ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

১.
কাঙালি ভোজে যার পাতে ভোজ তোলা হচ্ছে, সে নিজেকে একজন কাঙাল হিসেবে নিশ্চিত করছে। সরকার তথা আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে তাদের শাসনামলে দেশজুড়ে  ‘কাঙালশুমারি’ কি সুখকর? দিনটি জাতির পিতার জন্মদিন হলেও না হয় উৎসব আমেজের সার্থকতা বোধ হতো, কিন্তু বছর বছর কাঙালিভোজ আয়োজন আড়েবহরে যেরূপে বাড়ছে, তাতে শোক দিবসের ভাবগাম্ভীর্যের বদলে লীগ কর্মীদের ভোজোৎসব প্রথা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শোকদিবসের জোশে বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ির আঙিনায় কাঙালিভোজ করলে তাতে বেগম খালেদা জিয়ার বোধদয় ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু আর ১৫ আগস্ট নিয়ে তামাশা কতটুকু? শেষ পর্যন্ত ২০ দলীয় নেত্রীর কেক কর্তন কিন্তু ঠেকানো যায়নি। সুস্থ পদ্ধতি হচ্ছে, ২০ দলীয় নেত্রীর জন্মদিন জানতে চেয়ে একটি রিট আবেদন করা। অবশ্য এ বিষয়ে কয়েকটি রিট ও মামলা রয়েছেই। ১৯৯৭ সালের একটি মামলা আছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালেও নালিশি মামলা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ও গণমাধ্যমে  অনেকেই বেগম খালেদা জিয়ার জন্মসনের বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ আকারে উপস্থাপন করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার জন্মসনদ, একাডেমিক সনদ, পাসপোর্ট, নাগরিক পরিচয়পত্র, ভোটার আইডিকার্ড, প্রধানমন্ত্রীত্ব থাকাকালীন সরকারি নথিপত্র এসবই যথেষ্ট আদালতে উপস্থাপনযোগ্য প্রমাণ হিসেবে। তারপরেও মামলার কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রিতা আশ্চর্যজনক। লীগকর্মীদের বরং তথ্যপ্রমাণ একজোট করে মামলাটিকে গতিশীল করায় মনোযোগী হওয়া উচিৎ।

২.
শোকের দিনে দেশে ও বিদেশে ভোজসভায়-শোকসভায় লীগসমর্থকদের মারামারির সংবাদ শিরোনাম দেখার পর মনে হয়েছে, যে এ কারণেই বলা হয়, শোক পরিণত হোক ‘শক্তিতে’! জাতির জনকের ছবিওয়ালা বিরিয়ানির প্যাকেটও ছিল এবারের শোক দিবসের অনন্য তাৎপর্য। এক শোকদিবসকে ঘিরে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের এতসব আয়োজনে ‘কাঁদো … … কাঁদো’ স্লোগানকে হৃদয়ে ধারণ করা ব্যতীত জাতির আর কোনও গত্যন্তর ছিল না।

৩.
বিশ্বের অনুপ্রেরণাময় নেতাদের তালিকা জাতির জনককে উহ্য রেখে করা সম্ভব নয়। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এই বাঙালি জাতির পরিধি ব্যাপক। এ কারণেই জাতির জনকের শোক দিবসে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে কলাম লেখেন ভারতের বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। জাতির জনক বিশ্বের ২৫ কোটি বাংলা ভাষাভাষীর নেতা। তবে জাতির জনক যখন বাংলাদেশের স্থপতি, তখন তো তিনি বাংলাদেশের সব ভাষাভাষী গোষ্ঠীর নেতা।

বাংলাদেশে ৩৮ থেকে ৪৫টি সম্প্রদায় রয়েছে যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয়। তারা অবাঙালি, তবে তারা  বাংলাদেশি। ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ বলতে গিয়ে আমরা যে জাতীয়তাবাদ প্রচার করি তা মুখ্যত ভাষাকেন্দ্রিক, যেখানে বাংলাদেশের অবাঙালি গোষ্ঠীদের অস্বীকার করা হয়। দৃষ্টিভঙ্গির অগভীরতায় বাংলাদেশের কিছু সম্প্রদায়কে জাতির পিতার শোকে সামিল হওয়া থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কেমন দূরে সরিয়ে রাখছি আমরা। বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সংকট থেকে আমাদের কি তবে এখনও উত্তরণ  ঘটেনি? জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান একজন বাঙালি। একজন বাংলাদেশিও। তার জন্য বাঙালি কাঁদবে। অবাঙালি বাংলাদেশি কাঁদবে। কাঁদবে বিশ্ববাসীও।

৪.
জাতির পিতাকে নিয়ে কমিক মুদ্রণ, শিশুদের বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শেখানো, পথ প্রদর্শনীতে জনতার কাছে জাতির পিতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা–এর সবগুলোরই সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তবে জাতির পিতাকে নিয়ে কালজয়ী এক অথবা একাধিক চলচ্চিত্র নেই কেন?

চিলড্রেন অফ ওয়ার (যুদ্ধশিশু) চলচ্চিত্রে শেখ মুজিবকে আলো-আঁধারিতে ফুটিয়ে তোলার একটা প্রচেষ্টা ছিল ক্ষণস্থায়ী ফ্রেমে। আফসোস হলো, চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে নির্মিত হলেও, এর নির্মাণ কারিগর ভারতীয়। সিনেমাটির সকল অর্জন ভারতীয় টিমের ঝুলিতেই যাবে। আসলে আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে পর্দায় উপস্থাপন আমাদের জন্য আবশ্যক। টালিগঞ্জ আর বলিউডে ইংরেজ শাসনকাল, পাক-ভারত ইতিহাস নিয়ে অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে; হচ্ছে। সিনেমাগুলো বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে, পুরষ্কার পাচ্ছে, এমনকি সফল হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবেও।

গত কয়েক বছরে আমাদের চলচ্চিত্রে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। উন্নত হয়েছে সিনেমা হল। কিন্তু সিনেমায় শক্তিশালী গল্পের বড় অভাব। আমরা কেন এখন আর নির্মাণ করতে পারছি না ১৯৭১ নিয়ে চলচ্চিত্র? কেন জাতির পিতাকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারছি না আমরা? জরুরি নয় এসব ক্ষেত্রে সরকারি অনুদান নিয়েই সিনেমা করতে হবে। কেন এমন চলচ্চিত্রে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ হচ্ছে না সে ব্যাপারে কোনও প্রতিবন্ধকতা থাকলে, সরকার বড়জোর সেই সব প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে সুবিধা দিতে পারে।

শোনা গিয়েছিল, জাতির পিতাকে নিয়ে চলচ্চিত্র হবে। তাতে মূল চরিত্র রূপায়নে অমিতাভ বচ্চনকে নেওয়ারও কথা উঠেছিল। আর অনেকদিন এ বিষয়ে নতুন কোন সংবাদ চোখে পড়ে না। থেমে যাওয়া উদ্যোগটি পুনরুদ্যমে এগুবে এমনটা বিশ্বাস রাখি। তবে এর মূল চরিত্র রূপায়নে কেন আমাদের দেশি কোনও অভিনেতাকে ভাবা যায় না? অমিতাভ বচ্চনের অভিনয় দক্ষতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু আমাদের নির্মিত সিনেমা আমাদের ইতিহাসকে চিত্রায়ণ করার পাশাপাশি আমাদের নির্মাতা, আমাদের অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরই তুলে ধরবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, এমনটাই তো প্রত্যাশিত।

৫.
কোকোর জানাজায় মানুষের ঢল নামার পর দেশব্যাপী এমন একটি পরিস্থিতি হলো যেন কোকো তার জীবদ্দশায় বিশিষ্ট কামেল ব্যক্তি ছিলেন। যাদের কথায় কথায় জাতির পিতাকে মেজর জিয়ার কাতারে নামিয়ে আনার বদভ্যাস রয়েছে, তারা কোকোর জানাজায় মানুষের ঢলে দেখে খুব এক চোট সুযোগ পেয়েছিলেন জাতির পিতা আর কোকোর মাঝে তুলনায়। ২০ দলের সমর্থকরা প্রায়শই বলেন শেখ মুজিবের জানাজায় এসেছিল মাত্র ১৬ জন। তারা অবশ্য বলেন না মানুষকে শেখ মুজিবের জানাজায় অংশ নেওয়া থেকে কী করে বিরত রাখা হয়েছিল।

জাতির পিতাকে হারিয়ে জাতি তখন তথৈবচ। যে কোনও বিদ্রোহ ফুঁসে ওঠার সুযোগ ছিল। সেই বিদ্রোহ দমনে জানাজা ছাড়াই কবর দেওয়ার তোড়জোড় ছিল, লোকচক্ষুর আড়ালে। সেদিন অপেক্ষারত শত শত মানুষকে জাতির পিতার গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত শরীর দেখানোর মতো সাহস ছিল না কারও। গ্রামবাসীরা জানাজায় অংশ নিতে চাইলে তাদের বিরত রাখতে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে ২০-৩০ জনের দ্বারা জানাজার যাবতীয় কর্ম সম্পন্ন করে জাতির পিতাকে সমাহিত করা হয়। সেইদিন ওই মাত্র কয়েকজনই ছিলেন ৩০ লাখ শহীদের প্রতিনিধি। সেইদিন ওই মাত্র কয়েকজনই করে গেছেন আজকের ১৬ কোটি জনতার প্রতিনিধিত্ব।

৬.
কাঙালিভোজের মোড়কে জাতির পিতাকে খোঁজা অর্থহীন। জাতির পিতার মুখচ্ছবি থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

 

***
প্রকাশিত: বাংলাট্রিবিউন, ১৮ আগস্ট ২০১৫