ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

কয়েক দিন যাবত অসুস্থ, হরতাল পরবর্তী সন্ধ্যায় একজন ডাক্তার দেখালাম । একগাদা টেস্ট করতে হবে। পরদিন অবরোধ, ইদানিংকার হরতাল, অবরোধে মারামারি, পোড়াপুড়ি যা তা অবস্থা। আগের দিন পেপার আসেনি, বোধয় গাড়ি ভাংচুর করে পুড়িয়ে দিয়েছে । আমি অনেক অসুস্থ, খেতে পারছি না, ঘুমাতে পারছি না, দিনে প্রচণ্ড শীত লাগে আর রাতে লাগে প্রচণ্ড গরম। হায় আল্লাহ! আমি কি চাঁদের হিসাবে চলা শুরু করেছি! চাঁদ উঠলেই গরম লাগে। নানাবিধ সমস্যা।

উপায় না দেখে পরদিন ছুটলাম ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সকাল দশটা, মাথা থেকে পা অবধি শীতের পোশাক পরেও আমার শীত কাটে না। যাদের শীতের পোশাক নেই তাদের অবস্থাতো চরম খারাপ। রাস্তায় মাত্র কয়েকটি রিকশা চলছে, তারমধ্যে আমি একটিতে। শুনেছি আগের দিনে এ শহরে দুদলের কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে, তাই আজ টানটান উত্তেজনা। ভয় লাগছে, কখন যে আমি এর শিকার হই। যদি এমন হয়, আমি কি বলব? আমি একজন রোগী এই অসহায়ত্ব দেখাবো, নাকি ওদের সাথে লড়াইয়ের বীরত্ব দেখাবো, জানিনা এ অবস্থায় কখনও পড়িনি। তাই আগে ভাগে বলা যাচ্ছে না ।

কোন রকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পৌঁছলাম। তাড়াহুড়ো করে বাসায় প্রেসক্রিপশন ফেলে চলে আসছি তাই আমাকে রেখে আমার বর আবার বাসায় এসে প্রেসক্রিপশন নিয়ে গেলেন। একটা টেস্ট করার পর কিছু খেয়ে দুঘণ্টা পর বাকি টেস্ট করাতে হবে তাই আবার বাসায় আসলাম। পরে গিয়ে বাকি টেস্ট করালাম। রিপোর্ট পাব বিকেল ৫ টার পর। সন্ধ্যের পর ডাঃ দেখিয়ে রাতে আম্মার সাথে কথা বললাম। আম্মা তখনি আমার কাছে আসার জন্য অস্থির। এত রাতে আসা সম্ভব নয়। তিনি পরদিনও আসতে পারলেন না, পরদিন ছিল আবার হরতাল। আমি বাসায় একা, আমাকে দেখার কেউ নেই, আমার বর অফিস থেকে ফিরে আমাকে সেবা করে, কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়।

এমতাবস্থায় আমার একজন সঙ্গী প্রয়োজন। এখানে আমার আপনজন বলতে কেউ নেই। এই বিপদের দিনে মা, বোন ছাড়া তো ভরসা করার কেউ নেই। যত শুভ কামনাই আত্মীয় স্বজনেরা করুক, সব দূর থেকে। আপনার পাশে বসে আপনার সেবা করা, বিনিদ্র থাকা, রান্না করে খাওয়ানোর জন্য মা বোন ছাড়া গতি নেই (নারীদের ক্ষেত্রে)। কমলা খেতে খুব ইচ্ছে করছে, এক হালি কমলা কিছুক্ষণের মধ্যে খেয়ে ফেললাম। ভয় হচ্ছে, এটা তো অবশ্যই কেমিক্যাল যুক্ত। ফলাফল তো উল্টো হবে। ডাঃ এসব ফল খেতে বারণ করলেন। কি খাব? মাছ, মাংস, শাক, সবজি, ফল, ডিম, দুধ, বিস্কুট, জুস সব কিছুতেই ভেজাল।

হরতাল,অবরোধ সঙ্গী করেই আব্বা ছুটলেন (দু ঘণ্টা ট্রেন জার্নি করে) গ্রামের বাজারে। উদ্দেশ্য, আমার জন্য বাজার করা। পরিচিত লোকদের গ্রামের বাড়ি থেকে জলপাই, কামরাঙা, জাম্বুরা, অনেকগুলো ডাব, শাক সব্জি, ডিম, পরিচিত জেলের কাছ থেকে হাওড় থেকে ধরা মাছসহ বিশাল সম্ভার নিয়ে সবাই হাজির। আমাকে দেখে ওদের সস্তি মিলল, আমি অকূল সাগরে দ্বীপ খুঁজে পেলাম । তিন চার দিন পর ওরা চলে যাবে, কিন্তু হরতাল, স্থানীয় ধর্মঘট এসবের কারনে আরও কয়েক দিন আটকে গেল।

এভাবেই হরতাল চলছে তার আপন গতিতে। তাকে ঠেকানোর সাধ্য কার? ডিসেম্বর মাসের হরতালগুলোতে অনেক ভুগেছি। কয়েকজন স্থানীয় নেতাদের হত্যা করা হয়েছে, তাই শহরের পরিস্থিতি বেশ থমথমে। হরতালে বিশ্বজিৎরা মরে, অগ্নিসংযোগে যানবাহন পুড়ে মানুষ নিঃস্ব হয়, কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়, সাধারণ মানুষ জেলে যায়, রাজনৈতিক হয়রানীর শিকার হয়, শিক্ষা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পরে, খাদ্য পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম, সর্বোপরি যাতায়াত বন্ধ।
তাহলে হরতালে আসলে লাভটা কার? বিরোধী দল কেন রাস্তায় নেমে আসে? জনগনের উপর কেন তারা আস্থা রাখতে পারে না? আমরা তো নির্বাচনের সময় আমাদের রায় জানিয়ে দিয়েছি। আমরা জেনে শুনে বিষপান করে আসছি এতকাল ধরে। যে দলই ক্ষমতায় যাক না কেন, আমাদের ভাগ্যের উন্নয়ন আমাদেরই ঘটাতে হবে, সরকারী দল নিজের ফায়দা লুটবে। হরতাল তো পুরনো পদ্ধতি, আপনারা এর বিকল্প খুঁজুন। আপনারা সংসদে গিয়ে কথা বলুন । কেন আপনারা রাস্তাকে বেঁছে নেন? সাধারণ মানুষের জান মালের ব্যাপারে আপনারা এতটা উদাসীন কেন? সরকারী দলে থাকা অবস্থায় হরতালকে অপছন্দ করা আর বিরোধী দলে গেলেই হরতালকে হাতিয়ার করে নেওয়া আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে ।

সাধারন মানুষের মত যদি প্রতিদিনের সঙ্গে আপনাদের জীবিকা নির্বাহের প্রশ্ন জড়িত থাকতো, তবে হরতাল, ধর্মঘটের প্রশ্নই আসতো না। একবার চিন্তা করে দেখুন, একজন রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে কত মানুষের তিন বেলা খাবার দৈনিক আয়ের সাথে জড়িত। একজন ছাত্র স্কুলে যেতে পারছে না, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েও পরীক্ষা দিতে পারছে না, বার বার পরীক্ষার তারিখ পেছানো হচ্ছে। সে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ছে। এগুলো আপনাদের ভাবনার যোগ্যতা রাখে না, তাই না? আপনাদের সন্তানদের নিয়ে তো চিন্তা নেই, ওদের থাকা, পড়াশুনা, চাকুরী এমন কি বিয়ে শাদী সবই তো দেশের বাহিরেই হচ্ছে । আর যারা দয়া করে দেশকে ভালবেসে দেশেই রাখছেন, তাদের জন্য তো আপনার অঢেল সম্পদ তো আছেই, মাসআল্লাহ্‌ । চিন্তা কি !

তাই আম জনতার কথা আপনার ভাববার প্রয়োজন নেই।আজ আবার হরতাল। বিরোধী দল এই উপহার বার বার দিবেন, এই ইঙ্গিত ইতিমধ্যে দিয়ে রেখেছেন। জানিনা আরও কত কি দেখতে হবে। আমি রাজনীতি বুঝি না, শুধু চাই বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হোক। এর দায়ভার আমি সরকারের একার উপর ছাড়ছি না। আমি আমার অবস্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছি । আমি শ্রম, মেধা কাজে লাগাচ্ছি, মানুষকে মানব সম্পদে উন্নয়নের চেষ্টা করছি, মানুষকে ভালবেসে পাশে থাকার চেষ্টা করছি। আমার মত সাধারণ মানুষের এই প্রচেষ্টাতেই দেশ এগুচ্ছে বলে আমার বিশ্বাস।

কিন্তু আমরা চাই যোগ্য নেতৃত্ব । যে আমাদের কথা ভাববে, আমাদের ভাবনা গুলোর কদর করবে, আমরা যার উপর আস্থা রাখতে পারি। আমরা জানি না, আমাদের জীবদ্দশায় এই সুদিন আমরা দেখতে পাব কি না!

লিয়া সরকার ।
০৫-০১-১৩

৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. atmkader বলেছেনঃ

    বিএনপি-জামাত হরতাল দেয় রাজাকারদের বাচানোর জন্য, বামরা দেয় সরকারকে মদদ দেবার জন্য আর আওয়ামীরা দেয় অন্য সবাইকে হঠিয়ে জনকের রাজত্ব চিরদিনের করে রাখার জন্য । [এ সহজ কথাটা বুঝলেননা !] ফলাফল গণনাভিশ্বাস । এ ধারা চলতে থাকবে অনেকদিন,যতদিননা ফয়সালা হয় দেশটা কার ! কারো জনকের ?কারো স্বামীর ? না গণমানুষের ?

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...