ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

‘মাদার ল্যাংগুয়েজ’ তথা ‘মাতৃভাষা’ নামকরণে যাদের আপত্তি আছে তাদের যুক্তিগুলো রসাত্মক। প্রথমটি হলো, এটি লৈঙ্গিক পৈতাবাহী শব্দ। তাদের মতে, আধুনিক ভাষার ব্যবহারে যেখানে প্রতিনিয়ত এ ধরণের শব্দ পরিহারে সকলে বদ্ধপরিকর, সেখানে ভাষা শব্দটিকেই লিঙ্গ পরিচয়ে একপেশে করে রাখা হয়েছে। স্পাউস, পেরেন্ট্‌স, চেয়ারপারসন, সিবলিং, কেবিন ক্রু, সেল্‌স পারসন, হৌম হেল্প, ইমপার্সোনাল প্রোনাউন ‘ওয়ান’ ইত্যাদি সব শব্দ/শব্দগুচ্ছ  নিঃসন্দেহে চমৎকার, কিন্তু সেই ধারাবাহিকতার বিপরীতে ‘মাতৃভাষাকে’ প্রতিষ্ঠা দিয়ে পৃথিবীর সকল পিতাকে অসম্মান করা হয়েছে। আবার অন্যদিকে, নারীর জন্যও নাকি এটি শোভনীয় নয়। ‘ওয়াইফ’ শব্দটি ভালো লাগে না, কিন্তু ভাষায় নিজের লিঙ্গ সংশ্লিষ্টতা ভালো লাগে— এটি নাকি অদ্ভুত এবং কিছুটা অশ্লীলও। তাই সকলের স্বার্থে মাতৃভাষা না বলে স্বভাষা (ইংরেজিতে ‘ন্যাটিভ ল্যাংগুয়েজ’ আব ‘ফার্স্ট ল্যাংগুয়েজ’) বলা উচিত বলে তারা মনে করেন।

.

বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখা যায়। শিশুর প্রথম শেখা ভাষাটি তার মায়ের তথা তার নৃতাত্ত্বিক পরিচয়বাহী ভাষা নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অনেক বিদেশি নাগরিক আছেন যারা তাদের মায়ের ভাষাটি বলতে পারেন না। অনেকেই জন্মের পরপরই মাকে হারিয়েছেন। যার ভাষার বিকাশে মায়ের কোনো অবদান নেই তার মাতৃভাষা কী হবে তবে? এক্ষেত্রে তার মাতৃভাষা তার মায়েরটিই। আর সন্তান হিসেবে তার মায়ের প্রথম ভাষা আর তার নিজের প্রথম ভাষা অভিন্ন নয়। সুতরাং মাতৃভাষা মানে তবে সর্বদা স্বভাষা বা প্রথম ভাষা নয়। 

.

বাঙালির কাছে মাতৃভাষার আবেদন পৃথিবীর আর কোনো ভাষাভাষীর মতো নয়। তাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের এই প্রিয় ভাষাটিকে নিয়ে অহঙ্কার হবারই কথা। বাংলা ভাষার ইতিহাসের এই অমর দিন ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিকভাবে পালনের সিদ্ধান্ত ভাষাটিকে তো বটেই, আমাদের নিজেদেরকেও অনন্য সন্মানে বিশ্ব দরবারে অধিষ্ঠিত করেছে। শোক দিবসটি তাই এখন আর শুধুই শোকের নয়। আত্মমর্যদায় নিজের অবস্থানকে অনুভবের আরেকটি দিন। এটি আনন্দেরও। আবার এদিনে ভাষার কথা ভেবে দুশ্চিন্তাও যদি কারও হয়, সেটিও অস্বাভাবিক নয়। 

international-mother-language-day-21-february

বিশ্বজুড়ে মানুষের ভাষা এখন দারুণ সব মিথষ্ক্রিয়ায় নিয়মিত বিচিত্র সাজে উপস্থাপিত হচ্ছে। গত দেড় দশকে বাংলাদেশে তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ অন্য অনেক কিছুর সাথে আমাদের ভাষাকেও বিভিন্ন ভাবে প্রভাবিত করেছে। কম্পিউটার থেকে ইন্টারনেট সুবিধা মোবাইল ফোনে গড়ানোর সাথে সাথে দেশব্যাপী প্রযুক্তির যে প্লাবন বয়ে গেছে তাতে যেমন আমরা ভেসেছি, আমাদের ভাষাও ভেসেছে অনেক দূর। এই ভাসাভাসি বৈপ্লবিক তাতে সন্দেহ নেই। দোকানপাট, মার্কেট, সাইনবোর্ড, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, পাঠদান পদ্ধতি, আমাদের অবসর বিনোদন সবকিছুতে এখন এই ডিজিটাল প্লাবনের স্বাক্ষর। চোখ ধাঁধাঁনো আলোর সাইনবোর্ডে, ফেইসবুকে, ভিডিও কথোপকথনে আমাদের অভ্যস্ত হতেও খুব সময় লাগেনি।

.

আমরা সহসাই অনেকগুলো বিদেশি শব্দকে আমাদের করে নিয়েছি। নেট ব্রাউজিং-এর অশান্তি ছিলো, যখন ডেটা স্পিড সাতাশ কেবিপিএস থেকে আর উপরে যেতো না। ভিডিওতে ক্লিক করলে বাফারিং-এর সেই অসম্ভব অপেক্ষার দিন ঘুচিয়ে দেশে থ্রিজি ইন্টারনেট এসেছে। স্মার্টফোন হাতে হাতে সব বয়সীর। ফোনের কলরেটও কমে এসেছে। এখন শুধু কল, টেক্সট (বা এসএমএস) নয়, লাইভে থাকা যাচ্ছে, টাইমলাইনের স্ট্যাটাস, লাইক, শেয়ার আর ছবি আপ্লোডানো তো আছেই। অনলাইনে পড়াশুনা, ইউটিউবে নাটক-সিনেমার মতো বিবিধ বিনোদনের আঞ্জামে এতো যে শব্দের অনুপ্রবেশ— সে তো ওই প্লাবনের কল্যাণেই।

.

বিশ্বায়নের ফলে এখন বিভিন্ন ভাষাভাষীর পারস্পরিক ব্যবসায়িক যোগাযোগে ‘লিঙ্গুয়া ফ্র্যাংকা’র (যেমন ইংরেজির) অশুদ্ধ প্রয়োগেও কিছু আসে যায় না যদি মূল বক্তব্য উভয়ের কাছে স্পষ্ট হয়। তাই বলে ভাষার বিশুদ্ধতাকে সামগ্রিকভাবে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আমি যদি ইংরেজিতে ‘আই এ্যম কাম ফ্রম বাংলাদেশ বলি’, তবে শ্রোতার কাছে আমার কথার অর্থের সাথে আমার শিক্ষার করুণ চিত্রটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তেমনিভাবে সেমিনারে বিজ্ঞ আলোচকের মুখে ‘দারিদ্র্যতা’, ‘সখ্যতা’ শুনতেও নিশ্চয়ই ভালো লাগার কথা নয়। আর মাতৃভাষা, পিতৃভাষা, স্বভাষা যা-ই বলি না কেনো, বাঙালি নামধারী হয়ে বাংলা ভাষার প্রতি দরদহীনতা নিজের জন্য কলঙ্কজনক। তাতে অবশ্য ভাষার কিছু আসে যায় না। ভিন্ন ভাষার শব্দ এসে নিজের ভাষায় জড়াবে— এতে দোষের কিছুও নেই; কিন্তু তার মানে যদি এই হয় যে, প্রমিত বাংলা ব্যবহারে দেশের সর্বোচ্চ স্তরের শিক্ষিতরাও অপারগ, তবে মারাত্মক দোষের।

.

নিত্য ব্যবহার্য ভাষা হিসেবে আমরা বাংলার সাথে ইংরেজিকে আপন করে নিয়েছি। কষ্টের বিষয়টি হলো, ইংরেজিকে ‘শুদ্ধরূপে লিখিতে, পড়িতে এবং বলিতে পারার জন্য’ আমাদের যতো তোড়জোর, বাংলার ব্যাপারে ঠিক তার বিপরীত। স্কুলে, কলেজে বাংলা ব্যাকরণ আর রচনার মুখস্তপাঠ ছাড়া প্রমিত বাংলার কোনোরূপ চর্চা এদেশে এখনও ‘ব্যাতিক্রম’ অভিধা থেকে মুক্তি পায়নি। তার চেয়েও যন্ত্রণার যা, তা হলো, ইংরেজির জন্য এতো কিছু করেও আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে ইংরেজি ব্যবহারে সক্ষম করে তুলতে পারছি না।

.

গ্রামের কথা নয়; যে কোনো শহরের শিক্ষার সামগ্রিক হালচাল সম্পর্কে মোটামুটি ওয়াকিবহাল যিনি তিনি স্বীকার করবেন, দেশের অধিকাংশ শহুরে স্কুল-কলেজে পাঠদানের ভাষা যাচ্ছেতাই। যে কোনো অজুহাতে শুদ্ধ বাংলার চর্চা যেনো ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে পারলে বাঁচি আমরা। দেশের শিক্ষিত কিশোর-তরুণদের একটা বিরাট অংশ আমাদের চোখের সামনে ভাষা প্রতিবন্ধী হয়ে বড়ো হচ্ছে। সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তো তবু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, রচনা প্রতিযোগিতা ইত্যাদির চল আছে; অন্যগুলোতে এসবকে বলতে গেলে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে, পাছে পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটে, জিপিএ খারাপ হয়! যাদের এসব দেখভাল করার কথা তারা আরও অনেক কাজে ব্যস্ত থাকায় উদ্যোগ সব স্বপ্ন হয়ে ঝুলছে দিবস পালনের আলোচনায়। ফলে মানুষের উচ্চারণে, টিভির বিজ্ঞাপনে, ফেইসবুকের স্ট্যাটাসে, পরিক্ষার খাতায়, ইমেইলে, জনসভার মঞ্চে, বিলবোর্ডে, দোকানের সাইনবোর্ডে, লিফলেটে, পোস্টারে, অটোতে, রিক্সায় অবিরাম অশুদ্ধ বাংলার উৎসব চলছে…এবং চলবে।

.

পাঠক, যদি ভেবে থাকেন আমি বাংলায় বিরাট পণ্ডিত, তাহলে ভুল হবে। আমার যথেষ্ট সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও আপনি খুঁজলে এই লেখাতেও ভুল বেরিয়ে আসবে— এ বিশ্বাস আছে। বাংলা বানানের চরম দুর্দশা থেকে গত দু-তিন বছরের চেষ্টায় অনেকটাই উঠে আসা সম্ভব হয়েছে; বাকিটা হবে বলে আশা করছি। ভাষার প্রতি দরদ না থাকলে ভাষার উৎকর্ষ আসে না— এই উপলব্ধি থেকেই নিজের শব্দের ব্যাপারে যত্নবান হতে চেষ্টা করি। নিচের তালিকায় যেসব ভুলের হিসেব দেওয়া আছে, সেগুলো থেকে নিজের মুক্তি বেশি দিনের নয়।

.

Facebook 4

.

বাংলার সাথে ইংরেজির মিশেল নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে থাকেন। এরকম মিশেল পৃথিবীর অপরাপর ভাষাতেও অহরহ হচ্ছে। একজন বাইলিঙ্গুয়াল, যিনি দুটো ভাষাকেই স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহারে পারঙ্গম, এমনটি করতেই পারেন সাধারণ কথাবার্তায়। কিন্তু দুটো ভাষার কোনোটিরই সঠিক জ্ঞান না থাকার ফলে যদি এহেন মিশেলে মনযোগ বাড়ে তবে তা ভাষার মিশেল না হয়ে জগাখিচুরি হয়। আর ভাষার জগাখিচুরি বাবুর্চির পছন্দজাত নয়, অনটনজাত। এখানে খুব প্রাসঙ্গিক বলেই ফেইসবুকের বন্ধুতালিকার একজন সম্মানিত শিক্ষকের বিচিত্র এই অভিজ্ঞতার কথা পাঠকের সাথে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না—

.

“সম্প্রতি একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে শ্রোতা হিসেবে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিলো। বক্তা আলোচিত টিভি ব্যক্তিত্ব। আমি তাকে ভীষণ পছন্দ করি। শ্রদ্ধাও করি। সাহসী ও সুবক্তা হিসেবে খ্যাতিও ঢের। আলোচনার বিষয় ছিলো: বিউপনিবেশীকরণ: মাতৃভাষায় শিক্ষা ও জাতীয় জাগরণ।

সম্মানিত বক্তার বক্তব্যটা ছিলো অনেকটা এরকম :

আমরা রাষ্ট্রের ভেতরে কয়েকটি ক্লাস তৈরি করেছি। তাদের মধ্যে একটি হলো এলিট ক্লাস। দে আর সামহাউ অলওয়েজ কলোনাইজড। তারা ভৌগোলিক বাঙালি, বাট তারা ইডিওলজিক্যালি বাঙালি নন। সো আমাদের মেন্টালিটি ওভাবেই প্রতিনিয়ত জেনারেট হচ্ছে। এতে রিসেন্টলি মিডল ক্লাসও সংযুক্ত হচ্ছে। তাদের হাতে পাওয়ার এবং বিত্ত উভয়ই। দ্যাট মিনস বোথ সাইডে তারাই পাওয়ারফুল। এবং লক্ষণীয় যে, দে আর মেইকিং নিউ প্রবলেম। নব্য ধনিক শ্রেণি এদের সঙ্গে ইনভলবড হচ্ছে। আমরা কিছুই করতে পারছি না। আমাদেরকে বলা হচ্ছে তোমরা পরকালে পাবে। ইহকাল আমাদের। বেসিক্যালি আমরা আমাদের কালচারকে ধরতে পারিনি। কালচার কী? কালচার বলতে আমি বুঝি- ইট ইজ অ্যা ট্রি এন্ড ইট’স ফ্লাওয়ারস আর কালচার। দেখুন, আমাদের ল্যাঙ্গুয়েজ মুবমেন্ট কিন্তু একটি এ্যান্টি কলোনিয়াল ভিউ থেকে হয়েছিলো। বাট আমরা সেটা ভুলে যাই। সো উউ শুড চেঞ্জ আওয়ার ভিউজ। বিকজ আমরা দেখছি যে, যারা ইংরেজি মাধ্যম কিংবা ইংলিশ ভার্সনে পড়ালেখা করছে তারা দ্রুত চাকরি পাচ্ছে। পক্ষান্তরে বাংলা মাধ্যমের ছেলেমেয়েরা সে অ্যাডভান্টেজটা পাচ্ছে না। আমরা নাইনটিন সেভেনটি ওয়ানে কী দেখেছি- আমরা দেখেছি আমরা একটি বিষয়ে যথেষ্ঠ ইউনাইটেড ছিলাম এবং ফাইট করেছি। বাট এখন আমরা বহুমাত্রিক ইডিওলজি দ্বারা প্রভাবিত। কে কার ওপর সওয়ার হয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারবো এটাই আমাদের গোল। অর্থাৎ আনকনশাস মাইন্ডে আমরা কিন্তু কলোনিয়ালই থেকে গেলাম। সোজা কথা স্টিল আমরা কলোনাইজড। আমরা ডিকলোনাইজেশনের কথা বলছি কিন্তু কলোনিয়াল ভাবনাগুলোকে রিমুভ করতে পারছি না। পারছি না কেন, বিকজ এর বিরুদ্ধে গেলেই কারো না কারো এগিনেস্টে চলে যেতে হয়। দিস ইজ দ্য ফ্যাক্ট। দেন কীভাবে আমরা চেঞ্জ নিয়ে আসবো? সো আই থিংক প্রথমত আমাদের মানসিক পরিবর্তন-ইট ইজ ভেরি ইম্পরটেন্ট। আপনাদের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম। জাস্ট আমার ভিউজগুলো শেয়ার করলাম। লাস্টলি বলতে হয় আপনাদের টপিকটা চমৎকার- মাতৃভাষায় শিক্ষা ও জাতীয় জাগরণ। আমার ভালো লেগেছে।”(https://web.facebook.com/maksudul.alam.18/posts/744608885695955)

.

পরিশেষে বলতে চাই, আসুন, ইংরেজি-হিন্দি-নেপালি-গুজরাটি-আরবি-ফার্সি-ইত্যাদি যে যা পারি কপচাই; তবে তা যেনো ঠিকঠাক হয়, সে চেষ্টাটুকুও করি। সর্বোপরি বাঙালি হিসেবে বাংলাটাকে শুদ্ধরূপে ব্যবহারে আরও মনযোগি হই। বাংলা আসলেই অসাধারণ সুন্দর ভাষা।

————————–

শহীদ মিনারের ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে।