ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

শাহানার কথা মনে আছে?

শাহানা।

নিজের একমাত্র দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে ঘরে রেখে কাজে গিয়েছিলেন। শাহানা স্বামী পরিত্যাক্তা ছিলেন। স্বপ্ন দেখেছিলেন ঘাম বিকিয়ে অর্থ কিনে সেই অর্থে মানুষ বানাবেন নিজের রক্তেগড়া সন্তানকে।

মাতৃস্নেহের মূর্ত প্রতীক শাহানা অনেক সাহসী মা ছিলেন। শাহানা সাহসী হয়েছিলেন সন্তানের জন্য। আমরা তার বাৎসল্যের মূল্য দিতে পারি নি।

জানিনা আজ শাহানার সন্তানটি কোথায়-কেমন আছে?

জানি না সন্তানের জন্য শাহানার ত্যাগের কথা সন্তানটি জানে কি না? তাকে কেউ জানিয়েছে কিনা? অথবা সেও শাহানার মত অভিমান করে চলে গেছে কিনা – এই স্বার্থপর পৃথিবী ছেড়ে!

বোন শাহানা- মা শাহানার কথা আজ বড্ড বেশি মনকে খোঁচা দেয়, আঘাত করে। অসহায় চোখের জল বাধ মানে না, মনে পড়ে যখন শাহানার আশার কথা; সন্তানের প্রতি শাহানার ভালোবাসার কথা। সন্তানকে ঘিরে তার স্বপ্নের কথা।

সত্যি মা তো এমনই হয় – যেমন ছিল শাহানা।

শাহানা সেদিন চেয়েছিল শুধু নিজে বাচতে নয় বরং সন্তান। সন্তানকে বড় মানুষ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন।

গর্ভের সন্তান তো! দশ মাস যাকে পেটে ধরে জন্ম দিয়েছেন- মা হয়ে তাকে তো আর ফেলে দিতে পারেন না! চেয়েছিলেন নিজের জন্য নয়, সন্তানের জন্য- সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজে বাঁচতে- নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে।

শাহানার শরীরটা ভারী ছিলো কিনা আমার জানা নেই। তবে যেটুকু পথ তাকে বেড় করার জন্য উদ্ধারকারীরা খুঁজে পেয়েছিলো- তা ছিল নিতান্ত সরু। সেই সরু পথ দিয়ে শাহানাকে বেড় করে আনার কী চেষ্টাটাই না সেদিন করেছিল উদ্ধারকারীরা!

গায়ে তার শ্যাম্পু মাখানো হয়েছিল- যাতে পিচ্ছিলতা তৈরী হয়। না তবুও পারা যায়নি সেই পথ দিয়ে শাহানাকে বেড় করে আনতে।

অগত্যা, সব চেষ্টা যখন বৃথা- তখন উদ্ধারকারীরা প্রস্তাব করেছিলেন “মা তোমার শরীরটা ও সরু পথ দিয়ে বেড় করে আনতে গেলে বুক দুটি কেটে ফেলতে হবে। তুমি রাজি হও মা।”

মা শাহানা সেদিন রাজি হয়নি। শাহানা ভেবেছিলেন সন্তানের কথা।

শাহানা বলেছিলেন “আমার বুক কাটলে আমার ছেলে খাবে কী ? ছেলে যে আমার এখন ও বুকের দুধ খায়! আমি ওকে কী খাইয়ে বাঁচাবো!”

নিশ্চিত মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়ে সন্তানের কথা ভেবে যে মা বুক কেটে বেড় হতে রাজি হয় নি; তাঁকে আমরা বাঁচাতে পারি নি। আমরা সেদিন হারিয়েছি একজন নিবেদিতপ্রাণ উদ্ধাকারীকেও।

২৪ এপ্রিল সেই বিভীষিকাময় দিন। যেদিন রচিত হয়েছিল রক্ত বেচে অর্থ কিনে যাদের জীবিকা চলে, রানা প্লাজা নামক মৃত্যুকূপে – সেই সব মেহনতি শ্রমিকের হত্যামিছিল।

 

গৌতম হালদার