ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

বাংলাদেশের মানচিত্রের উপর দিকে তাকালে পাখির ঠোঁটের মত চোদ্দশ বর্গমাইলের জেলা শহর -পঞ্চগড়।হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘার শীতল পরশ যার বুকে। বাহারি সব নামের ছোট বড় নদী আর প্রাগজ্যেতিষ কালের পুকুর, সমৃদ্ধ শীতল পরশ পাথরের -শহর পঞ্চগড়। সমতলে দৃষ্টি দিলে সবুজের সম্মিলনে চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যে মেহিত করবে চা বাগানগুলি।

মহানন্দা, তালমা, কুরুম, বেরং, ভেরসা, তিরনই কিংবা ডাহুকের সৌন্দর্যে মন কাড়বে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। এই শীতল জেলার সবুজে দাপাদাপি করতে করতে বেড়ে উঠেছে একটি ছেলে। নাম শাহজামাল সরকার।

সন্ধ্যায় কুরুমের জলে দেখেছে শরৎ চাঁদ। মাঝরাতে প্রাণ খুলে ধরেছে লালনের সুর। বুকে জড়িয়েছে জীবনানন্দ দাশ। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় হার না মানা যুবকের আশ্রয় হয়েছে – নজরুলের কবিতায়। স্বপ্রণোদিত হয়ে একে একে আপন করেছেন রবীন্দ্রনাথ ও মাইকেল মধুসূদন। জীবনের গান গেয়েছেন পড়েছেন সত্যেন সেন। এছাড়াও শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা সৈয়দ শামসুল হকসহ আরো অনেককে।

দুঃখ যাতনায় পিষ্ট এই কিশোর বিবাহিত জীবন শুরু করেন। পেশা কামার। হাড়িভাসা বাজারে কুরুম নদীর পাড়ে তার ছোট্ট খুপড়ী দোকান ঘর। সারাদিন শক্ত লোহা গলিয়ে কৃষকের জন্য যোগান দেন কাস্তে, ঘরে ফিরে ক্লান্ত গতরে চেতনার বাষ্প পুড়িয়ে যোগান দেন কবিতা। পা হতে মাথা অব্দি কবিতায় বসবাস এই কামার কবির।

ইতোমধ্যে কিছু স্হানীয় মানুষের কৃপায় সস্তা প্রকাশনী হতে প্রকাশ করে -“তেরশ নদীর ঠিকানা” কবিতার বই। টাকার প্রচন্ড অভাবে সারা বছরের জমানো টাকায় প্রকাশ করেন বিভিন্ন শিশুদের নিয়ে লেখা ছড়া বই। হঠাৎ ঈদে বাসায় তার সাথে দেখা।বললাম,শাহজামাল ভাই,একটা কবিতা শোনান। বললেন,

“আমায় আর ছোবে কিসে
সকালে খেয়েছি রাতের বাসি ভাত
দুপুরের খবর রাখিনি।
আমায় আর ছোঁবে কিসে?
আমার লিখার পাতা ফুরিয়ে গেলে
উঠোনেই লিখি রাখি প্রেমের কবিতাগুচ্ছ”

সেদিন বর্ষা নিয়ে কয়েকটি ছড়া লিখেছেন।একটি ছড়ায় পেলাম,

“ব্যঙ ডাকে আষাঢ়ে
জাগো জাগো চাষারে
ব্যঙের ছানা ব্যঙাচি
খেলছে সবাই বউচি”

এমন অসংখ্য ছড়া ও কবিতার স্রষ্টা এই চারণ কবি। মফস্বলের এসব নিবেদিত, ফোকাসহীন লেখকেরা সামান্য উৎসাহ চায়,সামান্য প্রেরণা চায়।জীবনের ক্লেদাক্ত চিত্রে তারা সুন্দর ফুল ফোটায়।তাই চায় সেই ফুলে মোহিত হোক অন্যেরা।

কবিতার প্রেমে পাগল যে কামার কবি হৃদয়ের টানে কাব্য বিথীকায় ভরাতে পারে নিজের মনের বাগান, সেসব প্রকৃত মাটির কাছাকাছি মানুষের কাছে নেই আমরা। আমরা ক্যামেরা, ফ্লাসে কিংবা প্রচারে প্রসারে জর্জরিত হয়ে রয়েছি। আত্মঅহংবোধে ফেটে পড়ছি। তাই শ্রদ্ধা জানাবার অবকাশ নেই -একজন শাহজামাল সরকার কে…।

slide