ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

*২৫শে মার্চ, ২০১০*

অফিসের কাজে মতিঝিলে। দুপুরে লাঞ্চের পর নিয়াজ ভাই হঠাৎ বললেন, জেবি, ইন্ডিয়ায় গেলে কয়দিনে ব্যাক করতে পারবেন? আমি ঠিক কী করব বুঝতে পারছিনা। ২৭ তারিখে কনফারেন্স শুরু, তামিলনাড়ুর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্পেস টেকনোলজির ব্যবহারের উপর একটি পেপার পাঠিয়েছিলাম। ওরা ১৫ তারিখেই এক্সেপ্ট করে জানতে চেয়েছিল ভারতে যেতে পারব কিনা। আমি তখন হ্যা বলেছিলাম কিন্তু প্রস্তুতির মধ্যে শুধু ভিসা করা আছে, ব্যাগ গোছানো দূরে থাক, ঢাকা কলকাতার বাসের টিকেটই করা হয়নি। ভারতের ট্রেনের টিকিটের কথা তো বাদই দিলাম।

DSC00586 DSC00555  DSC00692

মাদুরাই কমোরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে লেখক

মতিঝিলের একটি রেস্টুরেন্টে আমি, নিয়াজ ভাই আর অঞ্জনদা বসা। আমি যাব কি যাব না, চিন্তামগ্ন। নিয়াজ ভাই বললেন জেবি যান, এরকম সুযোগ সবাই পায় না এবং বার বার আসেও না। আরে পরশু কনফারেন্স শুরু, পরেরদিন সকালে আমার পেপার প্রেজেন্ট, এদিকে ঢাকা কলকাতা বাসের টিকেট, ওপারে ট্রেনের টিকেট পাওয়াও তো ডিফিকাল্ট! কেরামতি দেখাল অঞ্জনদা! শ্যামলী পরিবহনে ফোন করে এমন সব কথা বলা শুরু করল যে আমি না গেলে ভারত বাংলাদেশ দু’দেশেরই বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। কাজ হল, পরদিন ২৬শে মার্চ সকালের ঢাকা-কলকাতা সৌহার্দ পরিবহনে টিকেট পেলাম। আমি নিয়াজ ভাইয়ের কাছ থেকে ছুটি সোজা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, ব্যাগ গোছাতে হবে। তারপর সেমিনার আয়োজক কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিলাম যে আমি আসছি।

অবশ্য আমার সিদ্ধান্তহীনতা প্রিন্স ভাই (প্রিন্স ভাই আমার সিনিয়র, এখন শিক্ষক, আমরা দুজনই কনফারেন্সে যাচ্ছি) আজ সকালেই রওনা হয়ে গেছেন। বেচারা একটু সহজ সরল, জীবনের প্রথম দেশের বাইরে গেছেন। আমি কলকাতায় পরিচিতদেরকে ফোন করে ওনাকে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ করেছি।

পরদিন সকাল সাড়ে সাতটার বাস জাহাঙ্গীরনগরের ডেইরি গেটে আসল দশটায়, কারন ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সবাই সাভার স্মৃতিসৌধে আসছে। চিন্তা করেছিলাম সন্ধায় কলকাতা পৌঁছালে রাতের ট্রেনে চেন্নাই রওনা হব। দেখি কি হয়? পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে জ্যাম, সেখানে লেট। বেনাপোল পৌঁছালাম বেলা ৩টার দিকে। আমরা ছিলাম শ্যামলীর সৌহার্দ পরিবহনে। এই বাসটিই বর্ডার পার হয়ে সরাসরি কলকাতা চলে যায়। অন্যান্য সব পরিবহনের বাস পরিবর্তন করতে হয়। একুশে টিভির পরিচয় দেওয়াতে সহজে ইমিগ্রেশন পার হলাম।

বনগাঁ পার হবার পর পরিচিত রাস্তা ছেড়ে আমাদের বাসটি ডান দিকে টার্ন নিল। সুপারভাইজার জানালো সামনে রাস্তায় কাজ চলছে বাস চকদহ হয়ে কলকাতা যাবে, মানে ঘন্টা দেড়েক বেশী লাগবে। আমি চাই দ্রুত কলকাতা যেতে আর বাস প্রতি বাকে বাকে দেরি করছে। আমি অবশ্য ট্রেনের টিকিটের জন্য বর্ডার পার হয়েই তাজ ট্রাভেলের শাকিল ভাইকে ফোন করেছি। শাকিল ভাই আমার পূর্ব পরিচিত, মারকুইস স্ট্রীটের তাজ ট্রাভেলের মালিক।

কলকাতা পৌঁছালাম রাত সাড়ে আটটায়। নেমে আর এক বিপদ! ঢাকা থেকে আসা অন্যান্য সকল বাস থামে মারকুইজ স্ট্রীটে কিন্তু আমার পোড়া কপাল, এসেছি সৌহার্দে, বাস থামল সল্ট লেকের ইন্টারন্যাশনাল বাস কাউন্টারে। এই সময় এখান থেকে মারকুইজ স্ট্রীটে ট্যাক্সিতে গেলেও এক ঘন্টার উপরে লাগবে। ট্যাক্সি থেকে নেমে সোজা শাকিল ভাইয়ের অফিসে।

আমি: শাকিল ভাই স্লামালেকুম, কেমন আছেন, আমার টিকেট কই?

শাকিল ভাই: (উত্তর প্রদেশের লোক, হিন্দি টানে বাংলা বলেন) দেখিয়ে ওধারছে এছছেন, এছেই টিকেট চায়। জেবি’দা লাগেচ রাখো, পাছপোর্ট দিয়ে যাও, কাল দুপুরে চলে আছো। এখান খেকে ছোজা ইছটেছনে যবে!

আমি: শাকিল ভাই কি বলেন? আমাকে আজ রাতেই রওনা হতে হবে।

সত্যি বলতে কি কাল দুপুর দু’টা পঞ্চাশের করোমান্ডেল এক্সপ্রেসের আগে চেন্নাইয়ের কোনো ট্রেন নেই। অগত্য পাসপোর্ট শাকিল ভাইকে দিয়ে লাগেজ নিয়ে হোটেল খুঁজতে বের হলাম। পাশের গলিতে একটি ল’জে উঠলাম। ফ্রেশ হয়ে ফ্রী স্কুল স্ট্রীটে আহমদ চাচার দোকানে গেলাম গরুর মাংশের ভুনা আর ভাত খেতে। কলকাতার এ অঞ্চলের অধিকাংশ বাসিন্দা মুসলিম। যখনই কলকাতা আসি, আহমদ চাচার দোকানে গরুর মাংশের ভুনা আর ভাত খেতেই হবে।

রাতের খাবার খেয়ে তাড়াতাড়ি ল’জে ফিরে সেমিনারের প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে হবে। ঢাকাতে সময়ই পাইনি। রুমে ফিরে ল্যাপটপ বের করে ইলেক্ট্রিসিটির লাইনে মাল্টিপ্লাগ লাগাতেই পুড়ে গেল! এদিকে ল্যাপটপে চার্জ নেই, হোটেলের কোনো প্লাগেই চার্জার লাগানো গেলনা। মনে একটু ভয় ঢুকে গেল। প্রথমত একদিন আগে ট্রেনের টিকেট পাওয়া প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত প্রতি পদে পদে বাধা পাচ্ছি। কিন্তু শাকিল ভাইয়ের উপর ভরশা আছে।

দেশের বাইরে গেলে আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। সেদিনও ভোরে উঠে এদিক সেদিক ঘুরে নাস্তা করে সোজা নিউমার্কেট। নতুন মাল্টিপ্লাগ কিনে লাগেজ নিয়ে বলা সাড়ে এগারটার দিকে গেলাম শাকিল ভাইয়ের ওখানে। আমাকে দেখেই ফোন নিয়ে কানে ধরলেন। ফোন নামিয়ে পাঁচ মিনিট বসতে বললেন। পাঁচ মিনিট লাগল না, মিনিট খানেকের ভিতর ধুতি ফতোয়া পরা খালি পায়ে পঞ্চাশর্ধো এক ব্যক্তি দুলতে দুলতে হাজির। পকেট থেকে টিকেট বের করে শাকিল ভাইকে দিলেন।

শাকিল ভাই: জেবি’দা টিকেটের খুব আকাল পড়েচে। তোমাকে একটু কষ্ট করে যেতে হবে।

আমি: কেন করোমান্ডেলের টিকেট পাওয়া যায়নি?

শাকিল ভাই: হ্যাঁ, জরুর পেয়েছি, লেকিন হাওড়া টু ভুবেনশ্বর স্লিপারে কনফার্ম আর ভুবেনশ্বর টু চেন্নাই টু-টায়ার এসিতে ওয়েটিং। (মনে মনে ভাবছি এসি তার মানে দ্বিগুনের বেশী ভাড়া তাও আবার ওয়েটিং)

আমি: শাকিল ভাই ওয়েটিং-এর সিরিয়াল কত?

শাকিল ভাই: ১৯ । তুমি ভুবেনশ্বর যাবার আগে সিট মিলে যাবে, পাক্কা।

আমি: সিট না মিললে?

শাকিল ভাই: আরে চিন্তা কেন কর। জওয়ান মানুষ আছো, কারো সাথে শেয়ার করে চলে যেও। তোমার আগের ভোডাফোন নাম্বারতো চালু আছে না? আল্লাহ কে নাম লেকে রওয়ানা কর। ঐ বিস্নু বাবুর জন্য ট্যাক্সি ডাক।

আমি বাস্তবতা জানি, টিকেট পাওয়া আসলেই কষ্টকর। শাকিল ভাই যেটা করেছেন সেটা অনেক বেশী। উনি অপারগতা প্রকাশ করলে আমি যেতেই পারতাম না। দুই টিকেটের দাম মিটিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম শাকিল আর কত দিতে হবে।

শাকিল ভাই: হাসি মুখে, এই দেখ ছবার ছাথে কি বিসনেস হয়। তুমি ছাত্র মানুষ যা পার দিয়ে যাও।

আমি দু’শো রুপি দিলে, উনি সেটা হাসি মুখেই রেখে দিলেন। অন্য কোথাও থেকে কিনলে আমাকে নির্ঘাত টিকেটের তিনগুন দাম দিয়ে কিনতে হত। শাকিল ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি সোজা হাওড়া স্টেশন। স্টেশনে ঢুকতেই মাইকে পরিচিত মেয়েলি কন্ঠস্বর: “কৃপায়া ধিয়ান দিজিয়ে। হাওড়াছে চেন্নাই সেন্ট্রাল যানেওয়ালি বারা হাজার আট’ছ একাতাল্লিচ করোমান্ডেল এক্সপ্রেস নির্দিচ্ট ছময়ছে দো ঘন্টে বাদ ছুটেগি। ছাব ইয়াত্রীকো প্লাটফর্ম নম্বর বাইচপার ইন্তেজার কারনেকি আনুরোধ কিয়া যা রাহা হে।” এটা শুনে মেজাজ কার ঠিক থাকে বলুন।

*২৭শে মার্চ, ২০১০*

longestplatform

একসময় খড়গপুরে পৃথিবীর দীর্ঘতম প্লাটফর্ম ছিল

এখন বাজে দেড়টা, ট্রেন দু’ঘন্টা লেটে চারটা পঞ্চাশে ছাড়বে। হাতে সময় আছে সাড়ে তিন ঘন্টার বেশী। সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি ২২ নম্বর প্লাটফর্মের দিকে চললাম। ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হাওড়া স্টেশন ভারতের সবচেয়ে পুরাতন ও বড় স্টেশন। এটি ভারতীয় রেলের পূর্ব রেল ও দক্ষিণ পূর্ব রেলের টার্মিনাল। বর্তমানে এখানে ২৩টি প্লাটফর্ম আছে যার মধ্যে ১-১৫ পূর্ব রেলওয়ে ও ১৬-২৩ দক্ষিণ পূর্ব রেলওয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। ১৭ থেকে ২৩ নম্বর প্লাটফর্মগুলো নতুন কমপ্লেক্সে অবস্থিত। সারা বছরই এ স্টেশনটি সরগরম থাকে। ২২ নম্বর প্লাটফর্মে মোটামুটি ভিড় দেখে আমি একবারে শেষের ২৩ নম্বর প্লাটফর্মে গেলাম। এটি খালিই আছে। আমি একটি বেঞ্চের পাশে ম্যাট বিছিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে কাজে লেগে গেলাম। নতুন কেনা মাল্টিপ্লাগ এখানের লাইনে বেশ সেট হয়েছে। আমার ল্যাপটপে চলছে মান্নাদের জনপ্রিয় গান আর সেমিনারের প্রেজেন্টেশন তৈরির কাজ।

বেলা চারটা বিশের দিকে করোমান্ডেল এক্সপ্রেস স্টেশনে প্রবেশ করল। আমার টিকেট দেখলাম এস-১২, রিজার্ভেশন-৪৩। মানে বারো নম্বর স্লিপারের ৪৩ নম্বর সিটটি আমার। সবগুলি প্লাটফর্মের উপরে আড়াআড়ি ভাবে অসংখ্য ইলেক্ট্রনিক বোর্ড ঝুলছে, তাতে কত নম্বর বগির দরজা সেই স্থানে এসে থামবে তার নির্দেশনা দেওয়া। এর পাশাপাশি সব প্লাটফর্মেই বড় বড় ইলেক্ট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ডে তিনটি ভাষায় বিভিন্ন ট্রেনের আপডেট দিচ্ছে যেমনটা এয়ারপোর্টে দেখা যায়। ভারতের সব স্টেশনে হিন্দী, ইংরেজি তার সাথে কোনো স্টেশন যে অঞ্চলে অবস্থিত সে অঞ্চলের স্থানীয় ভাষায় তথ্য প্রচার করে। হাওড়াতে হিন্দী ইংরেজির পাশাপাশি যেমন বাংলার প্রাধান্য দেখা যায়, তেমন মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজী স্টেশনে হিন্দী আর ইংরেজিকে ছাপিয়ে মারাঠি ভাষার প্রভাব চোখ পড়ার মত।

IMG_0990-M

সকাল বেলার হাওড়া ব্রিজ

আমি আমার সিটে যেয়ে বসলাম। হাওড়া থেকে চেন্নাই সেন্ট্রাল সাড়ে ছাব্বিশ ঘন্টার জার্নি হলেও আমাকে সাড়ে ছ’ঘন্টা পর ভুবনেশ্বর গিয়ে এই সিট ছেড়ে দিতে হবে। লাগেজ পায়ের কাছে রেখে আল্লাহ আল্লাহ করছি যেন ভুবনেশ্বর থেকে সিট কনফার্ম হয়। ঘন্টা দেড়েক পর খড়গপুর স্টেশনে ট্রেন থামতেই প্লাটফর্মের মাঝ বরাবর একটি দৃষ্টিনন্দন বোর্ড চোখে পড়ল, তাতে লেখা “বিশ্বের দীর্ঘতম প্লাটফর্ম, দৈর্ঘ্য: ১০৭২.৫ মিটার” (যদিও অক্টোবর, ২০১৩ সাল থেকে বিশ্বের দীর্ঘতম প্লাটফর্ম উত্তর প্রদেশের গোরাখপুরে, দৈর্ঘ্য: ১৩৬৬.৩৩ মিটার, ২য় কেরালার কোল্লাম জংশনে, দৈর্ঘ্য: ১১৮০.৫ মিটার আর খড়গপুরের অবস্থান এখন তৃতীয়)। খড়গপুর থেকে ট্রেন ছাড়ার পর পাশের ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হল, নাম পরিতোষ ব্যানার্জি, ব্যাংকে চাকরী করেন। উনিও ভুবেনশ্বর যাবেন। গল্প করতে করতে ন’টা বাজলে রাতের খাবার খেয়ে অনেকে ঘুমিয়ে পড়লেও আমি জেগে রইলাম।

এদিকে আমার টেনশন বাড়ছে, এখনও সিট কনফার্ম হয়নি। আমার ফোনে নেটওয়ার্ক ঝামেলা করছে। সাড়ে ন’টার দিকে হঠাৎ আমার সহযাত্রী পরিতোষ বাবু নিজের ফোন বের করে আমার কাছে এসি টিকেটের পিএনআর নিয়ে এসএমএস পাঠালেন। ফিরতি এসএমএস এলে বললেন “দাদা আপনার ওয়েটিংতো এখনও ৯ এ আটকে আছে”। এখনও ৯, ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে সিট কনফার্ম না হলে দাড়িয়ে থাকতে হবে। এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে পরিতোষ বাবু এমন একটি কাজ করলেন যে লজ্জায় ট্রেন থেকে ঝাপ দিতে ইচ্ছা হল।

আমার সামনে হাত পেতে পরিতোষ বাবু বললেন: “দাদা এসএমএসের তিন টাকা দিন!”

আমি প্রথমে হতচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, দাদা ঠিক আছে কিন্তু আমার কাছে ভাংতি নেই, আপনি বরং পাঁচ টাকা রাখুন, পরে না হয় আর একবার চেক করব। কলকাতার বাঙালিদের কৃপণতার সুনাম যে বিশ্বজুড়ে, এটি তার একটি নমুনা।

এগারটা বেজে গেছে, এখনও অনিশ্চিত। এদিকে ট্রেনের গতি কমে আসতে দেখে বুঝলাম ভুবনেশ্বরে ঢুকছি, মিনিট দশেকের ভিতরই এই সিট ছেড়ে দিতে হবে। যারা নামবে তারা লাগেজ গোছাতে ব্যস্ত। হঠাৎ আমার ফোন বেজে উঠল, দেখি শাকিল ভাইয়ের ফোন। শব্দে তার কথা ঠিকমত না শুনতে পেলেও “কনফার্ম” শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলাম। লাইনটা কেটে গেল। আমি ব্যাক করার আগেই এসএমএস আসল: “Seat Confirm, AC Cabin-3, Berth-51”। আমিতো আনন্দে আত্মহারা। পরিতোষ বাবুর সাথে একটু মজা করব নাকি? বাকি দু’টাকা ফেরত চাইব?

***

ট্রেন থেকে নেমে গুনে গুনে সতেরটি বগি পার হয়ে তিন নম্বর এসি কেবিনে উঠলাম। টু-টায়ার এসি, মানে একদিকে দুটি করে সিট, উপর নিচে। সামনে দু’টি আর করিডোর পার হয়ে পাশে দু’টি। আমার সিট উপরেরটা। বিশাল সিট, ছ’ফুট বাই দু’ফুট। সিটের নিচে লাগেজ লক করে বসা মাত্রই ট্রেনের স্টাফ এসে পরিস্কার বালিশ, বেডসিট, কম্বল আর তোয়ালে দিয়ে গেল। আমার উপরের আর সামনের সিটের যাত্রী এখনও আসেনি, পাশের দু’জন আমার চেয়ে একটু বেশী বয়সী, আলাপ হল, প্রসাদ আর বিজেই (বিজয় কে এরা বিজেই বলে)তারা মোট ছ’জন বাকিরা পাশের সেগমেন্টে। সবাই টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার, ভারতী এয়ারটেলে চাকরী করেন। নতুন কর্মস্থল কেরালার ত্রিভুন্দাপুরামে যাচ্ছেন।

মিনিট পাঁচেক পর মাঝ বয়সী ভদ্র মহিলার সাথে এক তরুণী আর একটি কিশোর ব্যাগ বোচকা আমার সামনে ফেলে আবার দৌড় দিল, ছেলেটিতো আমার কোলের উপর ব্যাগ রেখে গেছে। তিনজনে আরো তিনটি ব্যাগ নিয়ে এসে সামনের সিটে বসে হাপাতে লাগল। আমি বসে মজা দেখছি, আমার কোলের উপর তাদের একটি ব্যাগ, নিঃসন্দেহে এটি লেডিস ব্যাগ!

হঠাৎ তরুণীটি আমাকে কি বলল বুঝলাম না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করল আমি তার ব্যাগ ধরে রেখেছি কেন? আমি কোন উত্তর না করে ছেলেটির দিকে তাকালাম। সে সরি বলে আমার কাছ থেকে ব্যাগ নিয়ে তরুনীর সাথে আবার অচেনা ভাষায় কথোপকথন শুরু করল। যতটুকু বুঝলাম মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে তরুনীটি চেন্নাই যাচ্ছে। ঘড়িতে রাত বারোটা, আমি একটু ক্লান্তও। তারা টিকেট বের করে আবার সেই অচেনা ভাষায় কথা বলছে আর আমার দিকে তাকাচ্ছে। ভাষাটি হয় তামিল আর না হয় তেলেগু। মেয়েটিই প্রথম আলাপ করল, ইংরেজিতে। হাই, আমি অম্ভি, উৎকল ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, কেমিস্ট্রি অনার্স ফাইনাল ইয়ার।

আমি: আমি জেবি, জিওগ্রাফি এ্যন্ড এনভাইরনমেন্টে মাস্টার্স করছি, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ থেকে।

অম্ভি: বাংলাদেশ? ওয়াও! কোথায় যাচ্ছ? বেড়াতে না কাজে?

আমি: দু’টোই প্রথমে মাদুরাই কমোরাজ ইউনিভার্সিটি সেখান থেকে কন্যাকুমারী তারপর কলকাতা হয়ে বাংলাদেশ। তুমি?

অম্ভি: আচ্ছা শোনো, ইনি আমার মা আর এ আমার একমাত্র ভাই আধাভান। আমার পরীক্ষা শেষ আর আধাভানের স্কুল ছুটি, আমরা বেড়াতে যাচ্ছি, বাবার অফিসে কাজের চাপ তাই আসতে পারেনি।

আমি: গুড! আচ্ছা তোমরা কোন ভাষায় কথা বলেছিলে? তামিল না তেলেগু?

অম্ভি: তেলেগু। আমাদের বাসা হাইদ্রাবাদে। বাবার চাকরীর সুবাধে আমরা ভুবেনশ্বর থাকি।

আমি: অম্ভি আর আধাভান, সুন্দর নাম। নামের অর্থ কী?

অম্ভি: অম্ভি আর আধাভান দুটিই তেলেগু নাম। আমার নামের অর্থ দেবী আর আধাভানের অর্থ সূর্য। তুমি কি তেলেগু জানো?

আমি: না। তবে হিন্দি জানি।

অম্ভি: তাই নাকি!!

এরপর অবশ্য বাকি আলাপ হিন্দিতেই হল। অম্ভি একটু ইতোস্তত বোধ করাতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে?

অম্ভি: জেবি, তুমি কিছু মনে না করলে একটা রিকোয়েস্ট করব?

আমি :: শিওর, বল।

অম্ভি: আধাভানের সিটটা তো নিচে কিন্তু সে উপরে থাকতে চাইছে।

আমি: আরে এটা কোনো ব্যাপার হল, আধাভান যাও, উপরে চলে যাও।

DSC00552

মাদুরাই কমোরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে আমি

(চলবে……….)