ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

pix

(ছবিঃ গুগল ইমেজ থেকে সংগৃহীত)

মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স এর বিমান- ফ্লাইট এমএইচ ৩৭০ এর হারিয়ে যাবার তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল তল্লাশি অভিযানের পর অনেকটা ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে অনুসন্ধানকারীরা খোঁজাখুঁজির কাজটা সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন মার্চের শুরুতে। বিমানটির হারিয়ে যাওয়ার লক্ষণ থেকে মনে হচ্ছে এটিও এক দীর্ঘমেয়াদী রহস্যের জন্ম দিতে যাচ্ছে।

এর আগে বিমান হারিয়ে যাবার সবচেয়ে রহস্যজনক ঘটনাটি ঘটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার ঠিক পর পর। ১৯৪৫ সালের ৫ ডিসেম্বর ইউ এস নেভির ৫ টি এ্যাভেঞ্জার টর্পেডো বোম্বার বিমান প্রশিক্ষন ফ্লাইটে গেলে ফ্লাইট কমান্ডারের বিমানের কম্পাসে ত্রুটি দেখা দেয়। তিনি সমস্যাটি কন্ট্রোল টাওয়ারকে অবহিত করেন। এরপর কোন রকম বিপদ সংকেত প্রেরন করা ছাড়াই সবগুলো বিমান একসাথে হারিয়ে যায়। বহুদিন গবেষণার পর তদন্তকারীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে রাডার থেকে প্রাপ্ত স্বয়ংক্রিয় তথ্যে এমন কোন ভুল ছিল যা বিমানগুলোকে ফিরে আসার সঠিক নির্দেশনা দেওয়ার পরিবর্তে বিপরীত দিকে চালিত করেছে এবং নেভিগেশন এলাকার বাইরে নিয়ে গেছে। ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জ্বালানি নিঃশেষ হবার কারণে বারমুডার কাছাকাছি আটলান্টিকে ডুবে গেছে বিমানগুলো।

এটা আজ থেকে সাত দশকেরও আগের কথা। প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতার কারণে তখনকার দিনে এরকম একটা দুর্ঘটনা খুব বেশি অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু আজকের দিনে জলজ্যান্ত একটা বিমান হারিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। ওবামা প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তার অভিষেক অনুষ্ঠানের একটা ছবি তোলা হয়েছিল। দাবি করা হয় যে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ১ মিলিয়ন লোকের প্রত্যেককে ঐ ছবি থেকে আলাদা করে চেনা সম্ভব। এমনকি নেমপ্লেটে লেখা তাদের নামও পড়া সম্ভব। যতদূর মনে আছে ছবি তোলার কাজে যে ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছিল তার রেজুলেশন ছিল ১৪৭৪ মেগা পিক্সেল। আকাশে ভাসমান সক্রিয় প্রায় ১০০০ কৃত্রিম উপগ্রহের নজরদারিতে আছে (উত্তর ও দক্ষিন মেরুর কিছু এলাকা বাদে) পৃথিবীর সমগ্র জল ও স্থলভাগ। আকাশে উড্ডয়নরত যে কোন বিমানের পাইলট এখন অটোমেটেড বিল্ট ইন ডিভাইস এর সাহায্যে বিমানটির দ্রাঘিমা এবং অক্ষাংশগত অবস্থান, জ্বালানি তেলের মজুত, কেবিন প্রেসার, বাইরের বায়ু চাপ, বায়ু প্রবাহের কৌণিক গতি, ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা, নিকটতম বিমানবন্দরের দুরত্ত্ব, ঝঞ্ঝাপূর্ণ এলাকার (যদি থাকে)অবস্থান, ঐ রুটে চলাচলকারী অন্য বিমানের অবস্থান সহ সকল প্রয়োজনীয় তথ্য  নিখুঁতভাবে জানতে পারেন। আবার এই সবগুলো তথ্যই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিকটতম বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রন কক্ষে প্রেরিত হতে থাকে। বিমানের কোন অংশে বাইরের আঘাত জনিত ক্ষত বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে ককপিটে বসে পাইলট যেমন জানতে পারেন, একইভাবে নিয়ন্ত্রন কক্ষে দায়িত্বরত ব্যক্তিটিও তা সাথে সাথে জেনে যান। ফলে দুর্ঘটনা পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও দুর্ঘটনা ঘটে যাবার পর কারণ নির্ণয় এখন আর কোন কঠিন কাজ নয়। তবে সন্দেহ নেই এম এইচ ৩৭০ এ বিষয়ে অনেকদিন পর একটা সত্যিকার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।

দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানকে বিবেচনায় নিলে নিরাপত্তা সূচকে হারিয়ে যাওয়া বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর উড়োজাহাজের অবস্থান তৃতীয়। প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে এয়ারবাস এ ৩৩০ এবং এয়ারবাস এ ৩৪০। তবে নির্মাণকালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহারকে হিসেবে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বোয়িং ৭৭৭-কেই এ যাবতকাল নির্মিত সবচেয়ে নিরাপদ বিমান হিসেবে মনে করছেন। এটাই হল পৃথিবীর প্রথম সম্পূর্ণ কম্পিউটার নকশাকৃত বিমান যা ১৯৯৫ সালে বানিজ্যিক উড্ডয়ন শুরু করে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬০ টি এয়ারলাইনস, মোট ১৫৪৮ টি ‘বোয়িং ৭৭৭’ কেনার অর্ডার দিয়েছে; যার মধ্যে ইতোমধ্যে ১১৭৮ টি সরবরাহ করা হয়েছে। বড় আকৃতির বিমানের চাহিদা এবং বিক্রির ক্ষেত্রে বিগত ১৮ বছরে এটাই সর্বোচ্চ সূচক। বোয়িং ৭৭৭-র এটা ছিল দ্বিতীয় দুর্ঘটনা। এর আগে ২০১৩ সালের ৬ জুলাই একটি বোয়িং ৭৭৭ সানফ্রানসিসকো বিমানবন্দরে অবতরনের সময় পাইলটের অদক্ষতায় সানফ্রানসিসকো বে-র সীমানা প্রাচীরের সাথে ধাক্কা খেয়ে রানওয়েতে বিধ্বস্ত হলে তিনজন যাত্রী নিহত হন। ২০১৪-র ১৭ জুলাই ইউক্রেন –রাশিয়া সীমান্তে অজ্ঞাত পক্ষের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের আর একটা ৭৭৭ বিধ্বস্ত হলে ২৮৩ যাত্রী এবং ১৫ জন ক্রু-র সবাই মারা যায়।

ফ্লাইট এম এইচ ৩৭০ এর ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানা যাচ্ছে না; এমনকি এ নিয়ে জোর কোন অনুমানও নাই। বিষয়টি শুধু অস্বাভাবিকই নয়, চরম বিস্ময়করও বটে। ঘটনাক্রমটা মোটামুটি এরকমঃ ফ্লাইট এম এইচ ৩৭০ কুয়ালালামপুর থেকে ৮ মার্চ স্থানীয় সময় রাত ১২টা ৪১ মিনিটে ২৩৯ জন যাত্রী ও ক্রু সমেত বেইজিং এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে এবং এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে মালয়েশিয়ান এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এসময় বিমানটি ভিয়েতনামের চিয়া মাও পেনিনসুলার পাশে দক্ষিন চীন সমুদ্রের ওপর থাকার কথা। প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া হয়েছিল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবার মুহূর্তেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। তাই প্রথম অনুসন্ধান অভিযানটি চালানো হয় এই অঞ্চলেই। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ান সামরিক রাডার তথ্য দেয় যে বিমানটিকে ফুকেটের দক্ষিনে মালাক্কা প্রনালীর পাশ দিয়ে উড়তে দেখা গেছে। ফলে অনুসন্ধান এলাকা আন্দামান সাগর এবং দক্ষিন বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়।

এক সপ্তাহ খোঁজাখুঁজি করার পর অনুসন্ধানকারীরা যখন মোটামুটি নিশ্চিত হন যে বিমানটি এই এলাকায় বিধ্বস্ত হয়নি তখন তাদের কাছে নতুন খবর আসে। ভারত মহাসাগরের ওপর ভাসমান একটি অস্ট্রেলীয় কৃত্রিম উপগ্রহ কর্তৃক সংগৃহীত উপাত্ত থেকে তারা নিশ্চিত হন যে অদৃশ্য হয়ে যাবার সাত ঘন্টা পর কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে যোগাযোগ না থাকলেও বিমানটির স্বয়ংক্রিয় ডাটা বিনিময় ব্যবস্থা চালু ছিল। এবং বিমানটি থাইল্যান্ড এবং কাজাকাস্থানের মধ্যবর্তী করিডোর দিয়ে উত্তর দিকে উড়ে গেছে অথবা ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিন ভারত মহাসাগরের করিডোর ধরে দক্ষিনে চলে গেছে। তবে উত্তরে যাবার সম্ভাবনা খুবই কম একারনে যে তাতে সেটা কয়েকটি দেশের রাডারে ধরা পরার কথা। এই বিমানের ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক জেনারেল ইলেক্ট্রিক এভিয়েশনের সদর দপ্তরে চালু অবস্থায় সকল বিমানের ইঞ্জিন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাটা পৌঁছে যায়। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী হারিয়ে যাবার পরও বিমানটির ইঞ্জিন পরবর্তী সাত ঘন্টা ত্রুটিমুক্ত এবং স্বাভাবিকভাবে চালু ছিল। সবদিক বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টরা দক্ষিন ভারত মহাসাগরকেই বিমানটি অনুসন্ধানের উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেন। তিন বছর অনুসন্ধানের পরও কোন অগ্রগতি নেই এবং তারা ন্যুনতম সূত্রের সন্ধানও পাননি।

বিমানটি ছিনতাই হয়ে থাকলে কোথাও অবতরন করত। ছিনতাইয়ের পর বিধ্বস্ত হলে মুল হোতারা এর কৃতিত্ব দাবি করার কথা। যান্ত্রিক গোলযোগে ধ্বংস হলে ধ্বংসাবশেষ না পাবার কারন নেই। কোথাও নিরাপদে অবতরন করে থাকলে এতদিন সেটা গোপন থাকার কথা নয়। বিমানটিতে দূর নিয়ন্ত্রণের সাহায্যে চালানোর প্রযুক্তি সংযোজিত ছিল। কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কি ভুমিতে বসে এটার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল? সেক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন দেখা দেয়- এর ধ্বংসাবশেষ গেল কোথায়? ১৯৭২-র অক্টোবরে আন্দিজ পর্বতমালায় বিধ্বস্ত উরুগুয়ের বিমান ফ্লাইট ৫৭১-র মত কোন বরফাচ্ছাদিত পাহাড়ের দুর্গম খাদে গিয়ে কি অবতরন করেছে বিমানটি ? (এ নিয়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত “জীবন যেখানে যেমন” আর্টিকেলটির কথা অনেকের মনে থাকার কথা।) ঘটনাটা আসলে কী ?

উড্ডয়ন নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন এমন একজন ভারতীয় বিশেষজ্ঞের একটা নিবন্ধ ২০১৪-র মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে হিন্দুস্তান টাইমস –এ প্রকাশিত হয়েছিল। তার ধারনা বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে হতাশাগ্রস্থ পাইলট জাহিরি আহমাদ আত্মঘাতী হয়ে এ কাজটি করে থাকতে পারেন; যেভাবে ১৯৯৯ সালে মিশরীয় এয়ারলাইন্সের এক পাইলট ২১৭ জন যাত্রী সমেত যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ডে আছড়ে পড়েছিলেন। ঐ নিবন্ধে বলা হয়েছে, রাত ১টা ০৭ মিনিটে প্রথম বার্তাটি পাঠানোর পর কো পাইলট টয়লেটে গেলে জাহিরি ককপিটের দরজা বন্ধ করে দেন এবং ১ টা ১৯ মিনিটে দ্বিতীয় বার্তাটি (গুড নাইট। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস থ্রি সেভেন জিরো)পাঠান। মাত্র ১২ মিনিটের মাথায় আবার একটা বার্তা পাঠানোর দরকার ছিল না; বিশেষ করে সেখানে যখন কোন নতুন নির্দেশনা বা প্রয়োজনীয় কোন তথ্য নাই। এরপর তিনি বিমানের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেন। তখন কাছাকাছি অবস্থানকারী একটা বিমানের পাইলট ভিয়েতনামিজ এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের নির্দেশের প্রেক্ষিতে ৩৭০-র ককপিটে জাহিরির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তিনি শুধু কিছু অস্পষ্ট কথা (তার ভাষায় মাম্বলিং) শুনতে পেয়েছিলেন। এরপর বিমানের দ্বিতীয় ট্রান্সপন্ডারটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে প্যালেস্টাইনী গেরিলারা তেলাআবিভ থেকে এয়ার ফ্রান্সের একটা  বিমান ছিনতাই করে এন্টেবি নিয়ে যায়। সেটা উদ্ধারে অভিযানে যাবার সময় ইসরাইলী কমান্ডোরা মিসর, সুদান এবং সৌদি আরবের রাডার ফাঁকি দিয়ে ২৫০০ মাইল দূরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছেছিল এবং সফল অভাযান শেষে নিরাপদে ফিরে এসেছিল। লোহিত সাগরের ওপর দিয়ে ওড়ার সময় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বিমানগুলোর উচ্চতা ছিল সর্বাধিক ৩০ মিটার। এম এইচ ৩৭০-র চালক জাহিরি একজন দক্ষ পাইলট। তিনি জানেন বিমানটিকে কীভাবে রাডার থেকে অদৃশ্য করে ফেলা যাবে। বিস্ময়কর শোনালেও এটাই তথ্য যে ভূপৃষ্ঠের শতকরা মাত্র ১০ ভাগ এলাকা সিভিল এভিয়েশন ব্যবহৃত  রাডারের আওতায় আছে। তিনি বিমানটিকে নামিয়ে আনেন সমুদ্র পৃষ্ঠের ৩০-৫০ মিটারের মধ্যে এবং এই উচ্চতা দিয়ে দক্ষিন- পশ্চিমে হাজার দুয়েক মাইল উড়ে গিয়ে ভারত মহাসাগরের উৎস মুখে এমন এলাকায় পৌঁছেন যেখানে কোন রাডার ব্যাবস্থা সক্রিয় নয়। এরপর তিনি বিমানটিকে স্বাভাবিক উচ্চতায় নিয়ে সোজা দক্ষিনে চালিয়ে নিয়ে যান পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন অঞ্চল- দক্ষিন ভারত মহাসাগরে এবং আলতো করে পানিতে অবতরন করান যাতে কোন ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন না রেখে বিমানটি অক্ষত অবস্থায় ডুবে যায়।

বিভিন্ন উপাত্ত একখানে করে বিমানটি ধ্বংস হবার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ উপকুল থেকে দুই হাজার মাইল দক্ষিন পশ্চিমে চার লাখ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে চিহ্নিত করা হয় এবং তল্লাশি অভিযানের বড় অংশ চালানো হয় এখানেই। ছোটবেলার ভূগোল বইয়ে পড়া “গর্জনশীল চল্লিশা”-র কথা সবারই মনে থাকার কথা। হ্যাঁ। জাহিরি তার বিমান নিয়ে সেখানেই চলে গিয়েছিলেন। জাহিরিকে আত্মঘাতী সন্দেহ করার পেছনে জোরালো কারণ হচ্ছে তার ব্যক্তিগত কম্পিউটারে এই উড়াল পথের একটা সিমুলেশন পাওয়া গেছে। এটা কোন বিমানের যাত্রাপথ নয়। এ পথের শেষে দক্ষিন মেরু। তাহলে জাহিরি এই পথ নিয়ে গবেষণা করলেন কেন? যাহোক এখন প্রশ্ন হতে পারে আত্মহত্যা করার জন্য তিনি আট ঘন্টা বিমান চালিয়ে এতদূর গেলেন কেন ? মনোবিজ্ঞানীদের ধারনা আত্মহত্যা করার সময় কেউই চায়না তার মৃতদেহ নিয়ে পরে টানা হেঁচড়া হোক। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের সামনে অদৃশ্য হয়ে যাবার কোন উপায় থাকে না। জাহিরি হয়ত সে উপায়টি খুঁজে পেয়েছিলেন।

ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অরগানাইজেশনের (আইসিএও) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে বিশ্বে মোট বিমান যাত্রীর সংখ্যা ছিল ৩.৩ বিলিয়ন।  দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানকে হিসেবে নিলে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ বাহন বিমান। পৃথিবীতে প্রতিদিন মোটামুটি এক লাখ ত্রিশ হাজার ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। সে হিসেবে বছরে ফ্লাইট সংখ্যা দাঁড়ায় পৌনে পাঁচ কোটি। বিগত পনেরো বছর যাবত ছোট বড় মিলিয়ে বছরে গড়ে ১৫০ টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতি সোয়া তিন লাখ ফ্লাইটের মধ্যে দুর্ঘটনায় পড়েছে মাত্র একটি ফ্লাইট। এই দুর্ঘটনার মধ্যে  কেবিনের বায়ু চাপ কমে যাওয়া, চাকা ফেটে যাওয়া, যান্ত্রিক বৈকল্যের কারণে জরুরি অবতরণও অন্তর্ভুক্ত। আর এই পনেরো বছরের মধ্যে প্রানহানি ঘটেছে এমন দুর্ঘটনার সংখ্যা ১৯৫ টি; বছরে গড়ে ১৩ টি-যাতে মারা গেছেন সর্বমোট ১৮০৪৭ জন আরোহী। গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১২০০ জন। অর্থাৎ প্রতি ছত্রিশ লক্ষ ফ্লাইটের মধ্যে মাত্র একটি ফ্লাইট প্রানহানি ঘটানোর মত গুরুতর দুর্ঘটনায়  পড়েছে। পরিসংখ্যান মতে বিমান ভ্রমনের সময় যে কোন একজন বিমান যাত্রীর মৃত্যু ঝুঁকি ছত্রিশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। বিষয়টি এরকম যে কোন যাত্রী যদি এক কোটি চুয়াল্লিশ লক্ষ ঘন্টা উড্ডয়ন করেন তাহলে তার একবার বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি যদি প্রতিদিন চার ঘন্টা করে বিমান ভ্রমন করেন তাহলে এগারো হাজার আটশ বছরের মধ্যে তার প্রান হারাবার সম্ভাবনা একবার। কিন্তু সমস্যা হলো তিনি জানেন না দুর্ঘটনাটা তার প্রথম ফ্লাইটেই ঘটবে কিনা। ২০১২ সালের জুন মাসে এশিয়া প্যাসিফিক রিসার্চ নেটওয়ার্কের এক সন্মেলনে অংশ নিতে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সে হ্যানয় গিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর যাত্রায় বাহন ছিল এই বোয়িং ৭৭৭। আর কুয়ালালামপুর থেকে হ্যানয় পর্যন্ত যাত্রায় সেই মলাক্কা প্রনালির ওপর দিয়ে কিছু সময় উড়তে হয়েছিল যেখানে বিমানটি অদৃশ্য হয়ে গেছে।

নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া রহস্যময় ঘটনাগুলোর মধ্যে তো বটেই, এটাকে কেউ কেউ শতাব্দীর সেরা রহস্য বলে দাবি করছেন। গত শতাব্দীর শুরুতে, আজ থেকে ১০৮ বছর আগে, সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত জনবিরল অঞ্চলে ঘটে যাওয়া এক বিস্ময়কর বিস্ফোরণের রহস্য উদঘাটনে ব্যয় হয়েছিল অর্ধ শতাব্দীরও কিছু বেশি সময়। যেটাকে সবাই তুঙ্গাস্কার বিস্ফোরণ নামে জানে। ১৯০৮ সালের কথা। তখন  বৈকাল হ্রদের উত্তর পশ্চিমে পাহাড়ি উপত্যকায় বাস করত ইভাঙ্ক উপজাতির লোকজন। জার সম্রাটের  অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য এ অঞ্চলে বসবাস করতে শুরু করেছিল কিছু রাশিয়ান। ৩০ জুন সকাল সাতটা চৌদ্দ মিনিটে তারা বিশাল এক অগ্নিগোলক আছড়ে পরতে দেখল পুরো উত্তর দিগন্ত জুড়ে। কিছুক্ষন পর শোনা গেল পৃথিবী কাঁপানো ভয়াবহ এক বিস্ফোরণের শব্দ এবং সাথে সাথে শক্তিশালী এক শক ওয়েভ তাদের আছড়ে ফেলল কয়েক গজ দূরে। গোটা ইউরোপ মহাদেশ এবং এশিয়ার উত্তর অংশ জুড়ে অনুভূত হল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বায়ুচাপ। টাইমস-এ শিরোনাম ছাপা হল ‘এন ইরি এটমোস্ফেয়ারিক প্রেসার হিটস দ্য নর্দার্ন হেমিস্ফেয়ার’। ইউরেশিয়ার আকাশ রাতের বেলাতেও উজ্জ্বল হয়ে রইল পরবর্তী দুই সপ্তাহ। কি ঘটেছিল সেখানে সে বিষয়ে কেউ কিছু অনুমান করতে পারল না। নিকোলাস দ্য সেকেন্ড-এর তখন অন্তিম দশা। দ্যুমার সাথে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। তাছাড়া মাইলের পর মাইল দুর্গম পাইন আর বার্চের অরন্য পেরিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছেতে যে লোকবল, অর্থ আর প্রযুক্তির দরকার সেটাও তাদের হাতে ছিল না।

বলশেভিক বিপ্লবের পর নতুন সমাজতান্ত্রিক সরকার ১৯১৯ সালে ঐ অঞ্চলে প্রথম অভিযান চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। এরপর ১৯২০ সালে পর পর তিনটি অভিযানের একটিও গন্তব্যের অর্ধেক পথ পাড়ি দিতে পারেনি। সবশেষে ঘটনার এক দশক পর, ১৯২১ সালের জুলাই মাসে একদল সোভিয়েত গবেষক সেখানে পৌঁছুতে সক্ষম হন। তারা দেখেন বিস্ফোরণ কেন্দ্রে রয়েছে পানি ভর্তি বড় আকারের একটা লেক এবং এই লেককে কেন্দ্র করে প্রায় দুই হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকার গাছপালা বিপরীত দিকে শুয়ে পড়েছে। প্রথমত ধারনা করা হয়েছিল যুক্তরাজ্য বা জার্মানি অতি শক্তিশালী কোন বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের স্থান হিসেবে সাইবেরিয়ার এই জনমানবশূন্য এলাকাকে বেছে নিয়েছে। এর কোন প্রমান না পেয়ে ভাবা হল ভূগর্ভস্থ কোন লুকানো আগ্নেয়গিরি থেকে বিস্ফোরণটি ঘটেছে। সেটাও একসময় ভিত্তিহীন বলে প্রমান হল। তখন কেউ কেউ ভাবতে শুরু করলেন ভিন গ্রহের কোন মহাকাশযান এখানে আছড়ে পরেছিল। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তারও কোন লক্ষন পাওয়া গেল না। অবশেষে তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপ, ধ্বংসযজ্ঞ থেকে দফায় দফায় নমুনা সংগ্রহ এবং দীর্ঘ গবেষণার পর ১৯৬৩ সালে সোভিয়েত একাডেমি অব সায়েন্স সরকারিভাবে ঘোষণা করল যে এটা ছিল মোটামুটি এক কিলোমিটার ব্যাসের একটা গ্রহাণুর বিস্ফোরণ। হতভাগ্য ফ্লাইট এম এইচ ৩৭০-র রহস্য উদঘাটিত হয় কিনা তা দেখার জন্য আমাদেরও হয়তো অনিশ্চিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ফলাফল কী হবে আমরা জানিনা।

hassangorkii@yahoo.com