ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
Gulshan-Attack-Rabiul-Famil

জঙ্গিবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক হোলি আর্টিজান ট্রাজেডিতে প্রাণ দেয়া শহীদ পুলিশ অফিসার রবিউল করিম ওরফে রবি কামরুলের পরিবারের সাথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যা করে দেখাল তা রীতিমতো নৈতিকতার অধঃপতন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ব দর্শন ও চিন্তা-চেতনা লালন করবার কথা। মহৎপ্রাণের জয়গান করবার কথা। কিন্তু তাদের চিন্তা এখন বেশ আড়ষ্ট এবং গোলমেলে। সুষ্ঠু চিন্তা-চেতনাকে দমন করে রাখতে রাখতে অবদমিত চেতনাবাদিতায় রূপান্তর ঘটেছে তাদের। গাধার ঘোলাজল পানের সিন্ড্রমটা এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আষ্টেপৃষ্ঠে।

পত্রিকায় ফলাও করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারা ওই বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্র রবিউল করিমের স্ত্রীর সম্মানজনক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের জন্য রবি’র ত্যাগের কৃতজ্ঞতা জানাতে চান। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নিয়ম মেনে প্রথম শ্রেণির প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে আবেদন করে নিয়োগ পরীক্ষাও দিয়েছিলেন ভূগোল বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স পাশ রবি’র স্ত্রী উম্মে সালমা। কিন্তু চাকরি দেবার বেলায় গ্রন্থাগার অফিসে উচ্চমান সহকারী পদে মাস্টাররোলে দৈনিক ৫২৫ টাকা মজুরীতে ৯০ দিনের জন্য নিয়োগ দেয়া হলো। আর প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদটা কিনা দেয়া হলো বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন শিক্ষকের স্ত্রীকে।

াংোস
রবি’র পারিবারিক বন্ধু এবং মাছরাঙা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার নূর সিদ্দিকী সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি আমাদের নজরে আনলেন। প্রথম আলোর সাবেক সিনিয়র রিপোর্টার শরিফুল হাসানও তার ওয়ালে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদে সরব হলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন ন্যাক্কারজনক অবনমন দেখে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েটরা তীব্র প্রতিবাদ জানালাম। এমন প্রতিবাদের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ওঠা নিন্দার ঝড় সামাল দিতে না পেরে তরিঘড়ি করে উম্মে সালমাকে উচ্চমান সহকারী পদে নিয়োগের পরদিনই এডহক ভিত্তিতে শিক্ষা অফিসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োপত্র ইস্যু করলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম এ ব্যাপারে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘প্রার্থীর অভিজ্ঞতা না থাকলে সরাসরি প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়ার নিয়ম নেই। সে অনুযায়ী উম্মে সালমাকেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পরে এসি রবিউলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হলো।’ রবি’র প্রতি প্রশাসনের শ্রদ্ধাবোধটা ফিরল, সবার সমস্বর প্রতিবাদমুখর হওয়ার পর।

ততততততত
আমরা যারা বাইরে থাকি তারা প্রতিবাদে সরব না হওয়া পর্যন্ত জাবি প্রশাসনের মতিগতি ফেরে না কেন? আমাদের প্রশ্ন হলো, একজন চাকুরি প্রার্থী প্রশাসনিক অফিসার পদে ইন্টারভিউ দিয়ে মাস্টাররোলে উচ্চমান সহকারী পদে নিয়োগের অফার পান কি করে। তারওপর উম্মে সালমার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি অকালবিধবা; একজন জাতীয় বীরের স্ত্রী। এমন নয় যে, সালমা সরকারের দয়া-দাক্ষিণ্য না পেলে ছেলে সামি ও কন্যা রায়েনাকে নিয়ে পথে বসে যাবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের পারিবারিক অবস্থার সাথে পরিচিত বলেই জানি, যথেষ্ঠ বনেদী পরিবার ওঁদের। সালমার বাবা ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে অবসর জীবন যাপন করছেন। এমন এক কন্যা ও তাঁর সন্তানদের দেখভাল করবার মতো সামর্থ্য বাবা হিসেবে তাঁর যেমন রয়েছে, তেমনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রবি’র একমাত্র ভাই শামসুজ্জামান কিংবা ওঁর মাও সেই সক্ষমতা রাখেন। তবু আমরা চেয়েছিলাম, উম্মে সালমার নিজস্ব একটা সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। যাতে সন্তানকে রবি’র মতোই আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। রাষ্ট্রের কাছেই প্রশ্ন, আমাদের চাওয়া কি খুব বেশি ছিল?

এমন একটা প্রেক্ষিতে রবি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলেই সবার আগে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরই দায়িত্বটা বর্তায় রবি’র সন্তানদের সুরক্ষা দেয়ার। কিন্তু তারা যে কাজটি করে দেখাল তা রীতিমতো লজ্জার ও হতাশার।

াীবহহহহহ

বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮/৯ বছর শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময়ে সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিলাম বলেই জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ে কারা চাকরি-বাকরি পান, কিভাবে পান? বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণের চেয়েও আত্মীয়করণ বেশি। শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারিদের শ্যালক, ভাগ্নে ও মেয়ের জামাইয়ে ভরা পুরো প্রশাসন। এসএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত অনার্স ছাড়া সবটিতেই প্রথম শ্রেণি রয়েছে উম্মে সালমার। সেক্ষেত্রে কর্মকর্তা তো বটেই অনেক শিক্ষকের চেয়ে বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন তিনি। কিন্তু তাঁকেই কিনা অফার করা হলো মাস্টাররোলের রোজভিত্তিক কর্মচারির চাকরি। কেন? তিনি কি রাষ্ট্রের কাছে কোনো দয়া, করুণা বা দাক্ষিণ্য চেয়েছিলেন? তাঁর সন্তানের প্রয়াত বাবার অসীম ও অপূরণীয় ত্যাগই তাদের যথার্থ পাথেয়। ওদের জন্য কারো অনুকম্পা চাওয়ার তো প্রশ্ন ওঠে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের আলো বাতাসে যারা রোজ পরিপুষ্ট হন। সবুজের মুগ্ধতায় অবুঝ থাকেন, তাদের কাছ থেকে এমন অন্যায্যতার কোনো প্রতিবাদ আসে না। আসবেই বা কিভাবে? তারা শুধু আন্দোলন করতে জানেন নিজের আখের গোছানোর ইস্যুতে। দেশাত্ববোধ, মানবীয় চিন্তাচেতনা তারা গিলে খেয়ে ফেলেছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো নীতিবাদী চাপপ্রয়োগকারী গোষ্ঠী গড়ে ওঠেনি। এই সুযোগে প্রশাসন দিন দিন মতিভ্রমটাকেই ভালো আত্মস্থ করে চলেছে। তারা মানুষকে সম্মানিত করবার প্রচারণা করে অপদস্ত করবার দুঃসাহস দেখাতে পারে। প্রতারণা, শঠতা আর ভন্ডামিটাই এখন তাদের কাছে ডালভাত। জাতির সাথে, মানুষের সাথে এবং একজন বীরের পরিবারের সাথে এমনতর স্থূল মশকরাটা না করলে কি চলত না নির্বোধ প্রশাসন?

13528914_10154182535226328_3226070596431057874_n
রবি কামরুল এমন একজন মানুষ যিনি তাঁর স্বল্পকালীন জীবদ্দশাতেই নিজের গ্রামে ‘ব্লুমস’ নামে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য একটি বিশেষায়িত ইশকুল প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। যেখানে সমাজের অবহেলিত শিশুরা পড়াশোনা করে নিজেদেরকে আলোকিত করবার সুযোগ পায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলাম আপনার কাছে একটা আবদার থাকল আমাদের। রবি’র মতো করে ওই বয়সে এমন একটা ইশকুল আপনি প্রতিষ্ঠা করবার স্বপ্নটা দেখতে পারতেন তো? পারতেন তো ভালো। না পারলে বলবো, রবি যে মানবিকতার আলোয় আলোকিত। সেই আলোকিত চেতনাকে অসম্মান করবার কোনো অধিকার আপনাদের ছিল কি?

আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য, যারা জাহাঙ্গীরনগরকে হৃদয়ে ধারণ করে চোখে চোখে রাখি তাদের সরব প্রতিবাদে যথাসময়ে আপনাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। এজন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। বাবার শূণ্যতা থাকা সত্ত্বেও আপনাদের বদান্যতায় সামি ও রায়েনা একটি সুস্থির জীবন পাবে। বাবার দেখানো পথধরে হেঁটে চলবে ওরা। আমাদের হার্দিক চাওয়া তো এটাই। রবিও নিশ্চয় আজ খুব খুশি! শিশু সন্তানদের নিয়ে উম্মে সালমা এখন জীবনযুদ্ধটা লড়তে পারবেন রাষ্ট্রকে পাশে নিয়ে রাষ্ট্রকে সেবা দিয়ে। যে সম্মাননা প্রদানের মধ্যে এত ঘোরপ্যাঁচ থাকে, হীনমানসিকতা থাকে আর চিন্তার অবদমন থাকে সেই মার্যাদাদানে আপনারা ধন্যবাদার্হ হবেন কি করে? তবু সাধুবাদ জানাই সঠিক সিদ্ধান্তগ্রহণের জন্য।

পাদটীকাঃ রবি’র মতো পুলিশের এসিট্যান্ট কমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা যখন কর্তব্যরত অবস্থায় মারা যান, রাষ্ট্রের কাছে বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত হোন, সেই বীরের পরিবারের জন্য ঐ বাহিনীর পক্ষ থেকে কিছু করবার থাকে না? প্রিয় পুলিশপ্রধান এ কে এম শহীদুল হক আপনার কাছেই জিজ্ঞাসা, সামি, রায়েনা বা উম্মে সালমার জন্য আপনারা আসলে কি করছেন? আমরা রবি’র বন্ধুরা তবু জাহাঙ্গীরনগরকে তাদের দায়িত্ব ও বোধের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিতে পারলাম। আমরা তো ভেবেছিলাম, জাবি প্রশাসনের অসম্মানের মুখে প্রথম শ্রেণির একখানা চাকরি আপনারা উম্মে সালমার হাতে তুলে দিয়ে বীরের পরিবারকে সম্মানিত করবেন! কিন্তু তা কেন হলো না, কেন হয় না?

আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম ও তাঁর সভাসদদেরকে কৃতজ্ঞতা ও অভিবাদন জানাই এজন্য যে, তাঁরা আমাদের সম্মিলিত চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে সময়োচিত সিদ্ধান্তগ্রহণের মাধ্যমে রবি’র সন্তানদের জাহাঙ্গীরনগরের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠবার সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনারা জাবিয়ান রবিকে সম্মানিত করে প্রকারন্তরে জাহাঙ্গীরনগরকে, আমাদেরকে এবং নিজেদেরকেই গৌরবান্বিত করলেন।

লেখকঃ রবি কামরুলে’র সহপাঠী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট
০৭ জুলাই ২০১৭