ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

সকল কবিকেই দার্শনিক এবং তাদের রচনাকর্মকে দর্শনতত্ত্বই ভাবি আমি। সেইজন্য কবিতার গভীরতর বোধের প্রকৃত সমঝদারিতার অভাবপ্রসূত নিজের অক্ষমতা ঢাকবার মানসেই পারতপক্ষে কবিদের নিয়ে কম কথা বলা উচিৎ বোধ করি। কিন্তু এইসময় কবিতাকেন্দ্রিক পদক পুরস্কারের আহাজারির বিরাট ডামাঢোলে নিজের স্থিরতা ধৈর্য হারাচ্ছে। তাই বিশ্ব চরাচরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সকল কবির প্রতি প্রণতি জানিয়েই দু’চার কথা বলি।
12143240_438543559663005_3716878426364071301_n

নেত্রকোনার বারহাট্টার কাশতলা গ্রামে মা বীণাপাণি’র ঘরে ১৯৪৫ সালের জুন মাসে এক পুত্রসন্তান জন্মলাভ করে। তার নাম হয় নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণচৌধুরী। যৌবনে সেই মানুষটি কবি হয়ে উঠবার পর নিজের নাম সংক্ষেপ করে রাখেন নির্মলেন্দু গুণ এবং মায়ের মতো আপন গ্রামটির নামও কাব্য করে পাল্টে রাখেন কাশবন। যদিও আমাদের কাছে একালে বানানো কাশবনের চেয়ে দীর্ঘকালধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী নাম কাশতলাকেই অধিকতর কাব্যিক মনে হয়।

কবি নিজের গ্রামের প্রান্তিকজনের উপকারার্থে বিদ্যালয়, পাঠাগার, সংগ্রহশালা প্রভৃতি নির্মাণ করেছেন। এখনও বাকী কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। অর্থের প্রয়োজন তাঁর আছে।

আমাদের সেই সত্তরোর্ধ বর্ষিয়ান কবির মনে হয়েছিল, এবার তিনি তিন লাখ টাকা ও ৫০ গ্রাম স্বর্ণ মূল্যের স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন। কিন্তু গেল ৭ মার্চে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যখন ১৪ জন ব্যক্তি ও নৌবাহিনীর নাম ঘোষণা করল সেখানে আমার এই প্রিয় কবির নাম দেখা গেল না। যেই কবি কিনা ‘শেখ মুজিবঃ ১৯৭১’, ‘সেই রাত্রির কল্পকাহিনী’, ‘আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি’, ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ জাতীয় দেশপ্রেমমূলক অজস্র কবিতা লিখেছেন। এমনকি শেষোক্ত কবিতা, যা বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ্য। যার কবিতা ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে পরিচালকের ভাগ্যে জাতীয় পুরস্কারও জুটেছে। সেই কবির কাব্যদ্রোহ সত্তরের দশকে মানুষের মনে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়েছে। যিনি কিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে প্রথম কবিতার রচয়িতা। সেই কবিকে স্বাধীনতা পদক দিতে ভুলে গেল সরকার। তাও আবার কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ক্লাসমেট শেখ হাসিনার সরকার। খুবই আপসেট হয়ে কবি নিজের ফেসবুকে বিস্ময় ঢেলে দিয়ে জানিয়ে দিলেন, এবারই তাঁর স্বাধীনতা পুরস্কার চাইই চাই, নয়তো আর কোনোদিন নয়।

‘আমাকে স্বাধীনতা পদক দিন’ শিরোনামে ১০ মার্চে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, আমার একদা সহপাঠিনী, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার দৃষ্টে আমি প্রথম কিছুকাল অবাক হয়েছিলাম- কিন্তু আজকাল খুবই বিরক্ত বোধ করছি। অসম্মানিত বোধ করছি। ক্ষুব্ধ বোধ করছি। আমাকে উপেক্ষা করার বা কবি হিসেবে সামান্য ভাবার সাহস যার হয়, তাকে উপেক্ষা করার শক্তি আমার ভিতরে অনেক আগে থেকেই ছিল, এখনও রয়েছে। পারলে ভুল সংশোধন করুন। অথবা পরে এক সময় আমাকে এই পদকটি দেয়া যাবে, এই ধারণা চিরতরে পরিত্যাগ করুন।

যাহোক খনার বচন, ‘যদি থাকে বন্ধুর মন/ গাং সাঁতরাইতে কতক্ষণ’ মনে রেখে কবির সহপাঠী অবশেষে ভুল সংশোধন করেছেন। বাংলা সাহিত্যে অনন্য ভূমিকা রাখায় স্বাধীনতা পদক পেয়ে কবি যারপরনাই সম্মানিত হয়েছেন। উপরন্তু ৪৮ বছর আগের পাওনা দুই টাকা উসুল করে দিয়ে কবিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন। অবশ্য দুই টাকা পিতাকে নিয়ে লেখা কবিতার কাব্যদক্ষিণা কিনা তা কবির বুঝবার সাধ্য কি?

এই নিয়ে কবির যারা চক্ষুশূল তারা কবিকে তুলোধুনো করেছেন। পুরস্কারটাকে আবেগ ও সম্পর্কের দোহাই দিয়ে আদায় করা বলছেন, কোনোমতেই যা অর্জন নয়।

অবশ্য কবি নিজের জবানিতেই এর জবাব দিয়েছেন, আমি স্বাধীনতা পদক চেয়েছি এই জন্যই যে, আমি চাই এই পদকটি সসম্মানে সচল থাকুক। তার মানে হলো, কবি ধরেই নিয়েছেন, উনাকে পদক না দেয়া পর্যন্ত পদকের সাম্মানিক দায় মুক্তি ঘটবে না!

কবি আরও বলেন, আমার মতো ছোটো হতে ভয় না পাওয়া Confessional ঘরাণার কবি যারা দেখেনি, আমার Unpredictable behavior তাদের কাছে অচেনা ঠেকছে বলেই তারা আমাকে নিন্দামন্দ শুধু নয়, গালমন্দও দিচ্ছে। আমার ক্ষোভকে তারা লোভ বলছে। যদিও আমি বলেছিঃ
আর কিছু তো আরাধ্য নয়
কাব্য এবং নারী ছাড়া,
ওটা পেলে জাহান্নামেও
যেতে আমি এক পা খাড়া।
ইতোপূর্বে স্বৈরাচার এরশাদকেই আমরা ‘King of Unpredictable’ বলে জানতাম। কিন্তু এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত প্রতিবাদী কবিতার রচয়িতা কিনা নিজেকেই সেই কাতারে নামিয়ে আনলেন। যে কবি নিজেই স্বীকারোক্তি দেন যে, ‘নারী ও কবিতা’ পেলে জাহান্নামে গিয়েও তাঁর সুখ, সেই কবিরই তবে পুরস্কারের জন্য কাঙালপনা বা সংক্ষুব্ধ হওয়ার প্রয়োজন পড়ল কেন? এর একটাই কারণ নির্মলেন্দু গুণ একমাত্র নিজেকেই শ্রেষ্ঠ কবি ঠাওরে বসে আছেন। বাকীরা স্রেফ অকবি।

পুরস্কারটা পেয়ে যাবার পর যেমনটা কবি দাবি করছেন, আমার ওপর আস্থা হারাবেন না। আমার কবিতা পড়বেন। বাংলা ভাষার একজন প্রধান আধুনিক কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বাণী ‘আমারে এড়িয়ে বাড়াও নিজেরই ক্ষতি’ রেফারেন্স টেনে গুণ বলেন, আমার কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে আপনাদের নিজেদেরই ক্ষতি হবে। সব কবিরই অহংকার থাকে অল্পবিস্তর। কিন্তু নির্মলেন্দু গুণের কথায় আমরা ধরে নিতে পারি, কবির অতি অহংকার এবার আকাশ ছুঁয়েছে। কবি কামিনী রায় খামোখা উচ্চারণ করেছিলেন, আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে/ আসে নাই কেহ অবনী ‘পরে।

কাগজে পুরস্কারগ্রহণের খবর ছাপা হওয়া নিয়ে তিনি ২৬ মার্চে স্বধীনতা দিবসে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, ‘ভিন্ন পত্রিকার অভিন্ন সিদ্ধান্ত’ শিরোনামে। সেখানে কবি অভিযোগ করেন, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এবারের স্বাধীনতা পদকের খবর ছাপাতে গিয়ে বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নামটি কবির আগে ছেপেছে। সব পত্রপত্রিকা এবং সরকারী নোটে যেখানে কবির নাম বন্যার আগে সেখানে ঐ দু’টি পত্রিকা কবির চেয়ে ১২ বছরের ছোট বন্যাকেই কিনা ওপরে উঠিয়ে দিয়েছে। এতে কবির ‘ইগো’তে খুব লেগেছে। কবিগুরু রবি ঠাকুরের ভাষায়, ‘বহু বাসনায় প্রাণপণে চেয়ে’ যে পদকটি তিনি বাগিয়েছেন, সেই পদকের খবর নিয়ে নয়ছয় তিনি মানবেন এমন জাতের কবি তিনি না। কিন্তু সমস্যা হলো, কবির এই ন্যায্য স্ট্যাটাসে যারা সমালোচকসুলভ মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছেন তাদের সবাইকে তিনি, চুপ বেয়াদব, নো উপদেশ প্লিইইইএজ, চুপ হ মূর্খ্য, শাট আপ স্টুপিড, জাতীয় অশালীন বাক্যবাণে কান্ডজ্ঞান শিখিয়ে ছেড়েছেন। অথচ ঐ সংবাদে সবার নীচে নৌবাহিনীর নাম ছাপা হয়েছে। তা জনাব কবি, আপনার স্থান নিশ্চয় ঐ বাহিনীর ওপরে?

এই কবিই আবার নবীনতর কবিদের টিপস দেন, যত খারাপই হোক নিজের কবিতা বেশি বেশি করে পড়বে। আর যত ভালোই হোক, যত বিখ্যাতই হোক অন্যের কবিতা কম পড়বে। ঠিকাছে। তাই কি হয় কবি? আপনি পদক পাওয়া এতো ভালো কবি, আমরা কেন আপনার কাব্যসুধা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখব?

কবি বলেন, ভালোবাসা, অর্থ ও পুরস্কার আদায় করতে হয়। কিন্তু এই কথাটি ঠিক মানা গেল না কবি। পুরস্কার আর ভালোবাসার সাথে যখন জেনেবুঝেই অর্থের সংশ্রব ঘটানো হয়, তা কখনোই ভালোবাসা বা সম্মানের স্বর্ণালী ঘড়া পূরণ করে না।

কবির জেনে রাখা ভালো যে, ফরাসী সাহিত্যিক ও দার্শনিক জাঁ পল সার্ত্রে ১৯৬৪ সালে পাওয়া নোবেল পদক ফিরিয়ে দিয়ে নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন। লেখক ভালো করে জানতেন, তিনি নোবেল নিলে ঐ পদকটাই মহত্তর হতো, তিনি নন। বরং তিনি তা বর্জন করে নিজের সাম্মানিক স্থানটা বিশ্ববাসীকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন। কবির জানবার কথা, পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ নিরীহ নারী-পুরুষ ও শিশুদের ওপর ব্রিটিশ সৈন্যদের নির্বিচার গুলি চালানোর প্রতিবাদে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশদের দেয়া নাইটহুড খেতাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি এবারের স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তিতে কবির সতীর্থ ন্যাপ সভাপতি মোজাফফর আহমদ পর্যন্ত পদক গ্রহণ করেননি। যিনি কিনা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মন্ত্রিত্বও গ্রহণ করেননি।

প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ, আপনি পারবেন, সার্ত্রে হতে, রবীন্দ্রনাথ হতে কিংবা নিদেনপক্ষে মোজাফফর হতে। না আপনি পারবেন না। যে পুরস্কার আপনি রাষ্ট্রের কাছে ভিখ মেগে পান, সেই রাষ্ট্রের হাজার দুর্যোগের প্রতিবাদেও ঐ অমূল্য পদক ত্যাগ করবার নৈতিক বল আপনার থাকবে না কবি?

সোহাগী জাহান তনু’র ওপর বর্বরতা কিংবা রাজকোষ লুট হয়ে যাওয়া বিষয়ে কোনো দ্রোহী বচন তো আপনার মুখ থেকে আশা করতে পারি না আমরা, তাই না কবি? পদকের ভিমরতিতে ন্যুব্জ কবির কাছে আসলে আমরা কিছুই আশা করি না।

কাজেই আপনি আমাদেরকে যতোই চুপ বেয়াদব বা মূর্খ বলুন, আমাদের দৃষ্টিতে এখন আর আপনি প্রতিবাদী বা দ্রোহি কবি নন। আত্মসম্মানকে ভালোবাসবার তরিকা যার জানা নাই, পুরস্কারের মোহতেই যিনি কাব্যিক নির্বাণ খুঁজেন, তাঁকে আর যাই হোক ভালোবাসার কবিও বলতে পারব না আমরা। আমাদের বিবেক এতে সায় দেয় না, কি করব কবি! কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলতেন, আনন্দকে ভাগ করলে দুটি জিনিস পাওয়া যায়; একটি হচ্ছে জ্ঞান এবং অপরটি হচ্ছে প্রেম। কিন্তু বিক্ষোভে আদায় করা আপনার পদকানন্দ ভাগ করে আমরা সেরকম কিছুই পেলাম না। তাছাড়া যে পুরস্কার পেয়ে এককালে স্বাধীনতাবিরোধী শর্ষিনার পীর আবু সালেহ মোহাম্মদ জাফর সাহেব সম্মানিত হয়েছেন, সেই একই পুরস্কারে আপনি ভূষিত হয়ে যথার্থ সম্মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবার খায়েস কীভাবে মিটে যায়, তা আমাদের সকলের সত্যি অজানা।

এখন কোনো তরুণ কবি যদি, কাঙালপনা, পদকভিখারী, তদবিরকবি বা পদকফকির নামে পদ রচনা শুরু করেন, তবে তাকে কীভাবে সামলাবেন প্রিয় কবি? অথচ জানতাম, সুচিত্রা সেনকে নিয়ে কবিতা লিখবার জন্য সুচিত্রার মেয়ে মুনমুন সেন প্রায় আপনার সমবয়সী হয়েও কবির পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিলেন। বয়সে বঙ্গবন্ধুর অনেক ছোট হওয়ার পরও তিনি কবিকে আপনি বলে সম্বোধন করতেন।

প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণের নিজেকে পদকের রাজ্যে হারিয়ে খুঁজবার কালে প্রাচীন ভারতীয় গুরু এবং তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক চাণক্যের কথাটিই আমরা মনে রাখব, বিষ থেকেও অমৃত আহরণ করা চলে, মলাদি থেকেও স্বর্ণ আহরণ করা যায়, নীচজাতি থেকেও বিদ্যা আহরণ করা যায়, নীচকুল থেকেও স্ত্রীরত্ন গ্রহণ করা যায়।

তাই আমরা হয়ত পদকের বাহাস পেছনে ফেলে গুণের কবিতার রসাস্বাদনেই শিল্পরসিক হবো আর কবি জন কীটসের মতো করে ‘Beauty is truth, truth beauty’ খুঁজব। আর কায়মনোবাক্যে চাইব, পদক নয়, পঙক্তি’র জয় হোক।

তথ্যসূত্রঃ facebook.com/nipa.sharkar.98

লেখকঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
২৭ মার্চ ২০১৬
facebook.com/fardeen.ferdous.bd
twitter.com/fardeenferdous