ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

বাংলাদেশ স্বাধীন হলো ৪৫ বছর হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতার প্রতিরোধ পর্বে তৎকালিন কুষ্টিয়া জেলার ছোট্ট শহর চুয়াডাঙ্গা মহাকুমার ঐতিহাসিক পর্বের ঘটনা বাংলাদেশের নাগরিকদের অনেকেরই অজানা।১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্হায়ী রাজধানী হিসেবে চুয়াডাঙ্গার নাম ঘোষণা করা হয়।প্রথম রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম ও সিলমোহর তৈরি হয়েছে চুয়াডাঙ্গা থেকেই।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র‘১৫শ খণ্ডে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম বলেন,“মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক শপথের জন্য ১৪ এপ্রিল দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল।শপথের স্হানের জন্য আমরা চুয়াডাঙ্গার কথা প্রথমে চিন্তা করি কিন্তু পাকহানাদার বাহিনী সেখানে বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে।আমরা চুয়াডাঙ্গা রাজধানী করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত তা আর গোপন থাকেনি।চুয়াডাঙ্গার কথা বাদ দিয়ে আমাদের নতুন স্হানের কথা চিন্তা করতে হলো“।

মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি রচিত‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রতিরোধের প্রথম প্রহর‘বইয়ে বলা হয়েছে,“১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের পর চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের অস্হায়ী রাজধানী করা হয় বলে আকাশবাণীর খবরে জানা যায়“।‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা‘র বাংলা ১৩৮৩ সালের ৩ বৈশাখ প্রকাশিত সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার অবদান সম্পর্কে প্রতিবেদক শ.ম.শওকত আলী লিখেছেন,“চুয়াডাঙ্গায় অস্হায়ী রাজধানী করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়“।

ড.মুনতাসীর মামুনের‘সেই সব দিন‘ বইয়ের ৪৭ ও ৪৮ পাতায় বলা হয়,“১৪ এপ্রিল ঠিক হয়েছিল চুয়াডাঙ্গায় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে।হয়ত পাকিস্তানীদের কাছে সে খবর পৌঁছে গেল।চুয়াডাঙ্গায় সাংঘাতিকভাবে বোমা বর্ষণ করা হলো।তারপর মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় ঠিক হয় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে“।১৯৯১ সালে সংস্হাপন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত নুরুল ইসলাম খান সম্পাদিত বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার,কুষ্টিয়া-এর ৫১ পৃষ্ঠায় স্বাধীনতা সংগ্রামে চুয়াডাঙ্গার ভূমিকা সম্পর্কে বলা হয়,“চুয়াডাঙ্গা স্বাধীন বাংলাদেশের অস্হায়ী রাজধানী বলে ঘোষিত হলে শুরু হয় হানাদার বাহিনীর বিমান হামলা“।

মুক্তিযুদ্ধকালিন ৮ নং সেক্টর কমাণ্ডার মেজর(পরবর্তীতে লে.কর্ণেল)আবু ওসমান চৌধুরী তাঁর ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম‘ বইয়ের ২৩৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,“১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করে চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের অস্হায়ী রাজধানী বলে ঘোষণা করা হয়।আকাশবাণী থেকে এ খবর প্রচারের পরপরই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জঙ্গী বিমানগুলো চুয়াডাঙ্গার ওপর ব্যাপকভাবে হামলা চালাতে থাকে“।১৯৯৪ সালের ১৭ এপ্রিল ‘দৈনিক সংবাদ‘ পত্রিকায় মুজিবনগর প্রসঙ্গে প্রতিবেদক লিখেছেন,ডা.আসহাবুল হক(দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের প্রধান উপদেষ্টা,বাংলাদেশ রেডক্রসের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান) বলেন,“তাজউদ্দীন আহমদ টেলিফোনে ২ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় শপথ গ্রহণ এবং রাজধানী ঘোষণার কথা জানান“।

ফজলুল বারী লিখিত‘একাত্তরের আগরতলা‘ বইয়ে বলা হয়েছে,“আগরতলার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়,কুষ্টিয়া জেলার চুয়াডাঙ্গা হবে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তর“।১৯৯৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর‘ভোরের কাগজ‘-এ কলকাতায় অনুসন্ধানের পর ও প্রোব বার্তা সংস্হার তৈরি‘মুক্তিযুদ্ধ‘৭১ কলকাতার স্মৃতি‘শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়,“চুয়াডাঙ্গায় মন্ত্রিসভার(অস্হায়ী সরকারের)শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করার চিন্তা ছিল।কিন্তু গোপনীয়তার অভাবে পরিকল্পনা পণ্ড হয়ে যায়“।

১৯৯৭ সালের ১৭ এপ্রিল বিটিভি তে প্রচারিত‘মুজিবনগর সরকার‘ অনুষ্ঠানে চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের অস্হায়ী রাজধানী উল্লেখ করে বলা হয়,“২ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের অস্হায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়েছে – এই সংবাদ প্রচার হওয়ার পর পাকবাহিনী বিমান হামলা চালায়।ফলে চুয়াডাঙ্গায় মন্ত্রিসভার যে শপথ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, তা পরিবর্তন করে মুজিবনগরে নেয়া হয়“। ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল বিটিভি‘র ‘ঘটনার আড়ালে‘ অনুষ্ঠানের ‘মুজিবনগর‘ পর্বে চুয়াডাঙ্গা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্হায়ী রাজধানী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজীব আহমেদের‘মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গা ভূগোল ইতিহাস‘বইয়ের ৫৬ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,“১০ এপ্রিল‘৭১-এ আগরতলায় ২৮ জন এম.এন.এ-র উপস্হিতিতে অস্হায়ী সরকার গঠনের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গাকে অস্হায়ী রাজধানী ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়“। ১৪ এপ্রিল নয়াদিল্লী থেকে UPI পরিবেশিত খবরে বলা হয়, “The Proclamation, broadcast by the rebel Free Bengal Radio and monitored here said the capital of the Bangla desh(Bengali Nation) government would be Chuadanga,a small town 10 miles from the border with India”.(Bangladesh Genocide and world press,page 45).

ইতিহাস গবেষক সুকুমার বিশ্বাস‘মুক্তিযুদ্ধে রাইফেলস ও অন্যান্য বাহিনী‘বইয়ের ১৭১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,“১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করে চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের অস্হায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয় বলে আকাশবাণীর খবরে জানা যায়।এই ঘোষণার পরপরই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জঙ্গী বিমানগুলো চুয়াডাঙ্গার ওপর ব্যাপকভাবে হামলা চালাতে থাকে“।

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বাংলাদেশ রেডক্রস জন্মলাভ করে এখানে।চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা‘প্রথম রাজধানী‘নামকরণের ছাড়পত্র দিয়ে কর্তৃপক্ষ প্রমাণ করেছে চুয়াডাঙ্গা হলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্হায়ী রাজধানী।মুজিবনগর স্বাধীন বাংলাদেশের অস্হায়ী রাজধানী একথা সত্য তবে মুক্তিযুদ্ধের কিছু সময়ের গৌরবের স্মৃতি বহমান রাখতে মুক্তিযুদ্ধকালিন চুয়াডাঙ্গার এতটুকু ঐতিহ্য পুরো জাতি ও ভবিষ্যত প্রজন্ম যাতে ভুলে না যায় সেজন্য যে উপায়ে সংরক্ষণ করা যায়, যতটা উদ্যোগ নিলে যথেষ্ট হবে সেই উদ্যোগ গ্রহণের প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরকারকে নিতে হবে।