ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

পাঠ্যপুস্তক নিয়ে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক লেখালেখির রেশ এখনো কাটেনি। শিশুদের মধ্যে হেফাজতিকরণের যে সূক্ষ্ণ ষড়যন্ত্রের ধারা শুরু হয়েছে তাতে আমাদের দেশ সহজেই ইসলামিক রিপাবলিক হতে বেশি সময় নিবে না বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। আমরা কিছু সংখ্যক লোক এখন যেমন বাহাত্তরের সংবিধানের বহাল চাইছি, কিছুদিনের মধ্যে এক বিশাল সংখ্যক নতুন ধারা সৃষ্টি হবে যারা বলবে বাংলাদেশকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে পরিনত করো। সেইভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পাঁয়তারা শুরু হয়েছে।

ব্রিটিশ আমলের কেরানি সৃষ্টির শিক্ষা ব্যবস্থা বাতিল আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা সংঘঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদের নেতৃত্বেই এদেশের শিক্ষা পাঠ্যক্রমকে ইসলামি করণের কাজ শুরু হলো। পুরো পাকিস্তান  আমলে ’ঋ’ তে ঋষি পড়ে আসলেও পাকিস্তানের ইসলামিক ধারার সাথে সাংঘর্ষিক হয় নাই। অথচ এখন প্রায় ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ’অ’ -তে অজগরের জায়গায় অজু, ’ও’ -তে ওলের পরিবর্তে ওড়না চলে এসেছে। বাংলা ভাষার বহুল পঠিত কবিতা ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে’ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে, হুমায়ুন আজাদ স্যারের বই কবিতা বাদ পরে যাচ্ছে অবলীলায়। এ যেন পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্র সংগীত লেখানোর মতো ঘটনা।

অনেকেই বলছেন জামাতের গোপন গোষ্ঠী এইসব ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত। জামাতিরা গোপনে ছদ্মবেশে সরকারের বিভিন্ন জায়গায় ঢুকে পরে ষড়যন্ত্র করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের পাঁয়তারা করছে। কিন্তু আমরা জানি জাতীয়  শিক্ষা কার্যক্রমের চেয়ারম্যান শ্রী নারায়ন চন্দ্র সাহা। শুধু তাই নয় শিক্ষা পাঠ্যক্রম নির্ণয়ে দেশের প্রথিত যশা ব্যক্তিরা জড়িত থাকেন।

যা হোক শিক্ষা কার্যক্রমের কথা এখন কিছুটা পুরানো হয়ে এসেছে, দেশের তাবত মানুষ এই বিষয়ে নানাভাবে নানা স্তরে আলোচনা সমালোচনা করে আসছেন। অবশ্য এ ব্যাপারে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী এখনো তেমন কিছুই বলেন নাই। এ প্রসঙ্গে একটি কথা স্মরণযোগ্য যে আজকের শিক্ষা পাঠ্যক্রমের যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তা হলো মাদ্রাসার সাথে সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রমের এক অভিন্ন করার হেফাজতি ও জামাতের প্রেসক্রিপশন। হেফাজত এবং জামাতকে খুশি করতে যেই কি স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকার শিক্ষাপাঠ ক্রমে এই ইসলামিকরণের পথ গ্রহণ করলো?

প্রথমেই আসা যাক হুমায়ুন আজাদ স্যারের বই কবিতা কেনো বাতিল করা হলো। কারণ এই কবিতায় বলা হয়েছে, ’যে বই তোমায় ভয় দেখায়, সেগুলো কোন বই নয়,’ এখানে তিনি বই পড়ার ক্ষেত্রে বাছবিচারের কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের ধর্ম ব্যবসায়ীরা এই বই কে ধর্মের সাথে গুলিয়ে বলেছে। আর সেই প্রেক্ষিতে হুমায়ুন আজাদ স্যারের কবিতা বাদ পরে গেলো শিক্ষা পাঠ্যসূচী থেকে।

দ্বিতীয়ত, ষষ্ঠ শ্রেনীর বই থেকে রাঁচি ভ্রমণ বাদ দেওয়া হয়েছে, কারণ রাঁচিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের তীর্থ স্থান থাকায় সৈয়দ মুজতবা আলী পিরামীড ও মিশর ভ্রমণের গল্প দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয়ত, একই শ্রেনীতে সত্যেন সেনের লাল গরুটা বাদ দেওয়ার কারণ কারণ গরু হিন্দু সম্প্রদায়ের মাতা, তাই হিন্দুয়ানী শেখানোর চেয়ে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহের সততার পুরস্কার পড়ানো ভালো।

চতুর্থত, সপ্তম শ্রেনীতে নারায়ন গঙ্গোপধ্যায়ের লালা ঘোড়া গল্পটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এখানে পশুর প্রতি সমবেদনা প্রকাশ হয় । এই ভালোবাসা প্রকাশ করতে যেতে কোন দিবসের উপর প্রভাব পরে কিনা সেই চিন্তায় বাদ দেওয়া হয়েছে এবং হাবিবুল্লাহ বাহারের মরু ভাস্কর গল্প দেওয়া হয়েছে।

পঞ্চমত, সুকুমার রায়ের আনন্দ কবিতায় ফুলের কথা বলা হয়েছে , যা নাকি অসামঞ্জস্য।

ষষ্ঠত, কালিদাস রায়ের অপুর্ব প্রতিশোধ কবিতায় সুন্দর প্রশংসা থাকলেও এই কবিতা বাদ দেওয়া হয়েছে।

এইভাবে শরৎ চন্দ্র থেকে শুরু করে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথসহ প্রায় সতেরো জনের কবিতা, গল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। কবিগুরুর ও আমার দেশের মাটি কবিতাটি বাদ দেওয়ার অর্থই হলো এই শক্তি যে কোন সময়ে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবিতে মাঠে নামবে। সেক্ষেত্রে এই নতুন শিক্ষায় শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের তাদের দাবির সাথে সম্পৃক্ত করতে বেগ পেতে হবে না। বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে জনগনের মাঝে উপরোক্ত প্রশ্ন বা চিন্তাগুলো এসেছে। মুক্তবুদ্ধি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তৈরী একটি সরকার সম্পুর্ণ মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত ধর্মের শিক্ষাপাঠ্য সূচি প্রণয়ন করবে এ চিন্তারও বাহিরে।

বর্তমানে দুইটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এই সব বিষয়ে পর্যালোচনা করার জন্যে। কিন্তু যে ব্যক্তির সমন্বয়ে এই ঘটনাগুলো সংঘঠিত হয়েছে তাকেই আবার এই কমিটিগুলোর সমন্বয়ক করা কতোটা যুক্তি সংগত তা ভেবে দেখতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা কার্যক্রম এবং সাধারণ শিক্ষাকে একীভূত করতে যেয়ে জামাত এবং হেফাজতের বুদ্ধির কাছে সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে দেশকে পিছনে নেওয়ার জামাতি হেফাজতের রাজনীতির কাছে মুক্তিযুদ্ধের শক্তির এমন পরাজয় চিন্তা করা যায় না।