ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

এখন মাঘ মাস। প্রতিদিন সকালে রোদ মেলে না। কিন্তু সেদিন (শুক্রবার, ৮ মাঘ, ২০ জানুয়ারি) সকালে সুন্দর রোদ উঠলো। আমরা বেরুলাম। টাউন হল মোড় থেকে সিএনজি অটোতে মুক্তাগাছা। এইটুকু রাস্তা মুখস্থই আছে। অচেনা জায়গাটার শুরু তার পর থেকেই। গন্তব্য মামীর বাড়ি। ‘পাহাড় পাবইজান’ গ্রাম। অদ্ভুত নাম। আগে শুনিনি। খুব নাকি সুন্দর এলাকা। গ্রামের নাম গুগল করে মনোনেশ দাসের একটি প্রতিবেদন পাওয়া গেলো, যেখানে এর এক ঐতিহাসিক স্থাপনার উল্লেখ আছে। মুক্তাগাছা থেকে প্রথমে আমাদের যেতে হবে কালীবাড়ি বাজার। 

qqqq93

,

শহর থেকে বেরিয়ে যেতেই সরু রাস্তা। দু’পাশে ফসলের মাঠ– বোরোর মৌসুম শুরু হয়েছে। যেতে যেতে ডানে-বাঁয়ে দেখি, ক্ষেতে ক্ষেতে কাদাতে পানিতে মাখোমাখো– চারা রোপণের প্রস্তুতি। কোথাও কোথাও বীজতলার হলুদ-সবুজ, আর আশপাশ নাড়াময়। এমনি একটা বীজতলার কচি বুকে চোখ পড়তেই দেখা গেলো, তার প্রতিবেশি এক সেগুন গাছের মরা পাতা কয়েকটা ওখানে পড়ে রয়েছে। সেগুন পাতারা আকারে বড়ো হলেও ওজনে কম। ছোটবেলায় আমাদের খেলাধূলায় এ পাতার ব্যবহার ছিলো। কাঁচা পাতা ভালো করে হাতের তালুতে ডলে নিলে চমৎকার রঙ হয়। যতোদূর জানি, শৈলী, যে তখনও অটোর পেছনের সিটে বসে ওর আন্টির সাথে চিপ্‌স খাচ্ছে আর কৌতুহলী চোখে রাস্তার দুপাশ দেখছে, এই পাতা ছুঁয়ে দেখেনি। পথের পাশের এই গাছটার সবুজ পাতা অনেক উঁচুতে; তাই মেয়েকে শুধু শুধু তিন দশক আগের বালক বেলার গপ্পো শুনিয়ে আফসোস বাড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না– এমনটি ভেবে নিয়ে আমি বিচক্ষণ বাবা হই। রাস্তার দুপাশে দৃশ্যপট বদলাচ্ছে একটু পর পর। পাতাপুতার রঙের আলাপ চেপে গিয়ে বরং যখন যেমন  পারছি, ক্যামেরার শাটার চেপে যাচ্ছি যেতে যেতে। রোদমাখা আকশটা পরিষ্কার নয়। বাতাসের শিরশির ঝাপটায় চোখেমুখে শীত শীত।

Untitled

.

একটা বাড়ির পেছন দিকের পেঁয়াজ ক্ষেতে ব্যস্ত কৃষক। ওঁরা বাপ-বেটা মনে হলো। আর আইলে বসে সঙ্গ দিচ্ছেন নারী যে জন, সে জন নিশ্চয়ই ও বাড়ির চাচি। শীতের সূর্য মোলায়েম হয়। এমন উজ্জ্বল দিনে গাঁও-গেরামে রোদ পোহাতে সুখ। কেউ কেউ দেখি খালি গায়েই মাঠে কাজ করছেন। বেগুন ক্ষেতে পাতার ফাঁকে বেগুন যেনো ছোট্ট শিশু, ছায়ায় ছায়ায় বড়ো হচ্ছে। অটোর ড্রাইভারের পাশে বসে চোখের সামনে দিয়ে গ্রামীণ জীবনের এসব শীতছবির দৌড় দেখতে খুব ভালো লাগছিলো। মূলত, দেশের সবখানেই শহর ছেড়ে এরকম একটু গ্রামের দিকে গেলে দৃশ্যগুলো মোটামুটি এমনই এখন। তবু এগুলোর প্রত্যেকের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, গড়পড়তা দৃষ্টিতে যা এড়িয়ে যায় প্রায়শ। একটি লালচে গরু আয়েশ করে রোদ খাচ্ছে, নাড়া খাচ্ছে। বাড়ির বউরা/মেয়েরা কেউ কেউ পাশের ক্ষেতে জালা (ধানের চারা) তুলছে, নাড়া তুলছে। এই জালা ওসব কাদাময় ক্ষেতগুলোতে রোপণ করা হবে। আর নাড়াগুলো হবে জ্বালানি। দৈনিক রান্না-বান্না, আগুন পোহানো, পিঠা পুড়ে খাওয়া– নাড়া ছাড়া এতো সাশ্রয়ি হতো না মোটেই। প্রসঙ্গত না বলে নিই, ‘নাড়া’ শব্দটি বাংলা কবিতায়ও বিশেষ স্থান দখল করে আছে। জসীমউদদীন তাঁর ‘নিমন্ত্রণে’ লিখেছেন, “তুমি যদি যাও – দেখিবে সেখানে মটর-লতার সনে/ সীম-আর-সীম হাত বাড়ালেই মুঠি ভরে সেইখানে/ তুমি যদি যাও সে-সব কুড়ায়ে/ নাড়ার আগুনে পোড়ায়ে পোড়ায়ে/ খাব আর যত গেঁয়ো চাষিদের ডাকিয়া নিমন্ত্রণে/ হাসিয়া হাসিয়া মুঠি মুঠি তাহা বিলাইব জনে জনে।” খাতুনে জান্নাত তাঁর ‘যুবতী জ্যোৎস্নায়’ লিখেছেন, “নাড়ার আগুনে শীত ভাঙে যুবতীরা/ উনুনের ভাঁপে রাখে ভেজা হাত/ উষ্ণতা বেয়ে উষ্ণতা উঠে যায়/ কোষ কলায় সঞ্চারী ধারাপাত…”। তানভীর রাসেল লিখলেন, “নাড়ার আগুনে বেদম পুড়ছে হেমন্তের বাতাস…/পোড়া বাতাসের ঘ্রাণ উস্কে দিচ্ছে তোমার উদগ্র ক্ষুধা,/ আর তুমি খাচ্ছো অবলীলায় জীবনকেই খাচ্ছো খুব।” কবিতা থাক, ভ্রমণের কথায় ফিরে আসি। আমাদের অটো চলছে। চোখের সামনে এবার ছোট্ট জলাধার এক। তার পাশে ঘাসে বসে রোদ পোহাচ্ছে হাঁসের একটা ঝাঁক। জানি, পানি এখন অত্যন্ত ঠাণ্ডা।

DSCN9866

.

দুপুর একটার কিছুটা আগে কালীবাড়ি পৌঁছুনো গেলো। এখান থেকে ‘পাহাড় পাবইজান’ নাকি দশ-পনেরো মিনিটের রাস্তা। তন্বী (ভ্রমণের আয়োজক) জানালো, মামীর বাড়ির বাকি পথটুকু অটো কিংবা ভ্যান দুভাবেই যাওয়া যায়। আমরা একটা ব্যাটারি চালিত ভ্যানে উঠে পা দুলিয়ে বসে পড়লাম। শৈলী’র এটি দ্বিতীয় ভ্যান জার্নি। এই পথটা মেঠো। চারদিকে সবুজের আরও ঘন বিস্তার। পথ জুড়ে ধূলোর প্রাচুর্য আছে, তবে মোটর গাড়ি তেমন চলছে না বলে ওসব উড়ছে না। শব্দ-দূষণের বালাই নেই। শুক্রবার বলেই বোধ হয় লোকজনের আনাগোনা তেমন নেই। রাস্তার দুধারে ঘর-বাড়ি আর গাছেদের নিপাট ছায়া। আর আর গ্রামের মতোই টিনের, বাঁশের কিংবা ঝোপ-ঝাড়ের পাঁচিল।

xxxxxxxx94

.

মামীদের বাড়িতে পৌঁছুতে সত্যিই বেশিক্ষণ লাগলো না। সুন্দর গ্রাম। ছিমছাম। অনেক গাছ-গাছালি। এদিকটায় পাখিটাখি বেশ আছে গাছে। ফোনের নেটওয়ার্ক ভালো এখানে। ইলেক্ট্রিসিটি আছে। আমরা হাত-মুখ ধুয়ে নিলাম। ওহ্‌, বলতে ভুলেই যাচ্ছিলাম প্রায়, মামীর নামটি সিলভি, আর মামার নামটি মিল্কি। ছোট্ট ছেলে সাফিদকে নিয়ে তাদের ছোট্ট সংসার। শহরেই থাকেন। গ্রামে মাঝে মাঝে আসা হয়। এ বাড়িতে নিয়মিত থাকেন মামীর বাবা-মা আর এক মাত্র ভাইটি। ভীষণ অতিথিপরায়ণ এই মানুষগুলোর উষ্ণ অভ্যর্থনা আর আপ্যায়নে আপ্লুত না হয়ে উপায় নেই। এমন আতিথেয়তা জগতের অন্য যে কোনো আনন্দের অভিজ্ঞতাকে ম্লান করে দিতে পারে।

.

প্রথমে পিঠাপুঠা খেয়েটেয়ে বাড়ির পেছন দিকটাতে আমরা হাঁটতে গেলাম। পুকুরের ধারঘেঁষা পথ, মাঠের অনেকটা ধূ-ধূ; শুধু এক-আধটু সবুজ সুন্দর। চারদিক রোদ ঝলমল। তবে ডান দিকে হেঁটে গিয়ে উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তায় পা দিয়ে দ্বিধা– সাপটাপ নেইটেই তো? টিলামতো জমি; পুরোটাই বিবিধ বৃক্ষরাজিতে পূর্ণ। পাহাড়ি মাটি কেটে চলাচলের রাস্তা হয়েছে। না, প্রথমত, এটি ভয়ঙ্কর স্থান নয় এবং আরেকটি ব্যাপার হলো, এখানে অন্য ফসলের উপযোগিতা অর্জন সহজ না হলেও এসব গাছ-পালা থেকে পাওয়া অর্থনৈতিক উপকার সন্তোষজনক– জানালেন জমির মালিক। 

DSCN9894

.

হাঁটতে হাঁটতে ‘বানার’ নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ালাম আমরা। দুপাশে ঘন গাছপালার ছায়া আর তার ফাঁক গলে আসা সামান্য রোদ বুকে মেখে আঁকাবাঁকা, স্লিম নদীটির জল নিস্তরঙ্গ। সুন্দর। ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা তিনটায় ছুঁইছুঁই। দুপুরের খাবারের জন্য ডাক পড়লো। ঝটপট কিছু ছবি তুলে নিলাম। বাড়িতে ফের ঢুকবার আগেই এক কাঠবিড়ালের দেখা মিললো হঠাৎ। কিন্তু এতো ছটফট তার, লেন্সে ধরা অসম্ভব। উঁচু ডালে পাতার ভিড়ে মূহুর্তে হারিয়ে গেলো।

.

খাবার টেবিলে বিশাল আয়োজনের সামনে বসে মনে হলো, মোঘলরা বেঁচে আছে। এ বাড়ির মেয়েরা সত্যিই ভালো রাধুঁনি। এরকম ভোজনান্তে বিশ্রামের চাহিদা সত্ত্বেও উপায় ছিলো না কারণ রসুলপুর যাওয়ার গাড়ি বাড়ির সামনে রেডি। এবার রাস্তাটা বনের পাশ দিয়ে। লম্বা গাছের সারি। কোথাও আবার তুলার, ধানের এবং অন্যান্য সব্জির ক্ষেত।  

Unsffled

.

রসুলপুরের পার্কে প্রবেশ করলাম। ভেতরটা চমৎকার। বিভিন্ন প্রাণীর ভাস্কর্য, ফোয়ারা, আর গাছ-পালা এবং বাঙ্গালো বাড়িটা সবই নয়নাভিরাম। তবে এখানকার প্রাণী ও পাখির প্রতি আকর্ষণ বোধ করি অন্য কিছুর চেয়ে বেশি। ময়না, টিয়া, পেচা, তুর্কি মোরগ, হুতুমপেঁচাসহ অনেক প্রজাতির প্রাণী ও পাখির সংগ্রহ রয়েছে এখানে। 

aaaa7

.

দিনের আলো ফুরিয়ে এলো। আমাদের ফিরবার তাড়া ছিলো। সবাই থেকে গেলো। আমরা বাপ-বেটি সন্ধ্যার মুখে ফেরার গাড়িতে উঠলাম। শৈলীর অভিজ্ঞতায় নতুন অনেক কিছু জুটেছে গত পাঁচ-ছয় ঘণ্টায়। কাঠবেড়াল, পেঁচা এবং আরও অনেক পাখ-পাখালি, নতুন কিছু মানুষের আদর-আপ্যায়ন, সর্বোপরি দাদাবাড়ি ভিন্ন অন্য কোনো গ্রামের পথে পথে বিচরণের বিস্ময়। ওর বিচারে ‘পাহাড় পাবইজান’ অন্য রকম সুন্দর এক গ্রাম। ওখানকার মানুষগুলোও অন্য রকম ভালো। ঠিক তা-ই। এক নতুন অভিজ্ঞতা। নতুন আনন্দ লাভ। ভ্রমণের আয়োজকের জন্য, তার এই প্রাণোচ্ছ্বল মামীর এবং তাঁর পরিবারের সবার জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা । 

.

“কৈশোর আহা কৈশোর! তুমি ছিলে শীতের সকালে নাড়ার আগুনে ওম
খেজুরের রসে গেলাসে গেলাসে সুখ ছিলে তুমি” (কবিতা- ফেরারী কৈশোর; কবি- মাসুম বাদল)