ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

গত রোজার ঈদের সম্ভবত পাঁচদিন আগে এক সাংবাদিক বন্ধু নিচুস্বরে বলল, শাকিল ভাই আপনার কাছে কিছু টাকা হবে? বাসার বুয়ার বিল দিতে পারছি না। একটু অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, ঈদের বোনাস দেয়নি অফিস? প্রশ্নটি শুনে তার মুখের আওয়াজ যেন বন্ধই হয়ে গেল। মাথা নেড়ে বললো, বেতনই পেলাম না আবার বোনাস!

অবাক হলাম না। কারণ নিজেও এ পেশার লোক হওয়ায় এই ঘটনা সম্পর্কে ভালোই জানি। তবে মুখ থেকে একটি গালি এলো। কিছুটা সামলিয়ে বললাম, অনেক অমানুষ দেখেছি, কিন্তু তোমার পত্রিকার মালিকের মতো অমানুষ দেখিনি। ঈদের আর ৫-৬ দিন বাকি এখনতো অন্তত বেতনটা দেয়া উচিৎ ছিল। বেতন-বোনাস কখন দেবে আর কখন মার্কেটিং করবে আর কখনইবা বাড়ি যাবে? সে জবাব দিল ঈদে তো আমার ছুটি নেই। এবার ঈদ ঢাকাতেই করতে হবে।

আমি আর কি বলবো এবার একটু হতবাকই হলাম। বেতন না পেয়েও পরিবারের লোকজনকে ছেড়ে অফিস করে কাটাবে ঈদ, সত্যি বিশাল আত্মত্যাগ। আনমনা হয়ে ভাবতে থাকলাম, এদের আবেগ অনুভূতিকে পুঁজি করেই টিকে আছে কিছু …বাজ লোক। ঈদ এলে সব প্রফেশনের শ্রমিকদের বেতন আদায়ে কর্তাদের নিয়মিত চাপ দিয়ে গেলেও, নিজে বেতন না পেয়েও দিব্যি খেটে যাচ্ছে এসব আবেগি সাংবাদিক। অথচ এসব মালিকরা এদের আবেগ অনুভূতির দাম কখনো কি দেয়?

গত কিছুদিন ধরে সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। অর্থমন্ত্রীর একটি বক্তব্য নিয়েও বেশ আলোচনা-সমালোনা চোখে পড়ছে। আর এসব ঘটনা দেখে মনে পড়ে গেল সেই বন্ধুর কথা। নিজের বেতন বাড়ার ইস্যু নিয়ে কথা হলেও বন্ধুর কথাটি মনে পড়তেই আমি অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যেতে পারলাম না। অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন আমি তার পক্ষে না হলেও আপাতত এ আলোচনাই পছন্দের তালিকায় নিতে পারছি না। কারণ যেসব গণমাধ্যমের কর্মীরা সঠিক সময়ে বেতন, বাৎসরিক বোনাস, সরকারি ছুটি বা ছুটির পরিবর্তে ডিউটির জন্য আলাদা কনভেন্সই পায় না তাদের আবার ওয়েজবোর্ড কিসের? যার চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই, আজ থাকলে কাল নেই সে ওয়েজবোর্ড দিয়ে কি করবে?

গণমাধ্যমের বিশাল একটা অংশে যে ঠিক মতো বেতন দেয়া হয় না, আজ বলে কাল চাকরি থেকে বাদ দেয়া হয়, চাকরি ছাড়লে শেষ মাসের বেতন মিলে না, ঈদসহ সরকার ঘোষিত বোনাসগুলো দেয়া হয়না- এসব বিষয় খুব ভালো করেই জানেন আমাদের সাংবাদিক নেতারা। কখনো কখনো নিজেরাও ভুক্তভোগী হন এসব ঘটনার। কিন্তু এত কিছুর পরও কেন চুপ থাকেন আমাদের সাংবাদিক নেতারা? কেনইবা বেতন না পাওয়া সংবাদকর্মীদের পাশে দেখা মিলে না তাদের। যেখানে সাংবাদিক নেতাদেরই পাওয়া যায় না, সেখানে তথ্যমন্ত্রী মহোদয়ের দৃষ্টি আশা করাতো অপরাধই বটে।

তাই বলছি ওয়েজবোর্ডের দাবি নয়, আগে গণমাধ্যমের কুসংস্কৃতি বন্ধ করণে পদক্ষেপ নিন। পাশে দাঁড়ান নিয়মিত বেতন না পাওয়া সাংবাদিকদের। নিয়ন্ত্রণ করুন সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে ধান্দাবাজি করা লোকদের, রক্ষা করুন এ মহান পেশার মান। আগে প্রাপ্য মান আদায় ও রক্ষা করুন, তারপর আনুন মানোন্নয়নের দাবি।