেশের বেকারত্বের প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা যেতে পারে মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং চাহিদামত শ্রমিকের আসামঞ্জ্যসতা। বেকারত্বের প্রভাব শুধু পারিবারিকভাবে নয় বরং সমাজের জন্য তা হয়ে হঠে বিপদস্বরূপ। বেকারত্বের গ্লানি তরুন সমাজকে ঠেলে দেয় মাদকাসক্তি, আভিপ্রায়ন এবং আরো বিভিন্ন অপরাধের দিকে। কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনা করলে দেখা যায় ভাল কাজের পরিবেশের অভাব। বিশেষ করে যেখানে বিশ্বের ৮০ ভাগ কর্মক্ষেত্রে নারীর অবস্থান সেখানেই আমদের দেশে তাদেরকে কর্মক্ষেত্রে অবহেলা এবং সাথে সাথে নারী পুরুষের বৈষম্য তো আছেই।  আমাদের জন্য ভালো বিষয় যেটি তা হচ্ছে ৬ নং লক্ষ্যমাত্রা অর্জন যেটি হচ্ছে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা। বর্তমানে ৯৮ শতাংশ লোক নিরাপদ পানি পেয়ে আসছে কিন্তু আমাদের উচিত এটিকে ১০০ ভাগে নিয়ে যাওয়া যাতে করে সুন্দর স্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবনটাকে অন্তত হলে ও দেশবাসীকে পুরস্কার স্বরূপ দেওয়া যায়। সাথে সাথে ৬১ ভাগ দেশবাসী এখন পয়নিস্কাশন সুবিধা পেয়ে আসছে। পাশাপাশি যেখানে ২০০৪ সালে খোলা পরিবেশে মলমূত্র ত্যাগের পরিসংখ্যান ছিল ৪১ শতাংশ সেখানে বর্তমানে তা ১ শতাংশের (০.৮৮ শতাংশ) নিচে। কিন্তু শুধুমাত্র সুপেয় পানির ব্যবস্থা হলেই সব কিছুর শেষ নয় তার জন্য দরকার তার যথাযথ ব্যবহার।

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকা শহরে প্রতিদিন মানুষ গড়ে ৫৮ কোটি টাকার গ্যাস ব্যবহার করে শুধু পানি ফোটানোর জন্য এদিকে একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ ঘাটতি হচ্ছে অন্যদিকে বাড়ছে টাকার অপচয়। উপরোক্ত কারন বিবেচনায় রেখে স্বল্প আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দিকে বাংলাদেশের পদার্পণ এবং তার সাথে সাথে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা তরান্বিত হবে তা এখন দেখার বিষয়। আমরা যখন পেরেছি সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে তাকে দৃষ্টান্ত রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়াই হওয়া উচিত একমাত্র লক্ষ্য। এখন সময় সামনে এগিয়ে যাওয়ার, পেছনের গ্লানি ভুলে নতুনকে অর্জন যা দেশের জন্য বয়ে আনবে এক সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ যখন আমরাও পারবো উন্নত দেশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে এবং বিশ্বমানচিত্রে এক অনন্য বাংলাদেশের নজির গড়তে।