ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে বকরী ঈদে ঢাকা থেকে বাড়ি গেছি। দু‘দিন ভালোই কাটলো। তৃতীয় দিন আব্বার সাথে চায়ের টেবিলে কথা হচ্ছে। সকাল ৭.৩০ হবে হয়তো। একজন এসে খবর দিলো আপনি যে রোগীর চিকিৎসা করছিলেন সে গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেছে। মধ্যবয়সী নারী। তাঁর সম্পর্কে আমি কিছুটা জানি। উপজেলা পরিষদ অফিসে প্রতিদিন ঝাড়ু দেয়, পানি টেনে দেয়। তাতে সামান্য উপার্জন হয়। স্বামী তালাক দিয়েছে সেই যুবতীকালেই। ছেলে আছে, মোটামুটি ভাল রোজগার। মাকে দেখে না। তিনি সম্ভবত টাইপ-টু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেকদিন। ২৫-২৮m/mol মাত্রায় আবস্থান করে প্রায়ই। কব্জি পর্যন্ত দুই হাত এবং দুই পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত বিভৎস চেহারার ঘা জন্মেছে বহুদিন। জেলার সদর হাসপাতালে যায় ডাক্তার ওষুধ দেয়, খায় কিন্ত কিছুই হয় না। জেলা শহরে বড় ডাক্তারের চেম্বারে দেখিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেরে অনেক টাকা পয়সা খরচ করে ওষুধ খায়। হাত পায়ের অবস্থা যা ছিলো আরো বেড়ে গেল।

আমি আগে থেকেই জানতাম আমার আব্বার কাছে উনি চিকিৎসা নিচ্ছেন আড়াই মাস ধরে। যখন উনি প্রথম আব্বার কাছে আসেন কাকতালীয়ভাবে তখনও আমি বাড়িতে জরুরী কাজে গেছি। যাই হোক বকরী ঈদে যখন বাড়ি গেলাম তার পরদিনই আব্বার চেম্বারে তাঁর সাথে দেখা হয়, কথা বলি। আমি নিজ আগ্রহেই তাঁর হাত নেড়েচেড়ে দেখি। বিস্ময়ে আমি আব্বার দিকে তাকাই, আব্বা সেটা লক্ষ্য করলেন না। উনার হাত পায়ে কোনো ঘায়ের চিহ্ন নেই। একেবারে পরিষ্কার, দু‘এক জায়গায় চামড়া শুকিয়ে উঠে যাচ্ছে! তাঁর মলিন চেহারায় হাসি ঝলমল করছে। আব্বা ওকে নিঃখরচায় চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। কী এমন হলো যে সুস্থ্য হয়ে ওঠা মানুষ গলায় রশি দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিল?

পরে জানা গেল দেড় দু‘মাস অফিসের কাজে যেতে পারেনি, টাকা পয়সাও পায়নি। অন্য এক কর্মে সক্ষম নারীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আশেপাশে এর ওর বাড়িতে খেয়ে না খেয়ে থাকতো। ছেলে ৪৪/৪৫ বছরের মাকে বলছে বুড়ি মরেছে কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে, যে ছেলে স্বচ্ছল জীবন যাপন করে। আমার মনে প্রশ্ন জাগে এই রাষ্ট্রে যদি ‘শুভমৃত্যু‘র আইন থাকতো আর ঐ নারী যদি রাষ্ট্রের কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করতো, রাষ্ট্র তা মেনেও নিতো তারপরও কি সেটা ‘শুভমৃত্যু‘ হিসেবে গণ্য করা যায়!

সত্যিই বিষয়টি অনেক জটিল। জটিল থেকে জটিলতর। বাংলাদেশ চষে বেরালে বিরল রোগের রোগী হয়তো অনেক খুঁজে পাওয়া যাবে এবং এদের চিকিৎসার ব্যয়ভারও বিশাল অংক ছাড়িয়ে যাবে যার সঙ্কুলান করা বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের পক্ষে কষ্টসাধ্য হতে পারে। আবার প্রশ্নও উঠতে পারে, যে রোগের উপশম নেই তার পেছনে কোটি টাকা কেন অপচয় হবে?

বাংলাদেশ এখনই স্বাস্থ্যবীমা কার্যকরীতে ফলপ্রসূ হবে কিনা বলতে পারি না। তবে এমন ক্ষেত্রে রাষ্ট্র উদ্যোগী হয়ে স্থায়ী তহবিল গঠন করতে পারে কিনা। সেখানে রাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা হাজার কোটি, শতকোটি টাকার মালিক (কোটি টাকার মালিকের তো হিসেবের ইয়ত্তা নেই) সকলে প্রতি মাসে এই স্থায়ী তহবিলে অর্থ প্রদান করবেন সেইসাথে রাষ্ট্রও নির্দিষ্ট সংখ্যক অর্থ সেই তহবিলে রাখবে। সরকার গুরুত্বের সাথে এগোলে এই কার্যক্রম সফল হতে পারে আশা করা যায়।

আবুল বাজানদার এবং আরো এমন উদাহরণ আমাদের সামনে তো আছে। রাষ্ট্র ও তার ধণাঢ্য নাগরিক দায়িত্ব পালনে সৎ এবং উৎগ্রীব হলে সফলতার আশা করা যায়। শতভাগ সফলতা আশা করা বৃথা তবে সাধ্যমতো চেষ্টা না থাকলে ‘শুভমৃত্যু’র নামে আত্মহত্যার প্রবণতা আরো বাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়ে যায় কিনা। রোগীর হতাশা থেকে আত্মহত্যা, এমন অঘটন বাংলাদেশে অনেক ঘটে আমরা সব জানতে পারি না। তোফাজ্জেল মিয়ার ঘটনা আইনের মাধ্যমে ঘটানোর চেষ্টার আবেদন তাই সাড়া পড়েছে। অনেক সময় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র হৃদয়হীন হলে মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নেয় নিজেকে অবাঞ্চিত ভেবে। এতে কি রাষ্ট্র এবং নাগরিক উভয়েই বর্বর হয়ে যায় না?

এধরনের খবরগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করবেন, বিশেষ করে অশিক্ষিত দরিদ্র মানুষ রোগের গুরুত্ব বুঝতে পারে না (শিক্ষিতরাই পারে না)। সেই দরিদ্র রোগী যদিও চিকিৎসকের কাছে যায় সেই চিকিৎসকের দায়িত্ব, আচরণকে মানবিক পর্যায়ে গণ্য করা যায় না (ব্যতিক্রমী চিকিৎসকের কথা ভিন্ন)। বিরল রোগ ছাড়াও এমন অনেক সাধারণ রোগ আছে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করালে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ সম্ভব। সেক্ষেত্রে ঐ রোগীরা রোগের গুরুত্ব দেয় না বিশেষ করে অর্থাভাবের কারণে আবার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উদাসীনতা অবহেলা অনাদরের আচরণের মুখোমুখি হতে হয় বলে।

বিরল রোগের কথা আলাদা, এমন সাধারণ রোগ যখন চিকিৎসকদের অবহেলা, সময়মতো না আসা ইত্যাদি কারণে রোগীর মরণ হয় অথবা মরণের মুখোমুখি পর্যায়ে অবস্থান করে, সেই কারণেও কি আপনি বা আমরা ‘শুভমৃত্যু’কে স্বাগত জানাবো! নিশ্চয় কেউই সেটা চায় না। আমাদের দেশে এগুলো অহর্নিশ ঘটে চলেছে- অধিকাংশ চিকিৎসকের অবহেলা, রোগের প্রতি গুরুত্ব না দেয়া, রোগীর কথা গুরুত্ব দিয়ে না শোনা, এমবিবিএস হলেও সে আনাড়ি এসব কিছু মিলিয়ে রোগ সাধারণ পর্যায়ে থেকেও এক পর্যায়ে রোগী সহায়-সম্পদ সবকিছু বিক্রি, ধার-দেনা করেও তার রোগ সারাতে পারলো না। তখন আমরাই পাশে থেকে বলি আল্লাহ হায়াত অতটুকুই রেখেছেন, কি আর করা।

বিরল রোগ পৃথিবীতে থাকবে। সব রোগের চিকিৎসার উপায় সাথে সাথে উদ্ভাবিত হবে না সত্য, কিন্তু চিকিৎসকের চেষ্টা সর্বাগ্রে থাকতে হবে। থাকতে হবে রাষ্ট্রের সকল উপাদানের যোগান দেয়ার দায়িত্ব। সব বিরল রোগের চিকিৎসার সবকিছুই চিকিৎসকের হাতে থাকবে এমন কথা কেউই বলে না। কিন্তু গরীব ধনী সকল রোগীর প্রতি সম আচরণ চিকিৎসকদের দেখাতে হবে। রোগীর প্রতি অনীহা দেখানোই বৈরী আচরণ। মোঃ তোফাজ্জেল কিন্তু শেষে আগ্রহ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্র তাদের দেখুক।