ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

মিডা আমগাছ। রসুইন্যা আমগাছ। চুক্কা আমগাছ। তৃতীয়টার ফলন খুব বেশি হতো। একটু লম্বা যাঁরা, ছোটখাট কাঠি দিয়ে নাগাল পেতেন সহজেই। ধান কাটার জন্য যাঁরা দূরের গ্রাম থেকে আসতেন এদিকের কৃষকের হয়ে কাজ করতে, তাঁরা কোনো কোনো ভয়ানক রোদের দুপুরে দু-চারটে চুক্কা আম পেড়ে নিয়ে ছায়ায় বসে মরিচ লবণ দিয়ে কামড়ে খেতেন। আমরা দেখতাম। অমন ভয়ঙ্কর চুক্কা আম খাওয়ার সাহস আমাদের ছিলো না। এমনকি পাকলেও। অথচ একই আঙিনায় কয়েক গজ দূরেই বাকি যে দুটি গাছ, ওগুলোর আম কতো সুস্বাদু ছিলো! কাঁচাই খাওয়া যেতো।

DSCN0003

খড়ের আগুনে শুকনো মরিচ পুড়ে নিতে দু-তিন মিনিট। আরও কয়েক মিনিট যেতো পাটায় খানিকটা লবণ ঢেলে ওগুলোকে গুঁড়ো করে নিতে। তারপর সেই বিচিত্র, লোভনীয় ঝালের সাথে ফালি করে কাটা ওই রসুন ঘ্রাণের কাঁচা আমের সঙ্গ— আমাদের অভিজ্ঞতায় এখনও বিখ্যাত হয়ে আছে। একই উপাচারে কামরাঙ্গা আর কাঁচা তেঁতুলও দুর্ধর্ষ হয়ে জিহ্বায় হানা দিতো। তবে ওই যে বললাম, অতি টকে আমার ভীতি ছিলো। যেমন জলপাই। সমস্যাটা দাঁত নিয়ে। পুরো দু’পাটি দাঁত টকে বিবশ হয়ে থাকতো। অন্য কিছু আর চিবিয়ে খাওয়ার উপায় থাকতো না। বিশ্রীরকমের অস্বস্তিকর শিরশির।

জানলার ধার ঘেঁষে পড়ার টেবিল। হারিকেনের হলদে আলোয় অন্ধকার সুন্দর দেখায়। তার উপর যদি জ্যোৎস্নার রাত হয় তবে তো কথাই নেই। জানলা দিয়ে ওই নরম আলো ঘরে আসার আগেই চট করে উঠোনে চলে আসা যেতো। ঝিরিঝিরি বাতাসে বাঁশঝাড়ের পাতাগুলো কোমল শব্দে দুলতো। আর ওদের ফাঁক গলে জ্যোৎস্না এসে উঠোনটা ভরিয়ে দিতো। গরমের অজুহাতে রাতের বেলা বাইরে এসে কিছুক্ষণ হাঁটা যেতো। পথের ধারে দাঁড়ালে বাতাসের উদার শুশ্রূষা বুক ভরিয়ে দিতো। এসির বাতাসের সাধ্য কী তার সমান হবে? এখন বৃষ্টির আগে-পরে হঠাৎ ওরকম বাতাসের ঝাপটা পাওয়া যায়। পোড়া মরিচের ঘ্রাণ ঠিক পাওয়া যায় ওরকমই। কিন্তু বাঁশঝাড়ের মাথার উপর চাঁদের ওই চেহারা অনেকদিন দেখা হয় না।

কোনো কোনো দিন খুব গরম যেতো। পড়তে বসে ঘামতে হতো বেজায়। হাতপাখা ছিলো। ম্যানুয়ালি কতো চালানো যায়? বাতাস পেতেও গতরখাটা! তার চেয়ে নিরবে ঘেমে যাওয়া শ্রেয়তর। ওরকম থমথমে বৈশাখে-জ্যৈষ্ঠে, ঘরে বসে পরিক্ষার পড়া পড়তে গিয়ে মন সরে যেতো অনেক দূরে। এন্টার্কটিকা মহাদেশের কথা ভেবে ভেবে শরীরকে মহাশয় করে নেওয়া গিয়েছিলো। কখনও ওইসব শীতল ভাবনার নৈঃশব্দ্য ভাঙতো বাইরে আমপতনের শব্দে। দৌড়ে গিয়ে ওই চুক্কা গাছের নিচে টর্চের আলোয় ওটা খুঁজে পাওয়া যেতো। খাবার অযোগ্য আম, তবু কুড়ানোর মজাটা অভিন্ন ছিলো।

DSCN0004

খুব বৃষ্টি হতো কোনো কোনো দিন। এখনও যেমন হয়। বৃষ্টির দিনে আমের শরীর বেয়ে তুমুল জলের ধারা নামতো। ভিজে ভিজে এদিক-ওদিক দৌড়াতে গিয়ে ওই দৃশ্যে চোখ আটকে যেতো। তবে তাকিয়ে থাকা যেতো না বেশিক্ষণ। ঘন বৃষ্টিতে চোখ ভিজে একাকার। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যেতো।

কীভাবে যেনো বছর বছর একটা ঝিনুকের খোল জুটে যেতো। স্কুলের বারান্দার ভাঙা কোণে ওটাকে ঘষে ঘষে আমের খোসা ছড়ানোর যন্ত্রটা বানিয়ে ফেলা যেতো। আর পাকা আম খেতে গিয়ে এখনও মনে পড়ে, তখন আঁশওয়ালা আস্ত আম এক হাতে সামলাতে গিয়ে আমের রস কনুই অবধি গড়াতো। কতোবার যে আমের পোকা গলায় যাবার আগ মুহূর্তে জীবন নিয়ে বেরিয়ে এসেছে তার ঠিক নেই। নৈ খেলাটার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নাম। খেলা হয় নিশ্চয়ই এখনও। আমের আঁটি ছুঁড়ে আরেক আঁটিকে ছুঁয়ে দিয়ে খেলা। কনুই দিয়েও ঠেলতে হতো আঁটি। কখনও কখনও কনুইয়ের চামড়া ছড়ে যেতো।

আমাদের ওই আমগাছগুলো গত হয়েছে বেশ আগেই। তবে দেশে আমগাছ এখনও আছে। এখন বৃষ্টি হলে ওরকম আম গাছে, আমের গায়ে জলের ধারা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এখনও আম খাওয়া যাচ্ছে। না, ওসব আনন্দের দিন ফিরে পাবার জো নেই। তবে স্মৃতিতে কাতর হওয়ার সময় আলগোছে হয়েই যাচ্ছে। আম খেতে খেতে আমের আঁটি খামছে ধরে পুরনো সে আনন্দকে মুঠোয় পুরে নেবার প্রয়াসটাও আনন্দময়। সুন্দর যা গেছে, তার জন্য ব্যথার দিন ফুরিয়েছে। ও যে ছিলো এবং আমারই ছিলো—এই ভেবেও কি কম আনন্দ হয়?

আম খেতে খেতে এসব ভাবা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলি, কাঁঠাল কেটে দিয়ে আমকে জাতীয় ফল করে দিন। জাতীয় গাছের ফলও জাতীয় হোক। আম এর সাথে তো কাঁঠাল থাকছেই। মনে হচ্ছে শহরে-গ্রামে লিফলেট বিতরণ করা হোক। ওতে লেখা থাকুক, অতিমাত্রায় অর্থকড়ি-সোনা-দানা যেমন মানুষের বিপদের কারণ হয়ে ওঠতে পারে, তেমনি শুধু কলার খোসা না, আমের খোসা বা আঁটিও বিপদজনক হয়ে ওঠতে পারে।

হঠাৎ এখানে গরমরাতে ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলে, চোখ বন্ধ করে বিগত সেই শৈশবকে ফের অধিকার করে নেওয়া যায়। দেখা যায়, ওই তো আমি! পাকা আমে ঘর ভরা। যতোগুলো পারা যায়, খেয়ে নিয়ে ভ্যাপসা রাতের আন্ধারে আমাদের সেই বিছানায় বাবার পাশে শুয়ে আছি। প্রচণ্ড গরম। বাবা হাতপাখায় বাতাস করছেন। আমার শরীর শীতল হয়ে আসছে। আমার ঘুম চলে আসছে। জীবন এইভাবে অনন্য হয়ে ওঠে। জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে।