ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দারিদ্রপীড়িত প্রত্যন্ত এক গ্রামে আমার জন্ম। চাকরি করি পূর্বাঞ্চলে, পাঁচশ’ কিলোমিটার দূরে। ফলে যা হয় আরকি, গ্রামের জন্য মন কাঁদে, কিন্তু সচরাচর যাওয়া হয় না।

’৯০ দশকের শুরুতে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা শুরু হয়েছিল এবং তার ফলে দেশের তথাকথিত উন্নয়ন যেভাবে এগিয়েছে, নিভৃত পল্লীও এর বাইরে থাকেনি। পল্লী উন্নয়ন নিয়ে কাজ করি; সুতরাং আমি এ অস্থিরতার জলজ্যান্ত সাক্ষি। অনেক দিন পর গ্রামে যাচ্ছি। আখের ক্ষেত টানছে। শুকনো-প্রায় বিলের তাজা মাছের আঁশটে গন্ধ টানছে। বাবা-মার মুখ টানছে। কিন্তু বাসযাত্রা সীমাহীন; বাংলাদেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। ঈদের রাস্তার হাল নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। মানুষের ঢল যেন পিঁপড়ার সারি! মনে আছে, সে বার সিনকাঞ্চেন (বুলেট ট্রেন) মাত্র একঘণ্টায় আমাকে ওসাকা থেকে হিরোশিমায় পৌঁছে দিয়েছিল, প্রায় তিনশ’ কিলোমিটার বেগে। এবার পাঁচশ’ কিলোমিটার চলেছি দু’দিন ধরে। সাথে বউ-বাচ্চা রয়েছে। নাকাল অবস্থা।

অবশেষে কুমারখালী বাসস্ট্যান্ডে নামলাম। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ; যদিও মোবাইলের স্ক্রিনে তখন মধ্যরাত এবং বাড়ি আরও চার কিলোমিটার দূরে। বাবা-মা বার বার ফোন করছে, কিভাবে পৌঁছুবো! রিক্সা-ভ্যান বা অটো-নসিমন কিছু পাব তো! কিন্তু বাসস্ট্যান্ড তখনও রমরম করছে। ভাল লাগল। ১২০ টাকায় এক অটোচালক রাজি হয়ে গেল; যদিও দুশ’ দিতেও আমি ভীত ছিলাম না!

রাত্রির আকাশ দিগন্ত জুড়ে জোছনা ঢেলে চলেছে। মৃদু শীতল বাতাস। হঠাৎ মাথার ভেতরটা ফুরফুরে হয়ে গেল। এই তো আমার গ্রাম! অটোচালককে জিজ্ঞেস করলাম, এত রাতে অজগাঁয়ের রাস্তায় গাড়ি চালাতে ভয় লাগছে না? উচ্ছ্বসিত জবাব দিল সে। ভাই, সবগুলা শ্যাষ! এখন কোন সমস্যা নাই।

রাতে খেতে বসেছি। অস্বাভাবিক বড় মাছের টুকরো। কৌতুহলী চোখে মায়ের দিকে তাকাই। অন্ততঃ তিন মাস ধরে এই জিনিস ফ্রিজে সংরক্ষিত ছিল, আমার জন্য! আহা! চোখ জলে ভ’রে ওঠে কেন! মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা চুরমার করে হাইভোল্টেজ সাউন্ডে হিন্দি গানের সুর ভেসে আসছে কাছের মন্দির থেকে। কাল দশমী। মা জানালো, ঐ মন্দিরে পাশাপাশি দুটো পুজো চলছে। ওরা যখন দরিদ্র ছিল, মিলেমিশে একটাই পুজা করত। এখন টাকা হয়েছে, দারিদ্র গেছে। সাথে নিয়ে গেছে সম্প্রীতিটুকু। অস্থির সমাজ বুঝি এমনই হয়!

ঈদের নামাজ শেষ করে যথারীতি কুরবানী। বড় কষ্টকর কাজ। অনেক সময় লাগে। অনেকের সাহায্য দরকার হয়। সাত বছরের রুবাই ভীষণ উৎসাহিত। কিন্তু আমি নার্ভাস ধাতের মানুষ। রক্তপাত দেখতে পারি না।

ছোটবেলা থেকেই দেখছি, মাংস বিতরণের জন্য আব্বা আগে থেকেই তালিকা তৈরী রাখে। দরিদ্র মানুষের মুখগুলো খুব চেনা। ফি বছর একই, অপরিবর্তনীয়। সব শেষ হলে খবরের কাগজে মুড়ে ছোট ছোট পুটলি বেতের ধামায় করে এবাড়ি-ওবাড়ি দিয়ে আসতাম। বাকিরা বিকেলে আসত। বাইরের দরজায় কড়া নাড়িয়ে উচ্চস্বরে ডাকত, চাচা! ভাই! আমার গোস্তটুকু…! মা একেকজনকে পুটলি দিচ্ছে, আর আব্বা তালিকায় একটা করে নাম কাটছে। তালিকার বাইরে কোন লোক নেই। মাংসের কোন পুটলিও পড়ে নেই। এই ছিল আমার শৈশব, কৈশর, বেড়ে ওঠার, তারুণ্যের চিরচেনা বার্ষিক উৎসব। স্থির সমাজ, স্থির জীবন। সবকিছু অপরিবর্তনীয়।

কিন্তু এবার সব অন্যরকম। মানুষ আসছেই, সারাদিন ধরেই আসছে! ছেলে-বুড়ো, মা-মেয়ে, ভাই-বোন। নানান বয়সের মানুষ। অসংখ্য। অচেনা মুখ। হাতে বড় পলিব্যাগ। ‘গোস্ত দাও, আমাকে গোস্ত দাও!’ বিকেলে যখন মাংস আর অবশেষ নেই, মায়ের নিজের অংশটুকুও নিঃশেষ-প্রায়, তখনও আসছে। তারা ভীষণ রিএ্যাক্ট করছে! মুখ ফসকে দু’একজন বেয়াদপিও করে ফেলছে নির্দিধায়। ‘আমি সকালে এসে বলে গেলাম, আমার গোস্ত কেন রেখে দিলে না!’ আমি অনেকের নাম-ধাম জিজ্ঞেস করি। কেউ দূরের নয়। গ্রামেরই। হয়তো অন্য পাড়ার, হয়তো পাশের গ্রামের।

আমি মিলাতে পারি না। গ্রামের মানুষের আত্মসম্মানবোধ প্রবল, তীক্ষ্ণ। আমি বিশ্বাস করি, ক’টুকরো মাংসের জন্য তারা মানুষের বাড়িতে ভিক্ষা চাইতে আসতে পারে না। কিন্তু এরা কারা? কোন ফাঁকে এদের উদ্ভব হলো! আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গরিবানা হালের মধ্যেও গর্ব করার মত। এরা বেষ্টনীর বাইরে থেকে গেল কিভাবে? অল্প বয়সী যারা, তারা কেন আসছে এমন মিসকিনের দলে! ওদের আত্মসম্মানবোধ কোথায় গেল?

তাহলে কি সত্যিই ভেঙ্গে পড়ছে সবকিছু!