ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সে এক সময় এসেছিলো বাংলার ইতিহাসে। দারুন সময়, রাজপথ জলছে মিছিলে মিছিলে, মাঠের পর মাঠ আন্দোলন আর সংগ্রামে প্রকম্পিত হয়ে সকল অন্যায়ের অরাসাদ কেপে কেপে উঠেছিলো নিত্যদিন। বহু যুগের পর বাংলা মায়ের সব ছেলে রবি ঠাকুরের সেই বিখ্যাত কবিতা “সাত কোটি সন্তানরে মা রেখেছো বাংগালী করে ,মানুষ করো নি” কে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে জ্বলে উঠেছিলো। জ্বলে উঠার সেই দিন গুলো বাংলার ইতিহাসে আজো সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবার প্রেরনা হয়ে আছে।

আজো যখন এই বাংলায় যখন কোন অন্যায়, স্বৈরাচার বা সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচারা দিয়ে উঠতে চায় বাংলার মানুষ সেই অন্যায়ের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আজো আসাদ মতিউর অয়াজির বাবুল বা মনু মিয়া আমাদের সংগ্রামের, আমাদের যুদ্ধের নায়ক হয়ে আমাদের মাঝে শক্তি জোগায়। হাসি মুখে বুক চিতিয়ে দাড়াবার যে শিক্ষা ,সেই শিক্ষা আমরা পেয়েছি এই সব তরুন আর লাখো শহীদের প্রান বিসর্জনের ইতিহাস থেকে।

পুরো ষাটের দশকই ছিলো এই বংলার মানুষের জেগে উঠার বছর। এমন প্রতিবাদ, এমন প্রতিরোধ আর এমন ঐক্যবদ্ধতা পৃথিবীর মানুষ খুব কমই দেখেছে। গুটি কয়েক বেঈমান ছাড়া সেদিন বাংলার মানুষ এক দাবীতে, এক চিন্তায় এক পতাকার নীচে দাঁড়িয়েছিলো  একটি মাত্র লক্ষ্য কে সামনে রেখে । সেই লক্ষ্য বাংলার মুক্তি, অসাম্প্রদায়িক এক জাতি গঠন, শোষনমুক্ত এক সমাজ তৈরী ।

৬৯ এর গন অভ্যুত্থানের পথ বেয়ে সত্তরের নির্বাচন এবং ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ সবই একই সুত্রে, একই দাবীর আংগিকে। আসাদ যে স্বপ্ন দেখেছিলো, মতিউর যে স্বপ্ন দেখতো, যে স্বপ্নে ত্রিশ লাখ শহীদ প্রাণ দিয়েছিলো, দুই লাখ মা বোন সম্ভ্রম দিতে বাধ্য হয়েছিলো সেই স্বপ্ন আজ কোথায় হারিয়ে গেছে কেউ বলতে পারে না। রাজনীতির কোন চোরাগলিতে আমাদের স্বাধীনতার মুল মন্ত্রগুলো আজ হারিয়ে গেলো কেউ তা বলতে পারে না।

সব ঠিক হয়ে যাবে বা ৭৫ এর পরের সময়গুলোর দোষ দিয়ে পার পেয়ে যাবার সময় আজ শেষ হয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধীদের আর্থিক সাম্রাজ্য তৈরী, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব বা সীমাহীন সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার যে প্লাটফর্ম তা কিন্তু তৈরী হয় নি এক দিনে বা একটি মাত্র সময়ে। স্বাধীনতা বিরোধীরা সবসময়ের জন্যেই আনুকুল্য পেয়ে এসছে ৭১ এর বিজয়ের পর থেকেই। মহানুভবতা দেখানো ভালো কিন্তু যে শক্তি সুযোগ পেলেই আমাকে, আমার স্নগস্কৃতি, আমার স্বাধীনতাকেই স্বীকার করে না তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া বা সীমিতভাবে সুযোগ করে দেওয়া আমাদেরঅই ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতা আজ আমাদেরকেই ধ্বংসের দারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে।

আজ ভুল ভ্রান্তি যাই থাকুক না কেনো, শাহবাগের গনজাগরন মঞ্চের যদি সৃষ্টি না হতো তাহলে আরো একটি জঘন্য ভুলের দিকে আমাদের যাত্রা শুরু হতো। যে ভুলের মাসুল দিতে হতো স্বাধীনতার সকল অর্জনকে বিসর্জন দিয়েই। আজ হেফাজত আর জামাতের নির্দেশনায় আমাদের শিশুদের পাঠ্যক্রমে যে সাম্প্রদায়িক শিক্ষার অনুপ্রবেশ ঘটানোর কাজ শুরু হয়েছে সেই ভয়াবহতা আরো আগেই শুরু হতে যেতো।

স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি আজ ক্ষমতায়। এতো নিরুংকুশ ভাবে কোন দল বা জোট বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই ক্ষমতায় থাকেনি। অথচ ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের উপর যে জঘন্য অত্যাচার নেমে এসেছিলো তার চেয়ে কোন অংশেই কম অত্যাচার চলছে না বর্তমান সময়ে। উট পাখির মতো বালুর মধ্যে মুখ গুজে থাকলেই ঝড় কে উপেক্ষা করা যায় না। তেমনি প্রতি দিন সারাদেশে যে হারে মুর্তি ভাংগা, মন্দির ভাংগা, বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেওয়া সহ খুন ধর্ষন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর চলছে তা সকল অত্যাচারের ইতিহাসকে ছাড়িয়ে যাবে।

শুধুমাত্র ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্যে সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে আপোষ কখনোই বর্তমান সরকারী দলের জন্য শুভ কিছু বয়ে আনতে পারে না। উনসত্তরের গন অভ্যুত্থান, ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত সংগ্রামের ইতিহাস সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক আপোষহীন সংগ্রামের ইতিহাস। যে সংগ্রামে বংগবন্ধু জীবন বাজী রেখে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মজলুম জননেতা মৌলানা ভাসানী সকল হুমকী ধামকীকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন। সি সংগ্রামের ফসল বাংলাদেশ আজ পথ হারাচ্ছে ক্ষমতার অন্ধ গলিতে। আজ আবার সেই উনসত্তরে ফিরে যাবার দিন এসেছে। সকল কুপমুন্ডকতা, সাম্প্রদায়িকতা কে পরাজজিত করে আমাদের বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক বাংলায় পরিনত করতেই হবে এই হোক গন অভ্যুত্থান দিবসের অংগীকার।