ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, মানবাধিকার

 
02_international+day+of+indigenous+people_090815_0004

গারো আদিবাসী বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, সিলেট সুনামগঞ্জ, মৌলভিবাজার, ঢাকার গাজিপুর এবং টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় এ গারো আদিবাসীদের বসবাস । ২০০১ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) গারো আদিবাসীদের বসবাস রয়েছে এই দেশে। গারোদের আদি ধর্ম ছিল সাংসারেক ধর্ম অর্থাৎ প্রকৃতি পূজারি ছিল গাছপালা প্রকৃতিকে পূজাই ছিল প্রধান ধর্ম কিন্তু‘ ইতিহাস অনুযায়ী ১৮৬২ সনের পর থেকে খৃষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে বর্তমানে প্রায় ৯৮ ভাগই খৃষ্টান ধর্ম পালন করে। খৃষ্টান ধর্ম গ্রহন করার পর অনেক কিছু পরিবর্তন হওয়া সত্বেও নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার-রীতিনীতিকে গারোরা বিসর্জন দিতে পারেনি। ধর্ম পালন করে ঠিকই, কিন্তু সামাজিক রীতিনীতি কৃষ্টি-কালচার, উত্তরাধিকার আইন সব কিছুই নিজেদের। গারোদের যে কালচার-কৃষ্টি সে অনুযায়ীই অনুসরণ করে ও পালন করে চলেছে এটা একটি গর্বের বিষয় । সবচেয়ে অন্যরকম একটি বিষয় বা কৃষ্টি হলো গারোরা মাতৃতান্ত্রিক পরিবার । বলা হয়ে থাকে সারা বিশ্বে শুধুমাত্র গারো আদিবাসিদের মধ্যেই এ প্রথা বা নিয়ম বিদ্যমান । অর্থাৎ সম্পত্তির মালিক উত্তরাধিকার সূত্রে মেয়ে সন্তানরাই পায় কোন ছেলে সন্তান পেতে পারে না এবং এখনও পায়না যদি জীবিতকালে মা-বাবা উইল করে দিয়ে না যায় বা মেয়ে সন্তান অর্থাৎ বোনরা যদি দয়া করে না দেয় তার ভাইদের জন্য।

আরেকটি বিষয় হলো সন্তানরা মায়ের টাইটেলকে বা মাহারিকে গ্রহন করে । মাহারি হলো গোষ্ঠী বা টাইটেল অর্থাৎ যে কোন সন্তানের পরিচিতি তার মায়ের টাইটেল দিয়ে পরিচিতি পায় । যে কোন জায়গায় গেলে বা কোথাও পরিচিতি জানাতে হলে মায়ের টাইটেল দিয়েই পরিচিতি করতে হয় । যেমন আমার নাম লীনা জাম্বিল, এই লীনা হলো নাম আর জাম্বিল হলো আমার টাইটেল বা মাহারি। আমার বাবা ফিলিপ রেমা অথচ আমার টাইটেল জাম্বিল কেন প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক কিন্তু আমার মা যেহেতু মর্জিনা জাম্বিল তার টাইটেল জাম্বিল তাই আমিও জাম্বিল।

আমরা ৬ ভাইবোন সবাই জাম্বিল। ছেলে সন্তান হোক আর মেয়ে সন্তান হোক কেউ বাবার টাইটেল নিতে পারেনা এবং বাবার টাইটেল দিয়ে পরিচিতি কোন সন্তানেরই হয় না। আমার যত সন্তান সব জাম্বিল মাহারি দিয়েই পরিচিতি লাভ করতে বাধ্য গারোদের রীতি অনুযায়ী এবং এখনো এ রীতিতেই চলছে কিছু শিক্ষিত জনরা হয়তোবা রেজিষ্ট্রেশন করার সময় স্কুলগুলোতে বাবার টাইটেলকে শখ করে গ্রহন করে কিš‘ সমাজে তাকে মার টাইটেল দিয়েই পরিচিতি লাভ করতে হয়।

আরেকটি আশ্চর্যরকম একটি রীতি হলো কোন দম্পতির যদি মেয়ে সন্তান না থাকে তবুও কোন ছেলে সন্তান তার মা-বাবার সম্পত্তি লাভ করতে পারবে না। সেই সম্পত্তি তার মায়ের অন্য আত্মীয়-স্বজন পাবে কিন্তু কোন ছেলে সন্তানের সম্পত্তি পাওয়ার অধিকার নেই । তাই নিজের  মেয়ে সন্তান জন্ম না হলে পালক মেয়ে সন্তান নিয়ে এসে তার জন্য সম্পত্তি দান করার রীতি রয়েছে এবং এমন অনেক পরিবার এখনো রয়েছে । তবে বর্তমানে গারোদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত হওয়ার কারণে ছেলেদেরকেও সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে না।

যে বিষয় এখানে তুলে ধরতে চেয়েছি সেই বিষয়টি হলো গারোদের মেয়ে সন্তানরাই সব সম্পত্তির মালিক। গারো রীতি অনুযায়ী  গারোদের মধ্যে মেয়ে সন্তানরা বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি যায় না বরং ছেলেরাই জামাই হয়ে মেয়ে বাড়িতে চলে আসে এটাই গারোদের আসল রীতি । বর্তমানে বাঙালি সংস্কৃতির ছোঁয়া পেয়ে তাদের সংস্পর্শে এসে শিক্ষিত গারো ছেলেরা আর শ্বশুর বাড়িতে ঘর জামাই হিসাবে থাকতে সংকোচ বোধ করে। তাদের সম্মানহানী হবে এমন ধারনা থেকে বউ উঠিয়ে নিয়ে এসে নিজের ঘরে থাকে বা স্বাধীন বিয়ে করে নিজের মত সংসার করে চলেছে ।

বাইরে থেকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, যেহেতু মেয়েরাই সম্পত্তির মালিক তাই সব ধরনের ক্ষমতা তাদের হাতেই রয়েছে। এমন মনে করাটা স্বাভাবিক কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম । বাস্তব চিত্র যদি দেখি তাহলে বলা যায় যে মেয়েদের শুধুমাত্র নামেই যেন সম্পত্তির মালিক বানানো হয়েছে অথচ তার কোন ক্ষমতা বা প্রয়োগ কোথাও দেখা যায় না।

এ সম্পত্তিতে কেন পরিবারেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার কোন ক্ষমতাই যেন মহিলাদের নেই বলতে গেলে। অনেকে হয়তো আমার সাথে ভিন্ন মত পোষন করবে এবং করাটাই স্বাভাবিক। কারণ সব পরিবারে এমন হয় না । তবে বেশির ভাগ পরিবারের দিকে তাকালে আমরা যা দেখি সেটাকেই তুলে ধরছি আমি। সব সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা পুরুষদেরই থাকে । ঘর থেকে বের হবে কি হবে না, কোথাও যাবে কি যাবে না, কি রান্না করবে সে পর্যন্তও পুরুষের উপর নির্ভর করতে হয় । কোন সভা সংগঠন করবে কি করবে না, কোন সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহন করবে কি করবেনা সব কিছুই পুরুষের অনুমতির উপর নির্ভর করতে হয় । পরিবারের সকল দায়িত্ব কিন্তু মেয়েরাই করে । ঘর ঘোছানো, খাবার দাবার প্রস্তুতি, রান্না, মুরুব্বি থাকলে তাদের যত্ন, সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব সব মেয়েদেরকেই করতে হয়।

এরপর গারোদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো কৃষি জমিতে হালচাষ করা ছাড়া সব ধরনের কাজ মহিলাদের পুুরুষদের পাশাপাশি সব কাজই করে, ধান লাগানো থেকে শুরু করে, আগাছা পরিস্কার, ধান কাটা ধান মাড়ায় যেমন করে তেমনি অন্য ফসল রোপনের বেলায়ও একই কাজ করে । অথচ এই ফসল যখন বিক্রি করে তখন কত বিক্রি হলো তা জানানোরও প্রয়োজন মনে করে না অনেক পুরুষ আর বিক্রি করে কিভাবে টাকা খরচ করা হলো সে বিষয়ে জানতে চাওয়া তো অনেক দূরের কথা।

পরিবারে সংসারে অভাব আসতেই পারে এবং অভাব আসাটাই স্বাভাবিক। এই অভাব আসলেই আর কোন কথা নেই প্রথমেই হাত দিতে হবে জমির উপর যেন জমি বিক্রি করা ছাড়া এই অভাব উত্তরনের আর কোন উপায় নেই কারণ জমি তো বউয়ের জমি নিজের জমি না এতে এই মনোভাবরই বহিঃপ্রকাশ পায় । যদি জমি বিক্রি করতে কোনভাবে একটু আপত্তি করে তাহলে তো আরো কোন কথায় নেই সেই সংসারে যেন খড়গ নেমে আসে । তখন একটা অজুহাত পেয়ে বসে, তোমার সংসার তুমি বুঝো আমি এতে নেই, ব্যাশ আর কোন খোঁজ খবর নিবেনা। স্ত্রী সন্তান কিভাবে দিন যাপন করছে, কিভাবে সামাল দিয়েছে তার কোন খোঁজ খবর রাখবেনা । কোথায় কিভাবে সারাদিন আড্ডা দিয়ে বেড়ায়, শুধু খাবার সময় আর ঘুমানোর সময় হলে দেখা মিলবে এর আগে না ।

স্ত্রীদের ব্ল্যাকমেইল করার নব নব কৌশল করে যাবে আর স্ত্রী বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করতে রাজি হয়ে যেতে হয়। না হলে সংসার টিকবে কিভাবে? স্ত্রী রাজি না হলে তো জমি বিক্রি হলেও জমি রেজিস্ট্রিকরণের বেলায় স্ত্রীকে লাগবেই এ কারনে এমন নব নব কৌশল করে স্ত্রীকে বাধ্য করে । আবার অনেকে স্ত্রীকে না জনিয়েই তার জমি অন্যের কাছে বিক্রি করে দেয় যখন জমি দখল নিতে আসে তখন জানা হয় যে এই জমিটি বিক্রি হয়ে গেছে তার স্বামীই বিক্রি করে দিয়েছে । আমার জানা নেই স্বামী থাকা অবস্থায় কোন স্ত্রী নিজের প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছামত কারো কাছে স্বামীর অনুমতি ছাড়া নিজের জমি বিক্রি করেছে কিনা আজ পর্যন্ত শুনি নাই অথচ অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে স্বামী না জানিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে করার কিছু নেই ।

কোন স্বামী যদি না জানিয়ে বউয়ের সম্পত্তি বিক্রি করে তখন নানা উদাহরণ নিজের সংসারের প্রয়োজনেই নিজের সন্তানদের জন্যই বিক্রি করেছে সে তো কেউ না নিজেরই স্বামী করার কিছু নেই । আর যদি সন্তানদের প্রয়োজনই উচ্চশিক্ষার জন্য বা চিকিৎসার জন্য বিক্রি করতে চায় নিজের জমি তাহলে সে স্বামীর অনুমতি ব্যতীত কোন ভাবেই বিক্রি করতে পারবে না কোনভাবে বিক্রি করলেই সে হলো অলক্ষি চরিত্রহীনা, বেহিসাবী, সংসারী না আরো নানাধরনের কত অপবাদ কত অপমান সমাজে মূখ দেখানোই তখন বড় দায় হয়ে যায় ।

সুতরাং যতই জমির মালিক হোক না কেন, নামে শুধুমাত্র মালিক। নিজের কোন ক্ষমতা নেই, অধিকার নেই এই জমির উপর । থাকা না থাকা সমান কথা যেন । তবুও গর্ব করে গারোরা বলতে পারে জমির মালিক আমরা মহিলারা। সচেতন মহিলারা নিজের মালিকানা থাকার কারণে সকল ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারও বাস্তবায়ন করতে পারে । যত চাপ প্রয়োগই হোক না কেন আমাদের এ রীতিকে আমি মনেপ্রাণে ভালবাসি। কেউ কেউ এ রীতিকে ভাঙার জন্য নানা অপপ্রচার প্রচারণা শুরু করেছে, গারোদের মধ্যেই, যেন মহিলাদের হাতে জমির মালিকানা না থাকে।
জমির মালিকানা এবং ক্ষমতা দুটোই মহিলাদের থাকুক এটাই কাম্য গারো জাতিকে রক্ষার জন্য ।