ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
Map-Comilla

ঢাকা শহরের জ্যাম আমাদের জীবনে এক নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। কাউকে কথা দিলেন অমুক সময়ে আমি অমুক জায়গায় দেখা করবো। কিন্তু সেই নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে আপনার পৌঁছানো কেবল অসম্ভবই নয়, ইদানীং এটা অলীক পর্যায়ে চলে গেছে। যদি কাউকে সকাল নয়টায় দেখা করার অঙ্গীকার করেছেন তবে সেই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে সাত সাড়ে সাতের মধ্যে রওনা দিতে হবে। এইটা সম্ভব শুধুমাত্র সকালের জন্য। কিন্তু যদি রাত নয়টা হয় হবে সেক্ষেত্রে সময় বলে লেখার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন মনে করি না। তারপরেও ঢাকা মহানগরীর ক্ষেত্রে অনেকটাই সহনীয় হয় মাঝে মাঝে। হঠাৎ করেই ফাঁকা রাস্তা পেয়ে যেতে পারেন। কিন্ত উত্তরা টঙ্গী এবং গাজীপুর মহাসড়ক এমন চিন্তা করা অবাস্তব।

ঢাকা জিরো পয়েণ্ট থেকে জয়দেবপুর চান্দনা মোড়ের দুরত্ব মাত্র ছত্রিশ কিলোমিটার। অথচ এই পথটুকু পাড়ি দিতে স্বাভাবিক দিনে বা ছুটির দিনে লাগে আড়াই ঘন্টা থেকে তিন ঘন্টা। আর সপ্তাহের অন্যান্য দিনে এই দুরত্ব পাড়ি দিতে লেগে যায় প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘন্টা। কখনো এই সময় ছয় ঘন্টাও পার হয়ে যায় অথচ গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট বা চান্দনা পৌঁছানো যায় না।

বিশেষ করে উত্তরা পার হওয়ার পর এবং টঙ্গী ব্রিজ ঢোকা থেকেই শুরু হয় অসহ্য যানজট। এই পথটুকুতে সব আছে। চার লেনের ডাবল ট্রাফিক রাস্তা, ট্রাফিক পুলিশ, আছেন কমিউনিটি পুলিশ সদস্য। আইন-শৃংখলা বাহিনী সবসময় সচেতন কিন্তু জ্যামের কমতি নেই। এই রাস্তায় জ্যাম লাগার কোন যৌক্তিক কারণও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গাড়িতে বা বাসে বসে আছেন প্রায় আধা ঘন্টা। ঘেমেনেয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা অথচ গাড়ি চলছে না। হঠাৎ দশ থেকে বিশ মিনিট বসে থাকার পর দেখবেন রাস্তা ফাঁকা। গাড়ি স্মুথ গতিতে চলছে। আবার কিছুদুর যেয়ে আপনাকে থেমে পরতে হবে আরো দশ বিশ মিনিটের জন্য। কেনো এই থেমে থাকা, কেনো এই জ্যাম কেউই বলতে পারেন না।

পুরো রাস্তা জুড়ে এই ভাবে প্রায় দশ বারো বার দশ থেকে পনেরো-বিশ মিনিট করে থেমে থেমে যেতে হয়। ফলে মাত্র ষোল কিলোমিটার পার হতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘন্টা। ঢাকা শহর থেকে প্রায় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক কর্মচারীসহ বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী মানুষের যাতায়াত এই মহাসড়কে। উপরন্তু বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাসমূহের সাধারন মানুষের যাতায়াত। অনেক মানুষ আছেন যারা প্রতিদিন ঢাকায় এসে চাকরি করতে চান। কিন্তু এই অহেতুক বিড়ম্বনার কারণে মানুষ এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উত্তরা থেকে জয়দেবপুরের এই সামান্য দুরত্বের রাস্তা গাড়িতে আসতে কেন এই সময়ের বিড়ম্বনা?

প্রথমতঃ পুরো রাস্তা জুড়ে আগে ছিলো হকার আর কাঁচাবাজারের দোকান পাঠ। রাস্তা এবং ফুটপাতের অধিকাংশ জায়গাই ছিলো অবৈধ স্থাপনার দখলে। বর্তমানে অনেকাংশে এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হলেও কিছু কিছু জায়গায় আজো বিদ্যমান।

দ্বিতীয়তঃ প্রতিটি বাস ট্রাক যেখানে সেখানে গাড়ি ঘুড়িয়ে রাস্তার স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়।

তৃতীয়তঃ যাত্রী উঠানো নামানোর জন্য যেখানে-সেখানে রাস্তার মাঝখানে থামিয়ে দেওয়া। এতে করে দুই বা ততোধিক বাসের প্রতিযোগিতা পুরো রাস্তা জুড়ে যাতায়াতকে বন্ধ করে দেয়।

চতুর্থতঃ পুরো মহাসড়ক জুড়ে রাস্তার পাশে গাড়ি, বাস, ট্রাক আর কভার ভ্যানের পার্কিং করে রাখা।

সর্বশেষ সারা রাস্তা জুড়ে আছে গার্মেন্টস শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের রাস্তা পারাপারের দীর্ঘ লাইন। এই মহাসড়কে অনেক ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে রাস্তা দিয়ে পার হয়। এতে করে রাস্তার গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক থাকতে পারে না। এভাবেই প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন আর ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বিশৃংখলার রাজত্ব চলছে এবং যার ফলশ্রুতিতে যে হাজার হাজার ম্যান পাওয়ার অহেতুক নষ্ট হচ্ছে তার হিসাব কেউ রাখে না। দেশের আর্থসামাজিক খাতে এই সময়ের মূল্য যদি আমরা যোগ করতে পারতাম তবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি আরো বেগবান এবং সমৃদ্ধ হতো।

আমরা যারা প্রতিদিন এই মহাসড়ক ধরে দেশের রফতানি খাত সমৃদ্ধশালী করার কাজে নিয়োজিত এবং প্রতিদিন জিডিপিকে উত্তরোত্তর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি তারা এই অব্যবস্থার কারণেই হাজার মানব ঘন্টা অকারণে নষ্ট করছি।