ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

38

যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি সদয় নন, আল্লাহও তার প্রতি সদয় নন। তুমি যদি আল্লাহর সৃষ্ট জীবের প্রতি রহম কর, তবে আসমানে যিনি থাকেন তিনিও তোমার প্রতি রহম করবেন। এগুলো আমাদের মহানবী (সা)- এর বাণী!

একবার রাসূল (সা) কে জিজ্ঞাসা করা হলো:- ইয়া রাসূলুল্লাহ! সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ ব্যবহার পাওয়ার যোগ্য কে?

রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন:- তোমার বাবা-মা, তোমার ভাই-বোন এবং এর সাথে তোমার সেই খাদেম, যে তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন। এসব হচ্ছে ওয়াজিব হক।

নবীজি কাজের লোককে বলতেন খাদেম অর্থাৎ সেবক। নিজে যা খেতেন তা খাদেমকেও সহাস্যে খাওয়াতেন। সর্বোচ্চ সম্মান দিতেন। তো সেই নবীর অনুসারী হয়ে আমরা কি করছি?

আমাদের এক নিকটাত্মীয়কে জানি। স্বামী সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা। খুবই ধার্মিক। পাঁচওয়াক্ত নামাজ মিস করেন না। উনার গিন্নিটাও কম যান না। হিজাব পরেন। মুখ থেকে আল্লাহ রসূলের নাম সরে না। কিন্তু ওই ধার্মিক ম্যাডামের বাসায় পনের দিনের বেশি কোনো কাজের লোক টিকে না। সারাবছর কাজের লোক খুঁজতে খুঁজতে জামাই বাবাজি একদম জেরবার।

সমস্যা একটাই কাজের লোক বা গৃহকর্মী কিছুতেই মালকিনের কাছে রহম পায় না। চুন থেকে পান খসলেই বকাঝকা! রাগের মাত্রা বাড়লে খুন্তি-ছ্যাকাও বাদ যায় না। মালকিন যে চালের ভাত যে তরকারি দিয়ে খান তার স্বাদ কাজের মানুষটিরও চেখে দেখতে ইচ্ছে করে। রান্নাটা যে ওইই করে। কাজের লোকের কিছুতেই ইচ্ছে করে না মালকিনের আন্ডারক্লথ ওয়াশ করতে। কিন্তু ওকে রোজ তাই করতে হয়। (হোয়াইট হাউজে বিপুল সেবাকর্মীর সান্নিধ্যে থাকাকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাশুড়ি নিজের আন্ডারক্লথ নিজেই ওয়াশ করতেন)।

চোখের সামনে সবাই মাছের টুকরো খেয়ে ওর জন্য ঝুলটা রেখে দিলে প্রাণে আর কাহাতক সয়? অথচ কাজের লোকের জিহবাটাও আমাদের মতোই। ওর যে মন আছে সেই মনের সাথে আমাদের মনের কোনোই পার্থক্য নেই। মালিকের আচরণ প্রতিবন্ধীতায় ওরা যে কষ্ট পেতে পারে সেই ভাবনাটা মালিক ছাড়া কি অন্যকেউ ভেবে দেবে?

Greptar20151207053001

.

আমাদের ধর্ম কি এই শিক্ষা দেয়? নিজের সেবাকর্মীকে নির্যাতন না করে স্রেফ ভালোবাসা দিয়ে খুব সহজে যে শান্তির বেহেশতের সন্ধান পেতে পারতাম, সেই অধরা স্বর্গ খুঁজতে বকধার্মিক সেজে হিজাবের অন্ধকারে তলিয়ে গিয়ে নামাজের পেছনে দৌড়াতে হতো না! নামাজ তো সকল মন্দ কাজ দূর করবার কথা। নিজের সেবককে সকাল-সন্ধ্যা অত্যাচার করাটা মন্দ কাজ নয়?

আমার আরেক আত্মীয়কে জানি। যার কাছে অর্থটাই সব। ব্যাংকের ভল্টে টাকা জমা না রাখতে পারলে মাথাটা ঠিকঠাক কাজ করে না। বয়সজনিত কারণে শরীরে নানা অসুখ-বিসুখ বাসা বাঁধায় নিজে খুব বেশি কাজ করতে পারেন না। অথচ এই মানুষটির কাছেও কাজের লোক থাকতে চায় না। কারণ একটাই টাকা খরচ করে লোক রাখা হয় বলে সেই টাকা উসুল করতে কাজের মানুষের ওপর মাত্রাতিরিক্ত কাজের বুঝা চাপিয়ে দেয়া এই মানুষটির বাজে স্বভাব। অথচ নিজের এই সেবককে যদি ভালোবাসা দেয়া যেত, ব্যাংকের ভল্ট থেকে কিছু অর্থ ওর আর ওর পরিবারের জন্য ব্যয় করা যেত তবে খুশি হয়ে সব কাজ করে দিত।

সমাজে কত মানুষ আছে যারা নিজের খেয়ে বনের মেষ তাড়িয়েই আনন্দ পান। নিজের সমস্ত আয়-রোজগার এতিম, অসহায় বা বঞ্চিতজনের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করেন। বিনিময়ে কোনো প্রাপ্তির আশা করেন না। তারা লোকদেখানো ধর্মকর্ম নিয়েও মাথা ঘামান না। তবে অন্তরে প্রবল মানবীয় ধর্মবোধকেই লালন করেন। বিশ্বাস করেন, জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। এমন মানুষদের মনমানসিকতার ছিটেফোঁটাও আমাদের এই নিকটাত্মীয়দের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে না। নবীর কথা না মেনে নবীর ধর্মাচারী সাজার কোনো মানে আছে?

1420480_818899348131538_1922878458_n

.

শেষে আমার পূর্ণাঙ্গীনির কথাটাও কই। আহ্লাদী নামে উনার একজন মেইড সার্ভেন্ট আছে। ঈদে আহ্লাদী ১০দিনের ছুটি পেয়েছে। এ ক’দিন নিজের দুগ্ধপোষ্য শিশুর সেবা, পরিবারের সবার কাপড়-চোপর ওয়াশ, রান্নাবান্না নিজ হাতেই করছেন আমার গৃহলক্ষ্মী। আমাদের বয়সী মা যথাসাধ্য হেল্প করে চলেছেন। কষ্ট হলেও নিজ হাতে কাজ করায় সরকারি কলেজের শিক্ষক আমার বউয়ের জাত যায় না। আহ্লাদীর মেয়ে সোহাগী জন্ম থেকেই ডিফরেন্টলি এবল। আমাদেরকে সেবা দিয়ে যে টাকা পান তার অতিরিক্ত ৫শ টাকা দেয়া হয় ওই কন্যাটির নিয়মিত চিকিৎসা চালাতে হয় বলে। আমি প্রায়শ দেখি আমরা সকালে যে খাবার টেবিলে বসে খাই সেই টেবিলে বসেই আমাদের খাবারের অনুরূপ ব্রেকফাস্ট আহ্লাদীও করে। তারপরও বউ মনে করেন সেবা দেয়া মানুষটিকে যদি আরেকটু রেস্ট দেয়া যেত, মূল্যায়িত করা যেত যদি আরও বেশি!

নিজেদের কথা নিজে বললাম বলে যারপরনাই শর্মিন্দা হলাম বটে, কিন্তু যাদের জন্য বললাম সেই নিকটাত্মীয়দের কি একটু বোধোদয় হবে? শুধু নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে অন্য মানুষের প্রতি খানিকটা ভালোবাসা, কিঞ্চিত ঔদার্য প্রদর্শন করে দেখেনই না সুখের স্বর্গটা কেমন হাতের মুঠোয় চলে আসে। ভালোবাসার নামই তো আল্লাহ, ভগবান!

ফারদিন ফেরদৌস
সুখেরছায়া
০১ জুলাই ২০১৭