ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

??????????????
১.
এখন ঋতুরাজ বসন্তকাল নয়। তবু আমার বাগিচায় শীতের বিশুষ্ক অদিনেও ‘বউ কথা কও’ পাখি ডাকে। আজ তাই আমার বউয়ের জবানিতেই একখানা জীবনবাদী সত্য গল্প শুনাই!

টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারী মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিলাম। সেকালেও এখনকার মতোই টাউট বাটপাড়ে ভরা ছিল দেশটা। কিন্তু পড়াশোনার ছিটেফোঁটাটা অন্তত ছিল। সেকালের সেই টাউটরা আমাদের পরীক্ষার বেলায় প্রশ্নপত্র আউট করে দিলে, পরীক্ষার হলে সেট বদলে দেয়া হয়। ফলে ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষা খুব বাজে হলো। জানাশোনা প্রশ্নরা দ্বারে কড়া নাড়ল না একদম, উত্তরও তাই যুৎসই হলো না। ফেল মারব এই চিন্তায় বাকি পরীক্ষার অবস্থাও হলো জগাখিচুড়ি!

এমন একটা অবস্থায় কোনোরকমে পরীক্ষা শেষ করে গ্রামে চলে গেলাম। তিনমাস পর রেজাল্ট বেরুনোর দিন এল। সেকালে ইন্টারনেট বা টেলিঠকের মোবাইল এসএমএস বলে কিছু ছিল না। কলেজে গিয়ে রেজাল্ট জানবো এমন মতিগতিও হলো না। অগত্যা গ্রামের ‘আপন’ নামের এক উৎসাহী পাড়াত ভাইকে রেজাল্ট আনতে পাঠানো হলো।

রেডিওতে জানলাম দুপুর ১২টায় রেজাল্ট বেরিয়েছে। এলাকার আশেপাশের কলেজে পড়ুয়া ইশকুল বান্ধবীরা ফল পেয়ে খুশির নাচনও দেখিয়ে গেল কেউ কেউ। আর আমি বুকধুকপুক নিয়ে উৎকন্ঠায় অপেক্ষা করি, পাড়াত ভাইটা কি ফল আনে! বিকেল গেল, সন্ধ্যা গেল, রাত ১২টাও বাজল। ফল এলো না। খবর নেয়ার আর কোনো উপায় নাই। অতএব সিদ্ধান্তে আসা গেল’ ‘আমি ফেল মারিয়া বাবা মা’র মুখে চুনকালি মাখাইয়াছি’! একবুক কান্নাকে আপন ভেবে নাকের জলে চোখের জলে এক করে ঘুমুতে গেলাম। বাবা কর্মস্থল ঢাকায়, তাঁর বেগ আবেগ জানা হলো না। কিন্তু ‘মা’ সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা খুঁজে পেলেন না।

সকালে কাছের বান্ধবী এসে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটাবৎ খোঁচা দিয়ে গেল, ‘কেন যে বাড়ির কাছের কলেজ ছেড়ে কুমুদিনীতে মরতে গেলি’? নিরবতা আমার সঙ্গী। রেজাল্টের সকল আশা ছেড়ে দিয়ে বাড়ির দক্ষিণের বকুল গাছ তলায় বসে পরের বারের পরীক্ষার ক্ষণ গুণছি আর কড়া হোস্টেল সুপার ম্যাডামের আরো এক বছরের অত্যাচার শিরোধার্য জ্ঞান করছি; এমন সময় সেই উড়নচণ্ডী পাড়াত ভাই ঢ্যাং ঢ্যাং করতে করতে আমাদের উঠোনে এসে হাজির হলো। দাঁত কেলিয়ে বলতে লাগল, ‘ওই ‘মিনি’ কাল রাতে টাঙ্গাইল থেকে গাজীপুরের আপার বাসায় গেছিলামরে। অনেকদিন আপার কাছে যাই না তো তাই।’

ইচ্ছে করল ওর গালে কষে এক থাপ্পড় মারি। তোর ভ্রমণ বৃত্তান্ত কে শুনতে চেয়েছেরে ব্যাটা। হঠাৎ মাঝখানে ‘মা’ এসে জানতে চাইল, এই আমাগো গেদি’র ফল দেয় নাই? আমার বুক ধড়ফড়ানি তখন তুঙ্গে। হ, ‘মিনি’ পাস করছে। আমার মন আরো খারাপ হলো; খালি পাশের তো কোথাও কোনো খাওয়া নাই। ‘সেকেন্ড ডিভিশন’ পাইছে। আমি স্রেফ ‘থ’ হয়ে গেলাম। পাশ করেছে ৩৯%; তারমধ্যে আমিও একজন। দ্বিতীয় বিভাগ আমার কাছে এখনকার জিপিএ-১০০০। আমি অবশেষে আমার পরীক্ষার ফল হাতে পেলাম। কিন্তু ফল প্রকাশের ৩৬ ঘন্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর ফলাফল জানতে পারার ধৈর্যধারণ একালের বাস্তবতায় অবশ্যই অসম্ভব।

??????????????

২.
গতকাল বেলা ২টায় আমার কন্যা সুখপ্রীতা’র (Sukhoprieta Hera) প্রথম পাবলিক পরীক্ষা প্রাইমারি সমাপণীর ফল বেরুলো। ওর বাবাকে বললাম, টেলিঠকে মেসেজ দাও। ও দিতেই থাকল বেশ কয়েকবার। কোনো রেসপন্স পেল না। বললাম, ডিপিএ’র ওয়েব সাইটে যাও। গেল। ওখান থেকে একটা বিশাল পিডিএফ ফাইল ডাউনলোড দিল। ওপরে হিজিবিজি লেখা। সুতন্বী ফন্ট ইউনিকোডে কনভার্ট করার আগে যেমনটা দেখায় সেরকম আর কি। সেখানে খোঁজ করে ২৭৮ নাম্বার রুলের কোনো নিশানা মিলল না। সুখপ্রীতার বাবা চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ে মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তায় নিমগ্ন হলেন। এই অবসরে আমি কন্যাকে নিয়ে দৌঁড়ে ইশকুলে গেলাম। কন্যা বলল, যাও বাবা কিনা কি দেখছে! ইশকুলে পৌছতে না পৌছতেই ওর বাবার বেশ কয়েকবার ফোন। সুর যেন, এটা কি হলো। মেয়ে নিশ্চয় খাতায় রুল নাম্বার লিখতে ভুলে গেছে।

অত:পর ঝামেলার অবসান হলো। ইশকুলের কে কে জিপিএ-৫ পায়নি শিক্ষকরা তাদেরকে হারিকেন দিয়ে খুঁজতে লাগল।
অনেকেই জানাল, তাদের পুত্র কন্যারা ‘সোনালী’ জিপিএ পেয়েছে। আমি বলতে চাইলাম, আমার কন্যাতো ‘হিরন্ময়’ জিপিএধারী। কিন্তু বললাম না। আদিখ্যেতায় ডুব দেয়া বাবা-মা’দের বোঝানো যাবে না যে, গোল্ডেন-ফোল্ডেন বলে কিছু নাই। যাহোক কন্যা পাশ করছে, লিস্টে তার নাম আছে এতেই ভীষণ খুশি। নানা ভঙ্গিমায় ইশকুল ক্যাম্পাসে ফটোসেশানও হলো। রাতে ও ঘুমুতে গেল আনন্দময়ী হয়ে।

রাত ১০টা ৩৭মিনিটের দিকে সুখপ্রীতা বাবা’র মোবাইলে মেসেজ এল।
Thana:
KALIAKOIR, Roll:
276, Year:
2016, result:
Passed, CGpa:
5.00, Ban: A+, Eng:
A+, Math: A+, EVS Social:
A+,EVS Science:
A+, Religion: A+,
Powered by
Teletalk.
From:
16222
29/12/2016
10:37PM

মানেটা দাঁড়ালো- দুপুর ২টায় পাঠানো মেসেজের উত্তর ‘টেলিঠক’ মশায় রাতের বেলা দিলেন আর কি! হাসব না কাঁদব বুঝতে পারলাম না। আমার ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট পায়ে হেঁটে আসতে সময় লেগেছিল ৩৬ ঘন্টা। আর কন্যার রেজাল্ট ডিজিটাল পদ্ধতিতে এল সাড়ে ৮ ঘন্টা পর। সাথে খানিক সময়ের জন্য উদ্বেগ উৎকন্ঠা পুরোটাই ‘ফ্রি’!

৩.
আমাদের দেশে ইদানিংকালে যারা এতো ঢাকঢোল পিটিয়ে ডিজিটাল ডিজিটাল কোরাস গান। তারা কি আসলে তলিয়ে দেখেন, কি ধাচের সেবাটা আমাদেরকে তারা দিচ্ছেন? পিডিএফ ফাইলের ওপরে কেন হিজিবিজি লেখা থাকবে আর একটা মেসেজের উত্তর দিতেই বা কেন সাড়ে ৮ঘন্টা সময় লাগবে। যেসব ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি) সাহেবরা ডিজিটাল বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, আমরা এখন ধরে নিচ্ছি তারা আসলে রীতিমতো ‘টাল’! কিন্তু প্রশ্ন একটাই ডিজি কেন এখনো টাল?

যে লেখাপড়ার সাথে আনন্দের ছিটেফোঁটা আর অবশিষ্ট নেই; সেই লেখাপড়া অসার অন্ধ। সেকালে ৩৯% পাশের যুগে ৩৬ ঘন্টা পর দ্বিতীয় বিভাগের রেজাল্ট পাওয়ার যে আনন্দ তার সাথে একালের হাজারটা জিপিএ-৫ এর আনন্দ একপাল্লায় মাপা যাবে না। তাহলে কীসের জিপিএ, কিসের আইটি, কিসের ডিজিটাল। এসব দিয়ে বাচ্চারা করবেটা কি? কোমলমতি বাচ্চাদের জিপিএ-৫ কেন লাগবে, পাতানো পাবলিক পরীক্ষা কেন লাগবে? তাদের কোন কাজে আসবে এসব? শিক্ষা ব্যবস্থা আর কতটা অধঃপাতেে গেলে তবে তাকে নষ্টামি বলা যাবে?

আমাদের বন্ধু নূর সিদ্দিকী যথার্থ বলেন, সন্তান এ+ পেয়েছে? চিয়ার্স!!
এ+ মানুষ হবে তো ডিয়ার্স! এই বন্ধুর মতো প্রশ্নটা আমাদের সবারও।

আমরা এখন নির্দ্বিধায় বলতে পারি, পাবলিক পরীক্ষার নামে সহস্র ছলাকলা আর অসাধুতায় শতভাগ পাশ দিয়ে এই ভূমিপুত্রদের মানুষ করা যাবে না। শিশুদের চুরিচামারি, অসততা আর মনোবৈকল্যই কেবল শেখানো হবে; প্রজ্ঞা আর উদারবাদিতা সে বহুদূর। মানুষ গড়তে হলে মানুষ গড়বার কারিগর চাই। মানুষ গড়বার সুদক্ষ কারিগর দূরে থাক আপাততঃ আপাদমস্তক ‘টাল’ নীতিনির্ধারকদের হাত থেকে রেহাই চাই? বলা যায়, এটা আমাদের থার্টি ফার্স্ট নাইট প্রত্যাশা।

ফারদিন ফেরদৌস
লেখক ও সাংবাদিক
৩০ ডিসেম্বর ২০১৬
twitter.com/fardeenferdous
facebook.com/fardeen.ferdous
bdnews24.com/author/fardeenferdous