ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কবে মাথা উচুঁ করে দাঁড়াবে, তার হোঁচট খাওয়া কবে বন্ধ হবে এসবের উত্তর মেলে না । প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) ভেঙে গিয়ে জন্ম নেয় আল-ফাতাহ ও হামাস । গাজা ভূখন্ডের দখল নিয়ে দুইয়ের মধ্যে শুরু হয় গোষ্ঠীগত স্বার্থদ্বন্দ্ব । ছোট্ট জনপদ গাজা । ১৯১৭ সালে তুর্কিদের থেকে এই অঞ্চলের অধিকার নেয় ব্রিটিশরা । এদিকে ১৯১৭ সালে ‘বেলফোর চুক্তি‘ মতে ঠিক হয় ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সীমানা । তখন প্রস্তাব হলো নতুন রাষ্ট্র প্যালেষ্টাইন হলে এই ভূখন্ড তারই অংশ হবে ।

১৯৪৭ সালে গাজাকে পৃথক আরব দেশ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় । ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল স্হাপিত হলো । ১৮৯৬ সালে প্রথম ইহুদি রাষ্ট্রের দাবী উঠল । আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে পৃথক ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা শুরু হয় । ইসরায়েল স্হাপনের কয়েক মাসের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ । সীমানা অগ্রাহ্য করে জেরুজালেম দখল করল ইসরায়েল । জেরুজালেম দখল পাল্টা দখলের ইতিহাস অনেক পুরনো । এদিকে ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে মিশর এ ভূখন্ড দখল করল । ১৯৬৭ সালের কয়েক দিনের যুদ্ধে মিশরের থেকে আবার এই জনপদের দখল নেয় ইসরায়েল ।

প্যালেস্টাইন-ইসরায়েল সম্পর্কের তিক্ততা বেড়েই চলে । ২০০৪ সালে গাজা ভূখন্ডে ইসরায়েলি শাসনের অবসান হয় । ২০০৭ সালে গাজার নির্বাচনে জয়ী হয় হামাস । পশ্চিমা বিশ্বের কাছে হামাসের পরিচিতি ‘জঙ্গি সংগঠন‘ হিসেবে । পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কাছে ইসরায়েলের পরিচয় ‘বর্বর‘ ‘যুদ্ধবাজ‘ ইত্যাদি বিশেষণে । এদিকে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী তায়েপ এরদোগান ইসরায়েলকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র‘* বলেছেন । একদা ইসরায়েলের বন্ধুদেশ তুরস্কের এমন মন্তব্য বৈরিতারই প্রমাণ দেয় । হামাস হচ্ছে ফিলিস্তিনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী । এরই মধ্যে নির্বাচন পরবর্তী গাজাতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইসরায়েল । গাজার অর্থনীতিতে আঘাত আসে । গাজাকে ‘বিরোধীশূন্য‘ করার অনবরত চেষ্টা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল । একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে হামলা পাল্টা হামলার । হামাসের দাবী ইসরায়েলকে সকল অন্যায় অবরোধ প্রত্যাহার করে নিতে হবে ।

আবার উত্তপ্ত পরিস্হিতি । অশান্ত গাজা । ইসরায়েলের ব্যাপক ক্ষেপনাস্ত্র হামলা । ইতোমধ্যে শতাধিক নিরীহ নাগরিক নিহত হয়েছে । ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে ইসরায়েল গাজায় তিন সপ্তাহ ধরে নির্বিচারে হামলা চালায় । নিহত হয় প্রায় চৌদ্দশত ফিলিস্তিন নাগরিক । সারা দুনিয়ার শান্তিকামী জনগণ হতবাক হয়ে পড়ে । সমালোচিত হয় ইসরায়েল । ইসরায়েলের প্রতি কঠোর মনোভাব পোষণ করলেও প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ এড়িয়ে চলে হামাস । হামাস হামলার পরিমাণ কমিয়ে আনলেও ফিলিস্তিনের অন্যান্য বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠনগুলো হামলার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় ।

ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস শান্তি আলোচনার অঙ্গীকার করার পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিন ৬ নভেম্বর ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে আরও বসতি স্হাপনের দরপত্র চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে । মাহমুদ আব্বাস যখন দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের অঙ্গীকার করেছেন তখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বসতি এলাকায় নতুন ইউনিট নির্মাণের সম্মতি দিয়েছেন ।

ইসরায়েলি ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় গাজা জ্বলছে

গাজায় ইসরায়েলের বেপরোয়া হামলার মধ্যে বারাক ওবামা ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন । টেলিফোন আলাপে ওবামা বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছেন যে তাদেরও আত্মরক্ষার অধিকার আছে । হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে যে ওবামা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারে বিশ্বাস করে । প্রচার আছে ওবামার কাছে টেলিফোন এসেছে নেতানিয়াহুর
থেকে । নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনের সমর্থন চেয়ে ওবামার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মার্কিন সরকারের দেয়া আয়রন ডোম ক্ষেপনাস্ত্রের প্রশংসা করেছেন** ।

বারাক ওবামার ডেপুটি Ben Rhodes এর ভাষ্য- US would like to see the conflict resolved through`de-escalation` and diplomacy, but also believes Israel has a right to self-defence. ( Reuters, Fri Nov 16, 2012 )
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন নেতানিয়াহুকে জানিয়েছেন- “ to do everything possible to bring the conflict to an end “. ( Reuters, Fri Nov 16, 2012 )
উপরিউক্ত বক্তব্যগুলো আমরা এ সকল ক্ষেত্রে সবসময় এভাবেই পেয়ে থাকি । উদ্দেশ্যের হেরফের হয় না ।

ইসরায়েলি ক্ষেপনাস্ত্রে বিধ্বস্ত ভবন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রয়োগে গত বছর জাতিসঙ্ঘে জমা দেয়া ফিলিস্তিনের আবেদনপত্র ‘বিবেচিত হয়নি‘ । চলতি মাসে পুনরায় ফিলিস্তিন আবেদন জানাবে । দেখা যাক এবার কোন শক্তিধর সদস্য রাষ্ট্রের ভেটো আসে । আমাদের প্রশ্ন জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ বৈঠক বসতে আপত্তি কোথায় ।

আর কত নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরলে এর ফয়সালা হবে । বিপুল সংখ্যক মানুষ, নিষ্পাপ শিশু হত্যা করেও দখলদার ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহানুভূতি পায় কি করে !

ছবি: বিবিসি ও রয়টার্স থেকে

তথ্যসূত্র: **Obama and Netanyahu discuss ways to calm Gaza situation -White House

* Turkey`s Erdogan Calls Israel a “terrorist state”

৯ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. বোতল বাবা বলেছেনঃ

    যহরত ভাই কে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনার পোস্ট কেই আমার একমাত্র প্রতিবাদী কন্ঠ হিসাবে চোখে লাগলো। আপনি তথ্য ভালই দিয়েছেন। জার্নাল এর মত রেফারেন্সিং করলে বা লিংক গুলো দিয়ে দিলে আরো ভালো হতো । অথচ দেখছেন আপনার পোস্টে কোনো কমেন্ট নাই। কারণ কি জানেন চিন্তাশীল পাঠক খুব কম। আর এই কারনে ধর্ম কে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মাথা ধোলাই করতে পারতেছে এক শ্রেনীর গোষ্ঠী।

    একপাশে যেমন জামায়াতিরা প্রতিবাদের নামে সুইসাইড বোম্বিং , সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এ ইসলামের নাম দিয়ে ইসলাম কে কলংকিত করে । অথচ ইসলামে প্রতিবাদ কেমন আসলে ! আমার কোনো দিনই তাদের লেখায় চোখে পরে নি। তারা ইসলাম ধর্মের কলংক। আল্লাহ পাক ই তাদের ধ্বংস করবেন ।

    অন্য পাশে সাধারণ মানুষরা আহাজারির ছবি দিয়ে সহানুভুতির ভিক্ষা চায় । কিন্তু বাস্তবতায় মানুষ বড়ই বস্তুবাদী, পুঁজিবাদী , ভোগবাদী । ওদের কানে এইগুলো যায় না ।

    ভালো থাকবেন ।

  2. যহরত বলেছেনঃ

    বোতল বাবা, আপনাকেও অশেষ ধন্যবাদ ।
    আসলে লিঙ্ক দিতে গিয়ে বিপত্তি শুরু হয়েছিল । লিঙ্ক কপি-পেস্ট করতে গিয়ে এলোমেলো হয়ে যাওয়াতে অবশেষে ক্ষান্ত দিয়েছি । দুঃখিত ।
    আপনিও ভাল থাকবেন । শুভকামনা ।

  3. যহরত বলেছেনঃ

    @ হৃদয়ে বাংলাদেশ
    আমাদের জ্যেষ্ঠজন কোথায় ? ভাল হোক মন্দ হোক অথবা তীব্র সমালোচনায় হোক মন্তব্য তো একটা দিবেন ! বুঝব কি করে লাইনে আছি না লাইনচ্যূত হয়েছি । ভুলে গেলে কী চলে ! পেশাগত ব্যস্ততা রয়েছে নিশ্চয় ? যেভাবেই থাকুন ভাল থাকুন ।

  4. আব্দুল মোনেম বলেছেনঃ

    এ নিয়ে পশ্চিমা রাজনীতির অবস্থান তাদের সব দর্শন ও মূল্যবোধের, তাদের নীতিকথা ও প্রগতিচিন্তাকে মিথ্যায় পর্যবসিত করার জন্য যথেষ্ট—এবং এটাকে তারা উৎকটভাবে, নগ্নভাবে, স্পষ্টভাবে প্রকাশিত করে ফেলেছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে. অত্যাচারের বিরুদ্ধে, প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধকে শিকড়হীন বাগাড়ম্বরে পরিণত করেছে। তাদের সমস্ত দাবীকে তত্ত্বগতভাবে অসার ও কৌশলগতভাবে জালিয়াতিপূর্ণ বলে মনে করার কারণ জুগিয়েছে।

  5. যহরত বলেছেনঃ

    মোনেম ভাই, আপনার দেয়া মন্তব্যের প্রতিটি শব্দের সাথে পূর্ণ সহমত । এদের বাগাড়ম্বরতা, জালিয়াতি চিন্তা ও বক্তব্য তো ৫০ বছর আগের পত্র-পত্রিকা ঘাটলেও পাওয়া যায় । এরা নিবেদিত প্রাণ ছিল কবে ?
    আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ । সুস্হ থাকুন । শুভকামনা ।

  6. জিনিয়া বলেছেনঃ

    যহরত ভাই, ব্যক্তিগত কাজে কিছুটা ব্যস্ত থাকায় আপনার চমত্কার এই পোস্টের মন্তব্য দিতে দেরি হল, যদিও পোস্টটি আমি আগেই পড়েছিলাম..কৌশলগত কারণে এমেরিকা জীবনেও ফিলিস্তিনীদের সহায়তা দেবে না, আর আরব দেশগুলো নির্লজ্যের মত চুপ করে এ বীভত্স বর্বরতাকে নিরব সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে..আর আমরা অসহায়ের মত ওদের করুন মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে কতকাল চেয়ে চেয়ে দেখবো?..প্রতিবাদে মুখর হতে হবে..বন্ধ কর ইজরায়েলী আগ্রাসন!!

    অনেক অনেক শুভকামনা।

  7. যহরত বলেছেনঃ

    জিনিয়া আপা, ঠিক তাই । দখলদার ইসরায়েল তাদের আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে । তারা গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত । নিরীহ জনগণ সর্বোপরি নারী ও শিশু হত্যা, অবৈধ ভূমি অধিগ্রহণ এবং বসতি স্হাপনের মধ্য দিয়ে ইসরায়েল তাদের সীমাহীন দখলদারিত্ত্ব অবলীলায় চালিয়ে যাচ্ছে ।
    তবে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীন বিভক্তি দূর করা না গেলে এ সমস্যা আরো প্রকট হবে , আমার ধারণা ।
    আপনাকে অনেক ধন্যবাদ । শুভেচ্ছা ।

  8. স বু জ বলেছেনঃ

    ”মানবতাবাদী” কথাটার বিশালতা অনেক।ফেসবুকে আমি ‘মানবধর্ম’ পালন করি- লিখে রাখলেই আপনার মানবধর্ম পালন শেষ হয়ে যায়না । মানুষ ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর সবখানে , নিগৃহীত হচ্ছেও সর্বত্র । আপনি শুধু পাকিস্তানি বালিকার স্কুলে না যেতে পারার কষ্ট নিয়ে ফেসবুকে মানবধর্মের প্রচার করে যাবেন,এর পাশাপাশি ইজরাইলি মিসাইলের আঘাতে লুন্ঠিত মানবতার কথাও বলতে হবে।বলতে হবে সেই সব শিশুর কথা যারা বিমান হামলার ভয়ে রাত কাটায় বাংকারে
    ,যাদের বিশ্রামের রাত কেড়ে নিয়েছে ব্ল্যাকআউটের সাইরেন। আপনাকে বলতে হবে সেই সব শিশু ‘মানবের’ কথা যারা স্কুলে যেতে পারেনা কারন তাদের স্কুল ধ্বংস হয়েছে রকেটে । আপনি ভুলে যেতে পারবেন না সেই সব শিশুর কথা,যারা নিজের একটি দেশ পাওয়ার জন্য যুদ্ধে নামার আকাঙ্খায় জন্ম নেয়।আপনাকে সেই সব শিশুর কথা বলতেই হবে,কারন এইসব শিশুর জন্ম পাকিস্তানে নয়,তাদের বন্ধুদেশও আমেরিকা নয়।

    মালালাকে অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে হয় নি কোনো সেনাদল দ্বারা,রেশনের যৎকিঞ্চিত খাবারের জন্য তাকে চিন্তিত থাকতে হয় নি প্রতিনিয়ত। তার চোখের সামনে নিয়মিত খুন হয়ে যেতে দেখেনি বাবা-মা কে, অথবা প্রতিবেশীদের। স্কুলে যাওয়ার প্রতিবন্ধকতা ছাড়া মালালা ইউসুফজাইকে আর কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি,অথচ প্যালেস্টাইনের শিশুরা জন্ম থেকেই খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা এবং নিজের একটি পতাকার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে , বলে যাচ্ছে ,
    You might rob me of my last inches of land…
    And throw my youth to years of imprisonment…
    You might put out a flame in my darkest night…
    And deprive me of my mother’s kiss…
    You might rob me of a fragment of my dreams…
    And deprive our children of the joy of celebrating a Eid with new clothes..
    You might build around me walls and walls, enemy of the sun..!
    But, I will never compromise..!
    And to the very last pulse in my veins, I will fight..!

    মালালা ইউসুফজাই’র জন্য ক্রন্দন যদি মানবতার জন্যই হয়,তবে প্যালেস্টাইনের এইসব শিশুর জন্যও আপনার মুখ খুলতে হবে। আমি বিশ্বাস করি মানবতা কোন স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পরিবর্তনশীল নয়।যে মানবতা পাকিস্তানের বুলেটবিদ্ধ বালিকার জন্য কথা বলে,সেই মানবতা প্যালেস্টাইনের রকেটবিদ্ধ শিশুর জন্যও বলবে।যে মানবতা মুসলিম মালালার জন্য বলেছে,সেই মানবতাই মুসলিম প্যালেস্টাইনি শিশুর জন্য বলবে। বলতেই হবে ।

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...