ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

এমনকি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা), হযরত মুসা, হযরত ঈসা এঁদেরও পূর্বকার কনফুসিয়াস, গৌতম বুদ্ধ, সক্রেতিস প্রমুখ মহাপুরুষেরা যারা মানুষের মুক্তির বার্তা ও দুর্দিনের সতর্কবাণী নিয়ে এসেছেন, তাঁরাও সাংবাদিক অর্থাৎ সংবাদবাহক।

সংবাদ, সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা এখন নেতিবাচক শব্দ। নতুন সহস্রাব্দের শুরু থেকে বাংলাদেশের সংবাদ ভুবনে নতুন নতুন খবরের জন্ম হচ্ছে এবং দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পটে সংবাদ ভুবন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছে। কিন্তু, বাংলাদেশের সংবাদ ভুবন রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ মজবুত হবার বদলে ভেঙ্গে অবনতির দিকে এমনভাবে ধাবিত হল যে, এর একটা নাম হয়ে গেল- হলুদ সাংবাদিকতা।

ব্যক্তিগত লাভ-লোভ ও আনূকুল্য লাভের জন্মগত স্বভাবের কারণে যেনতেন উপায়ে অর্থ উপার্জন জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়ায় ধর্মীয়-সামাজিক-শিক্ষা-আইন সর্বত্র দুর্নীতির জয় জয়কার। তাই, বাদ যায়নি সংবাদ জগৎ। শুরুটাও হয়েছে কেন্দ্র বা জাতীয় সংবাদ মাধ্যম দিয়ে। আর, মফস্বলে সংবাদ-বাণিজ্যপত্র হয়েই প্রকাশিত হয়। হোটেল-রেস্তুরা, ঠিকাদারী-আড়তদারীর মত এক প্রকার যৌথ ব্যবসার নাম- সংবাদপত্র। প্রকাশক, সম্পাদক এখানে ‘ব্যবসায়িক পার্টনার’ নামেই পরিচিত হন।

হবিগঞ্জ জেলা হতে অন্তত ত্রিশটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ট্যাবলয়েড সাইজের নিউজপ্রিন্ট কাগজে চার পৃষ্ঠা। এর প্রথম পৃষ্ঠা বিভিন্ন জাতীয় মাধ্যমের কপিপেস্ট আর স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ যেমন: চার সন্তানের জনক চাচার সাথে ষোড়শী ভাতিজির পলায়ন, পরিবারের অস্বীকার। পত্রিকার প্রকাশিত শব্দ ও বাক্যের অধিকাংশই ভুলে ভরা থাকবেই। তাও মাঝে মাঝে নয়, নিয়মিত। বাকী তিন পৃষ্ঠা ব্যক্তিগত খবর ও বিজ্ঞাপন, যার অধিকাংশ হাস্যকরও বটে। প্রতিদিন থাকে হারবাল কোম্পানী আর কোচিং সেন্টার এর বিজ্ঞাপন।

নমুনা হিসাবে হবিগঞ্জ জেলা হতে প্রকাশিত ‘সমাচার’ নামে স্থানীয় একটি দৈনিককে নিতে পারি। গত ৮ জুন প্রকাশিত একটি সংবাদে ক্ষুন্ন হয়ে, ‘সমাচার’ পত্রিকার সম্পাদক, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত তথ্য-প্রযুক্তি আইনের এক মামলায় সম্পাদককে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠানো হয় এবং উক্ত সম্পাদকের রিমান্ডের আবেদন জানালে জেল গেইটে জিজ্ঞাসাবাদ করার আবেদন মঞ্জুর করেন বিজ্ঞ আদালত। ঢাকা হতে প্রকাশিত একটি অনলাইন পত্রিকার বরাত দিয়ে এক সংবাদ প্রকাশিত হয় স্থানীয় ওই পত্রিকায়।

আগামি সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দলীয় ৮০ জন এমপি মনোনয়ন বঞ্চিত হবার আশংকা রয়েছে এবং এর মধ্যে হবিগঞ্জের একজন সাংসদ রয়েছেন বলেও উক্ত সংবাদে প্রকাশিত হয়। উক্ত সংবাদে ক্ষুদ্ধ হয়ে, স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা পত্রিকাটির সম্পাদকদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করলে দৈনিকটির সম্পাদককে গ্রেফতার করতে পারলেও অপর দুই সম্পাদককে গ্রেফতার করাে সম্ভব হয়নি।

এরপর, ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ, মামলা অতঃপর সম্পাদক গ্রেফতার ইত্যাদি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এমনকি, গত ১২ জুন তারিখে প্রকাশিত জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘Daily Star’ পত্রিকায় জনৈক কলাম লেখক শাখাওয়াত লিটন বিষয়টি নিয়ে ‘A dark cloud on freedom of press’ শিরোনামে একটি কলাম লেখেন। উক্ত কলামে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার সমালোচনা এবং গ্রেফতারকৃত সম্পাদকের পক্ষে তার মতামত তুলে ধরেন। উক্ত কলাম লেখক গ্রেফতারকৃত সম্পাদক এবং তার কর্তৃক প্রকাশিত পত্রিকা সম্পর্কে কতটুকু জানেন তা জানিনা বলে মফস্বল পত্রিকাসমূহের সম্পাদক ও সম্পাদনা সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করছি।

জেনে অবাক হতে পারেন, হবিগঞ্জ জেলা হতে প্রকাশিত পত্রিকার সাথে জড়িত অধিকাংশ সাংবাদিক- প্রতিবেদক- সম্পাদক নিরক্ষর। অর্থাৎ এরা বাংলা ভাষায় লিখতে ও পড়তে পারেন না।

একটি/দুইটি বাদ দিলে হবিগঞ্জের পত্রিকায় টাকা ছাড়া সংবাদ প্রকাশিত হয় না। বিশেষ করে, ওই সমাচার পত্রিকায় কোন সংবাদ পাঠালে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ প্রথম যে কথাটি জানতে চাইবেন তা হল- “নিউজের সাথে বিল আছে কিনা?”। বিল বা টাকা দিলে যেকোন সংবাদ প্রতিবেদন ছাপানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। উল্লেখ্য, প্রেরিত সংবাদের নীচের অংশে বিল, বিকাশ, ফ্ল্যাক্সিলোডের পরিমান লিখে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

যে সংবাদ প্রকাশ নিয়ে মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা তার মূলে রয়েছে বিল বা টাকা, সম্পাদকদের নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতা। দেশে এমন অনেক প্রিন্ট ও অনলাইন পত্রিকা রয়েছে যারা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। পত্রিকায় অর্থ কিংবা কোন সুবিধার বিনিময়ে যেকোনো ধরনের সংবাদ প্রতিবেদন করতে দ্বিধা করেনা। ঢাকা হতে প্রকাশিত অনলাইন পত্রিকার সূত্র ধরে নয় কারো প্ররোচনা এবং সাথে কিছু অর্থ পেয়েই ওই সংবাদটি প্রকাশ করে ‘সমাচার’।

পত্রিকার মালিক পক্ষের একজন এবং একজনমাত্র কম্পিউটার অপারেটর হবিগঞ্জের একটি পত্রিকা প্রকাশের জন্য যথেষ্ট। বলতে গেলে সংবাদপত্রকে পণ্যে রূপান্তরকরণে হবিগঞ্জের ‘সমাচার’ পত্রিকাটি প্রধান ভূমিকা রাখে। আর, আমার বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একবার ঘুরে আসেন হবিগঞ্জের যেকোন একটি সংবাদপত্রের অললাইন সংস্করণে। যদিও মাত্র চারটি পত্রিকা অনলাইনে প্রকাশিত হয়।