ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 
21_Arafat+Sunny_220117_0001

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলে আমাদের স্থান খুঁজব তো দূরের কথা দিন দিন র‌্যাংকিং এতোটা তলানিতে গিয়ে ঠেকছে যে, আর কিছুদিন পর হিসেব রাখবারও জরুরত থাকবে না। অন্যান্য খেলাধুলার অবস্থাটাও যে খুব সুখকর তা বলবার উপায় নেই। তবে দেশের এমন বাস্তবতায় ক্রিকেট হলো সকল আশার দিকদিশারি বাতিঘর। বিশ্বসমাজে আমরা ক্রিকেট খেলাটার এমন একটা অবস্থান তৈরি করতে পেরেছি যে, খুব আত্মবিশ্বাস নিয়েই বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের এখন বীর বলে সম্বোধন করি। আর সেই বীরত্বে নাম লেখানোটা এখনকার সমাজের তরুণদের মধ্যে এক ধরণের অদম্য ক্রেজ।

জাতীয় দলে ক্রিকেট খেলতে পারা মানেই অনেক কিছু। চাকরি-বাকরি, পড়াশোনা-ডিগ্রি, বিসিএস, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসা, সমাজসেবা আজ সব হার মেনেছে ক্রিকেটের কাছে। ছেলে যদি ক্রিকেটার হতে পারে আর কী চাই? আকাশের চাঁদই যেন হাতে পাওয়া হয়ে গেল। মিডিয়ার মাতামাতি, বিজ্ঞাপন, কাড়িকাড়ি টাকা। ভালো খেলতে জানা ক্রিকেটার মানেই একেকজন রাষ্ট্রীয় দূত; বিশ্বজোড়া যাদের খ্যাতি। প্রত্যন্ত গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত পরিবার থেকে ওঠে আসা মুস্তাফিজ বা মিরাজের কেমন জয়জয়কার, এখনকার সবচে’ বড় উদাহরণ তাঁরাই। ওঁরা ভালো খেলে প্রতিপক্ষের সমীহ আদায় করতে পারলেই হলো, রাষ্ট্রের তরফে গাড়ি-বাড়ি, প্রধানমন্ত্রীর ডিনার, রাষ্ট্রপতির প্রশংসাতো মামুলি, সর্বোপরি ১৬ কোটি মানুষ পারলে তাদেরকে মাথায় তোলে নাচে। তাহলে আজকের তরুণদের স্বপ্ন, ধ্যান, জ্ঞান কেন ক্রিকেট হবে না? সমালোচনা নয়, বরং এসবের আমরা বরাবর তারিফই করে এসেছি।

আমাদের গ্রাম-বাংলায় প্রবাদ প্রবচনে খুব সহজ ও সাবলীলভাবে ‘আদর দিয়ে মাথায় তোলা’র ব্যাপারটা হাজার বছর ধরেই নানাভাবে বিবৃত হয়ে আসছে। এর প্রকৃত অর্থ কী, কারো তা অজানা নয়। এখন এই মুহুর্তে এসে আমাদের উপলব্ধির জায়গাটিকে নতুন করে চিনতে হচ্ছে। আমাদের এই বীর ক্রিকেটারদের আদর দিয়ে দিয়ে খুব বেশি মাথায় তোলে ফেলছি নাতো? আমাদের কিছু ক্রিকেটারের সাম্প্রতিক বিতর্কিত কর্মকান্ড এই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে আসছে।

তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এক নারীর করা মামলায় ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার আরাফাত সানি গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং ঘটনার তাৎপর্য বিবেচনায় আদালত তাঁকে একদিনের রিমান্ডও মঞ্জুর করেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকেই জানা যাচ্ছে, ওই নারীকে তিন বছর আগে গোপনে বিয়ে করেছিলেন সানি। তখন তাঁর এতো যশ খ্যাতি ছিল না। এখন বাড়াবাড়ি রকমের ‘মানি এন্ড ফেম’ দেখা দিয়েছে সানির ভুবনে। পুরনো বউয়ে কি আর চলে? এটা সমস্যা নয়, দেশে প্রচলিত আইন আছে, বিচ্ছেদেরও নিশ্চয় পদ্ধতি আছে। আর যাই হোক জোর করে তো আর সংসার চলে না। কিন্তু আরাফাত সানি তাঁর বউয়ের নগ্ন ছবি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াকে কলুষিত করেছেন। একটা মানুষের কতটা মানসিক বিকৃতি ঘটে গেলে এমনটা করা সম্ভব, এটা বিচার করবেন মনোবিদরা। কিন্তু আমরা যাদের বীর বলে সম্বোধন করি, তাদের এই অবস্থার দায়টা দেশের হুজুগে ক্রিকেট ভক্ত বা রাষ্ট্রের ওপর সমানভাবেই বর্তায়। একজন সাধারণ মানুষকে ক্রিকেটার হওয়ার সুযোগ দিয়ে রাষ্ট্রদূত হিসেবে গড়ে তোলে মাথায় করে নাচি; অথচ তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বা বোধের খবর কেন রাখি না? তারা যদি হন সমাজের আইকন, তবে আমজনতা তাদের কাছ থেকে আসলে কী শিখবে? খেলার বিনোদন তো পরের কথা!
10_Shahadat+Hossain_CMM+Court_051015_0003
এর আগেও আমরা দেখলাম, ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর ভয়ঙ্কর নির্মমতা। বাড়ির শিশু গৃহকর্মীকে খেতে না দেয়া, মারধর করা বা গরম খুন্তির ছ্যাকা দেয়াসহ অমানবিক আচরণ। দুঃখজনক হলেও সত্যি সেই মামলায় কোনো শাস্তি পেতে হয়নি শাহাদাত দম্পতির। নির্যাতনের শিকার হওয়া গৃহকর্মীটিই নাকি আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছে, তার গায়ে কেউ ফুলের আঁচরটি পর্যন্ত দেননি। শাহাদাত একসাথে কয়েকটি অপরাধ করেছেন; নিরীহ শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতন করেছেন; উপরন্তু সেই শিশুকে মিসগাইড করে রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করেছেন। এখন এই যদি হয় অবস্থা যে, রাষ্ট্রের দূত বা ক্রিকেট বীর হলেই সাতখুন মাফ পাওয়া যায়, তবে যুগে যুগে সানি বা শাহাদাতদের জন্ম কেউ রোধ করতে পারবে বলে মনে হয় না!

শাহাদাতের আগে রুবেল হোসেন ও হ্যাপি কান্ডে আমাদের ক্রীড়া সাংবাদিকরা বেশ কয়েকমাস মেতেছিলেন। রুবেল হ্যাপিকে বিয়ের প্রলোভনে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে ঠকিয়েছেন বলে আত্মহত্যারও হুমকি দিয়েছিলেন ওই অভিনেত্রী। ঘটনার সুরাহা করবার জন্য আদালত পর্যন্ত দৌঁড়েছিলেন হ্যাপি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্রিকেটদূতের কাছে হার মেনে নীরবতাকেই সঙ্গি করেছেন হ্যাপি। আমরাও ভুলে গেছি, রুবেল খুব ভালো খেলোয়াড় বলে!

ক্রিকেটে সাকিব আল হাসানের নৈপূণ্য নিয়ে কোনো সংশয় বা প্রশ্নই নেই। সাবেক শীর্ষ বিশ্ব অলরাউন্ডার তিনি। এখনো ক্রিকেটের ইতিহাস রচনা করে চলেছেন। সেই তিনি খেলা চলাকালীন সরাসরি সম্প্রচারকালে বিশ্বের কোটি দর্শকের সামনে এমন এক আচরণ করলেন; যার কোনো নজির বিশ্বের ইতিহাসে নেই। হতে পারে সেসময় তিনি স্ত্রী সংক্রান্ত জটিলতায় মানসিক অশান্তিতে ভুগছিলেন। কিন্তু তাই বলে দর্শক অনুরাগীকে তো জেদ বা খেদ দেখানোর কিছু নেই। অবশ্য সেসময় সাকিব কয়েকমাসের সাসপেনশানের শাস্তি পেয়েছিলেন। যদিও আমরা ক্রিকেট অনুরাগীরা সব ভুলে গিয়ে সাকিবের পক্ষাবলম্বনই করেছিলাম।

একসময়ের দুর্দান্ত ক্রিকেটার আশরাফুলের ম্যাচ ফিক্সিং এর কাহিনীও আমরা দেখেছি। সামান্য কিছু টাকার লোভ সামলাতে ব্যার্থ হয়ে আজীবনের ক্রিকেট ক্যারিয়ার নষ্ট করেন তিনি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বিসিবির’র ডিসিপ্লিনারি বোর্ডের দেয়া ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞার সাজা তিন বছরে শেষ করতে পারলেও; অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে পারেননি আশরাফুল। ঢাকা গ্লাডিয়েটরসে খেলাকালীন যে নৈতিক মর্যাদা হারিয়েছিলেন তিনি, সেই স্খলনেই গিলে খেয়েছে আশরাফুলের ক্রিকেটিয় দক্ষতা।
Ashraful+1
আর এভাবেই আমাদের জাতীয় বীর ক্রিকেটারদের আমরা ভালোবেসে হৃদয়ে স্থান দেই, আর ওঁরা অবলীলায় সেই ভালোবাসাকে অমর্যাদায় পায়ে দলে নির্লজ্জভাবে ঠকিয়ে যায় আমাদের। আশরাফুল, রুবেল, শাহাদাত বা সানিদের বিগড়ে যাওয়ার পেছনে কোন ‘লাই’টা কাজ করছে এবার তা খুঁজতে হবে ক্রিকেট নীতি নির্ধারকদের। শুধুমাত্র রাষ্ট্রূীয় কোষগারের পয়সা খরচ করে নামীদামী মনোবিদ রাখা কিংবা শক্ত কোড অব কন্ডাক্টের দোহাইতে ক্রিকেটারদের বোধ ফেরানো যাবে না। তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে জীবনটা এতো সহজ নয়। জানিয়ে দিতে হবে, যদি তুমি মানুষ হয়ে ওঠতে না পারো, তবে তোমার যেকোনো দক্ষতাই মূল্যহীন। কাজেই এখনই সময় খেলোয়াড়দের মতিগতির রাশ টেনে ধরবার। ক্রিকেটফ্যান বা রাষ্ট্রের প্রশ্রয়ে আর ঘটুক ক্রিকেটারের অধঃপতন।

তারও আগে ক্রিকেট খেলাটাকে খেলার জায়গায় রাখতে হবে। একটা দুটো ম্যাচ জিতলেই রাষ্ট্রীয় নির্বাহিদের পাল্টাপাল্টি অভিনন্দনের বন্যা ভাসিয়ে দেয়ার এমন রেওয়াজ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আমাদেরকে এবার আদেখলাপনাটা ছাড়তে হবে। ওঁরা দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলে ম্যাচ জিতবে বা সুনাম অর্জন করবে বলেই ওঁদের পেছনে কাড়িকাড়ি অর্থ ঢালা হয়; যে পয়সাটা আমাদের সবার। কাজেই ম্যাচ জিতে আসার পর তাদের নিয়ে হুলুস্থুলে কান্ড বাঁধিয়ে দেয়ার কিছু নেই। তাদের জন্য আলাদা করে বাড়ি-গাড়ির বরাদ্দটা স্রেফ বাতুলতা। একটু-আধটু ক্রিকেট খেলা দেখাচ্ছে বাংলার দামাল ছেলেরা; তাতেই আমাদের সর্বোচ্চ উৎসবের বলিহারি; যেদিন আমরা বিশ্বকাপ জিতব, সেদিনের উৎসবের রকমটা তাহলে কেমন হবে?

আরাফাত সানি বা শাহাদাত হোসেনদের মতো বেয়াড়া ক্রিকেটারদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। ক্রিকেট গৌরবে এগিয়ে থাকুক আমাদের বাংলাদেশ।

লেখক: সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
২৩ জানুয়ারি ২০১৭
twitter.com/fardeenferdous
facebook.com/fardeen.ferdous