ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

 

আমাদের উজানচর গ্রামে যেখানে মরা পোড়ায় জায়গাটা ভীষণ প্রিয় আমার। গ্রামে স্থায়ী শ্মশানঘাট নেই। কেউ একজন বাজারের পাশে তিতাসপাড়ে খানিক জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। তারপর থেকে এখানেই মরা পোড়ায়।ঠাকুমাকে দাহ করার সময় থেকে এই অস্থায়ী শ্মশানঘাট এলাকাটা আমার কেন জানি খুব ভালো লাগে। কারণ অনেক! বলেকয়ে শেষ করা যাবে না।

বাড়িতে গেলে সোজা পথে না গিয়ে আমি নদীপথে যাই। ঢাকা থেকে প্রথমে হোমনা কিংবা বিষনন্দী ঘাট। তারপর সেখান থেকে দাঁড় বাওয়া নৌকা বা ট্রলারে চেপে গ্রামের ঘাটে। অবশ্য ঘাট থেকে বাড়ি ক্রোশখানেকের পথ তো হবেই।

যা বলছিলাম। ঠাকুমার একটা ঘ্রাণ আছে নদীপাড়ে। আমরা সিলেট থেকে বাড়ি যাবো শুনলে ঠাকুমা লাঠিতে ঠকঠক করে লঞ্চঘাটে এসে বসে থাকত।নন্দী কাকুর দোকানে বসে ঠাকুমা ফেন উঠা দুধ খেত। বুড়ির বড্ড লোভ সরে। নন্দী কাকু বাবার কোন আমলের ছাত্র। ঠাকুমাকে খুব মাণ্যিগণ্যি করতো। নন্দী কাকুকের দুধেল গাই দুটি জবরদস্ত!

আমরা নদীর যে অংশে স্নান করি, তা থেকে খানিক দূরে এই শ্মশানঘাট। কলাই ক্ষেত, মরিচের ক্ষেত, তারপর শিখা দিদিদের বাড়ির  টমেটো ক্ষেত পার হয়ে নদীর ঢাল। শীতে নদী অনেক নিচে নেমে যায়। বর্ষার উত্তাল তিতাস থেকে শীতের এই ক্ষীণকায়া তিতাস আমার বেশ লাগে। লঞ্চ যখন যায় ঢেউগুলো খুব বড় হয়। বাচ্চাকালে এই ঢেউয়ে ভাসতাম, যদিও সাঁতার জানি না আমি।

গায়ে সুরেষ খাঁটি সরষে তেল মেখে নাইতে যাবো, অমনি হাঁক খ্যান্ত বউদির। খ্যান্ত বউদির ভালো নাম সীমা। আমাদের প্রজন্মের বড় যে ভাই, তার বউ। বাড়ির হর্তাকর্তা তিনি।

দুপুরে নাইতে যেতে দেখে বাজখাই গলা চড়িয়ে বলে উঠল , “যাইতাসস কই? অ্যাই দুপুড়ে কেউ স্নান করতে নদীত যায়? বাড়ির কলে স্নান কর। আমি ভাত বাড়ি…..”

বউদিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চলছি। … পেছন থেকে নানা প্রশ্ন, উপদেশ, আদেশ, অনুরোধ ভেসে আসতে থাকে।.. আমি কলাই ক্ষেত, টমেটো ক্ষেত মাড়িয়ে নদীতে নাইতে চলি।

আমি দুপুরবেলা স্নান শেষে শিখাদিদের বাড়ির ওপর দিয়ে না গিয়ে শ্মশানঘাটের দিকে হাঁটা দেই। ওপাশ থেকে নিতাই কাকার বউ বাজখাই গলা চড়িয়ে বলে “ওরে …পো.. হেদিকে যাইতাসস ক্যালেইগ্যা? তর কাম নাই? মরতে যাস হেন্ধা?”—কাকীমার কথার সুর বাতাসে মিলায়।

প্রশ্ন আর উত্তরের খেলা আমার ভালো লাগে না। পথে যেতে যেতে বাবার বন্ধু হারাধন মাস্টার কুশল জিজ্ঞাসা করেন। বাবা মায়ের কথা বলেন। আমি প্রকৌশলে পড়ে কেন প্রকৌশলী হলাম না তার ফিরিস্তি চান। আমি উত্তর না দিয়ে হাটতে থাকি। পেছন থেকে হারাধন কাকার বক্রোক্তি শুনতে পাই, “পোলাডায় মাইনষ্যের জাত না।”

পথে যেতে আরো অনেকের সাথে দেখা হয়। বছরান্তে বাড়ি যাই। বাড়িতে গেলে এমন কত লোকের সঙ্গে দেখা হবে। তাদের কত প্রশ্ন উঠবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার অযথা প্রশ্নোত্তরের খেলা ভালো লাগে না।

আমি ঠাকুমাকে যেখানে পোড়ানো হয়েছিল সেখানে যাই।একটা ছাতিম গাছ আছে। ছাতিম গাছের তলায় আমি একা বসে থাকি। তিতাস দেখি। তিতাসে জলের আনাগোণা দেখি, জলের কলকলানি শুনি। গঞ্জ থেকে নৌকা চলে আরেক গঞ্জে। এ এলাকায় সদাই -হাটে বড় ভরসা এই তিতাস। গলুই নৌকায় করে মশলা আসে, ফিরতি পথে সবজি বোঝাই করে ফিরে যায়। ভাগ্যিস গ্রামটা  এখনও পুরোদস্তুর গঞ্জ হয়ে যায়নি।

গ্রামে অন্য পাখি আছে কি নাই জানি না। কাক আছে অনেক। কা-কা- কা–…… অনেকক্ষণ। মৃতের আত্মা নাকি কাক হয়ে ঘুরে বেড়ায়। কে জানে?

কত মানুষের ঢল নামে নদীপাড়ে। নদীর এপাড়, ওপাড় ভাঙ্গাভাঙ্গির গল্প নেই। কোমল স্রোতেরা এসে আছড়ে পড়ে তীরে। তীরে দাঁড়িয়ে ওপাড়ের ঘাঘুটিয়া গ্রাম দেখি।

কত বছর পেরিয়ে গেছে! সময়, কাল, স্রোত, এই মানুষ… সব বদলে গেছে। বদলে গেছে এই হাটের বোলচাল।

শ্মশানে মরা আসছে একটা। দূর থেকে ভেসে আসছে, ‘হরি বলো, বল হরি’, ‘দেবের দেব মহাদেব’, ‘মহাদেব সংহার করো’……  মরার খাটিয়া ধরে এগিয়ে আসছে তার স্বজনেরা। ওরা মরা এনে রাখে শ্মশানে। এ গাঁয়ের কেউ না। পরিচয় জানা নেই। একটা নারীদেহ নিথর হয়ে পড়ে আছে।

আমি ছাতিম কোণা থেকে দেখি, লাশটা চিৎ হয়ে আকাশ দেখছে।

আকাশটা বড় নীল। থোকা থোকা মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছে ওখানে, সেখানে। মেঘের বাড়ি পাড়ি দেবে এই নারী। একটা পুষ্পরথ আসবে। সেই রথে চড়ে সে যমদুয়ারে যাবে। তারপর… অযথা নিজেকে প্রশ্ন করছি কেন?

মরা পোড়ানো দেখতে কারো ভালোলাগার কথা না। কিন্তু আমার পা চলছে না। কিছু একটা ছাতিমতলা থেকে আমার পা বেধে রেখেছে।

আমার মনে পড়ে, খ্যান্ত বউদি আমার জন্য ভাত বেড়ে রেখেছে। সাতসকালে বড়দা ছোট মাছ এনেছে। আমি খেতে পছন্দ করি বলে সে সারা দুপুর মাছ কুটেছে।

খ্যান্ত বউদির মতোই তো লাগল এই নারীকে। বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। কি ভাবছি! অযথা চিন্তা! বউদিকে আমি খুব ভালোবাসি। মায়ের মতো বউদিকে নিয়ে কি সব ভাবছি আমি!

নারীদেহটা বাতাসে মিলিয়ে গেল ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে। আমি অযথাই বসে থেকে মরা পোড়া দেখেছি। আমিও সবার মতো শ্মশানবন্ধু।

আমাকে এসে নারীর স্বামী নেমতন্ন করে গেল শেষকৃত্যানুষ্ঠানের। নারীর ছোট মেয়েটি বিন্তির মতো। বিন্তি আমার দিদির মেয়ে।মনটা খুব ভারী হয়ে গেল।

বিকাল হতেই ঠান্ডা হাওয়ার চলে এল দল বেধে। শীতে কাঁপুনি লাগছে। আমি ছাতিমতলা ছেড়ে আবারো হাটতে থাকি। এবার গন্তব্য গৌরবিষ্ণুপ্রিয়া জিউ মন্দির। সেখানে দেখা হবে রঞ্জিৎদার সঙ্গে। রঞ্জিৎদা আজ দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে মন্দিরের পূজারি। নির্মোহ, নির্লোভ লোকটিকে দেখলে মনে হয় এ যেন দেবতা!

দেবতার আসনে প্রণাম ঠুকার আগে আমি সবসময় দাদাকে প্রণাম করি।দাদা যতই চেঁচাক, আমি নিয়মের ব্যতয় করিনি কখনও।

দাদা আসন পেতে দেয়। আমি কলাপাতা কেটে নিয়ে বসে পড়ি। ঠাকুরের ভোগ নিতে অনেকে আসে বিকেলবেলা। আমি তাদের দলে পড়ে গেলাম।

দাদার সঙ্গে গল্প হয়। শানবাধানো ঘাটের পাড়ে বসে দাদার সঙ্গে কথা হয়। দাদা আমার কত প্রশ্নের উত্তর দেয়। দাদাকে প্রশ্ন করতে আমার ভালো লাগে। আমার আজগুবি সব প্রশ্নের উত্তর দাদার কাছে পাই। মন কেমন শান্ত হয়ে গেল।

দাদা ঈশ্বরের কথা বলেন। প্রেম আর প্রীতিভজনের গান শোনান। ‘ঈশ্বর যে এখানে আছেন’ তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখান। আমার মন ভীষণ ভালো হয়ে গেল।

আমি একা একা সন্ধ্যা বাতাসে গোবরে পোকা দেখি। একটা পানকৌড়ি ওড়ে আসে কোথা থেকে। তারপর মন্দিরের আরেক পূজারি সুজিৎ দা ঘন্টা বাজায়। তার আরতির সময় হয়েছে। দূর থেকে দেখি দাদার হাতে আলোর নাচন।

আঁধার কেটে আলো আসে না রঞ্জিৎদার ঘরে। বউদি ছেঁড়া শাড়ি পড়ে থানে পূজা দিতে আসে। ছোট্ট ছেলেটা স্কুলে যায় না। টাকা নেই বলে দাদা তার পুরনো বাতব্যথার ‍সুচিকিৎসা করাতে পারেন না। বউদি কি একটা ব্যামোতে পড়েছেন। তবুও দুবেলা ভাতের অন্ন জোগাতে না পারা দাদার জন্য বউদি তা মুখ ফুটে বলেন না। ছেলেটা শিখে গেছে, স্কুলে যেতে নেই। মন্দিরে বাবাকে সাহায্য করলে দুপুরে সে পেট পুরে খেতে পাবে। সেও বাবার মতো বিড়বিড় করে বলে, ‘ঈশ্বর খুব সুন্দর’।

কপাল, পূজারির ঘরে ঈশ্বর নাই!

আমি গালমন্দ করি ঈশ্বরকে। দাদাকে বলি, ‘তুমি মিয়া আজন্মাই বেকুব। এই ভগবান ভগবান কইরা নিজেরে খাইতাসো, অহন তুমি বউদি আর পোলাডারেও খাইবা। তুমি মিয়া বলদ।”

দাদা হাসে, ‘অযথাই ঠাকুরকে গালমন্দ করিস নে ভাই। ঠাকুর আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন।”

দাদার ঠাকুরমহাশয় এমন করে যে আরও কত অযথা পরীক্ষা নেবেন!!  ইমেইল নোটিফিকেশন জানিয়ে দেয়, আমার গ্রামে থাকার মেয়াদ ফুরিয়েছে। একটা অযথা শহর আমাকে আবার টেনে নিয়ে যাবে কাল ভোরে…

 

…. (চলমান)

 

 

slide