ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 
শব্দের ব্যবহারে আমরা সত্যিই অনেক এগিয়েছি। উচ্চারণে সুভাষণ (ইউফেমিস্টিক টার্ম), লিঙ্গবৈষম্যহীন সম্বোধন (ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দর পরিবর্তে শিক্ষার্থীবৃন্দ, নেত্রী না বলে নেতা ইত্যাদি) আমাদের ভাষার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বলে ভাবা যাচ্ছে। .ইংরেজি শব্দের বাংলায় মুঠোফোন এবং অন্তর্জাল শব্দবন্ধদুটি দারুণ আবিষ্কার। এমন আরও আরও পেতে ইচ্ছে করে। বুঝি, ভিন ভাষার শব্দকে বাংলায় রূপান্তর সহজ কাজ নয়, যতোটা সহজ বাংলাটা বাদ দিয়ে অন্যটা নেওয়া। ফলে আমাদের প্রাণের ভাষা শব্দগত এই পরিবর্তন-বর্জনের ধারায় সমৃদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাকে গ্রহণের পরিবর্তে বর্জন চরমে যাচ্ছে। তাতে যে অন্য কোনো ভাষায় বাঙালির দক্ষতা ব্যাপকতর হয়েছে, সেরকম বিশ্বাসের সুযোগও নেই। মাঝখান থেকে উচ্চারণে এবং লেখায় ইদানিং খোঁজ মিলছে না অনেক শব্দের। যেসব শব্দ হারাচ্ছে, তারা মাটির গয়নার মতো পরবর্তিতে আবার ফিরে আসবে তেমনটি সুস্থ থাকা অবস্থায় ভাবা যাচ্ছে না। যেমন সার্টিফিকেট এসে সনদকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। এইচএসসির বা এসএসসির বাংলাতেও সার্টিফিকেট কথাটি আছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর মতো বাংলা নামের অধিকার এগুলোরও তো ছিলো!
.
শিক্ষিত আমাদের বিরাট একটা অংশ প্রমিত বাংলায় ভয়ানক অপারগ। অফিসের বড়কর্তা সব সময় কথা বলছেন বিশ্রী বাংলায়, শিক্ষকগণ ক্লাস করাচ্ছেন বিশ্রী বাংলায়। বক্তৃতা চলছে বিশ্রী বাংলায়। পরীক্ষার খাতায়ও এর প্রভাব সর্বত্র। তবে ফেইসবুকের স্টেটাসের নাম করে হলেও অনেকের বাংলা চর্চা নিয়মিত হয়েছে। শুদ্ধ বানানে লেখা, শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলাকে বলার প্রবণতা আমিসহ (নিজের বয়স সত্তুর হলেও তরুণই আমি) অনেক তরুণের মধ্যে লক্ষণীয়। ভালো যা, তাকে তো ভালো বলতেই হবে। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়-
.
১। ছিলেন কাজের বুয়া, হয়েছেন ‘এসিস্ট্যান্ট‘
২। ছিলেন পিয়ন, হয়েছেন ‘অফিস সহায়ক‘
৩। ছিলেন ‘পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা’, হয়েছেন ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা’
৪। ছিলেন বেশ্যা, হয়েছেন ‘যৌনকর্মী’
৫। ছিলো পশুসম্পদ, হয়েছে ‘প্রাণিসম্পদ‘
৬। ছিলো বড়া, হয়েছে পাকুড়া
এগুলোর মধ্যে ‘অফিস সহায়ক’ আর ‘প্রাণিসম্পদ’ এ দুটো শব্দবন্ধ আমার খুব ভালো লাগে। তেমনি ‘রিক্সার ড্রাইভার’ কথাটিও সুন্দর। তবে বাসার এসিস্ট্যান্টকে মারধর, অফিস সহায়ককে সামান্য কারণে ধমকানো, নিজের চেয়ে বয়সে অনেক বড় ড্রাইভার লোকটার রিক্সায় বসে তাকে তুই বা তুমি বলার ধৃষ্টতা কিংবা তার সাথে দুর্ব্যবহার করা–এসব কমেছে বলে মনে হয় না। ঠিক তেমনি স্মার্ট ‘প্রথম আলোর’ মতো ‘উটপাখির নয়, মানুষের জীবন চাই’ টাইপের আনস্মার্ট বাণী কিংবা শুয়োর বা শুয়রের বাচ্চা, কুত্তা বা কুত্তার বাচ্চা, গাধা বা গাধার বাচ্চা ইত্যাদি প্রাণী সংশ্লিষ্ট গালির মাধ্যমে যে মূলত মানুষের চেয়ে ওসব প্রাণীরই অধিকার ক্ষুন্ন হয়, তাদেরকে অপমান হয় সেটা কে কাকে বোঝাবে? এর চেয়ে বরং শয়তান টাইপের, বা গড ফাদার টাইপের বা ঘোষখোর টাইপের কোনো ভিসির, মন্ত্রীর সাংসদের, ব্যবসায়ির বা মজুতদারের নাম ধরে গালি দিলে ভালো হতো নিশ্চয়ই; মানুষের জন্য গালি মানুষ দিয়েই। যেমন মীর জাফরের নামে গালি হয়।
.
বেশ কিছু বাংলা শব্দ যেনো খব দ্রুত বিলুপ্তির মুখে পড়ে গেছে। যেমন জবাব বা প্রত্যুত্তর থেকে রিপ্লাই, পছন্দ করা থেকে লাইক করা, তালা দেওয়া থেকে লক করা, বদলানো থেকে চেইন্জ করা, বাচ্চা থেকে বেইবি, মটর সাইকেল থেকে বাইক, চুলা থেকে ওভেন, কড়াই থেকে প্যান, শরবত থেকে জুস, ভাজি থেকে ফ্রাই, মুরগি, খাসি আর গরুর মাংস থেকে চিকেন, মাটন আর বিফ, বকেয়া থেকে ডিউজ, পরিক্ষা থেকে এক্সাম। যেগুলো বদলে গিয়ে নতুন এসেছে, আসছে সেগুলোও আদতে সব খাঁটি বাংলা– তেমনও নয়। তবু এই সান্ত্বনায় মন ভরে না। মনে হয়, ইংরেজি এসে এভাবে খেয়ে খেয়ে যেতে থাকবে সেটি কী করে হয়? ইংরেজিকে বাংলায় রূপান্তরগুলো করার গরজ বোদ্ধাদের আরও বেশি হলে ভালোই তো হতো।
.
আমার প্রবলেম নেই। আমিও শেষমেষ ঝাঁকের কৈ-ই। ভেবে নিই, সবই স্বাভাবিক পরিবর্তনের নিয়মেই হচ্ছে। তবু টেনশন হয়। টেনশনে টেনশনে শেষরাতে সেহেরি সেরে ওঘরের ওই বদনাটার জন্য মায়া হয়। চেয়ার, টেবিল তো ভালই মানিয়েছে বিদেশি হয়েও। বদনাটা কেমন বদ বদ লাগে। আহা, প্রিয় বদনাটার একটা সুন্দর বাংলা নাম যদি দেওয়া যেতো!
.
দিনশেষে এহেন ভাষাপ্রেম আর আফসোসের কথায় বেরসিক বন্ধু খোঁচা মেরে দিল, “আগে বলেন বদনা বা বদনী কোন ভাষার শব্দ? আর আপনিও তো টেনশনে ভোগেন। দুশ্চিন্তা তো দেখিনা আপনার!”  মোক্ষম জায়গাটায় হিট করেছে ব্যাটা। কে জানে কোন ভাষার? খালি মনে হয় বাংলার নয়। হিন্দির হতে পারে। লোটা-বদনা একই উৎসজাত মনে হয়। আর হলে বা না হলেও, এমন কি বাংলারও যদি হয়, ব্যক্তিগত মত হলো, এটা যুতের না। আরেকটু ভালো শব্দ হলে ভালো হতো। এই উপমহাদেশে মানুষের ধর্মীয় আচারে পবিত্রতা, শূচি-অশূচিতে বদনা আছে থাকবে। বদনা-বদনি-লোটার ভূমিকা পূজোয়, গোসলে, ওযুতে আর শৌচকর্মে আছে থাকবে। তবু এতো থাকা সত্ত্বেও দেখি, এটি টয়লেট-এ থাকে বলেই কিনা, একে ওরকম গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কাঁসার, পেতলের, চিনেমাটির, সোনার, রুপার, প্লাস্টিকের বদনার প্রদর্শনী হতে পারতো দু-চার-পাঁচটা। কিন্তু কই? হইলো না তো!