ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 
kasem-bin-abubakar2_46077_1493548504

বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় এখন তোলপাড় চলছে। বর্ষিয়ান এই লেখকের ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তার রহস্য নিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি, ডেইলি মিরর, ইয়াহু নিউজ, আরব নিউজ ও ইন্ডিয়ান টাইমসনাওসহ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে। এই নিয়ে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়াম্যান এবং প্রভাবশালী সাহিত্য সমঝদার-সমালোচক দাবিদারদের মধ্যে বিস্তর কাটাছিড়া হচ্ছে। বেশিরভাগ সমালোচকই লেখকের সাহিত্যমান নয় শুধু ধর্মের মোড়কে যৌনতা বিলানোর অভিযোগ এনে খোদ লেখককে পর্যন্ত তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের অন্তত ৮০ ভাগ মানুষ প্রায় চার দশক ধরে কাসেম বিন আবুবাকারের ভক্ত ও মুগ্ধ পাঠক। কিন্তু শহুরে ২০ ভাগ মানুষ এবং প্রায় শতভাগ উন্নাসিক গণমাধ্যমের কাছে আজীবনের অচ্ছুৎ রয়ে গেছেন এই লেখক আবুবাকার। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, তার লেখা ধর্ম ও যৌনতার পথে যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে, এমন কথা বলবারও কেউ প্রয়োজন বোধ করেনি!

একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকার, আশির দশক থেকে ১০০টি বই লিখেছেন। যাকে বাংলাদেশি মেইনস্ট্রিম মিডিয়া কোনোদিন তাদের গর্বের প্রচার-প্রসারে স্থান দেবার দায় নেয়নি, সেই তাকে যদি বিশ্ব মিডিয়া নিজেদের কাঁধে তোলে সাহিত্যসেবীদের সভায় পরিচিত করায় সে দায় কি আবুবাকারের?  আবুবাকার নিজের প্রচারের জন্য কি বিশ্ব মিডিয়ায় প্রেসরিলিজ দিয়েছিলেন?

আমাদের অতি সমালোচক যারা এই লেখকের পাঠ তোলে ধরে এখন তুলোধুনো করছেন, ধরে নিচ্ছি তারাও আবুবাকারের পাঠক। তাহলে ফল দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের সকলশ্রেণির মানুষই আবুবাকারের সাহিত্যের রসাস্বাদন করেছেন।

কাসেম বিন আবুবাকার সচেতনভাবে জেনেবুঝে তার লেখায় যুগপৎ ইসলামী ভাবধারা প্রচারের পাশাপাশি অবাধ যৌনতাও পরিবেশন করেছেন। হালাল সাহিত্য রচনাকার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করবার প্রয়াস পেয়েছেন তিনি। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মুসলিম ধর্মীয় মূল্যবোধটাকে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীর মনোদৈহিক চাহিদার সাথে অঙ্গিভূত করেছেন। আবুবাকার মানুষের জন্য সাহিত্য চর্চা করতে চাননি, তার অভিপ্রায়ই ছিল মুসলমানদের জন্য চটুল সাহিত্য রচনা করে সেকেলে ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী পাঠকের মন জয় করা। তার রচিত উপন্যাসের নাম ফুটন্ত গোলাপ, বিলম্বিত বাসর, স্বপ্নে দেখা সেই মেয়েটি, অবশেষে মিলন, তোমারই জন্য, একটি ভ্রমর ৫টি ফুল ইত্যাদি। এসব উপন্যাসে, নায়িকারা বোরখা পড়ে ডেটিঙে যায় এবং বিসমিল্লাহ বলে নায়ক নায়িকার ঠোঁটে চুম্বন শুরু করে। বাসর রাতকে আল্লাহর অশেষ নিয়ামত বলে অভিহিত করে বাসর ঘরের পাত্র-পাত্রীরা। এ ব্যাপারে আবুবাকার নিজেও বলেন, আমি শুধু চেয়েছিলাম মানুষের চরিত্র গঠন করতে, আর তাই কোরান হাদিসের আলোকে চিরকাল মানুষকে মানুষের মতো করে তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে লিখে গেছি। যদিও আবুবাকারের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে বা তার উদ্দেশ্য এটাই ছিল একথা কিছুতেই বলা যায় না। তা হলে সারাদেশে এতো অযাচার-অনাচার থাকত না। আর মানুষকে মহত্তম হয়ে উঠবার জন্য মহত্তম শিল্পচর্চা করেছেন আবুবাকার এটা বোধ করবার কোনো কারণই নেই। তবে তিনি এটা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, আমাদের গণরুচি তবে এটাই এবং পাড়াগাঁয়ের মানুষের ‘আইডল’ হলেন গিয়ে এহেন আবুবাকার।

মুসলমানের দেশে যেভাবে সাহিত্য চর্চা করলে গ্রাম্য শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত মুসলমানের মন পাওয়া যাবে তিনি নিবিষ্ট মনে তাই করে গেছেন। সাহিত্য মানে যদি হয়, জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠ শিল্পসমন্বিত বাক্যবিন্যাস, তবে শিল্প না হলেও পাঠকের মন বুঝে লেখকের কাঙ্ক্ষিত বাক্যবিন্যাস সাজাতে যা করা দরকার তিনি তাই করবার চেষ্টা করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, এজন্য তিনি নাম যশ টাকা পয়সা চাননি। এখন বিশ্ব মিডিয়া যদি কোনো উদ্দেশ্যবাদী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্ররোচনায়ও আবুবাকারকে প্রমোট করে থাকেন, তাতে লেখকের জাত যায় না।
download-1-1

আবুবাকারকে নিয়ে তৈরি করা খবরে এএফপি বলছে, সেক্যুলার লেখকরা এমন এক দুনিয়ার গল্প বলেছে, যেখান থেকে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রধান অংশের গ্রামীণ ও ধর্মীয় জীবনের অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয়েছে। কাসেম এই শূন্যতার বিষয়টি অনুধাবন করে তার উপন্যাসের বাজার গড়ে তুলেছেন। কথাটা যে অসত্য তা প্রমাণ করবার সক্ষমতা কার আছে? ধর্মভিত্তিক গোঁড়া পাকিস্তানকে আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে বাংলাদেশ নামের মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ যে জাতিরাষ্ট্র বিনির্মাণ করবার প্রয়াস ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি ও বীর শহীদদের তার এক আনাও কি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে?  না হয়নি। কারণ এখানকার কুলীন সাহিত্যিক, শিল্পবোদ্ধারা অর্ধশতক ধরে গুটি কয়েক শহুরে মানুষের গল্প শুনিয়ে গেছেন, গান গেয়েছেন, কাব্য করেছেন।  অথচ সারাদেশে যে বিপুল সংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত কিশোর তরুণ ধর্মশিক্ষায় শিক্ষা নিচ্ছে, তাদের কথা শহুরে আর্য সাহিত্যিকদের লেখায় আসে না। কথায় কথায় বলেন, এদেশের মানুষ ধর্মভীরু, ধর্মান্ধ নয়। তাহলে সেই ধর্মভীরু প্রান্তিক মানুষের কথা আপনাদের লেখায় ওঠে আসেনি কেন? আপনারা গল্প উপন্যাসের চরিত্রদের হলুদ পাঞ্জাবি নীল শাড়ি পরান। আর দাঁড়ি টুপিওয়ালাদের কটাক্ষ করেন। কেন? কুলীন নামধারী আপনাদের কর্তৃক এভাবে গ্রামীণ ধার্মিক মানুষদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবার সুযোগে আবুবাকারের মতো কেউ যদি তার ‘স্পেস’ খোঁজে নিয়ে ধর্মান্ধতা, যৌনতা ও ভালোবাসার মিশেলে একধরণের ককটেল সাহিত্য উপস্থাপন করে পাঠকের মন জয় করে সেখানে দায়টা কার? যৌনতা তো ধর্মের বাইরে কিছু নয়। তাই যদি হতো, তবে তা পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হতো কি করে?

আবুবাকার জানেন, বাঙালি ফজর-মাগরিবের নামাজ যেমন পড়েন তেমনি চুটিয়ে পর্নও দেখেন, চটি পড়েন, ঘুষও খান। যেসব নাক উঁচু সাহিত্যিক ও সমালোচকরা বাঙালির এই চরিত্র জানেন না, তারা এবার আবুবাকারকে ছুড়ে না ফেলে ওস্তাদ মানেন। সমালোচনা করবার আগে নিজেদের ব্যর্থতার ঘায়ে আগে মলম দিন। একবার ভাবুন, দেশের মানুষকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ- নির্বিশেষে এক কাতারে কেন আনা গেল না? নারী ও মানবতাবিদ্বেষী হেফাজতের ১৩ দফা, মুরুব্বীর তেঁতুল তত্ত্ব এবং কাসেম বিন আবুবাকারের লেখনিই এখনকার বাংলাদেশ। আর এমন ধর্মগুরুরাই এখন রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য  অংশ। আবুবাকারদের মতো বুদ্ধিবাদীদের চিন্তন  ও চেতনাকে মাপকাঠি মেনেই দেশের পাঠ্যপুস্তক পর্যন্ত বদলে যাচ্ছে! ভুলে গেলে চলবে না যে, কাসেম বিন আবুবাকার যাদের আইডল এখনকার সেই যুবকরাই টুপি এবং যুবতীরা বোরখা পরে ফেসবুক ইউটিউব করে!

কাজেই যাদের সীমাবদ্ধ একপেশে গপ্প আর দায়বদ্ধতার নির্লিপ্ততায় সমাজ ও মানুষের এমন উল্টপথে চলন ঘটেছে তাদের মুখে আবুবাকার সিন্ড্রমের সমালোচনা শোভা পায় না। পাঠকের পাঠ নির্ধারণ করে দেয়ার আপনি কেউ না। আপনার কাজ মানুষের ‘সাবলাইম’ গল্প বলে গণমানুষের প্রিয়ভাজন হওয়া। সেটা করতে পারছেন কি?

প্রিয় সংস্কৃতি সেবক, মিডিয়ার অধিকর্তা, গর্বিত লেখক-সমালোচক এবার আপনাদের সময় এসেছে এটা ভাববার যে, ঢাকা শহরের ওপরতলায় বসে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত গিয়ে নিজের কুলীন দৃষ্টি আটকে দেবেন নাকি অন্তরচক্ষুটা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় বিস্তৃত করবেন। সমাজের দুষ্টক্ষতকে উপেক্ষা করে নয় ভালোবেসে তা সারাই করবার উদ্যোগ নিন। সাধারণ মানের একজন লেখক কাসেম বিন আবুবাকার যে দায়িত্বটি নিজের কাঁধে নিয়ে গ্রামীণ মানুষের আস্থাভাজন হলেন, সেই জায়গাটিতে আপনি প্রবেশ করে আপনার অসাধারণত্ব দেখান, মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তুলবার দায়িত্ব নিন। আপনার শিল্পভূমির চরিত্ররাও যদি টুপি বোরখা পরে তরুণ-তরুণীদের মহত্তম হয়ে ওঠবার স্বপ্ন দেখায় ক্ষতি কি? আপনার দৃষ্টিতে আবুবাকার যদি তার লেখায় রগরগে আদিরস ও ধর্মান্ধতা প্রকাশ করে পাঠককে বিভ্রান্ত করে থাকেন, তবে আপনার উচিতকর্ম হবে তারচেয়েও অধিকতর ইতিবাচক কিছু করা। দেশ, মানবতা ও আপামর মানুষের স্বার্থে সেটাই হবে ইসলামিক রোমান্স ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকারের লেখার প্রকৃষ্ট সমালোচনা।

লেখক: সংবাদকর্মী,  মাছরাঙা টেলিভিশন
০১ মে ২০১৭
facebook/fardeen.ferdous
twitter/fardeenferdous