ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

অস্কারজয়ী বরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ সিনেমার প্রথম দৃশ্যেই প্রকৃতির অভয়াশ্রম বিষয়ে একটি চমৎকার ডায়ালগ আছে, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। কিন্তু এই ডায়ালগকে পুরোদস্তুর ভুল প্রমাণ করে শিশুরা আজ আর কোথাও নিরাপদ নয়, না দেশমাতার কোলে, না নিজ জঠরদাত্রী মায়ের কোলে।

সিলেটের রাজন, খুলনার রাকিব, কেরাণিগঞ্জের আবদুল্লাহ’র পর দুর্বৃত্তের নৃশংসতার শিকার হয় হবিগঞ্জের শুভ, তাজেল, মনির ও ইসমাইল নামের চার শিশু। এমনকি শেষ চারজনকে খুনিদের চাপা দেয়া মাটি খুড়ে বের করে আনতে হয়। মানুষের সাহায্য না পেয়ে উত্তরায় গ্যাসের আগুনে বাবা-মা সহ পুড়ে মারা গেল শিশু আরলিন ও জায়ান।

 

home

 

অন্যদিকে রাজধানীর বনশ্রীর আলভি ও অরণি’র মৃত্যুটা সকল নৃশংসতাকে হার মানিয়েছে। কারণ এই দুই শিশুকে খুন করার অভিযোগ রয়েছে স্বয়ং ওদের নিজের জন্মদাত্রী মা মাহফুজা জেসমিন এর বিরুদ্ধে। এমন জীবনবিরোধী ঘটনা কে কবে আর দেখেছে? বিবেক আর মানবিকতা আজ হাওয়ায় মিলায়ে গেছে। ঐ মা পুলিশের ইন্টারোগেশন সেলে দিব্যি সুস্থ্য মস্তিষ্কে কথা বললেও, তিনি দাবি করছেন, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় মানসিক বৈকল্য থেকে সন্তান হত্যা করেছেন। মা যে কারণেই সন্তান হন্তারক হয়ে উঠুন না কেন, একটা বিষয় স্পষ্ট যে, শিশুরা আর কোথাও নিরাপদ বা নিঃশংসয় নয়। আমাদের বড় বিপদ হলো যেখানে শিশুদের বাঁচবার অধিকার বা উপায়ই ক্ষীণ, সেখানে আমাদের বুড়োদের আর বেঁচে থেকে কী লাভ? এবার বুঝি সময় এসেছে সবাই একসাথে গলায় দড়ি দিয়ে বঙ্গোপসাগরে ঝাপ দেবার! অথবা বনবাসী হয়ে চিরসুন্দরকে আহ্বান করার!

আমরা এক অশুভ দুর্মর বিকারিকতায় মিশে গিয়ে শিশুর প্রাণবিনাশে আনন্দ খুঁজছি। আর শিশুর প্রতি আশ্চর্য সংবেদনশীল ও আজন্মই শিশুসুলভ সরল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সেই শিশুদের নিয়ে কী অসাধারণ কাব্যই না করতেন-

আমি চেয়ে আছি তোদের পানেরে ওরে ও শিশুর দল,
নতুন সূর্য আসিছে কোথায় বিদারিয়া নভোতল।’
‘তুমি নও শিশু দুর্বল, তুমি মহৎ ও মহীয়ান
জাগো দুর্বার, বিপুল বিরাট অমৃতের সন্তান।’

Oroni_Alvi

জার্মানীর বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ফ্রিটজ ল্যাং পরিচালিত তাঁর প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘এম’ মুক্তি দেন ১৯৩১ সালে। এই মুভিটিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০ চলচ্চিত্রের একটি বলে গণ্য করা হয়। একটি শিশুকে হত্যার কাহিনী নিয়ে এগিয়েছে পুরো ছবির গল্প। একটি বাচ্চা মেয়েকে খুন করে বিকৃত মানসিকতার এক খুনি। কিন্তু স্থানীয় পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় সেই খুনি। প্রকৃত হত্যাকারী ধরা না পড়ায় একসময় সেই শহরটি অপরাধের আস্তানায় পরিণত হয়। এমন কাহিনীনির্ভর ক্লাসিক ছবি ‘এম’। আমাদের সমাজের আজকের প্রেক্ষাপটে সিনেমাটি বড়ই প্রাসঙ্গিক।
প্রকৃত বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক সাজার ঘাটতি থাকায় দিন দিন আমরা মানসিকভাবে এক খুনে জাতিতে পরিণত হচ্ছি। যেখান থেকে আবাল বৃদ্ধ বণিতা এমনকি নিষ্পাপ শিশুদেরও রেহাই নেই।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেই দিয়েছেন, ‘অপরাধের একটি ট্রেন্ড আছে, যখন যে ধরনের অপরাধ হয়, তখন বিভিন্ন জায়গায় একই ধরনের অপরাধ হতে থাকে। এটা মনস্তাত্ত্বিক।

আর আমাদের মনস্তত্ত্ব কেমন ধাতুতে গড়া তা পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে। বাংলাদেশে সরকারী হিসেবে মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভোগেন। কিন্তু এত বড় সংখ্যক রোগীদের জন্য দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মোটে আড়াইশো এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল মাত্র দু’টি।

এতো রোগীর চাপে মানসিক ডাক্তার সাহেবের মানসিক অবস্থাটা কোন পর্যায়ে থাকে তা না বললেও বুঝে নেয়া যায়। কাজেই এক অর্থে বলাই যায়, আমরা আসলে সবাই এক ধরণের মানসিক রোগী। আর এই পাগলের দেশে সেই বদ্ধ উন্মাদদের হাত থেকে কারো নিস্তার থাকনার কথা নয়! কাজেই আমাদের শিশুরা অকালে ঝরে পড়তে থাকবে মনোরোগীর নির্মমতা ও উন্মত্ততায়। তাদের নিষ্কলুষ আনন্দ ও হাসিরা মিলায়ে যেতে থাকবে প্রকৃতির আপন আশ্রয়ে। গত চার বছরে ১ হাজার ৮৫ জন শিশু হত্যার শিকার, আর এ বছরের প্রথম দুই মাসেই ৪৯ জন! এই পরিসংখ্যানটাই আমাদের ধারাবাহিক পাগলামীর প্রকৃত অবস্থাটা জানান দেয়।

মনোবিদদের মতে, স্ট্রেস, অবসেশন, অসম্মান, নির্যাতন আর বিশৃঙ্খল পরিবেশেই বাড়ে পারস্পরিক হিংসা। আমরা ফুলের মতো শিশুদেরও রেহাই দিচ্ছি না। এটা আমাদের কেমন দুর্মর অবসেশনাল রিসিডিভিজম? এই অবদমনপ্রসূত অপরাধপ্রবণতা থেকে আমাদেরকে উদ্ধার করতে পারে এমন কাউকে যে কোথাও দেখিই না। তবে কি বেঘোরে নিষ্পাপ জীবন হারানোর এই দেশে ‘হায় আমার বাংলাদেশ’ বলে শোক সংগীতেই আকাশ-বাতাস ভারি হতে থাকবে? আমাদের হতাশারা আর অপ্রাপ্তির চাপেরা আমাদেরকে কুড়ে কুড়ে খেতে থাকবে।

আমাদের শিশুদের যদি আমরা বাঁচিয়ে না রাখতে পারি, আমাদের প্রজন্মদের যদি আমরা বড় করে তুলতে না পারি, তবে এই দেশমাতার পতাকাটা ভবিষ্যতে বইবে কারা?

আমাদের বিপুল বিরাট অমৃতের সন্তানদের জীবনপ্রদীপ যদি জ্বালিয়েই না রাখতে পারি, আমরা যদি মানবীয় আলোয় নিজেদেরকে না আলোকিত করি, তবে প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’র মতো করে আর কোন কবি এমন কবিতা লিখবেন?
আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?
মুখে হাসি, বুকে বল তেজে ভরা মন
‘মানুষ হইতে হবে’ -এই তার পণ।

আমাদের নিজেদের মানবিক আবেগ, সুখানুভূতি, মায়া ও মমতাকে চিরতরে কবর না দিয়ে মনোবৈকল্যকে দূরে ঠেলে, পাগলামীর পোকাগুলোকে নির্বাসনে পাঠিয়ে শিশু মানুষের ভালোবাসায় কাতর হই না শেষবারের মতো। এতে আমরাও বাঁচি, বাঁচে আমাদের প্রাণের বাংলাদেশটাও!

 

লেখকঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
১৩ মার্চ ২০১৬
facebook.com/fardeen.ferdous.bd
twitter.com/fardeenferdous