ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

বিজয় দিবসের প্রাক্কালে একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলের টক শো তে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট সামসুল আলম বীর উত্তম আলোচনায় বলেছেন, একাত্তরে সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানে আটকে পড়া অনেক বাঙ্গালী সেনা অফিসার পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে আটকে পরেছিলেন। এদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন সেনা অফিসার ছলে বলে কৌশলে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা নিবাসগুলো থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল। বাকীরা কিন্তু সেখানেই অবস্থান করেছিলেন। সেই পালিয়ে আসা কয়েকজন সেনা অফিসারের মধ্যে তিনি একজন। তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসে এয়ারপোর্টেই ধরা পরেন এবং অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন।

সেই নির্যাতনের বর্ণনা করতে গিয়ে এক অসাধারণ সত্য উচ্চারণ করেছেন। জুন মাসের কোন এক রাত্রে তাকে যখন ছয় সাত জন পাকিস্তানী সেনা বেধরক পিটাচ্ছিলেন তখন প্রতি মাইরের সাথে পাকিস্তানী সেনারা উচ্চারণ করেছে শেখ মুজিবের বাচ্চা, শেখ মুজিবের বাচ্চা। মারতে মারতে তাকে মৃতপ্রায় করে ফেলেছে কিন্তু তাদের রাগ এবং সেই উচ্চারণ শেখ মুজিবের বাচ্চা গালিটা থামেনি। অর্থাৎ পাকিস্তানি সেনাদের সকল রাগ বিদ্বেষ ওই একজনের উপরেই ছিলো। সমস্ত জাতিকে যিনি ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন সকল শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে। সকল জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন মুক্তির প্রেরণায়। আর তাই পাকিস্তানি জান্তার ছোট থেকে বড়ো সকল স্তরের রাগ ক্ষোভ গিয়ে পরেছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের উপর। না কোন মেজর বা কোন নেতার নাম উচ্চারণ হয় নাই, কোন মেজরের ঘোষণা পাকিস্তানিদের কর্ণে ঢুকে নাই।

ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট সামসুল আলম বীর উত্তম আরেকটি কথা বলেছেন, উনারা যারা জীবন বাজী রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন সেই প্রজন্মের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে লেখা সম্ভব নয়। মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে থাকা পর্যন্ত ইতিহাস লিখতে গেলে তা হবে পক্ষপাতদুষ্ট, হবে আত্ম প্রচারণা। ইতিহাসকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হলে বায়াস হলে হবে না। তিনি বলেছেন সেইসব আটকে পরা অফিসাররা কোনদিনো বিশ্বাস করেন নাই বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। অথচ সেইসব অফিসারেরা স্বাধীন হবার পরে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করে।

বাংলাদেশ ৪৫ বছর পার করে ছেচল্লিশে পা দিচ্ছে। বিজয়ের এই বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে যেভাবে উন্নয়নের দিকে এগিয়েছে ঠিক তেমনিভাবে মানসিকতায় পিছিয়েছে প্রায় বিশ বছর। আজ থেকে বিশ বছর আগেও বাংলাদেশের মানুষের মন মানসিকতা ছিলো অনেক অসাম্প্রাদায়িক, খোলা মনের মানুষের ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আজ লেখাপড়া, বিজ্ঞানে অন্তর্জালের সুবিধায় অনেক এগিয়ে যাওয়ার পরেও মানুষের মন পিছিয়ে গেছে পঞ্চাশ বছর আগে। আগে শিক্ষা দীক্ষা কম ছিলো কিন্তু ভন্ডামী ছিলো না। মাথায় হিজাব পরে, গায়ে বোরকা চাপিয়ে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে মসজিদ বানিয়ে মুসুল্লীর সংখ্যা বাড়ীয়েও সমাজের অধঃপতন ঠেকানো যাচ্ছে না। তার সাথে যুক্ত হয়েছে ধর্মান্ধতা। পাশাপাশি দুটি ধর্মের মানুষের সহাবস্থান আজ প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। প্রায় হিন্দু সম্প্রদায়, খ্রিস্টান সম্প্রদায়, সাঁওতাল, সনাতন, উপজাতি গুলোর নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ আর আগুনে পুড়িয়ে মারার মতো হিংসাত্মক কর্মকান্ড ঘটেই চলেছে। কিছু প্রতিবাদ, তদন্ত কমিটি গঠন, কিছু গ্রেফতার এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এক শ্রেণীর মানুষ সরকারী দলের আশ্রয় প্রশ্রয়ে থেকে সরকারের ভাবমুর্তি নষ্টের ষড়যন্ত্রে মেতেছে। শুধুমাত্র সরকার নয় এই ষড়যন্ত্রের দ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকেই হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

১৬ই ডিসেম্বরের যে বিজয় সেই বিজয় কে মিথ্যা প্রমাণিত করার সকল উপায় এই ষড়যন্ত্রকারীরা প্রয়োগ করছে। সরকার এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা চালিয়ে নিজের এবং দেশের ক্ষতি করছে। আজ গ্রাম কে গ্রাম হিন্দু শুন্য হয়ে পরছে। ভারতে যেয়ে এইসব হিন্দু ভাইবোনেরা কেউই ভালো থাকেন না। কিন্তু জীবন আর সম্ভ্রমের তাগিদে সেই খারাপকেই বেছে নিতে দ্বিধা করছে না।

বিজয়ের এই পয়তাল্লিশ বছরের প্রাক্কালে এসে জাতি সকল ষড়যন্ত্রকে ধ্বংস করে বাউল সম্রাট আব্দুল করিমের সেই প্রখ্যাত গানের বাংলাদেশ চাইছে। আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম এই গানের অনুভুতি সকল মানুষের মাঝে ফিরে আসুক এই প্রত্যয়ে জেগে উঠুক জাতি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা চেয়েছিলেন এখনকার বাংলাদেশ সেই সোনার বাংলা হয়ে উঠে নাই।