ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

খুব সাধারণ স্বপ্নবাজ মানুষও একটি সুন্দর ঘর আর জীবনের কথা ভাবে। আমরা সকলেই চাই পরিকল্পিত সুন্দর আর স্বপ্নের সমান্তরাল জীবন। আর সে কারণে আমাদের মতো দেশে আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনে সবক্ষেত্রে আইন দরকার। এটা স্বাভাবিক।

গত ২১ মার্চ ২০১৭ তারিখের খবরের কাগজে দেখলাম, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন- ২০১৭ নামের আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নিঃসন্দেহে এটিকে ভালো বলা যায়। সরকারের এ উদ্যোগ প্রশংসারও দাবি রাখে। সেই সাথে একটি বিষয় মনে আসে। আর সে কারণে উদ্বেগ লাগাটা অস্বাভাবিক নয়।

প্রস্তাবিত এ আইন অনুসারে, এখন থেকে নিজের ইচ্ছামতো কোনো ভূমিতে বাড়ি নির্মাণ বা অন্য কোনো উন্নয়ন করতে মতো চাইলেই তা আর পারা যাবে না। এর জন্য সরকার-নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র বা অনুমোদন নিতে হবে। শুধু গ্রামেই নয়, উন্নয়নকাজে দেশের যেকোনো জায়গায় ভূমি ব্যবহার করতে হলে সরকারি কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র লাগবে।

02_Padma-Bridge_Construction_020115_0040

নতুন করা নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইনে বলা আছে, এটি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হবে। বোঝাই যাচ্ছে, আমাদের দেশে ভূমি নিয়ে যা হয়, কেউ ডাকাত দস্যু এসব বনে যাওয়ার কারণেই সরকার এ আইন করাকে যুক্তিসংগত মনে করেছে। অর্থাৎ সারা দেশে ভূমি ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনার জন্যই এ আইন করা হচ্ছে। আইনটির

মূল উদ্দেশ্য হলো যেখানে সেখানে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট বা অন্য কোনো নির্মাণকাজ করা যাবে না।  সুন্দর চিন্তার নির্ভেজাল জনসাধারণের এ আইনে খুশি হওয়ার কথা। এ আইনের উদ্দেশ্য খুব ভালো; কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা জানি, আইনের বাস্তবায়ন এদেশে কতটুকু এবং কেমন। আর আইন প্রয়োগে কী হয়, কার লাভ হয় আর কার ক্ষতি হয় তা সবাই জানেন। সোজা কথায়, এখনকার অবস্থায় আইন বাস্তবায়নে সাধারণ মানুষের হয়রানি বাড়ে। সেজন্যে আইন হবে না তা নয়, কিন্তু সেই সাথে  মানুষের হয়রানি যেন না হয়,  সেদিকে নজর  দিতে হবে। এ ছাড়া এই আইন বাস্তবায়নে সরকারকে বেশ কিছু পদক্ষেপও নিতে হবে। তা না হলে, উদ্দেশ্য কার্যত সফল হবে না।

প্রস্তাবিত নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন- ২০১৭ অনুযায়ী,  সংশ্লিষ্ট কাজগুলো বাস্তবায়নে দুটি কেন্দ্রীয় পরিষদ কাজ করবে। এর  মধ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২৭ সদস্যের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা  উপদেষ্টা এবং একই মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে ২৫ সদস্যের নির্বাহী পরিষদ  থাকবে। দুই কমিটিতেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিশেষজ্ঞরাও থাকবেন। উপদেষ্টা পরিষদ মূলত নীতিনির্ধারণী কাজগুলো করবে এবং উপদেষ্টা পরিষদের কাজ বাস্তবায়ন করবে নির্বাহী পরিষদ।

আইনের খসড়ায় উপদেষ্টা পরিষদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, পরিষদ ছাড়পত্র প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতা দিতে পারবে। এ কাজে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষসহ সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ এবং ভবিষ্যতে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্দেশিত সংস্থা নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা এবং ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা প্রণয়নকারী সংস্থা দায়িত্ব পালন করবে। এজন্য ছাড়পত্র নিতে ঢাকার বাইরের কাউকে ঢাকায় আসতে হবে না।

বর্তমানে ভূমি উন্নয়ন কাজের জন্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। বোঝাই যাচ্ছে  এখন এটিকে একটি আইনি কাঠামোয় নিয়ে আসা হয়েছে। জমির ধরন অনুযায়ী স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র দেবে। কিন্তু চিন্তার ব্যাপারটা সেখানেই। আমরা সামান্য কিছু সুবিধা পেতে কী পরিমাণ ভোগান্তি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাই তা ভুক্তভোগীরা ভালোই জানি। এবার সেটিকে ঘর বানানোর ক্ষেত্রেও নিয়ে যাওয়া হলো। আর গ্রামের সাধারণ স্বল্পশিক্ষিত মানুষ সেটার শিকার হবেন বেশি। যার লাভ, তাদের তা হয়ে যাবে। আর যারা ভূমি নিয়ে বিভিন্ন কেচ্ছার জন্ম দেন, আইন তাদের নাগাল পাবে তো?