ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

“ভালো নেই; তবু বলি ‘মোটামুটি’
বুকের কষ্টকে বলি ‘এসিডিটি’।”

.

হ্যাঁ, ঠিক এভাবেই আমরা আড়াল করি নিজেদেরকে। সব সময় সব কথা সবাইকে যায় না বলা। শোভাও পায় না। ফলে ‘কেমন আছেন’ কিংবা ‘কী হয়েছে’র উত্তরগুলো কেবলই লোকাচার হয়ে জনে জনে দৈনিক ঝুলে থাকে। ভ্রূণের বিকাশে আড়াল থাকে। জঠরের আড়াল ছেড়ে পৃথিবীতে এলো যে সন্তান, তার শিক্ষা জীবনের শুরুতে আড়াল। দেশের শিক্ষিতদের বেশির ভাগের জন্ম তারিখ হয় ৩১ ডিসেম্বর নয়তো ০১ জানুয়ারি; কাগজে তা-ই লেখা। জালিয়াতি। কেবলই যোগ-বিয়োগের সুবিধার নামে কিংবা ভবিষ্যতে অবৈধ সুযোগের লোভে অথবা অকারণেই গুরুজনেরা আমাদের জন্ম তারিখ আড়াল করে জাতিকে মহিমান্বিত করেছেন। জালিয়াতিতে চ্যাম্পিয়ান না হলে জাত থাকে?  

.

জানালায় পর্দার আড়াল থাকে। সময়ে তা সরাতে হয়। ধর্মসভায় বক্তাগণ বয়ানের শুরুতে উপস্থিত সবাইকে এবং ‘পর্দার আড়ালে থাকা মা ও বোনেরা’ যারা আছেন তাদেরকেও সালাম দিয়ে থাকেন। ছোটবেলায় গরুর ‘পর্দা’ দিয়ে বানানো দারুণ ডুগডুগি বাজানোর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে আছে। তাছাড়া পুরুষের রুচির অনুসঙ্গে নারীর সম্ভ্রমে ‘পর্দা’র থাকা না থাকাকে জড়িয়ে বহু কুকাণ্ড ঘটে গেছে এই পৃথিবীতে। একটি বিশেষ ধর্মে এই শব্দের অতি ব্যবহারেই কি না কে জানে, ‘পর্দা’ এখন পর্যন্ত ওড়নার চেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক। তবে আড়ালের সভ্যতা লুটে গেছে তাতে— তেমন ধারণার অবকাশ কই?  সোনা-মানিক, তেল-কয়লা, ফুল-ফসল, চন্দ্র-সূর্য— সকলেই আড়ালজাত। প্রকৃতির সব সুন্দরেই কম-বেশি আড়াল রয়েছে বলে বিশ্বাস হয়।

.DSCN2687

.

আস্তিকের স্রষ্টা আড়ালপ্রিয়। নিজের অস্তিত্বকে তিনি সৃষ্টির মাঝে প্রকাশ করেছেন, জেনে নিতে বলেছেন মানুষকে। আবার মানুষের কতো নিকটে তিনি তাও স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, ‘…আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী (সূরা ক্বাফ, আয়াত ১৬)।’ অদ্ভুত খেয়াল তাঁর। এতো কাছে, তবু চোখে দেখবার নন। কোরান বিশ্বাসকারির না জানবার কথা নয়, স্রষ্টার নিরানব্বই নামের একটি হলো, ‘আল-বাতিন’; মানে হলো ‘লুকায়িত/আড়ালস্থ’। এদিকে সনাতন ধর্মমতে, নিরাকার ঈশ্বররের সাকার রূপ নিয়ে ‘ভগবান’ (ত্রিমূর্তি/ব্রহ্মা-সৃষ্টিকর্তা, বিষ্ণু-পালনকর্তা, শিব-প্রলয়কর্তা) হিসেবে পূজিত হলেও তাঁর আড়াল ফুরাবার নয়। আড়ালের অবতার দৃশ্যের অধিকার খর্ব করে বেতারযোগে প্রার্থনার সুযোগ দিয়েছেন। আবার ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিমায় সেই আড়ালের গূঢ়ার্থ খুঁজে বেড়াবার অপশনও রয়েছে।

.

মানুষও মূলত আড়ালপ্রিয়ই। তবে ‘প্রকাশ’ নামের মানুষ যদিও অনেক আছেন, ‘গোপন’ কিংবা ‘আড়াল’ নামের তেমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানুষের অন্তরে আড়াল, শরীরেও। সভ্য সমাজে এসব আড়াল মডিফাই করবার অথবা খুলবার অধিকার নারীতে-পুরুষে অসমান বলে আড়াল নিয়ে ক্যাঁচাল বাঁধে। আড়ালে আমাদের আফসোস থাকে, সুখ থাকে, দুঃখ থাকে। আড়ালে অসুখ বাসা বাঁধে; বিবিধ পরিক্ষার রিপোর্টে চিকিৎসক সেই আড়ালের সন্ধানে হয়রান। ওদিকে সুযোগে বোরখার আর টুপির আড়ালে ঘাপটি মারে শয়তান। আড়ালে দেশে দেশে দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি হয়। অফিসগুলোর অনেক বড়ো কর্তা আড়ালে মাস্তান বনে যান। দরবেশের দোকান লাটে উঠে কাত হলে পরে লাল বাতি জ্বলে বলে যারা ‘শেষ’ ভেবেছিলেন তারা তো ঠিকই দেখলেন, আড়ালে কতো দূর সমুদ্দুর! মন্ত্রী মশাই দেশের, দলের উপকার চান। তাই বোয়ালদের নামের তালিকা আড়াল করে সকলের ইজ্জত বাঁচান। বাজারের মাছ-মাংস-সব্জি-ফলে তলে তলে প্রতিদিন কতো রসায়ন প্রযুক্তির চর্চা হয়, সে দৃশ্য ক্রেতা সাধারণের দেখবার উপযোগি নয়। তবে সাংবাদিকগণ খুব খারাপ লোক বলেই শরমের, আড়ালের এসব কাণ্ডকারখানা সামনে নিয়ে আসেন। সেদিনই তো, প্রিজন ভ্যানের চিপা দিয়ে ফটো তুলে অত্যন্ত দামি একজন ভাড়াটে খুনির মুখ শেষে ছেপেই দিলেন কাগজে!  ভুল তো মানুষই করে— একথা সকলে বোঝে, সাংবাদিকগণ বোঝেন নাকি? মানুষের মনের মধ্যে কতো নিভৃত যন্ত্রণা টনটন তার ঠিক নেই, অথচ বনের মধ্যে কার্বন-টার্বন কী ছাই হবেটবে তা নিয়ে অস্থিরতায় দূষিত করে তোলা হচ্ছে দেশের বাতাস।

.

আড়ালের গল্পে সুন্দরবনের প্রবেশ নিষেধ। বনাঞ্চল না ধূ-ধূ উপকূল হবে সেটি ব্যক্তিক পর্যায়ে চর্চার স্বাধীনতায় সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করেনি— এটি স্বস্তির। কথা এবার প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে। চুপিচুপি প্রেম হলে ডুবেডুবে জলপান অমৃত সমান। আবেগে খেচর প্রাণ জমিন-আসমান মাতিয়ে বেড়ায় আবডালে। মানুষ মাত্রই জ্ঞাত-অজ্ঞাতসারে কতিপয় গোপন প্রেমে ভেসেছেন, ভাসিয়েছেন। সবটুকু দেখার অধিকারটুকু কারও কারও আড়ালের, ঔদাসিন্যের নিঠুর শিকার। রবীন্দ্রনাথ তেমন শিকার হয়ে থাকবেন নিশ্চয়ই। তা না হলে একথা বলতেন বলে তো মনে হয় না,

এসেছিলে তবু আস নাই   জানায়ে গেলে

সমুখের পথ দিয়ে   পলাতকা ছায়া ফেলে॥

তোমার সে উদাসীনতা   সত্য কিনা জানি না সে,

চঞ্চল চরণ গেল ঘাসে ঘাসে   বেদনা মেলে॥’

https://www.youtube.com/watch?v=3nGF2UipsAw

.

রাতের মতো আড়ালও গভীর থেকে গভীরতর হয়। জটিল থেকে হয় যৌগিক। বিস্মৃতও হয় অনেক সময় এক সময়ের তুমুল আগুন। আবার দুঃসহকে সয়ে সয়ে, দুর্বহকে বয়ে বয়ে মানুষের আবেগিয় আড়াল আকারে বড়ো হয়। তখন কাছে যাওয়া মানে দূরে ঠেলে দেওয়া। আবার দূর মোটেও তেমন দূরে নয়। যেমন হেমন্ত গাইলেন,

 ‘কাছে গেলে যায় সে দূরে

ফিরলে ফিরায় বাঁশির সুরে

সে লুকিয়ে বেড়ায় ক্ষণে ক্ষণে

আড়াল পথে আমার মনে

কেউ জানে না।’

https://www.youtube.com/watch?v=wyb2LQV_oZU

.

এই ফাঁকে গায়ত্রীর গল্পটা একটু বলে নেওয়া দরকার। গল্পকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। “গায়ত্রী। বিষু বাবুর্চির বড়ভাই বিলাস বাবুর বড় মেয়ে। আমাদের গাঁয়ের গা ঘেঁষে গড়েরগাঁও; গতানুগতিক ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম বটে, কিন্তু মানুষগুলোর মন মাটির মতো মায়াভরা, ঘন ঘাসের সতেজ সবুজের মতো স্নিগ্ধ, গভীর ঘনিষ্ঠতায় টইটুম্বুর। হবে না? ও যে গায়ত্রী’র গাঁ। স্কুল থেকে ফেরার পথে হাঁটতে হাঁটতে ওদের বাড়ীর বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম আর আমার চৈতন্যজুড়ে শুরু হতো আট দশমিক সাত মাত্রার মুহুর্মূহু ভূমিকম্প–বাড়ীর পথে যেতে যেতে কতবার যে ভেঙ্গেছি আর গড়ে উঠেছি তার হিসেব কে জানে? এরপর থেকে উল্টানো কোন বড় কলসী, বড় বাতাবি দেখে কিংবা সীমের/গমের ক্ষেতে গেলে কেন জানিনা প্রায়শঃ গায়ত্রী’র চিত্রকল্প দেখতে পেতাম। তারপর কত বছর কেটে গেছে!” এরকম করে দর্শনের সামান্যতাকে কল্পনায় ভয়াবহ করে তুলে তাকে উদ্‌যাপন করা যায়। আজকাল ভার্চুয়ালি কতো কিছু চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয়রূপে অধিকারে আসে মানুষের! কবিগুরু বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই বলতেন, “কেমন করে ঘুরছে মানুষ/ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে/ ঘোর থেকে ঘোর ঘোরান্তরে/ছুটছে তারা কেমন করে…।”

 .

অন্তর্বাসের রঙয়ের মতো সুবোধ কিছু আড়াল ভালোবাসায় এসেনশিয়াল হয়। আড়ালে অভিলাষ জমে রগরগে হয়, ঘিনঘিনে হয়। অস্থির মন; কখনও স্খলনে নিশ্চিত হয় অবদমন। ছোটো-বড়ো নানা পতন-স্খলনের ইতিহাস বেয়ে মানুষের জীবন একদিন শেষ শ্বাসে উড্ডীন হয়। হ্যাঁ, স্খলন বহু প্রকারের হয়। ফাঁসির রায় হয়েছিলো ‘রুসু খাঁ’র‘, মনে আছে? চাঁদপুরের মদনা গ্রামের ছিঁচকে চোর যে কি না ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার‍ হয়ে ওঠেছিলো। ভালোবাসার বঞ্চনা নাকি তাকে হন্তারক করে তুলেছিলো। রুসু খাঁ’র মতো কিংবা তার চেয়েও বেশি বঞ্চনা সয়ে সয়ে বহুজন একদিন ওরকম বা অন্যরকম বিষ্ফারিত হয়। আবার অতি আদরেও তারও চেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে যে কেউ যখন তখন। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে তার নজির নেহায়েত কম নয়, যদিও সকলেই সমান নয়।

.

যতোদিন ঘর আছে, ততোদিন ঘোর থাকবে। মোহাবিষ্টের আড়ালের অধিকার দুর্লভ হলে বা না হলেও, তাকে পেলেই সবাই আগ্রাসী হয় না। ধর্মের, আইনের, জনগণের ভয়েটয়ে নয়, একেবারেই স্বাধীন সিদ্ধান্তে অনেক আড়াল আগলে রাখার মতো মনোবল থাকেই তো অনেকের। এভাবেই টলোমলো অনেক কিছুই শেষতক ধ্বসে না গিয়ে ঠিকঠাক শক্ত ভিতের পরে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই আশাতে ঘুম ঘুম ভালোবাসা ছায়ায়-ছায়ায় সুন্দর থাকে। সুন্দর থাক।  

সুনীল ঠিকই বলেছেন,

“সুন্দর লুকিয়ে থাকে মানুষের নিজেরই আড়ালে 
মানুষ দেখে না, 
সে খোঁজে ভ্রমর কিংবা 
দিগন্তের মেঘের সংসার।”