ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

বইয়ের  কিংবা ওয়েবসাইটের পাতায় সবুজ থাকে না। হাতের মুঠোয় গেইমের একটা যন্ত্র পেলে এখন শিশুদের আর সবুজ চাই না। নগরের শিশু তো বটেই, আমাদের দ্রুত পরিবর্তনশীল গ্রামগুলোতেও শিশুর দৃষ্টি ইনডোরের বিনোদনে আটকে থাকে। সম্পন্ন ঘরের গ্রামীণ শিশুদের অনেকেরই ফড়িং ধরা, সাঁতার শেখা, মাছ ধরার মতো দারুণ অভিজ্ঞতা এখন আর হয়ে ওঠছে না। প্রযুক্তি শুধু নগরে নয়, আছড়ে পড়েছে গ্রামেও। গ্রামের শিশুর ফেইসবুক এ্যকাউন্ট আছে, ফোন আছে, অবসরে অনলাইনে ঘণ্টা দুয়েক অনায়াসে আনন্দে কাটিয়ে দেবার আয়োজন আছে। অদ্ভুত আভিজাত্যের বোধ, সেলফির সুন্দরে, আত্মপ্রেমে মগ্ন করে রাখছে বলেই গ্রামীণ মধ্যবিত্তের সন্তান সবুজকে দূরে রেখে বড়ো হচ্ছে, শহরের পানে চেয়ে চেয়ে।

.

বলতে চাইছি, এখনকার গ্রামীণ শৈশব-কৈশোরের নিদারুণ দারিদ্র‍্যের কথা। আপনি যদি নব্বই বা তার আগের কোনো দশকের গ্রামীণ শিশু বা কিশোর হয়ে থাকেন, এখন নিজের গ্রামে গিয়ে নিশ্চয়ই আর আগের রকমারি সবুজ বিনোদনের চিত্র চোখে পড়বে না। প্রযুক্তির দাবানলে ওসবকে পুড়তে না দিলে অবশ্য উন্নয়নের সংজ্ঞায় উত্তীর্ণ হওয়াও সম্ভব নয়। সুতরাং পরিবর্তন যা যা হচ্ছে, তাকে মেনে নিতেই হবে। আর যেহেতু আমার শৈশবকালটা আশি আর নব্বইয়ে মিলে কেটেছে, লতায়-পাতায় জড়ানো সেসব দিনের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত না হওয়ার গ্যারান্টি মিলবে–এমন আশা নেই। বুঝতে পারছি, ডিজিটাল জীবনাচার বা তার আকাঙ্ক্ষা যা এখনকার গ্রামীণ শিশুদেরকে উদ্দীপ্ত করে তুলছে, তার তুলনায় নিজের সবুজময়, পুরনো ছেলেবেলাকে কম ভালো ভাববার ঔদার্য আমার নেই।

.

সেদিন খুব জ্বর এলো। পৃথিবী বিষাদময় হয়ে ওঠলো। জিহ্বা যেনো নিমপাতার রসে ডুবে আছে। তিনতলার ঘরের জানলার ধারে মাথা ঠেকিয়ে ওবাড়ির দেয়ালঘেঁষা কয়েকটা কচুগাছ চোখে পড়লো। এখন বর্ষাকাল। এসময় কচুপাতার খুব বাড় বাড়ে। ছোটবেলায় জ্বর হলে যেমন মন চাইতো, এবারও তেমন হলো। শুকনো মরিচ দিয়ে তৈরী কচুপাতার ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়ার জন্য জীবন যায় যায়। ভাগ্যিস, বাজারে সেদিন কচুপাতা পাওয়া গিয়েছিলো। ছোটবেলায় আমরা মানকচুর পাতা মাথায় দিয়ে বৃষ্টি ঠেকিয়েছি অনেক। নগরে ওরকম বড়ো পাতাওয়ালা কচুগাছ দেখা যায় না। কচুপাতায় মুড়ে মাছ বিক্রির দৃশ্যও এখন বিলুপ্ত হয়েছে।

.

বর্ষায় আরেক ধরণের পাতার ব্যবহার ছিলো আমাদের গ্রামের বাড়িতে। আমরা একে ‘গইডারি পাতা’ বলতাম। ক্ষেতের জমি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেলে গ্রামে মাছ ধরার উৎসব পড়ে যেতো। রাতে পেতে রাখা জালে ধরা মাছগুলো সকালে যখন ছাড়িয়ে আনা হতো, ওগুলোর কোনো কোনোটির গা থেকে ঈষৎ গন্ধ বেরুতো। ওই মাছগুলোকে আলাদা করে কেটে এই গইডারি পাতা আর পেঁয়াজ দিয়ে ভূনা করা হতো। কী এক অদ্ভুত ঘ্রাণে ম-ম করতো চারপাশ! খেতেও ছিলো দারুণ সুস্বাদু। শেষবার বাড়ি গিয়ে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না এই গইডারি পাতা।

.

রান্নাঘরের পেছনে পাটখড়ি, কঞ্চি আর কাঁচা কলাপাতা দিয়ে দোকানটা দাঁড় করানো গেলো অনেক চেষ্টার পর। তখন থ্রি কি ফোরে পড়ি। দোকান দোকান খেলাটায় ওসময় বিরাট আভিজাত্য ছিলো। কলার খোল দিয়ে বানানো নানাজাতের খেলনা ছিলো দোকানের প্রধান পণ্য। ক্রেতারা বিস্তর কাঁচাপাকা কাঁঠালপাতা নিয়ে এসে হাজির হতো। ওগুলোই টাকা। আমাদের টাকা যেহেতু গাছে ধরতো, তাই কোনো খেলনাই কম দামে বিক্রি হতো না। কাঁঠালপাতার আরেকটি ব্যবহারের কথা মনে পড়ছে। চওড়া সাইজের একটি পাতার দুপাশে খুব কৌশলে ছিঁড়ে নিয়ে পাতাটির মাঝ বরাবর ঝাঁটার শলা ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। তারপর সেই নাতিদীর্ঘ শলাটিকে আরেকটা লম্বা পাটখড়ির ডগায় গেঁথে নিয়ে বাতাসের দিকে ধরে দৌড়াতাম। অমনি ভনভন করে ঘুরতে শুরু করতো পাতার ঘিন্নিটা। বাতাসের গতি ভালো হলে অবশ্য দৌড়াতে হতো না।

.

খারাজুরার পাতা। আমরা তো সে নামেই ডাকতাম। এ পাতায় ভালো সালসা হয়। এখনও গরমকালে বাজারর শরবতওয়ালাদের কাছে এর সালসা পাওয়া যায় কোথাও কোথাও। আমাদের বাড়ির পূবদিকে ফকিরবাড়ি। ওবাড়ির আড়ায় এই খারাজুরা গাছ ছিলো এক। ওখান থেকে পাতা নিয়ে প্রথমে ধুয়ে নিতাম। এরপর জগের পানিতে কিছুক্ষণ কচলে নিলেই তৈরি হয়ে যেতো পিচ্ছিল এক সালসা।  বাজারের সালসাওয়ালার কাছ থেকে শুনে আমরাও ওটাকে বলতাম নওজোয়ানি সালসা। দুয়েক গ্লাস নিজে খেয়ে অন্যদের খেতে দিতাম। পরে বাকিটা ফেলে দিয়ে খেলা সাঙ্গ। বড়োরা কখনও মানা করেননি।

.

মুরুব্বিগণ আমপাতা, আমডাল দিয়ে দাঁত মাজতেন। আমরাও তাদেরকে অনুসরণ করতাম। আর ভাবতাম, এই যে এর ভেতর ক্লোরোফিল আছে, এটি সোজা গিয়ে দাঁতের গোড়ায় পুষ্টি জোগাচ্ছে। কচি আমপাতায় বানানো সুন্দর বাঁশি আমাদের হাতে খুব মানাতো।

.

বাঁশির জন্য বিখ্যাত হল নারকেল পাতা। নারকেল পাতা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বিশাল সিঙ্গার মতো দেখতে, শক্তপোক্ত একটা বাঁশি বানাতে বেশিক্ষণ লাগতো না। কচুরিপানা দিয়েও চমৎকার বাঁশি বানানো যেতো। তবে নারকেল পাতার বাঁশি বেশ টেকসই হয়। শুধু বাঁশিই নয়, জীবনের প্রথম ঘড়ি আর প্রথম চশমাটি আমার নারকেল পাতায়ই তৈরি হয়েছিলো।

.

শৈশবে ‘গ্রাফিটি’ শব্দটি অজানা ছিলো; কিন্তু দেয়ালে আঁকিবুঁকির অভ্যাসটা বেশ ছিলো। সমস্যাটা যেটা ছিলো তা হলো, এই প্রতিভা চর্চার জন্য খুব বেশি দেয়াল গ্রামে পাওয়া যায়নি তখন। নিজেদের ঘর আর নিকটস্থ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেওয়ালই ছিলো ভরসা। লেখার জন্য রং-তুলি আসতো প্রকৃতি থেকেই। সেগুনপাতা আর সিমপাতা। কড়া খয়েরি আর সবুজ রঙ। আর কড়া বেগুনী রঙ পেতে আমরা পুইলতার কালো ফলের রস ব্যবহার করতাম। তবে এদের মধ্যে কচি সেগুনপাতা ছিলো আমার সবচেয়ে প্রিয়। সেগুন গাছটি অসভ্যের মতো দ্রুত আকাশচুম্বী হয়ে ওঠলো; তখন কচি পাতা পাওয়া খুব মুশকিল হয়ে পড়লো। দাদা একটি সেগুন গাছের চারা লাগালেন। কিন্তু ওই কচি গাছের পাতা এতো কম যে, ছিঁড়তে ইচ্ছে হতো না। সেটি যখন বহুপত্রল হয়ে ওঠলো, ততোদিনে আমিও বেশ বড়ো হয়ে গেলাম।

.

বেয়ারিংয়ের গাড়ি আমার জুটেনি। তবে যেহেতু বাড়ির এদিকে-ওদিকে অনেক সুপারি গাছ ছিলো, পাতাসহ সুপারির খোল দিয়ে গাড়ি বানিয়ে অনেক মজা করেছি। আমাকে অনেকক্ষণ ধরে খোলে বসিয়ে টেনে নিলে বিনিময়ে কাউকে কাউকে একটা খোল দিয়ে দিতাম। নয়তো অদল-বদল করে খোল টানা চলতো। অবশ্য ওসব সুপারি গাছ এখন আর একটাও নেই বেচে।

.

বাঁশের কচি পাতা, মানে যখন চিকন শলাকার মতো দেখতে হয়, দাঁত দিয়ে কামড়াতে ভালো লাগে। ঘাসের কচিপাতার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। ঘাস কামড়ানো হয় না বহুদিন। তবে কচি বাঁশপাতা ছেদন দাঁতের ফাঁকে নিয়ে সূতোর মতো কাটতে ভালো লাগে, এখনও। আমাদের গ্রামের বাড়িটা এখনো জঙ্গুলে। বাড়ির উঠোনে দুটো বাঁশঝাড়। বাড়ি গেলে যখন দেখি বাঁশঝাড় কচিপাতায় চেয়ে আছে– আমার মন ভালো হয়ে যায়। আমার দাঁত নিশপিশ করে। সবুজ আমার কেবল চোখে আর হাতে-ছুয়ে দেখলে চলে না; সবুজকে চেখেও দেখতে হয়, কচকচ করে কামড়েও খেতে হয়।

.

বারান্দায় কয়েকটা ফুলের গাছের পাশাপাশি আছে একগুচ্ছ তুলসী গাছ। ছেলেটা ঘরময় দৌড়ায়। এই নগরে সবুজ দেখতে পর্যটক হয়ে পার্কে যেতে হয়। সে কি আর সব দিন পারা যায়? এই এক চিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশটা দেখা যায়। ওদিকের কয়েকটা গাছও চোখে পড়ে। আমি দেখি, ও প্রতিবার বারান্দায় যায়, আর দুয়েকটা করে তুলসীপাতা ছিঁড়ে খায়। পরম্পরায় আমাদের শৈশব লেখা আছে গাছে গাছে, পাতায় পাতায়।