ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া চলছে।যে বিচারের অপেক্ষায় বাংলাদেশ।অপেক্ষায় সারা দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষ।অপেক্ষার প্রহর গুনছি আমি, আমার পরিবার আর যারা আমাদের বান্ধব।আমাদের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের কোটি কোটি নিরীহ জনগণ।

যুদ্ধাপরাধ বিচারের যে আইন তাকে শক্তভাবে আকঁড়ে ধরেছে সংবিধানের ৪৭(৩)বিধান।আমার বোনের আত্মমর্যাদাবোধকে যে হায়েনারা অসম্মান করেছে, ৪৭(৩) ই তো আমার বোনের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে সেই হায়েনাদের বিচারে এগিয়ে এসেছে। ৪৭(৩)ধারা নির্যাতিত অসহায় নিরীহ জনগণের জন্য বর্ম। নিজস্ব আইন ও সংবিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে সে বিচারে কেউ সহায়তা করতে পারলে করুন তাতে আপত্তি নেই কিন্তু রাঙানো চোখ দেখিয়ে অঙ্গুলির নির্দেশনা দেয়ার অধিকার কারো নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রেলিয়া,অস্ট্রিয়া,জার্মানি,বেলজিয়াম,ইংল্যান্ড,আমেরিকা,কানাডা তাদের দেশে আশ্রয় নেয়া অন্যদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশানের ওপর ভিত্তি করে। অথচ আমরা আমাদের জন্মভূমিতে ঘটে যাওয়া প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধীর বিচার করতে পারব না! পৃথিবীর কোথাও ট্রাইব্যুনালকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার নেই।সংবিধানের ৪৭(৩) ধারার কারণে যুদ্ধাপরাধীরা ট্রাইব্যুনাল চ্যালেঞ্জে যেতে পারছে না, এখানেই তাদের ক্ষোভ।৪৭(৩)কে এজন্যই টার্গেট করেছে তারা।
সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে যা বলা হয়েছে-

(৩) এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য ২৭[বা অন্য কোন ব্যক্তি, ব্যক্তি সমষ্টি বা সংগঠন]কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক, ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দন্ডদান করিবার বিধান-সংবলিত কোন আইন বা আইনের বিধান এই সংবিধানের কোন বিধানের সহিত অসমঞ্জস বা তাহার পরিপন্থী, এই কারণে বাতিল বা বেআইনী বলিয়া গণ্য হইবে না কিংবা কখনও বাতিল বা বেআইনী হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে না ।]

শত শত অপরাধের প্রমাণ রেখেও ওরা বলে, কোন অপরাধই নাকি তারা করেনি।একটা চড়ও নাকি কাউকে মারেনি। তাহলে আমরা যে বাড়িতে এখনও বাস করি সেই বিশাল বাড়ি জ্বালিয়ে কয়লা করল কারা? ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুট করল কারা।পরিবারের সদস্যকে বাড়ির উঠোনে নিয়ে হত্যা করল কারা? ওরা নাকি মুসলমান! মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যারা, তারা নাকি কাফের।কাফের হলেই বা ওদের কী আসে যা্য়? আমরা হিন্দু মুসলমান খ্রীষ্টান বৌদ্ধ আরও অন্যান্য জাতিসত্বা মিলেই তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আমরা বাংলাদেশের জনগণ শোষণ বঞ্চনা বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছি হানাদারদের বিরুদ্ধে, ওই রাজাকারেরা কোন অজুহাতে পবিত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে অধর্মের ছুরি চালালো আমাদের ওপর? আমাদের পরিবারের সকল সদস্য সেদিন রোযারত ছিলেন।দিনটি ছিল ১২ নভেম্বর, ২২ রমযান,শুক্রবার। জুমার নামায শেষে আমাদের বাড়ির রোযা পালনরত ব্যক্তিকে ওরা হত্যা করেছে।তাঁর অপরাধ অবশ্যই ছিল-তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।এই হত্যাযজ্ঞের হোতাদের ক্ষমা করার অধিকার বিশ্বের কারো নেই।

একাত্তরে যারা গণহত্যা করেছে, তারা আজ Islamic Leader সেজে রাজনীতিকের মুখোশ ধারণ করে বাংলাদেশ দাপিয়ে বেড়ায়। সে বাংলাদেশের মাটিতে আমার, আমার মায়ের,আমার বাবার, আমার প্রিয়জনদের জায়গা কোথায়! ১৯৭১ সালে মতিউর রহমান নিজামী বলেন-ছাত্রসংঘ কর্মীরা রক্ত দিয়ে পাকিস্তানের প্রতি ইঞ্চি জমি রক্ষা করবে।(দৈনিক সংগ্রাম,৮সেপ্টেম্বর,১৯৭১)

বর্তমানে যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে লেখক-বুদ্ধিজীবী-শিক্ষক-পীর হত্যায় মেতে উঠেছে,জীবননাশের ফরমান জারি করছে, তাদেরই মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম ১৯৭১ সালের ১২ নভেম্বর প্রকাশ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরামর্শ দেয়। এদিন তারা বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তর থেকে যারা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করছে তাদের দ্রুত খুঁজে বের করে উৎখাত করতে হবে।এটা যত বিলম্ব হবে ততোই পাকিস্তানের ক্ষতি হবে।

১৯৭১ সালের ৪ নভেম্বর দৈনিক সংগ্রাম মন্তব্য করে, দুষ্কৃতকারীদের(মুক্তিবাহিনীর)ক্রমবর্ধমান দুঃসাহসিক তৎপরতা উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।তাদের এই দুর্বৃত্তপনার অবসান করা হবে।ইতিমধ্যেই সারাদেশে রাজাকার,মুজাহিদ ও বদরবাহিনী এইসব দুষ্কৃতকারী-কে একের পর এক খতম করে চলছে।

১৯৭১ সালের জামায়াত মুখপত্র সংগ্রামের বয়ান বলে দেয় ওদের অপরাধের মাত্রা কোন পর্যায়ে। বিচার শেষে রাষ্ট্রপতিও যেন তাদের মার্জনা না দেন- একথা বলার অধিকার বাংলাদেশের জনগণের রয়েছে। যদি আমাদের মৌলিক অধিকারের কথা বলি তবে এতটুকু বলা যায়, যিনি রাষ্ট্রপতি তিনিও যেন জনগণের অধিকারকে খর্ব না করেন।

গত বছর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হলো- সংবিধান সংশোধন হচ্ছে।মানবতাবিরোধীদের ক্ষমার অধিকার রাষ্ট্রপতির থাকবে না।‘সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত যে কোন দণ্ড মার্জনা বা হ্রাস করার রাষ্ট্রপতির অধিকার নিয়ন্ত্রিত করার চিন্তা করছে সরকার‘ (দৈনিক ইত্তেফাক,২০ অক্টোবর,২০১৪) । সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে যা উল্লেখ রয়েছে-

৪৯। কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যে−কোন দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করিবার এবং যে−কোন দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করিবার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকিবে।

ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে- এখন ওই অনুচ্ছেদে একটি শর্ত জুড়ে দেয়া হবে।শর্তাংশে উল্লেখ থাকবে-
‘তবে রাষ্ট্রপতি মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির দণ্ড হ্রাস,স্হগিত বা মওকুফ করতে পারবেন না।(দৈনিক ইত্তেফাক,২০ অক্টোবর,২০১৪)

সারা দুনিয়ার মানুষ বিশ্বাস করে লক্ষ বছর অতিক্রান্ত হলেও যুদ্ধাপরাধ লঘু হবে না,তামাদি হবে না।