ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ৮ই মার্চ বিশ্বের সকল দেশের মতো বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন হয়ে আসছে দীর্ঘ বছর ধরে। নারী দিবস কে কেন্দ্র করে আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতো এখন এনজিও থেকে শুরু করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এই নারী দিবসের কর্মসূচিতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতেও স্পন্সর করছে। এবং নারী দিবসের মাহাত্ম তুলে ধরছে। এ যে শ্রেফ ব্যবসা তা আমাদের দেশের অনেক নারী সংগঠনই বুঝে না বা বুঝতে চায় না।

নারী মানুষ, এই ধারনাটাই অনেক সমাজে, রাষ্ট্রে বা জাতিতে বুঝতে চায় না বা মানতে চায় না। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বিশ্বের অনেক ধনী দেশেও নারী দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেনীর নাগরিক। ভোটাধিকার তো অনেক পরের ব্যাপার তাদের একা চলাফেরা করারও অনুমতি নেই অনেক দেশে। সে দেশগুলো অর্থনীতিতে এগিয়ে থাকলেও নারী স্বাধীনতায় অনেক পিছিয়ে। ধর্মের দোহাই দিয়ে আজো বন্দী জীবনযাপন।

আজো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, জাতিতে, সমাজে নারীর খতনা বাধ্যতা মুলুক। এমন সব পৈচাশিকতা নিয়ম নীতির মধ্য দিয়ে নারী পথ চলছে। প্রতি মুহূর্তে নির্যাতনের আশংকা নিয়ে জীবন পাড়ি দিতে হচ্ছে নারীকে। সেই নারীদেরকে নিয়েই নারী দিবস। নারীর যথা যোগ্য সম্মান, অধিকার আর সুবিচারের দাবি নিয়ে নারী মুক্তির যে আন্দোলন শুরু হয়েছিলে শতাধিক বছর আগে, আজোও সেই সংগ্রাম শেষ হয়নি। নারীকে আজো লড়াই করতে হচ্ছে তাদের মৌলিক চাহিদা আদায়ের লক্ষ্যে।

নারী মানুষ, মেয়েমানুষ নয়, পুরুষের বাম পাঁজরের হাড্ডি থেকে সৃষ্ট কোন আংশিক মানুষ নয় এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতেই আজো বিভিন্ন যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে নারীকে। মানুষ যখন মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের স্বপ্নে বিভোর সেই সময় এখনো এমন অলীক ব্যাখ্যার মুখোমুখি হতে হয় নারীকে। শুধুমাত্র আমাদের দেশের অশিক্ষিত পুরুষ নয়, শিক্ষিত সমাজের বেশিরভাগে পুরুষেরা এই চিন্তা পোষন করে থাকেন। শুধু নাই নয় অনেক নারীও এই চিন্তাকে সমর্থন করে পুরুষের আধিপত্যকে আরো বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করে চলেছেন।

নারী দিবসের এই ক্ষণে অনেকেই বলে থাকেন বিশেষ একদিন নারী দিবস পালনের মধ্য দিয়ে নারীকে আরো দুর্বল, অসহায় বা নিম্ন শ্রেণিতে প্রকাশ করা হচ্ছে। বাস্তবতা ভিন্ন। নারী যতোদিন অধিকার আদায় করতে না পারছে, যতদিন নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি না পাচ্ছে, যতোদিন দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকত্ব থেকে মুক্ত না হচ্ছে ততোদিন এই নারী দিবস অবশ্যই পালনীয়, অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। একদিন স্মরণ করিয়ে দেওয়া সমাজের একটি অংশ তার সকল যোগ্যতা থাকা সত্বেও সে শুধুমাত্র লিঙ্গভেদে অবহেলিত, নির্যাতিত হচ্ছে। তাকে কিছু একক কাল্পনিক বেড়া জাল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। সতীত্ব শুধুমাত্র নারীর সম্পদ, অথচ পুরুষের সতীত্ব নেই। পুরুষ হাজার নারীতে গমন করলেও সে সৎ পুরুষ, সে তার মহিমায় সমুজ্জল। তার কিছুই হয় না সমাজে। পক্ষান্তরে নারীর শরীরে স্পর্শ লাগার সাথে সাথে তার সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন আসে। সে একঘরে হয়ে যাওয়ার আশংকায় পরে।

নারী শারীরিক ভাবে দুর্বল। এটি আজ যদিও খুব খোঁড়া যুক্তি, তবুও নারীকে ওই খোড়া যুক্তি দিয়েই ঘায়েল করতে চায়। পুরুষ তার সমাজে আধিপত্য বিস্তারে সকল রকম ন্যায়-অন্যায় কৌশল প্রয়োগ করে, নিয়ম নীতি, আইন কানুন, ধর্মীয় অনুশাসন প্রয়োগ করে নারীকে বন্দী করতে চেয়েছে। নারীকে করতে চেয়েছে নিজস্ব সম্পদ। নারীই একমাত্র সৃষ্টিশীল। সেই ধারন করতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে নারীকে বন্দী করার ইতিহাস প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকেই। সভ্যতা যত এগিয়েছে নারীকে বন্দী করার নতুন নতুন কৌশল আবিস্কারে পুরুষ সফল হয়েছে। নারীর নিজের সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনা পুরুষকে আরো শক্তিশালী করেছে।

নারীর আন্দোলন পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে, পুরুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে, নারীকে দুর্বল করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং সকল বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে। নারীকে সমানাধিকার দিয়ে, মানুষ হিসেবে মেনে নিয়ে একসাথে পথ চলার দাবি হচ্ছে নারী দিবসের প্রতিপাদ্য।